যেকোন আন্দোলন প্রগতিশীল অথবা পশ্চাৎগতিশীল চালিত
হয় নির্দিষ্ট মতাদর্শের ভিত্তিতে। ২০১২ সালের শেষ থেকেই দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে
পুনরায় মাথা চাড়া দিয়েছে মোদীর নেতৃত্বে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দর্শনে দীক্ষিত
রাজনৈতিক মুখপাত্র বি জে পি। সাভারকার, গোলয়ালকার , হেগডেভার ও শ্যামাপ্রসাদ
মুখার্জীকে আবার মহিমান্বিত করার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। ইতিহাস এইসব ব্যাক্তিদের
ঘৃণ্য, প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শের প্রবক্তা হিসেবে খলনায়কের পর্যায়ে নিক্ষেপ করেছে।
জিন্নাকে বলা হচ্ছে দ্বিজাতি তত্ত্বের জনক অথচ ইতিহাসের ধারায় সাভারকারের ভুমিকাকে
আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সাভারকার কে ‘বীর’ উপাধি দিয়ে আদবানী সম্মানিত করেছেন
আন্দামানে গিয়ে। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা
সুচতুর ভাবেই জীবন্ত ইতিহাসের প্রামানিক তথ্য কে এডিয়ে যান। জিন্নার মনে দ্বিজাতি
তত্ত্বে প্রসার ও বিকাশের আগেই সাভারকার দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতভাগ কে
সমর্থণ করেছিলেন এবং জিন্নার মনে এই দর্শনের চারা রোপণ করেছিলেন। এই নিরিখে
জিন্নাহকে পাকিস্তানের জনক না বলে সাভারকার কে পাকিস্তানের জনক বলা যায়। ১৯২৩ সালে ‘হিন্দুত্ব’ –এ লেখক সাভারকারের
বক্তব্যঃ- ‘The
Sanyasis, the Aryasamajis, the Sikhs and many others do not recognize the
system of the four castes and yet are they foreigners ? God forbid ! They are
ours by blood, by race, by country, by God. ' Its name is Bharat and the people
are Bharati' is a definition ten times better because truer than that. We,
Hindus, are all one and a nation, because chiefly of our common blood — '
Bharati Santati’। (সুত্র ঃ – হিন্দুত্ব-১৯২৩ )’। ‘We Hindus
are bound together not only by the love we bear to a common fatherland and by
the blood that courses through our veins... but also by the tie of the common
homage we pay to our great civilisation - our Hindu culture... we are one
because we are a nation, a race and own a common Sanskriti (civilisation).’। ১৯৩৭ সালে আহমেদাবাদে হিন্দু মহাসভার প্রকাশ্য সম্মেলনে , সভাপতি হিসেবে
সাভারকার বক্তব্য রাখেন ঃ- ‘India cannot be assumed today to be Unitarian and homogenous
nation, but on the contrary there are two nations in the main - the Hindus and
the Muslims’। (সুত্রঃ - writings Swatantrya Veer Savarkar, Vol. 6 page
296, Maharashtra Prantiya Hindu Mahasabha, Pune). ১৯৪৫
সালে সাভারকার জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্বকে সমর্থন করে বক্তব্য রাখেনঃ- ‘I have no quarrel with Mr.
Jinnah's two nation theory. We, the Hindus are a nation by ourselves, and it is
a historical fact that the Hindus and the Muslims are two nations।’ (সুত্রঃ - Indian Educational Register 1943 vol. 2 page
10)।
৯০-এর দশকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় এসে ভারতীয় মুলস্রোতে
সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে একচেটিয়া স্থান দখল হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক মুখপাত্র
বি জে পি । লোকসভায় ২ টো আসন থেকে ১৯৮৯
সালে তাদের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৮৮ তে, ১৯৯১ সালে ১২০ তে, ১৯৯৬ সালে ১৬১ তে- এই
সময়ে সংসদে সব থেকে আসনের অধিকারী এবং
১৯৯৮ এ ১৭৮ টি আসন। ভারতের রাজনৈতিক
ইতিহাসে ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে জোটসরকার গঠন করে এই প্রথম হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা
ক্ষমতা দখল করে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী দর্শনের ক্রিয়া এবং তার উন্মেষ ও প্রয়োগ
শুধুমাত্র বর্তমান দশকেই নয়, ভারতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক আঙিনায় এই দর্শনের
প্রভাব ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অন্যান্য
পুরাতন ও প্রাচীন দর্শনের মতন সক্রিয় ছিলো। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে এই দর্শন
পূর্নাংগ রূপ লাভ করে এবং বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগে এই দর্শন মুর্ত
রুপ পায় তার সাংঘঠনিক শাকা আর এস এস (RSS) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। বস্তত হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের
স্রোত ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে
প্রধান স্থানাধিকারী জাতীয় কংগ্রেসের সাথে চলতে থাকে। হিন্দু জাতীয়তাবাদ মতাদর্শগত
ও আন্দোলনের রুপ নেয় যখন কংগ্রেস গান্ধীর দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত এবং একটি
গন-আন্দোলনে পরিণত হয়। হিন্দু জাতীয়তাবাদ একটি বিকল্প রাজনৈতিক সংস্কৃতি গঠন করে
শুধু মাত্র অহিংসা দর্শণের বিরোধ করার জন্য নয় (বাল গঙ্গাধর তিলকের হিন্দু ঐতিয্য
রক্ষায় হিংসা প্রয়োগের মতাদর্শ--- সুত্রঃ- C.Jaffrelot, ‘Opposing Gandhi : Hindu Nationalism and
Political Violence), গান্ধীর ভারতীয় একজাতি তত্ত্বকে মোকাবিলা ও
খারিজ করার উদ্দেশ্যে। মহাত্মা গান্ধী ভারতীয় জাতিকে এক বহু তাত্ত্বিক,
বহুমাত্রিক, বহুজাতিক এবং বহুধর্মীয় সম্প্রদায়ের এক বিকশিত সম্মিলনী রুপ হিসেবে
দেখতে চেয়েছিলেন এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে এই সম্মেলনের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে
নিয়েছিলেন। যদিও গান্ধীর বক্তব্য ও আদর্শে হিন্দু ধর্মের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়
এবং এই নিরিখে মুসলিম সংখ্যালঘু সম্পদায়ের নেতারা গান্ধীর রাজনৈতিক ও সামাজিক
কাজ-কর্মে এই ধর্মীয় স্বত্তাকে আক্রমণ করতেন, কিন্ত শেষপর্যন্ত গান্ধীজি বারে বারে তার বক্তব্যে এই
মত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন যে তিনি এবং কংগ্রেস দল সব ধর্মসম্প্রদায়ের
স্বার্থে এক প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক সংঘটন। গান্ধীজির ভারত জাতির আন্তর্জার্তিক সংজ্ঞা রুপ
পেয়েছিল প্রথম প্রজন্মের কংগ্রেসী নেতা, প্রধানত গোপাল কৃষ্ণ গোখলের ভাবাদর্শ
থেকে, যাকে তিনি তার গুরু হিসেবে মানতেন। কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতাদের মতে ভারতীয়
জাতি সংজ্ঞায়িত হবে ভৌগলিক সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে; কোনো ধর্ম-সাংস্কৃতিক
ভিত্তিতে নয়। এই জাতির মধ্যে গন্য হবে সমস্ত মানুষ যারা বৃটিশ ভারতে বাস করেন। সুতরাং কংগ্রেসের কার্যপ্রনালীর প্রধান নীতি ও উপাদান হবে পুরোপুরি রাজনৈতিক। কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান (সতীদাহ
প্রথা, বাল্য-বিবাহ বা বিধবা বিবাহ প্রভৃতি) কংগ্রেসের কার্যপ্রনালীর পরিধির মধ্যে
পড়বে না। এই সব সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্টান এর রীতি রেওয়াজ ও বিধান নির্দিষ্ট
গোষ্ট বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দ্বারা স্থিরীকৃত হবে। এর বিপরীতে গান্ধীজি কিন্ত ধর্মীয়
পরিচিতিসও্বাকে দেশের সামাজিক কাঠামোতে প্রাধান্য দিতেন যদিও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারত জাতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মিশ্রণ ও সম্মেলন। ১৯২০
সালে এবং তার পরবর্তীকালে প্রথম প্রজন্মের কংগ্রেসের নেতাদের ছিন্তা-ভাবনা আরও
বিকশিত হয় কংগ্রেসের প্রধান চরিত্র ও নেতা নেহেরুদের দ্বারা। মতিলাল নেহেরু ও
জহরলাল নেহেরু উদারনৈতিক জাতি গঠনের পদ্ধতি নির্নয় করেন ব্যাক্তির উপস্থিতি
দ্বারা, কোনো সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ভিত্তির উপর নয়। নেহেরু দ্বয় জাতি গঠনের নিরিখে
আন্তজার্তিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করেন, যা কিনা গান্ধীর উপলব্ধির সাথে বহুলাংশে
ভিন্ন।
কংগ্রেসের জাতিস্বত্তা গঠনের ভিন্ন
দুই আন্তজার্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে খারিজ করে দেয় হিন্দু জাতীয়তাবাদ। (সুত্রঃ – Gyanendra Pandey, The Construction of Communalism
in Colonial North India , Delhi, Oxford University Press, 1990)। হিন্দুত্ব
জাতীয়তাবাদীদের মতে ভারতীয় জাতিসত্ত্বা সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দুদের দ্বারা নির্ধারিত
হওয়া উচিত, যারা বৃটিশ সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী মোটজনসংখ্যার ৭০ শতাংশ। ভারতীয়
সংস্কৃতিকে সংজ্ঞ্যায়িত করতে হবে হিন্দু
সংস্কৃতির প্রাধান্যের দৃষ্টিতে এবং সংখ্যালঘুদের এই দেশে বাস করার অধিকার দেওয়া
হবে সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের সংস্কৃতি, রীতি রেওয়াজের কাছে বশ্যতা স্বীকারের করার
শর্তে। নেহেরুর মতন কংগ্রেসের কাছে এই মতাদর্শ এক এবং অভিন্ন জাতীয়তাবাদ গঠনের
পরিপন্থী এবং সাম্প্রদায়িক। এই দর্শন প্রধানত হিন্দুত্ব নামে আখ্যায়িত হতে থাকে যার
পুর্বশর্ত হলো অভিন্ন জাতিয়তাবাদকে গড়ে তুলতে হিন্দুদের ধর্মীয় রীতি-রেওয়াজ ও আচার
–অনুষ্টানের দার্শনিক ভিত্তিতে। কিন্ত এই বহুমতের ধর্মীয় বিকাশের বর্তমান রুপে কোনো
প্রাধান্যকারী দার্শনীক বা ‘ism’ ভিত্তিবা ‘ism’
নেই। আর্য ধর্মীয় রীতির সাথে অনার্যদের সাংখ্য, যোগ, তন্ত্র, শিব এবং আদিম
মাতৃতান্ত্রীক দেবী পূজা। এই ধর্মের মধ্যে আবার সম্মিলিত হয়েছে ভক্তিবাদ ও
প্রেমবাদ। হিন্দু ধর্মের তাই কোনো নির্দিষ্ট বই বা বিধি নেই যেখান থেকে ধর্মের
ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্টিত করার প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। লুই রেনও এর মতে এই
ধর্মে , ‘...religious books can be described
as book written for the ue of a sect’। (সুত্রঃ – L. Renou, Religions of Ancient India, New Delhi :
Munshiram Manoharlal, 1972, second edition, page 50)। আবার
কোনো ঐতিহাসিকদের মতে, হিন্দু ধর্ম একটি একক ধর্ম নয় কিন্ত বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্টির সম্মলীত ও বিকশিত রূপ
মাত্র। (সুত্র ঃ- R.Thapar,
‘Imagined Religious Communities? Ancient History and the Modern Search for a
Hindu Identity’, Modern Asian Studies, Vol 23, no 2, 1989, page 216)। বস্তুত
‘হিন্দু’ শব্দটির বুৎপত্তি ঘটেছে ইন্ডাস নদী থেকে এবং এই শব্দটি বহুবার ব্যবহ্রত
হয়েছে অ্যাখামেনিড, গ্রীক এবং মুসলমানদের দ্বারা যারা এই নদীর ওপারে বসবাসকারী
জনসংখ্যা কে চিহ্নিত করতো এবং মধ্যযুগ পর্যন্ত জনমনে এই তত্ত্বের কোনো প্রভাব ছিলো
না । (সুত্রঃ – R.E.Frykenberg,
‘The Emergence of Modern Hinduism as a Concept and as an Institution: A
Reappraisal with Special Reference to South India’, in G.D. Sontheimer and H.
Kulke, eds, Hinduisim Reconsidered, Delhi: Manohar Publications, 1989, page 30.
J.T.O’Connell, The Word ‘Hindu’ in Gaudiya Vaishnava Texts’. Journal of the
American Oreintal Society, Vol. 93, no. 3, 1973, pp 340-44)। ‘হিন্দু’
চেতনার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটলো সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতের শিবাজীর সাম্রাজ্যে এবং
পরবর্তিকালে মারাঠা কনফেডারেসীতে। কিন্ত গাঙ্গেয় উপত্যকায় মারাঠাদের আক্রমণে কোনো ধর্মীয়
না সাম্প্রদায়িক উপাদানের চিত্র মেলে না। ; তারা যুদ্ধ ও আক্রমণের অভিমুখ চরিত্র
ছিলো মূলত আচার ও রীতি পালনের প্রতিফলনমাত্র
। কিছু হিন্দু ধর্মীয় পবিত্র ক্ষেত্রেগুলিকে (বারানসী প্রভৃত) উদ্ধার করা যেসব
স্থানগুলিকে সারাদেশে পবিত্র বলে গন্য করা
হতো। (সুত্রঃ- C. A. Bayly, The Pre-History of “Communalism”? Religious
Conflicts in India 1700-1800, Modern Asian Studies, Vol 19, no 2, 1985, page
187)। সুতরাং হিন্দু জাতিয়তাবাদের উত্থান একটি আধুনিক প্রক্রিয়া
যার বিকাশপ্রাপ্তি ঘটেছে একটি মতাদর্শের গঠনের মাধ্যমে। এই মতাদর্শনের প্রথম
বহিঃপ্রকাশ ঘটলো উনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজদের কর্তিত্ত্বের বিরুদ্ধে এবং ‘নব্য –হিন্দুবাদ’
নামে প্রকাশপ্রাপ্তি করলো। (সুত্রঃ – On neo-Hinduisim, K Jones, Socio-Religious Reform
Movements in British India , Cambridge, Cambridge University Press, 1989; A.
Copley, ed., Gurus and their Followers : New Religious Reform Movements in
Colonial India, Delhi : Oxford University Press, 2000)। দেশী
বুদ্ধিজীবিদের একাংশ ইউরোপীয় দর্শন এবং আধুনিক ভাবধারণা দ্বারা অভিভূত হয়ে পড়লো। ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় প্রথম প্রতিষ্টা লাভ করলো এবং বৃটিশেরা শুধুমাত্র
কর্মক্ষেত্রে মুৎসুদ্দি হিসেবে নিয়োগ
করেনি, তার সাথে তারা নিয়োগ করেছিল স্থানীয় এই দেশী বুদ্ধিজীবিদের, যারা মূলত
উচ্চবর্ণের থেকে এসেছিলো--- বৃটিশদের প্রশিক্ষিত একটি নতুন অভিজাত শ্রেনী, বাবু বা ভদ্রলোকেরা বাংলার সমাজে তৈরি হলো।(সুত্রঃ
– J.H. Broomfield, Elite Conflict
in a Plural Society, Twentieth-century Bengal, Berkley : University of
California Press, 1968)। বাঙালী
হিন্দুরা ‘বাবু’ই থেকে গেলো চিরকালের জন্যে, যদিও ‘বাবা’র মতোই ‘বাবু’ ও ফারসী
শব্দ। দাদা, দাদী, দিদিও কিন্ত ফারসীজাত। বরং মুসলিম উচ্চারিত বাপই (বপ্র) এবং
বাপু হচ্ছে সংকৃতজ। তাই ‘ভদ্রক’ থেকেই ‘ভদ্র’ সংস্কৃতজ। এ ভদ্রকেই বাঙলায় ‘ভালো’
হয়েছে। [ভদ্রক> ভড্ডক>ভল্লখ> ভাল] এখন অবশ্য ভালোমানুষ ও ভদ্রলোক
ভিন্নার্থক। আঠারো শতকের শেষ পাদে সুবে
বাঙলায় ইংরেজের কোম্পানি শাসক হয়ে তৈরি করলো দেশী বানিয়া-ফড়িয়া –
গোমস্তা-মুতসুদ্দি-নব্য জোতদার-জমিদার
শ্রেণি যারা কোম্পনির শোষণপ্রকৃয়ায় সহায়ক হওয়ায় অর্থে বিত্তে স্ফীত হল, কিন্ত তাদের চিত্তবৃত্তের পরিবর্তন হল না। উনিশ শতকে
ইংরেজি চিত্তলোকে প্রবেশ করলো অনেকে, অমনি তারা অনুভব করল সম্ভাবনার বাসন্তী
হাওয়া। লক, মিল, বেন্থাম, কোঁতে, সাঁ
সিমোনে, ফরিয়ার, কান্ট , ওয়েন, হিতবাদী প্রমুখ পশ্চিমি দার্শনিক চিন্তার প্রভাবে নতুন
মুক্তি –চেতনা, আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মসম্মানবোধ যে নতুন স্পৃহা জাগাল, তাতে
মনে-মেজাজে, রীতি-রেওয়াজে , নিয়ম – নীতিতে, আচার – আচরণে ইংরেজ হওয়ার এবং কলকাতাকে লন্ডন বানাবার প্রয়াসে – প্রযত্নে
ত্রুটি ছিল না কলকাতার নব্য-ইংরেজি শিক্ষিতদের। ইংরেজ – সান্নিধ্য-আসা ব্যক্তিদের
মধ্যে যারা বৃটিশ প্রদর্শিত পন্থায় বিধ্যা ও বিত্ত অর্জন করে গুন-মানে মাহাত্ম্যে
স্বপ্রতিষ্ঠিত হয়ে কৃতী ও কীর্তিমান হল, তাদের লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিহিন্দুকে আধুনিক
ইউরোপীয় মানুষরূপে গড়া এবং বাঙালী হিন্দুর তথা ভারতীয় হিন্দুর পরিবারকে ও সমাজকে
ইউরোপীয় জাতি রূপে গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে
সারা উনিশ শতক ধরে স্বদেশ ও স্বধর্ম প্রেমিক হিন্দুরা শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য,
বিজ্ঞান, দর্শন প্রভৃতিকে গুরুত্ব দিয়েছিল। এভাবে ১৮৬০ সালের পর থেকে তাদের
আত্মজিজ্ঞাসা তাদেরকে মৌলিক বা স্বস্থ ও সুস্থ চিন্তা-চেতনার যোগ্য করে তোলে। প্রসঙ্গত
রেনেসাঁস বা আলোকপ্রাপ্তির উন্মেষ ইতালিতে পনেরো শতকে। কিন্ত সেখানে
তা নিবদ্ধ ছিল না- ফ্রান্স, জার্মানী, হল্যান্ড, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে তা ছড়িয়ে
পড়ে। এক হিশেবে সৃষ্ঠিশীল মনীষা বা মনস্বিতা ঠিক দেশ-কাল-পরিবেশ নির্ভর হয়-
ঐতিহাসিক চাহিদার নিরিখে ব্যক্তিক মনস্বিতা, আগ্রহ, উদ্যম ও উদ্যোগ ভিত্তিক। তাই রেনেসাঁস সম্ভব করার জন্যে
দৈশিক স্বাধীনতা, রাষ্ট্রিক সুব্যবস্থা, সামাজিক শৃঙ্খলা, নৈতিক জীবনের উন্নতমান,
সর্বজনীন শিক্ষা, কুসংস্কারমুক্তি, জনগনের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বনির্ভরতা,
সাংস্কৃতিক সুরুচি, শ্রমজীবী বা বৃত্তিজীবী মানুষের সহযোগিতা, সমর্থন বা দাবির
প্রয়োজন হয় না। ইউরোপীয় রেনেসাঁসের উন্মেষকালের যাজকপীড়িত নিরক্ষর সমাজ ও
কোন্দলপরায়ণ বিছিন্ন বিভক্ত দেশ ও সামন্ত রাজ্য, নির্যাতিত দাস-ভূমিদাসের দারিদ্র
প্রভৃতি তার প্রমাণ। কিন্ত রেনেসাঁসকে সার্থক ও জনকল্যাণকর করতে হলে উক্ত
সব কিছুর প্রয়োজন হয়। ইতালীর রেনেসাঁসকে প্রেরনা যুগিয়েছে সমকালীন আরব মনীষা ও
তাদের মাধ্যমে প্রাচীন গ্রীক ও রোমক কৃতির সঙ্গে পরিচয়। বাঙলাদেশের
কলকাতা শহরে উদ্ভুত রেনেসাঁসের জন্যে এসব কিছুই দরকার হয়নি। প্রতীচ্যবিদ্যা ও
ইউরোপীয় জীবনের উন্নত মানই তাদের সে-আদলে জীবন রচনায় প্রণোদিত করেছিল। ইউরোপীয়
রেনেসাঁসের সঙ্গে তুলনা করলে উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য ও গুনগত পার্থক্যের
পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার রেনেসাঁসের মূল্যায়ন সহজ হবে। এবার বাংলার ও ইতালীর
রেনেসাঁসের সাদৃশ্য ও পার্থক্য নিয়ে একটা তুল্যমুল্য ধারণা করা যেতে পারে। ১)
ইতালীর রেনেসাঁসের উন্মেষ সৃষ্টিশীলতায়, বাংলার রেনেসাঁসের প্রকাশ প্রতীচ্যে
শিক্ষাগ্রহনের আগ্রহে ও ফলে। ২) কলকাতার শহরে রেনেসাঁস, মনীষীদের স্বশ্রেণীর ও
স্বধর্মীর স্বার্থচেতনায় ছিল সীমিত। তাঁরা যতটা হিন্দু হলেন ততটা বাঙালীও হলেন না,
আর অস্পৃশ্যের কিংবা দেশজ মুসলিমদের হিতচেতনা ছিল-ই না তাঁদের মনে। ইউরোপীয়
রেনেসাঁস উদারতার ও মানবতার দীক্ষা দিয়েছিল। ৩) ‘এজু’ দের (হিন্দু কলেজের ডিরোজী
কর্তিক আলোকপ্রাপ্ত ছাত্ররা) মর্ত্যপ্রীতি, জিজ্ঞাসা, সন্ধিৎসা, সিসৃক্ষা ছিল বটে কিন্ত তা নির্বিশেষ মানবিকবোধের বা মানবতাবোধের বিকাশ
ঘটায়নি। ইউরোপীয় খৃষ্টান সমাজে বর্ণভেদ ও বিধর্মীভেদ ছিল না ( ক্রুসেড যুদ্ধ ছিল
ধর্মীয় বাতাবরণে শ্রেনী সংগ্রামের রূপ), ছিল শাস্ত্রীয় সম্প্রদায়ের ভেদ। (তার ও
উন্মেষ জার্মানিতে ধর্মীয় বাতাবরণে কৃষকবিদ্রোহ-
শ্রেনীসংগ্রামের ফলে)। ‘এজু’-দের অনুরাগ ও শ্রেয়োবোধ নিবন্ধ ছিল স্বশ্রেণির
ও স্বধর্মীর পরিসরে- শ্রমজীবী মানুষ এঁদের চেতনায় ছিল অবহেলিত। ৪)ইউরোপীয়
রেনেসাঁসের ব্যাপ্তি ছিল ভূ-ভাগে ও সুদীর্ঘ কালে, উৎস ছিল প্রাচীন সভ্যতা ও
সংস্কৃতি ( গ্রীক, রোমক) এতে প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল সমকালীন আরবসভ্যতার। বাংলার
রেনেসাঁসের তথাকথিত উন্মেষ ও বিকাশকাল
পঞ্চাশ বছরের পরিসরে সীমিত। প্রেরনার উৎস ছিল লন্ডন-প্যারিস। ৫)ইউরোপীয় রেনেসাঁস
গ্রীক –ল্যাটিন ভাষার মোহ ঘুচিয়ে মানুষকে করেছিল মাতৃভাষামুখী, অন্ধ
বিশ্বাস-সংস্কার কাটিয়ে মানুষ হয়েছিল যুক্তিবাদী, মর্ত্যমুখী ও বাস্তববাদী। ইংরেজী,
ফারসী, জার্মান ভাষার প্রতিষ্ঠা ও উতকর্ষ, প্রোটেস্টান্ট মতের উদ্ভব, যাজকের
দৌরাত্মহ্রাস, কৃষকদের অধিকারচেতনা, বিজ্ঞানবুদ্ধির প্রয়োগ ও বিকাশ, দিকে দিকে
আত্মবিস্তার ও আত্মপ্রতিষ্ঠার আগ্রহ, শাস্ত্রীয় শিক্ষার চেয়ে মানববিদ্যার গুরুত্ব
স্বীকার, জীবন চেতনায় ও জগতভাবনায় ঐহ্যিকতার প্রাধান্য দান, সর্বোপরি ব্যক্তি,
সমাজ, শাস্ত্র রাষ্ট্র এবং ন্যায় সম্পর্কে নতুন জিজ্ঞাসাজাত তত্ত্বোপলব্ধির আলোকে
জীবনযাত্রার নিয়মনীতির ও রীতিপদ্ধতির পরিবর্তন সাধন এবং বাস্তবের হিতকর চাহিদা
পূরণও ছিল ইউরোপীয় রেনেসাঁসের লক্ষ্য ও ফল। বাংলায় ব্রাম্মমতে, রামকৃষ্ণের
সেবাধর্মে আর বঙ্কিম- ব্যাখাত গীতানুগ কর্ম-ভক্তির তত্ত্বেই সংস্কারমুক্তির প্রয়াস
অবসিত। এঁদের ব্যাখ্যাত তত্ত্বের মধ্যে পরিহারের কথাই রয়েছে বেশী। এবং তা কেবল
পুরোনোকের আস্থার ও আস্বাসের অবলম্বনরুপে দৃঢ় করে আঁকড়ে থাকার প্রবর্তনা দেয়ার
জন্যই। সমকালীন মানুষের মর্ত্যপ্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে ঐহিক-মানবিক চেতনার
পুষ্টিসাধন তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না। বাংলার রেনেসাঁসে সিসৃক্ষার চেয়ে সংস্কার
স্পৃহাই (Reform – এর ঈহা) ছিল বেশি। এঁরা revivalist ও reformist –এর মতো adjustment ও accommodation
–এর তথা মেরামতের প্রয়াসী ছিলেন,
নতুন কিছু নির্মানে আগ্রহী ছিলেন না। পুরাতন ক্ষয়মান ভঙ্গুর সামাজিক কাঠামোকে
বাইরে থেকে রঙ পলেস্তারা দিয়ে টিকিয়া রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা মাত্র। ৬) ইউরোপীয়
রেনেসাঁস দিল ভাষা ও দেশীয় জাতিচেতনা, বাংলার রেনেসাঁস জাগাল স্বধর্মীর
স্বাজত্যবোধ। ইউরোপীয় রেনেসাঁস দিল গ্রহনশীলতা- আত্মপ্রসারের প্রেরণা, বাংলার
রেনেসাঁস মানুষকে করল আধুনিক ইউরোপের অনুকারী আর প্রাচীন ভারতের অনুরাগী। ৭)
সমাজবিপ্লব রেনেসাঁসের লক্ষ না হলেও, চিন্তার ক্ষেত্রে বিপ্লব যেহেতু রেনেসাঁসের
প্রাণস্বরূপ, সেহেতু রেনেসাঁস জীবনের ও জীবিকার সর্বক্ষেত্রে রূপ বদলাতে রঙ চড়াতে
অবশ্যই সাহায্য করে। ইউরোপে তা-ই ঘটেছিল। কিন্ত আমাদের রেনেসাঁস কথায়, লেখায় ও রেখায় মাত্র
অভিব্যক্তি পেয়েছে, কাজে তেমন লক্ষণীয় হয়নি। তাই মনীষীরা ছিলেন সীমিত অর্থে ও
ক্ষেত্রবিশেষে উদার, ক্বচিৎ দ্রোহী এবং প্রায় সনাতন নিয়মণীতির অনুগত- জাতিভেদ,
বর্ণভেদে ও অধিকারভেদে আস্থাবান। নিঃস্ব নিরক্ষর ইউরোপেও রেনেসাঁসের দ্বারা
প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হয়নি, তবে পরোক্ষে নানা আন্দোলনের , ব্যবস্থার ও সমাজ
বিপ্লবের দিকনির্দেশিকা দিয়েছিল। আমাদের দেশে প্রজাপীড়নে কোন উপশম কিংবা
কৃষকবিদ্রোহে কোনো সহায়তা রেনেসাঁসের প্রবক্তারা বা তাঁদের অনুগামীরা দিতে
পারেননি। আর প্রথম স্বাধীনতা সিপাহীবিপ্লবের সময়ে তাঁদের মনে স্বাধীনতার স্পৃহাই জাগে
নি, বরং বৃটিশের পরাজয়ের আশঙ্কায় বিচলিত হয়েছিলেন তাঁরা।
বাংলার রেনেসাঁস যাঁরা ঘটালেন এবং
যাঁরা রেনেসাঁসের ফল ভোগ করলেন তাঁরা ছিলেন কোলকাতা শহরের ধনী-মানীরা ও জমিদারেরা
এবং তাঁদের সন্তানেরা- তাঁদের জীবনে, যুক্তি, বুদ্ধি, রুচি, আনন্দ, আরাম বাড়ল বটে,
তাঁদের চিন্তা-চেতনার জগত বিশাল হল বটে, কিন্ত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের, আন্তর্জাতিক বানিজ্যের,
চাকরির, উৎকোচের বিলুপ্তিসাধনের, নিলকর সাহেবেদের উৎপীড়নে, ব্যাঙ্কে উৎকোচের ও
উপঢৌকনের, বৃটিশের সহযোগীরুপে দেশী কুটিরশিল্পের বিলুপ্তিসাধনের, , ব্যাঙ্কে
মহাজনীতে আড়তদারীতের পূঁজি বিনিয়গের, রাজস্ববৃদ্ধির ও আওয়াব-সেলামীর প্রসাদ পেলেন রেনেসাঁসাওয়ালারা এবং তাঁদের স্বগোত্রের ও
স্ব-শ্রেণীর লোকেরা। আর নিঃস্বতার, দারিদ্রের, অনাহারের, পীড়নের, শোষনের এবং
দুঃশাসনের শিকার হল দেশের শতকরা নিরানব্বই জন চাষী-মজুর-তাঁতী প্রভৃতি ক্ষুদ্র
ক্ষুদ্র বৃত্তিজীবী মানুষ। রেনেসাঁসারুপে সামন্ত-পূঁজিপতি-বেনিয়ার চিত্তপ্রকাশ
গণমানবকে সমকালে কিছুই দেয়নি বরং পীড়ন ও বঞ্চনা বাড়িয়েছিল শত গুন। তাঁদের
বিদ্যাবিত্ত-গুন-জ্ঞান – বুদ্ধি – প্রজ্ঞা তাঁদেরই স্বশ্রেণীর জীবনে ও জগতে
বাসন্তী পরিবেশ তৈরী করেছিল মাত্র। এদিকে কোম্পানির প্রশাসনের শোষনের ও ব্যবসার
সহযোগী হিশেবে প্রায় একশ বছর ধরে বাঙালি হিন্দু চাকরি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে
কোম্পানির যে অবাধ ও উদার অনুগ্রহ পাচ্ছিল তা চালু রাখা, কোম্পনি সরকারের বৃটিশ
চাকুরেদের ব্যক্তিগত ব্যবসা চালানোর অধিকারচ্যুতি, সাম্রাজ্যের কলেবরবৃদ্ধি,
কোম্পনির শাসনক্ষমতার অবসান, শিক্ষিত হিন্দুর দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে,
বৃটিশ সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এছাড়াও প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের অভিজ্ঞতায়,
হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের সম্বন্ধে সন্দিহান ও আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল বৃটিশ। এ
ছাড়াও ছিলো বৃটিশ ভেদনীতি প্রয়োগের অভিপ্রায়। তাই বিদ্যায় স্বাধিকারচেতন এবং
বিত্তে মানলিপ্সু আর হৃতনুগ্রহ হিন্দুমনে নিষ্ক্রিয় বৃটিশ বিদ্বেষ উপ্ত হতে থাকে ১৮৬০
এর পর থেকে। এর প্রথম অভিব্যক্তি মেলে জাতীয় ঐতিহ্যে, সম্মান ও স্বাতন্ত্র্যচেতনা
প্রসূত হিন্দুমেলার প্রতিষ্টান। বিশ শতকের গোড়া থেকেই চাকরি ক্ষেত্রে প্রায়
একচেটিয়া হিন্দু অধিকারে যখন বাঙালীর মুসলমানও ভাগ বসাতে শুরু করল, এবং অন্যান্য
নানা ক্ষেত্রেও সংখ্যানুপাতিক অধিকার সংরক্ষণের দাবি পেশ করল, তখন হিন্দু সমাজ
সক্রিয়ভাবে বৃটিশ বিরোধী হয়। শিক্ষার প্রসারে, বিদ্যার বিকাশে, বিত্তের ও বেসাতের
বিস্তারে এবং সম্পদের সঞ্চয়ে বাংলার বর্ণ হিন্দুরা হয়েছে আত্মপ্রত্যয়ঋদ্ধ,
উচ্চাভিলাষী। উনিশ শতকী নিঃস্বতা, অজ্ঞতা, হীনমন্যতা বশে সর্বক্ষেত্রে হিন্দুর
স্বার্থসংরক্ষণ, হিন্দুর কল্যান সাধন, হিন্দু জাতি গঠন, হিন্দু ইতিহ্য-গৌরব স্মরণে
আত্মবোধন ও প্রণোদনাপ্রাপ্তির লক্ষ্যে
শিক্ষার এবং সংস্কৃতি, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস ও রাজনীতির চর্চার
ক্ষেত্রে উঠতি হিন্দুর চিন্তা ও কর্মের একমাত্র বিষয় হয়ে দাড়িয়েছিল জাতিবৈরই। তখন
অধিকাংশ স্বল্পবুদ্ধি ও স্থূলরুচি লিখিয়ে বৃটিশভীতির বশে অতীতের বিদেশী শাসককে-
বিলুপ্ত তূর্কি-মুঘলকে- বৃটিশ লিখিয়েদের অনুসরণে মুসলিম অভিধায় চিহ্নিত করে
হিন্দুমনে ক্ষোভ, হিংসা, জাতিবৈরি ও মুসলিম-বিদ্বেষ জাগিয়ে আত্মজিজ্ঞাসায় ও
আত্মোন্নয়নে হিন্দুদের অনুপ্রানিত করার নীতি গ্রহণ করেন। এ সঙ্গে বৃটিশ ভেদনীতির
কথা আগেই উল্লিখিত হয়েছে।
এই সংস্কারবাদীদের এক সংখ্যাগরিষ্ঠ
অংশ পশ্চিমী আধুনিক চিন্তা-ভাবণা, ধ্যানধারণ এবং আচার-অনুষ্টানের অনুপ্রবেশে
আশঙ্কিত ছিলো। তারা এই পশ্চিমী ধ্যান-ধারণকে তাঁদের দেশস্থ হিন্দু ধর্মের আচার
–অনুষ্টানের ওপর একটি আগ্রাসন হিশেবে পরিগণিত করেছিলো। তাঁরা তাঁদের প্রাচীন
ধর্মীয় রীতি রেওয়াজকে পরিত্যাগ না করে, পশ্চিমীধাঁচে তাঁদের হিন্দু ধর্মসংস্কৃতির
সংস্কার সাধন করতে চেয়েছিলো। এই ক্ষেত্রে রামমোহন বা পরবর্তিকালে বিদ্যাসাগর অবশ্য
ব্যাতিক্রমী ছিলেন।
রাম মোহন রায়

No comments:
Post a Comment