পাঞ্জাবে আর্যসমাজের নেতৃত্বে
ছিলেন উচ্চ-বর্ণের সমাজে প্রতিষ্টিতরা যারা ছিলেন বনিক শ্রেনীর মানুষ।
প্রাথমিকস্তরে সমাজে ব্রাহ্মণদের কর্তিত্ত্ব অস্বীকার করার জন্যে এই সংস্কারবাদী
আন্দোলন সামামজিক পরিমণ্ডলে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। আর্যসমাজীরা
ব্রাহ্মণদের ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে মধ্যস্ততাকারী ভূমিকাকেও অস্বীকার করতেন। এই
নিরিখে ব্রাম্মন্যবাদীদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে বনিকশ্রেনীস্বার্থের সামাজিক
দ্বন্দই প্রতিভাত হয়। প্রাচীন সামাজিক বর্নাশ্রম প্রথায় ব্রাহ্মণ শ্রেণীর বিরুদ্ধে বনিক শ্রেনীর অবস্থান স্বাভাবিক শ্রেনী দ্বন্দ ও সমাজপ্রগতিরই
অনিবার্য নিয়ম। বনিকশ্রেনী অবস্থান সমাজে আরো প্রাধান্য লাভ করেছিলো পাঞ্জাবে কৃষিজীবিদের
মধ্যে মহাজনী কারবার চালিয়ে। কৃষক ঋণের ফাঁদের পড়লেই, যা অতি স্বাভাবিক পরিণতি
ছিল, তার জমি এই বনিকশ্রেনির কবলেই চলে যেত। এই জমি থেকে বিতাড়নের প্রক্রিয়া উনিশ
শতাব্দীর শেষের দিকে একটা গতি লাভ করে এমন
স্তরে চলে গেছিলো যে বৃটিশ রাজ, ১৯০১ সালে আইন পাস করে গ্রামীন গোষ্টীকে রক্ষা
করার অভিপ্রায়ে কারণ তাঁদের শাসনের ভিত্তি
ছিল গ্রামাঞ্চল। (সুত্রঃ- N. G.
Barrier, The Punjab Alienation of Land Bill of 1900, Durham, Duke University
Press, 1966)। বৃটিশ রাজের প্রতি হিন্দু উচ্চবর্ণের অভিজাতরা এই আইন
প্রনয়ণ ও প্রয়োগে ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হল। বর্ণ হিন্দুদের মধ্যে এই অসন্তোষ আরও তীব্র হলো ১৯০৬
সালে যখন লর্ড মিন্টো নির্বাচনের পদে মুসলমানদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বে আলাদা ভাবে সংরক্ষণের দাবীকে বৈধতা ও প্রতিশ্রুতি দিলেন। মুসলমান সংখ্যালঘুদের জন্যে আলাদা ভাবে পদের সংরক্ষণের
আইন গৃহীত হলো। এই আইন মিন্টো-মরলী
সংস্কারে বৃটিশ ভারতে ১৯০৯ সালের আগে কার্যকারী
হয়নি । কিন্ত পাঞ্জাবে আর্য্য সমাজের নেতৃস্থানীয় উচ্চবর্ণের
ব্যক্তিরা ১৯০৭ সালে বিভিন্ন হিন্দু সভা প্রতিষ্টা হয়েছিল ১৯০৭ সাল থেকেই বৃটিশ অনুসৃত এই নীতির পরিণামের
আশঙ্কায়। এই আশঙ্কার বহিঃপ্রকাশ ঘটল হিন্দু সমাজের মুখপাত্রে এবং আর্য সমাজের নেতা
লাল চন্দের প্রতক্ষ্য মদতে। (সুত্রঃ- Lajpat Rai, A History of the Arya Samaj, Bombay,
Orient Longman, 1967)। আর্য্য সমাজের সদস্যরা নিজেদের বৈদিক বিধিকে
অনুসরণ করতো , নিজেদের ‘হিন্দু’ হিশেবে জাহির করতো না । কিন্ত বৃটিশ নীতি ও ধর্মের ভিত্তিতে জনসংখ্যা গণনার
পদ্ধতি তাঁদের বাধ্য করলো হিন্দুধর্মের অন্যান্য মতবাদীর সাথে মিলিত হতে। এই
বিভিন্ন হিন্দু ধর্মীয় মতবাদের মধ্যে ছিল রক্ষণশীল হিন্দু ধর্মালম্বীরা (সনাতনীরা)
যারা আর্য্য সমাজকে বিরূপ দৃষ্টিতে দেখতো তাঁদের বিভিন্ন সংস্কারবাদী
কার্য্যকলাপের জন্যে। (সুত্রঃ – Lal
Chand, Sanatana Dharma : An Advanced text Book of Hindu religion and Ethics,
Benaras: Central Hindu College, 1904, 2nd Edition)। কারণ
আর্য্য সংস্কারবাদীরা হিন্দু ধর্মে প্রতিমা পূজা, বর্নাশ্রম এবং ব্রাহ্মণের
আধিপত্য অস্বীকার করতো। যুক্তপ্রদেশ (
বর্তমান স্বাধীনত্তর উত্তরপ্রদেশে) রক্ষণশীল সনাতনী হিন্দুদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। এই
যুক্তপ্রদেশে ছিল হরিদ্বার, বারানসীর মতন পবিত্র ধর্ম ক্ষেত্র যেখানে আর্য্য
সমাজের প্রভাব কম ছিল। পুরসভা নির্বাচনীর প্রেক্ষাপটে মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্যে
সংরক্ষণের প্রতিক্রিয়ায় উনবিংশ শতাব্দীর
দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগে এই সনাতনীরা যুক্তপ্রদেশে হিন্দু সভা গঠনে প্রধান ভূমিকা
পালন করেছিলো।এই হিন্দু সভার নেতা ছিলেন স্বনামধন্য সনাতনী মদন মোহন মালব্য।
(সুত্রঃ – Biography of Malavya by
Paramanand, Mahatma Madan Mohan Malaviya, An Historical Biography, Varanasi,
BHU, 1985, 2nd Volume)। ১৯১৬ সালে মালব্য বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। (সুত্রঃ – S.L. Dar and S. Somaskandan, History of the Benras Hindu
University, Banaras, BHU, 1966)। এই হিন্দু
সভা আন্দোলন বিক্ষিপ্ত ভাবে পাঞ্জাব, যুক্তপ্রদেশ অতিক্রম করে বিহার, বাংলা,
মধ্যপ্রদেশ ও বেরার আর বোম্বে প্রেসিডেন্সী অবধি ছড়িয়ে পড়েছিল। এই আঞ্চলিক হিন্দু
সভা শাখাগুলো ১৯১৫ সালে তাদের প্রতিনিধি হরিদ্বারে পাঠিয়ে সারা ভারত হিন্দু মহাসভা
প্রতিষ্ঠিত করলো। এই কেন্দ্রীয় সংঘটনের কার্য্যপ্রনালী লক্ষ্য শুধু মাত্র সমাজ
সংস্কারের নিরিখে সনাতনী ও আর্য্য সমাজের মধ্যে দ্বন্দ নিরসনের জন্যে নয়, কিন্ত বৃটিশ শাসনের সম্যক ধারণার নিরিখে; সনাতনীরা বৃটিশ শাসনের সার্বিক অবস্থার
ওপরও বৃটিশ শাসনকে স্বীকৃতি দিত কিন্ত আর্য্য সমাজীরা এই রাজনীতিতে এই দৃষ্টিভঙ্গি
পরিহার করে সমাজ সংস্কারে নানাবিধ
কার্য্যপ্রনালীতে মনোনিবেশ করেছিলো। হিন্দু
মহাসভার পুনর্জাগরণ ঘটলো আবার ১৯২০ সালে। এই পাচঁ বছরে হিন্দু মহাসভায় মতাদর্শে
কিছু গুনগত উপাদান সংযোজিত হয়। হিন্দু জাতীয়তাবাদকে এক বিশেষ পর্যায়ে অগ্রাধিকার
দেওয়ার প্রয়াস দেখা যায়। প্রাথমিক সামাজিক-ধর্মীয় আন্দোলনে বিবর্তনের প্রক্রিয়ায়
এই পাশ্চাত্যবাদী আতঙ্ক থেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ একটি মূর্ত রূপ ধারণ করে। কালের
নিরিখে এবার এই মতাদর্শের আক্রমণের লক্ষ্য ও অভিমুখ সরে দাড়ালো ‘বহিরাগত’ খ্রষ্টানদের থেকে মুসলমান
সম্প্রদায়ের ওপর। মুসলমান সমাজ হয়ে গেলো এদের কাছে ‘threatening other’ । শুধুমাত্র বৃটিশ কর্তিক প্রচলিত
মিন্টো- মরলী সঙ্কারের জন্যে নয়, কিন্ত অসহযোগ- খেলাফত আন্দোলনে মুসলমান সম্প্রদায়ের
মানুষের অংশগ্রহণ হিন্দু জাতিয়াতাবাদ মতাদর্শের
বিকাশকে আরও ত্বরান্বিত করলো। খিলাফত আন্দোলন গড়ে ওঠে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
চলাকালীন যে সব চুক্তি সম্পদিত হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ওটোমান সাম্রাজ্যের
পরাজয়ে পরে মুসলিম দুনিয়ায় খিলাফত অপসারণ। এই চুক্তিতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের
প্রতক্ষ্য মদত ছিলো এবং ভারতীয় মুসলমানদের ক্ষোভকে জাতিয়াতাবাদী আন্দোলনের মুল
স্রোতে মেলাতে চেয়েছিলেন গান্ধীজী। হিন্দুমহাসভা এই প্রচেষ্টা কে ভালো চোখে দেখেনি
কারণ ১৯২০ দশকের প্রথম থেকেই দেশ জুড়ে বিভিন্ন কারণে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক
দাঙ্গা লেগেই থাকত যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য কেরলাতে মোপলা বিদ্রোহ। প্রসংত এই
বিদ্রোহের চিত্র ছিলো মুসলাম ক্ষেতমজুর
(মোপলা) দের হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে এক শ্রেণী সংগ্রামের প্রতিফলন যাকে সাম্প্রদায়িক রঙে রঞ্জিত করতে চেয়েছিলো মহাসভা।
(সুত্রঃ – R. L. Hardgrave, Jr., ‘The
Mapilla Revolution, 1921 : Peasant Revolt in Malabar’, Modern Asian Studies,
Vol 11, no 1, 1977)। ধারাবাহিক
মিটিং, সেসন , আন্দোলন সাময়িক ভাবে বন্ধ থাকার
পরে, ১৯২১ সালে হরিদ্বারে সনাতনী আর আর্য সমাজীরা মহাসভার ছাতার তলায় আবার মিলিত
হয়। দেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, খেলাফত আন্দোলন এবং মোপলা বিদ্রোহ সনাতণী ও
আর্যসমাজীদের মধ্যে সম্মেলন ও সংহতি তৈরী হয় মুসলমানদের মোকাবিলায় পরিকল্পনা ও তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পটভূমি
রচণা করে। এই সংহতির মুর্ত প্রকাশ পায় মালব্য এবং লাজপত রায়ের যৌথ কর্মসূচি ও
সহমতের ভিত্তিতে। হিন্দু সভা সদস্যরা দেশের সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দুদের জন্যে একটা ‘সংগঠন’-
এর প্রয়োজনিতা অনুভব করেন। যদিও আর্য সমাজী এবং সনাতনীদের কাছে সংগঠনের প্রয়োজনিতা
ও লক্ষ্য ভিন্ন উদেশ্যে পরিগনিত হতো। স্বামী শ্রদ্ধানন্দের মতে শুদ্ধি আন্দোলনের
লক্ষ্য ছিল দলিত, অস্পৃশ্য দের হিন্দু সমাজে সংযুক্ত করা এবং ধর্মানতরীতদের পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে নিয়ে
এসে ‘শুচি’ ও ‘পবিত্র’ করা। সনাতনীরা
অনিচ্ছাসত্ত্বেও সাময়িকভাবে মুসলমানদের প্রতিহত করতে এই ধারণকে গ্রহণ করতে বাধ্য
হয়েছিল। (সুত্রঃ - G. R. Thursby, ‘Aspects of Hindu-Muslim Relations
in British India : ‘A Study of Arya Samaj Activities, Government of India
Politics, and Communal Conflicts in the Period 1923-1928’, Ph D dissertation,
Duke University, 1972)। হিন্দু মহাসভা আলাদা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক
কর্মসুচিতে পরিচালিত ও সংগঠীত দল নয়। সেই সময়ে এই আদর্শের কোনো নির্ধিষ্ট রাজনৈতিক
মঞ্চ বা মুখপাত্র ছিলো না। তারা কংগ্রেসের মধ্যে একটা উপগোষ্টী হিসেবেই তাদের
মতাদর্শ প্রচার করতো। কংগ্রেসে গান্ধীজীর প্রাধান্য বিস্তারে এবং সিধান্তে ও
রণকৌশলে কেন্দ্রীভবণের ফলে মহাসভার
মতাদর্শগত ভিত্তি দূর্বল হয়ে পড়ে। যেহেতু গান্ধীজীর মতাদর্শ ও
রাজনৈতিক কার্যপ্রনালীর ভিত্তি ছিল বহুতত্ত্ববাদে সংবেদশীলতা এবং হিন্দু ধর্মের
সংস্কার, তাই তিনি হিন্দুমহাসভাকে কংগ্রেস ও ভারতীয় জনমনে প্রাধান্য বিস্তার করার
অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালেন। অতএব কংগ্রেস থেকে মহাসভার বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হল এবং
মহাসভার রাজণৈতিক প্রকাশ ঘটল তিরিশ দশকের শেষার্ধে সাভারকারের নেতৃত্বে। সাভারকার
নিজের মতাদর্শকে এমন দৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থাপন করেছিলেন যে নেহেরু মতন কংগ্রেসীরা
সাভারকারের তীব্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এবং মৌলবাদী ভাবধারণাকে কংগ্রেসে আশ্রয়
দিতে রাজী হননি। সাভারকার ছিলেম মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে আগত একজন মারাঠী ব্রাহ্মণ
কিন্ত হিন্দুমহাসভার সভাপতির পদ গ্রহণ করার আগেই
মহাসভার কার্যাবলির প্রভাব উত্তর ভারত থেকে কেন্দ্রীয় প্রদেশ আর বোম্বে
প্রেসিদেন্সী অবধি ব্যাপ্তি লাভ করেছিল। বস্তুত আজকের হিন্দু জাতিয়তাবাদের
জন্মস্থান মহারাষ্ট্রেই, খিলাফত আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায়। মহাসভায় সাথে পরিচিত হবার
আগেই সাভারকারকে এই মতাদর্শের জনক বলা যায়। রাজনৈতিক জীবনে বৃটিশ বিরোধী বিপ্লবী সাভারকার
পরিণত হলেন হিন্দুত্ববাদী সাভারকারে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের প্রথমার্ধে
পুনার রত্নাগীরি জেলে বসে সাভারকার একটি
বই লিখলেন হিন্দুত্ব; (Hindutwa
: Who is a Hindu?) শিরনামে। এই বইতে
তিনি প্রকৃত হিন্দু রাষ্ট্রের চরিত্র কে বিশ্লেষণ করলেন এবং বৈধতা দিলেন হিন্দুত্ব
পরিচিতিস্বত্তার ভিত্তিতে। হিন্দুত্ব তত্ত্ব সাভারকারের মতে হিন্দুধর্মীয় দর্শণের
সাথে সম্পর্কিত নয়। নিজেকে নাস্তিক হিসেবে ঘোষণা করে সাভারকার হিন্দু ধর্মকে হিন্দুপরিচিতিস্বত্তার
একটি মামুলি পুর্বস্বর্ত হিসেবে গন্য করতেন । বিভিন্ন পশ্চিমি জাতীয়
সম্বন্ধিত ধারণা ও মতবাদ থেকে সাভারকার
হিন্দুত্বের সংজ্ঞ্যা নির্ধারিত করেন। সাভারকারের মতে হিন্দুজাতিস্বত্ত্বার
পূর্বশর্ত নির্নয় করা আছে বেদ বর্নিত আর্য্যদের পবিত্র ভূমি আর্য্যভট্ট প্রদেশে
এবং স্বামী দয়ানন্দের রচিত বই ‘Satyarth
Prakash; -এ যেখান থেকে সাভারকারের
হিন্দুত্ব জাতিতত্ত্ব রসদ লাভ করেছিল। (সুত্রঃ – Dr. Keer, Veer Sabharkar, Bombay, Popular Prakashan, 1988, page 29, ‘While
in England in 1906-10 Savarkar stayed at India house, a guest house founded by
Shyamji Krishna Varma, who had been a close disciple of Dayananda’)। হিন্দুত্বের
ওপর জাতিতত্ত্বের আরপে সাভারকারের মতে
বর্তমান হিন্দুরা সেই পবিত্র ভূমির বাসিন্দাদের উত্তরসূরি। ধর্ম, পবিত্রভূমি এবং
জাতিতত্ত্বের সাথে সাভারকার ভাষাকে হিন্দুস্বত্তা নির্মানের একটি গুরুপূর্ণ উপাদান
হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই নিরিখে সংস্কৃত ও হিন্দী ভাষা কে নিয়ে হিন্দুত্বের দার্শনিক ভীতকে দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে
গঠণ করেন এক ত্রিমাত্রিক সমীকরণ ; ‘হিন্দু, হিন্দী, হিন্দুস্থান’। হিন্দু
জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রকাশপ্রাপ্তি ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা এবং পবিত্র ভূমির
সম্মিলিত তত্ত্বের মিশ্রণে। হিন্দুধর্মের পূনরুজীবনের নিরিখে ভারতীয় জাতিসত্ত্বা
হিন্দুত্বের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ করা উচিত এই ছিলো সভারকারের দার্শনিক
ভিত্তি। এই দর্শনের সারবত্তা হল হিন্দুত্ব দর্শনের পূর্বশর্ত দ্বারা দেশের কোনো
নাগরিককে ভারতীয় জাতি হিশেবে নির্নয় করতে হবে। সেই নিরিখে মুসলমান বা অনান্য
ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বহিরাগত এবং বিদেশী। তাই তাঁদের অন্দরমহলে নিজেদের ধর্মীয় আচার
– অনুষ্টান পালন করার স্বাধীনতা থাকলেও সমাজে তাঁদের হিন্দু ধর্মী রীতি এবং
সংস্কৃতির প্রতি বশ্যতা স্বীকার করতে হবে। সাভারকারের মতে এই বিধিগুলি প্রযোজ্য
হবে শুধু মুসলমান ও খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে । সাভারকারের মতে বৌদ্ধ, জৈন
বা শিখদের ক্ষেত্রে এই বিধান থেকে রেহাই দেওয়া উচিত কারণ তাঁদের ধর্ম হিন্দু
ধর্মেরই একটা উপসম্প্রদায় দর্শন যা কিনা হিন্দুত্বের সাথে দৃড়তায় সংযুক্ত। সাভারকারের
হিন্দুত্ব বলতে কী বোঝায়? দেশের মানুষের কাছে এই তত্ত্ব কী এমন সোনার খনি এনে দেবে
এই তত্ত্বে? হিন্দুত্ব কেবল সংখ্যালঘুদের স্বার্থবিরোধী নয়। লক্ষ লক্ষ হিন্দুর
দৃষ্টিভঙ্গি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং জীবনযাপন এই দর্শণ ধ্বংস করে দেবে।
নিশ্চিতরূপেই এটি হিন্দু ধর্ম দর্শণের সমার্থক নয়। ভারতবর্ষের এলাকার মধ্যে যে ব্যক্তি জন্মগ্রহণ
করেছে, জন্মসূত্রেই সে ভারতীয়। জন্মলগ্ন থেকেই কংগ্রেস এই তত্ত্বকেই সমর্থন দিয়ে
এসেছে। কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় উভয়সম্প্রদায়ের নেতারা এই ধারণাকেই সমৃদ্ধ করেছেন।
এর সঙ্গে ভারতবর্ষের ধর্ম্নিরপেক্ষতা, গনতন্ত্র এবং মিশ্র সংস্কৃতির ধারণা একটি
দৃঢ় ভিত পেয়েছে। আমরা সকলেই নিজ নিজ অঞ্চলের বিভিন্ন সংস্কৃতির সম্মেলনে একই জাতি,
ভারতবর্ষে ভারতজাতী হিসেবে গঠিত এবং বিকশিত হচ্ছি। দেশ স্বাধীনতা সংগ্রামে কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী ধারণা থেকে বিপথগামী না
হবার জন্য সাভারকার দেশের হিন্দুদের সতর্ক করেছিলেন। ‘Boycott the Congress’। (HRD)। ‘একখণ্ড
জমি যার নাম ভারতবর্ষ, তারই নিছক ভৌগোলিক স্বাধীনতার সঙ্গে কখনও প্রকৃত
‘স্বরাজ্য’কে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে ফেলা উচিত নয়। হিন্দুদের কাছে
হিন্দুস্থানের স্বাধীনতা কেবলমাত্র তখনি মূল্যবান হয়ে উঠবে যদি সেখানে ‘তাঁদের
হিন্দুত্ব’- তাঁদের ধর্মীয়, জাতীয় এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় –এর নিশ্চয়তা থাকে।
হিন্দুদের কাছে স্বরাজ্যের অর্থ অবশ্যই কেবলমাত্র সেই রাজ্য যেখানে তাঁদের সত্য,
তাঁদের হিন্দুত্ব নিজেদের অধিকারেই ফলে কায়েম রাখতে পারা যাবে; অ-হিন্দু জনগণ,
তাঁরা ভারতীয় ভূখণ্ডে বাসিন্দা হোক বা না হোক তাঁদের বাড়তি চাপ সইতে হবে না’। তাঁর
অনুগামীদের একজন বললেন যে, নিজেদের দেশ থেকে পালিয়ে এসে এদেশে আশ্রয় চেয়েছিল যারা
কিংবা ভয়ে বা অর্থ ও ক্ষমতার লোভে নিজেদের মহান পথ পরিত্যাগ করে যারা ধর্মান্তরিত
হয়েছিল তাঁদের বংশধর অথবা বর্বর অনুপ্রবেশকারীদের উত্তরসূরী যারা, যাদের
পূর্বপুরুষ আমাদের পবিত্র ভূমিকে ভূমিকে নষ্ট করেছে, পবিত্র মন্দির ধ্বংস করেছে,
হিন্দুরা কখনোই সেইসব মানুষের সঙ্গে যৌথভাবে দেশের মালিকানা গ্রহণ করতে পারে না...এ
দেশ কখনো তাঁদের দেশ হতে পারে না। যদি তাঁদের এ দেশে বাস করতে হয়, তবে হিন্দুস্থান
যে শুধুমাত্র হিন্দুদের, আর কারোর নয়, এ কথা স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনে নিয়েই তাঁদের
থাকতে হবে’।(সুত্রঃ- Prabha Dixit,
Communalism : A Struggle for Power, page 170, 171)। সেই
বিচারে তাহলে শ্রীলঙ্কায় বাসকারী বৌদ্ধসম্প্রদায়ের মানুষকে সিংহলী জাতি হিশেবে
বিবাচনা করা যাবে বা কারণ বুদ্ধদেবের জন্ম এবং প্রচারক্ষেত্র ছিলো মূলত
ভারতবর্ষেই, নেপালী বাসকারী হিন্দুধর্মসম্প্রদায়ের মানুষকে নেপালী জাতি বলে
প্রতিপন্ন করা যায় না কারণ হিন্দু ও আর্য্যরা
পবিত্রভূমি এই ভারতবর্ষের আদিম জনগোষ্ঠী। অথবা আমাদের বর্তমান
হিন্দুজাতীয়তাবাদীর প্রবক্তা লালকৃষ্ণ আদবানীও বিদেশী কারণ ওনারও জন্মস্থান তো
পাকিস্থানে। গান্ধীদর্শনের যে ঐতিহ্যকে পরম ভালবাসায় নেহেরু লালন করেছিলেন বছরের
পর বছর ধরে, সাভারকয়ার এবং সঙ্ঘ পরিবারের নানান শাখা সংগঠন সেই ঐতিহ্যকে পুরোপুরি
সমাধিস্থ করতে চায়। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের নামে এখন বহুতাত্ত্বিক ও বহুজাতিক
জাতিয়তাবাদী সংস্কৃতির হত্যা প্রচার চলছে, কারাবাস কালে একজন মারাঠা ছদ্মনামে রচিত
এবং ১৯২৩ সালে প্রকাশিত সাভারকারের রচিত ‘হিন্দুত্ব’ থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষের
চারা উর্বর জমি পেয়ে গেলো। রাজনৈতিক ব্যর্থতার বোঝা নিয়েই সাভারকার প্রয়াত হলেন।
চল্লিশ দশকের প্রথমেই ভারতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর দল মহাসভার কাজকর্ম বন্ধ হয়ে
গেলো। কিন্ত আর এস এস সম্পূর্ণ পৃথকভাবে তাঁর মতাদর্শ
আত্মসাৎ করায় সেটি আবার উজ্জিবিত হল। গোলওয়ালকারের রচিত ‘আমরা অথবা আমাদের
সংজ্ঞ্যায়িত জাতিসত্তা’ গ্রন্থটিতে এটির সুস্পষ্টরূপে দেখতে পাওয়া যায়। ধনঞ্জয় কীর
লিপিবদ্ধ করেছেন, ’১৫ ঐ মে, ১৯৬৩ সালে মুম্বাইতে এক বত্তৃতায় গোলয়ালকার বলেন যে,
সাভারকারের মহান রচনা ‘হিন্দুত্ব’- এর মধ্যে তিনি জাতীয়তাবাদের নীতিসমূহের
বৈজ্ঞ্যানিক ব্যাখ্যা দেখতে পেয়েছেন। তাঁর কাছে এটি ছিল একটি পাঠ্য, বৈজ্ঞ্যানিক
গ্রন্থ। (সুত্রঃ- কীর, বীর সাভারকার, ১৯৬৬, পৃ ৫২৭)। গোলওয়ালকারের রচিত (Bunch of thought) হিন্দুত্বের গভীর ভাবনায় রচিত। অঞ্চল ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ-এর
নিন্দায় একটি সমগ্র অধ্যায় নিয়োজিত। ‘The theories of territorial nationalism and of
common danger, which formed the basis of our concept of a nation, had deprived
us of the positive and inspiring content of our real Hindu Nationhood and made
many of the 'freedom movements' virtually anti-British movements. Anti-Britishism was equated with
patriotism and nationalism. This reactionary view has had disastrous effects
upon the entire course of the freedom struggle, its leaders and the common
people.’ । ‘Absurdity of 'Territorial
Concept'
They
forgot that here was already a full-fledged ancient nation of the Hindus and
the various communities which were living in the country were here either as
guests, the jews and Paris, ar as invaders, the Muslim and Christians. They
never faced the question how all such hetrogeneous groups could be called as
children of the soil merely because, by an accident, they happened to reside in
a common territory under the rule of a common enemy.’। (সুত্রঃ- Bunch of Thoughts, Golwalkar,
Page 119, Internet edition, 2013)। অর্থাৎ ‘এখানে ইতিমধ্যেই হিন্দুদের একটি পূর্ণ বিকশিত
প্রাচীন রাষ্ট্র ছিল। অন্যান্য যেসব গোষ্টী এই দেশে বাস করছে, তারা তখন হয় ইহুদী,
পার্শীদের মতো অতিথি কিংবা মুসলিম, খৃস্টানদের মতো আক্রমণকারী ছিল। তারা সকলেই এখন
যে এক সাধারণ শত্রুর শাসনাধীনে একটি সাধারণ অঞ্চলিক সীমার মধ্যে বাস করে এ এক
দূর্ঘটনা। কেবলমাত্র এই কারণেই এই সব বিভিন্ন
গোষ্ঠী সমূহকে কেমন করে একই মাটির সন্তান বলা যাবে, সে প্রশ্নের মুখোমুখি
তারা কখনো হয়নি... যে অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং সাধারণ বিপদের তত্ত্বে আজ
আমাদের রাষ্ট্রের ধারণা গড়ে উঠেছে, তাতে আমাদের প্রকৃত হিন্দু জাতীয়তাবাদ যথার্থ
এবং উৎসাহব্যঞ্জক বিষয়বস্তু থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। আর স্বাধীনতা আন্দোলন
প্রকৃত পক্ষে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে পর্যবসিত হচ্ছে। দেশাত্মবোধক এবং জাতীয়তাবোধের
সঙ্গে বৃটিশ- বিরোধিতা সমার্থক হয়ে পড়েছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, এর নেতৃত্ব,
সাধারণ মানুষ প্রত্যেকের ওপর এই প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্ঠিভঙ্গির একটা ধ্বংসাত্মক
প্রভাব পড়ছে’। আর এস এস ১৯৭৮ সালের দলিল এই রচনাটির ওপরে নির্ভরশীল। গোলোয়ালকর
নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ‘বীর’ সাভারকার ‘হিন্দুত্ব’ নামে একটি সুন্দর গ্রন্থ
রচনা করেছিলেন এবং হিন্দু মহাসভা হিন্দু জাতীয়তাবাদের সেই বিশুদ্ধ দর্শনের
ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। ‘If,
then, we are not to be mere ‘political Hindu animals’ or Hindus out of
reaction, we must live as Hindus by conviction, capable of expressing that
conviction in all aspects of our day-to-day life. The mere propagation of Hindu
thought in literature and newspapers takes us nowhere. For instance, Veer
Savarkarji wrote a beautiful book ‘Hindutva’ and Hindu Mahasabha based
itself on that pure philosophy of Hindu Nationalism.’
(সুত্রঃ- Bunch of Thoughts, Golwalkar,
Page 64, Internet edition, 2013)। সাভারকারের
চিন্তার সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় তাঁর রচিত ‘হিন্দুত্ব’ গ্রন্থটিতে। ‘হিন্দুত্ব’ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ঘৃণার মতাদর্শ
উপস্থাপিত করে। এই রচনাটির প্রকাশক এস এস সাভারকার এর দ্বিতীয় মুদ্রণের ভূমিকায়
ব্যক্ত করেছেন , ‘It was during his
stay from 1906 to 1910 in England that the attention of Veer Savarkarji was
drawn pointedly to the question as to who can by precisely called a ‘Hindu’’। (সুত্রঃ- Hindutwa, V D Savarkar, Preface by the Publisher of second edition)। তাঁর সেই তরুন
বয়সে, সাভারকার ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আর হিন্দু সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের দ্বন্দের
মধ্যে ছিলেন। আন্দামানেই তিনি প্রাথমিক লেখালেখি শুরু করেন। রত্নাগিরি জেলে এটি
চুড়ান্ত রূপ পায় এবং বাইরে প্রচার হয়ে যায়। ‘একজন মারাঠা’ এই ছদ্মনামে লেখা প্রথম
সংস্করণ নাগপুরের এক আইনজীবী ভি ভি কেলকার প্রকাশ করেন।







No comments:
Post a Comment