(সুত্র দি হিন্দু, ‘অযোধ্যা কান্ড’ – অনিরুদ্ধ রায় ও শ্যামল
চক্রবর্তী, ভারত সরকার প্রত্নত্বাত্তিক দপ্তরের রিপোর্ট)।
অতি সম্প্রতি সামন্ত জমিদার রাজা রামবক্স সিং এর প্রাসাদের
তলায় সোনার পাবার “নিশ্চিত” সম্ভাবনা সাধু কর্তৃক মুখনিস্তৃত দৈববাণী আমাদের দেশের
সংবাদমাধ্যমের পাতার শিরোনামে প্রধান স্থান অধিকার করে নিয়েছিল এবং বিষয়টা বেশ
কয়েক দিন ধরেই আমাদের আলোচ্য বিষয়ে প্রধান স্থান দখল করে নিয়েছিল। সাধুবাবাজির
উদ্দেশ্য ছিল হয়তো সাধু কারণ তিনি দেশের সরকারকে সেই প্রাপ্ত সোনার সাহায্যে
বর্তমান দেশের অর্থনৈক সঙ্কট থেকেয় উদ্ধারের রাস্তা দেখিয়েছেন। কিন্ত খননের মাধ্যমে প্রাপ্ত গুপ্তধন প্রত্নতাত্ত্বিক
দপ্তরের সংগ্রহশালায় স্থান পেত না রিজার্ভ ব্যাঙ্কের লকারে স্থান পেতো সেটা আমাদের
দেশের নীতি নির্ধারকদের উপরেই ছেড়ে দেওয়া
হয়তো বাঞ্ছনীয় । ভারত সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তর কোন যুক্তি, বৈজ্ঞ্যানিক
সুত্রর ধার দিয়ে না গিয়ে শুধুমাত্র “বিশ্বাস” ওপর নির্ভর করে, সরকার এবং জনগনের
টাকায় সেখানে খনন শুরু করে। সাংবাদিকরা এই
যুক্তির প্রশ্ন উত্থাপন করলে প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তরের আধিকারিকরা এক অদ্ভূত যুক্তির
অবতারণ করেন। ওনাদের বক্তব্য সাধূর দৈববাণীর প্রেক্ষিতে ওনারা ভূতাত্ত্বিক বিভাগের
রিপোর্টের ওপর প্রাসাদের তলায় খনন শুরু করেছেন। দ্রষ্টব্য এখানে যে ভূতাত্ত্বিক
বিভাগ ভূপৃষ্টের নিচে আলাদা কোনো বিক্ষিপ্ত সোনা , রুপোর সন্ধান দেন না। কিন্ত বিভিন্ন নির্মাণ কাজের স্বার্থে, পরিবেশ
ভারসাম্য রক্ষায়, পরিবেশ স্পর্শকাতর এলাকায়, ভূপৃষ্টের তলায় অবস্থিত মাটি , খনিজ
চরিত্র ও প্রস্তুরের চরিত্রের মূল্যায়ন করে সুপরামর্শ দেয়। যাই হোক সাধুবাবাজির
দৈববাণীর ফলে খননের ফলাফল এখন সর্বজনবিদিত। এক টন সোনা কেন? এক ভরি সোনা পাওয়া
যায়নি। এই ঘটনা কে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের কাছে আবার
আমরা হাস্যাস্পদ হয়ে গেলাম। কিন্ত এই দেশে এরূপ প্রহসনকে কি সামগ্রিতার মধ্যে
বিচ্ছিন্ন ঘটনা না সমকালীন দেশের রাজনৈতিক রংগমঞ্চে নতুন কোনো সমীকরনের
কার্য্যকারণের ফলশ্রুতি? কিচ্ছু প্রশ্ন এই ঘটনা থেকে উঠে আসে।
১) খননের ঘটনাটি ঘটল সেই
উত্তরপ্রদেশে যেখানে সবথেকে বেশী লোকসভা আসন আছে এবং নিকট অতীতে উগ্র
হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সাম্প্রদায়িক ভাত্রীঘাতী দাঙ্গা লাগাবার
অপচেষ্টা করেছিল। এই দাঙ্গা ঘটনার
সম্ভাবনা শুভবুদ্ধি সম্পন্ন শান্তিপ্রিয় মানুষের মনকে আশঙ্কিত করেছে।
২) মধ্যযুগের ভারতে রাজনৈতিক নানান
ঘাতপ্রতিঘাতের বাতাবরণে শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে ধনসম্পদ রক্ষা করার জন্যে
রাজা-মহারাজা-নবাব-সুলতান-সামন্ত-জমিদার শ্রেনী তাদের ধন সম্পত্তি মন্দির, মসজিদ
প্রাঙ্গণে বা প্রাসাদ সংলগ্ন মাটির তলায় নির্দিষ্ট গোপন লুকিয়ে রাখার
প্রচেষ্টা স্বাবাভিক। অবশ্য ব্যক্তিগত
সম্পত্তি যাতে কোন বেহাতে না পড়ে বা তার ঠিকানা যাতে ভবিষ্যতে অজানা না থাকে, তাই
এই নবাব-মহারাজ-সামন্তজমিদার শ্রেনী এই গুপ্তধনের সন্ধান তাদের অবর্তমানে দলিল
দস্তাবেজ বা নক্সা মারফৎ তাদের কোনো উত্তরাধিকারের বা অনুগামীদের কাছে পাঠিয়ে
দেবার সুব্যবস্থা নিশ্চয় করতেন, যদি তার সুযোগ পেতেন। যদি এই পুরনো পাণ্ডুলিপি (সত্যই যদি তার
অস্তিত্ব থাকে), অন্য অনভিপ্রেত কারোর কাছে গিয়ে পড়ে তাহলে সেই তথ্য কে নিয়ে
সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ যে হবে না তারই বা নিশ্চয়তা কথায়? দেশের মানুষের সৌভাগ্য যে
সেখানে কোনও সোনা পাওয়া যায়নি, না হলে হয়তো পরবর্তী দৈববানী জনমত কে প্রভাবিত করতো
উগ্রসাম্প্রদায়িক শক্তি কে দেশের উদ্ধারের তাগিদে দিল্লির মসনদে উপবিষ্ট করতে। প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তরকে যে উগ্রসাম্প্রদায়িক শক্তি আর এস এস এর দর্শণ কে
বাস্তবায়িত করার তাগিদে, প্রভাবিত করেছে, তার যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ সহকারে আলোচিত করা
যাবে।
৩) কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারে আসীন
সরকার কোনো ইতিহাস বিশ্লেষণের বৈজ্ঞ্যানিক
পদ্ধতি অবলম্বন না করে তড়িঘড়ি প্রত্নতাত্ত্বিক
দপ্তরকে খননের কাজে নিয়োগ করে দিলো। তাহলে কি কংগ্রেসের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র
মুখোশ মাত্র? বি জে পি র মতন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট ভোট পাবার ইদুর দৌড়ে একই পথের
পথিক?
8) ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধিনতা যুদ্ধে রাজা রামবক্স সিং এর আত্মত্যাগ ও
দেশভক্তি সম্বন্ধে কোন প্রচার নেই। শুধু কি এই মেরুকরণের তাগিদেই তাকে মহিমান্বিত
করা হচ্ছে? স্বাধিনতার যুদ্ধে ইতিহাস থেকে যানা যায় তিনি সেই যুদ্ধে ঝাঁসির রানির
সহযোগী ছিলেন।
জাতিয় আন্দোলন পরাভূত হবার পরে উনি কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। রাজা উপাধি ছিলো
নামেই কিন্ত শ্রেনীগত বিচারে ছিলেন বড় মাপের সামন্ত জমিদার
যার জমিদারীর ব্যাপ্তি ছিল ৩০ – ৩৫ কি মি জনশ্রুতি অনুযায়ী। এই চরিত্রের জমিদারের
কাছে ১০০০ টন সোনা থাকা অসমাজ্যস্যকর নয় কি?
উত্তরপ্রদেশের দৌন্ডিয়া খেদা গ্রামে প্রত্নতাত্ত্বিক
দপ্তরের (এ এস আই) রাজা রামবক্স সিং-এর দূর্গে ১০০০ টনের সোনা খুঁড়ে বার করার
সিদ্ধান্ত সুবিখ্যাত প্রতিষ্টানের ওপর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
কোনো পুরোহিতের “স্বপ্নাদেশ” ও ভূত্বাত্তিক দপ্তরের অপ্রতুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে
খনন কার্য পেশাগত ও পদ্ধতিগত গুরুতর প্রশ্নচিহ্নের মুখে। এ এস আই
তাঁর খননকার্য্যের পক্ষ্যে সওয়াল করতে সপ্তম ও উনবিংশ শতাব্দীর অতীত দলিলের সাহায্যে এই এলাকার ঐতিহাসিক
গুরুত্ব দিয়ে খনন কার্য্যকে বৈধতা দেবার চেষ্টা করছে। কিন্ত এই খনন কার্য্যে লক্ষ্যটিকে ব্যাখ্যা দেবার
ব্যার্থতায় , জনমনে সন্দেহ তাই আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞ্যানে বিপূল পরিমানে সোনা বা দামী
দ্রব্য উদ্ধার করা গতানুগতিক বিষয় । ২০০৯ সালে
ব্রিটেনের স্ট্রাফোর্ডশায়ারে বিপূল পরিমাণে সোনা-রুপা খনন করা হয়, যখন এক উৎসাহী
পৌরানিক দ্রব্যের সংগ্রহকারী, আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে, কৃষি ভূমির মধ্যে
সোনার বস্তুর খোঁজ পান। প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের খোঁজ দেবার পর সেখান থেকে
৩৫০০ টি বিভিন্ন রকমের সোনা ও রুপার বস্তু আবিস্কৃত হয়, পরিকল্পিত খননের ফলে । ২০১২ সালে জার্মানির গিজেল জেলায়, গ্যাস পাইপ লাইন পাতার
সময়ে, ১১৭ টি সোনার প্রাচীন বিভিন্ন বস্তু আবিস্কৃত হয়। পরিকল্পনা
মাফিক খনন কাজের সময় অনেকক্ষেত্রে সোনা বা মুল্যবান দ্রব্য আবিস্কার হয় । যেমন
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইহুদি প্রত্নতাত্ত্বিকরা জেরুজালেম মন্দিরের কাছে ৩০ টি সোনার মুদ্রা আবিস্কার করেন।
ভারতবর্ষেও নানান ক্ষেত্রে সোনা ও মূল্যবান বস্তু আবিস্কৃত হয়েছে। কিন্ত সেই আবিস্কারের প্রেক্ষাপটে দেখা যাবে কোনো
পরিকল্পনা বা ইতিহাস লব্ধ গবেষণা। কিন্ত শুধু মাত্র সোনা খোঁজা বা উত্তোলনের স্বার্থে
খনন কার্য্য বোধ হয় এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কার্য্য, প্রয়োগে ও বিদ্যা চর্চায়
নজিরবিহীন। বর্তমানে এই দপ্তরের আধিকারিকরা সব
দায় ভূত্ত্বাত্বিক বিভাগের রিপোর্টের ওপর
চাপিয়ে যাবতীয় দায় এড়াতে চাইছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক বিদ্যার সাথে যাদের
কিঞ্চিৎ পরিচিতি আছে, তারা খুব ভালো ভাবেই জানেন যে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক
খননকার্য্য চালানোর ক্ষেত্রে শুধু ভূত্ত্বাত্বিক বিভাগের রিপোর্টেই নিয়ামক নয়, তার
অন্যতম নির্দেশক বিধি প্রামানিক ঐতিহাসিক দলীল ও গবেষণা। ঐতিহাসিক রচণায় বা গবেষনায় এই স্থানের কিচ্ছু বিক্ষিপ্ত তথ্য থাকলেও , আলাদা কোনো গুরুত্ব আরোপ
করা হয় নি। অন্যান্য অঞ্চলে ভূত্ত্বাত্বিক
বিভাগের প্রাসঙ্গিক রিপোর্ট থাকা
সত্ত্বেও, সেখানে কেনো কোনো খনন কার্য্য শুরু হয় নি, সাংবাদিকদের এই প্রশ্নে কোনো
সদুত্তর প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তরের আধিকারিকদের কাছে নেই।
২০০৩ এ অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ চত্ত্বরে খননে প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তরের রিপোর্টের মূল্যায়ণঃ –
এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশে প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তর বাবরি মসজিদ চত্ত্বরে খনন
কার্য্য চালায় ধ্বংস হওয়া বাবরি মসজিদের জমির নীচে হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্বের
খোঁজে। এই নিরিখে খনন কার্য্যে শেষে প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তর একটি পূর্নাংগ রিপোর্ট
পেশ করে। প্রথমত স্মর্ত্যব্য যে আদালত এ
এস আই দপ্তরকে নির্দেশ দেয় বিতর্কিত জমিতে খনন কার্য্য চালিয়ে মন্দিরের অস্তিত্বের
তত্ত্ব প্রমানের জন্যে। কিন্ত এই তদন্তের প্রচেষ্টা এই কারণেই অপ্রাসঙ্গিক
কারণ ভারতীয় সম্পত্তির আইন অনুযায়ী জমির মালিকানা নির্ভর করে, জমির বর্তমান
দখলিস্বত্বের ওপর, জমির বর্তমান দলীল এর রেকর্ডের ওপর, জমির নীচে প্রাচীনভারতের
কোনো প্রাপ্ত প্রত্নত্বাতিক উপাদানের ওপর নয়। তাই আদালতের আদেশ বিতর্কের মূল ধারার
সাথে সম্পর্কিত নয়। এই প্রসঙ্গে আরও স্মর্ত্যব্য যে আরও অতীতে নরসীমা রাও সরকার দেশের শীর্ষ আদালতের কাছে সম্মতির জন্যে আপীল করে, বাবরি মসজিদ
চত্বরে (বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আগে) মন্দিরের উপস্থিতির তদন্তের জন্যে। দেশের শীর্ষ
আদালত সেই আপিলকে প্রত্যাখ্যান করে কারণ তাদের বিচার্য্যে এই বিষয় বিচার বিভাগীয়
ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক এবং প্রযুক্ত নয়। বিচার বিভাগের অবস্থান দেশের সংবিধানকে
রক্ষা করা, তাঁর সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান জমির আইন ও স্বত্বের ওপর ভিত্তি করে। পৌরাণিক
বিশ্বাস বা ঐতিহাসিক তথ্য বিচার ব্যবস্থার পরিধির বাইরে। শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশ
স্বত্বেও, উত্তর প্রদেশ উচ্চ ন্যায়ালয় এই বিতর্কিত বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং এ
এস আই কে রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দেয়।
বস্তুত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্য্যপদ্ধতির সাথে সাধারণ নির্মান কার্য্যে
খননের গুনগত পার্থক্য আছে। এই খননকার্য্য প্রথমত প্রচুর সময়সাপেক্ষ্যে পদ্ধতি এবং
অনেক সতর্কতা ও ধৈর্য্য নিয়ে সম্পন্ন করতে হয়। শাবল গাইতি দিয়ে নয় কিন্ত ব্রাশ ও উন্নত প্রযুক্তির নানাবিধ উপকরণ কাজে লাগানো হয় অতীতের রহস্য উদ্ঘাটনের
স্বার্থে। আদালত প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তরকে সময়সীমা বেঁধে দেয় যা পরে আবার পরে প্রলম্বিত
হয় কিন্ত সঠিক বৈজ্ঞ্যানিক পদ্ধতিগত খননকার্য্য চালিয়ে যেতে অনেক প্রতিবন্ধকতা ও
সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করা হয়। এই সব
সীমাবদ্ধতার সাথে সাথে, বড় বিপদ থেকে যায় আদালতের সময়সীমা বেঁধে থাকার দরুন
তাড়াহুড়ো ও পুর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে কে বৈধতা দেওয়ার তৎপরতা ও আশঙ্কা যারদ্বারা
আবার গুরুত্বপুর্ণ তথ্য ও নথি নষ্ট বা অবৈধ প্রভাব বিস্তার করার সম্ভাবনা থেকে
যায়, প্রকারান্তে ভবিষ্যতে এই সম্বন্ধিত যাবতীয় বৈজ্ঞ্যানিক পদ্ধত্বিগত খনন কাজের
সমস্ত সম্ভাবনার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক
খননের ফলে নানাবিধ ব্যাখ্যা উপস্থাপিত হয়।
যেরূপ তাড়াহুড়োয় এবং উদ্যমে এই দপ্তর দশম শতাব্দীর মন্দিরের অস্তিস্ব ঘোষনা করলো,
স্বাবাভিকভাবেই বাস্তব তদন্তের ফলকে
উপেক্ষা করে পুর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে ও প্রাক ভাবা ধারণাকেই প্রচারিত
করার প্রবণতা প্রতীয়মান হয় । প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তরের এই উদ্যমী ঘোষনার মধ্যে হিন্দু সঙ্ঘ পরিবারের
সাঙ্ঘঠনিক শাখা আর এস এসের প্রজ্ঞাপনের প্রভাবের কারণ বুঝতে খুব অসুবিধে হবার কথা
নয়। বাজপেয়ী সরকারের জাতীয় পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করা সংস্থায় এন সি ই আর টি (NCERT) তে নিয়োগ ও প্রভাব বিস্তার করায় এই সংস্থাকে তার স্বাধীনতা ও স্বশাসন ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির
প্রেক্ষিতে বার বার আপোস করতে হয়েছে। জাতীয় পাঠ্যসূচি ও পাঠক্রমে সাম্রদায়িকতার রঙ
মিশিয়ে এবং ভারতীয় ইতিহাসকে নতুন করে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রবণতা আর এস এসের
ফ্যাসিবাদী প্রজ্ঞাপনকে ত্বরান্বিত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয় “হিন্দু
রাষ্ট্” স্থাপনের উদ্দেশ্যে। এই প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তরের মাধ্যমে হিন্দু প্রার্থনার
উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রদেশের “ভোজশালা” উদ্বোধন কে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও
বিতর্কের সুত্রপাত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তরের এই সংরক্ষিত স্থান হয়ে ওঠে বি জে
পি নেতৃত্বে পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রদায়িক উপকরণ। সহজেই অনুমেয় যে আর
এস এস ভবিষ্যতে আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক নানান প্রতিষ্টানের মধ্যে নিজেদের
মতাদর্শকে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করবে, গন্তান্ত্রীক মূল্যবোধের ধ্বংস সাধনের
উদ্দেশ্যে। বর্তমানে এই হিন্দু পরিবারের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ছাড়া
নির্বাচণী কোনো ইস্তাহার নেই। তাই তারা এই ধর্মবিশ্বাসের মতন স্পর্শকাতর
বিষয়কেই পূঁজি করে নির্বাচণী বৈতরণী পার করতে চাইছে। যাবতীয় বিতর্কিত বিষয়ের মধ্যে
তাঁদের বর্তমানে মূখ্য লক্ষ্য অয্যোধ্যা তে রামমন্দির নির্মান করা। আর এস এস
এর সাংস্কৃতিক সাংগঠনিক মুখোশ খসে গেছে,
নরেন্দ মোদীর কে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থীর স্বাকৃতির মাধ্যমে। সঙ্ঘ
পরিবারের সাঙ্ঘঠনিকা শাখা আর এস এস এর বর্তমান প্রধান “সরসঙ্ঘচালক” মোহন ভাগওয়াত। এই মোহন ভাগওয়াতের বিরুদ্ধে পাক-গোয়েন্দা
মৌলবাদী মদতপূষ্ট সংস্থা আই এস আই এর কাছ থেকে অর্থ সাহায্য নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ
রয়েছে। মালেগাঁও ও নান্দেদ বিস্ফারণের ঘটনাই আর এস এস এর মুখোশ টেনে ছিড়ে দিয়েছে। কট্টর হিন্দুত্ববাদী এই
সংঘটন যে দেশে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম চালানোর জন্যই তলে তলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তা
পরিস্কার হয়ে যায় এই বিস্ফারণের মাধ্যমে। ইএ দুই বিস্ফারণে জড়িয়ে পড়েছে
হিন্দুত্ববাদী সংঘটনের বিভিন্ন নেতার নাম। মুম্বাই হামলায় ক্ষতম হয়ে
যাওয়া এ টি এস প্রধান হেমন্ত কারকারে মালেগাঁও তদন্তের চার্জসিটে স্পষ্ট জানান ,
মোহন ভাগোয়াত আই এস আই এর কাছ থেকে ২০ কোটি টাকা নিয়েছিল। এই হল হিন্দুত্ববাদী সঙ্ঘটনের দেশবিরোধী
কার্যকলাপের নিদর্শন পরে আবার বিস্তারিত ভাবে আলোচনার প্রসঙ্গে উঠে আসবে। বিশ্ব
হিন্দু পরিবারের তাত্ত্বিক প্রবক্তারা প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তরের রিপোর্টের ভিত্তিতে মুসলিম সমাজের
কাছ থেকে জমি নিয়ে রাম মন্দির নির্মাণের পক্ষ্যে সওয়াল ও দাবী উত্থাপন করেছে। কারণ
তাদের দাবী অনুযায়ী রামমন্দির ধ্বংসের করে বাবরি মসজিদ নির্মিত হয়েছে। কিন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তরের রিপোর্টে এই রূপ দাবীর
সপক্ষ্যে সরাসরি কোনো সমর্থন নেই। কিন্ত এই দপ্তর নিশ্চিত ভাবে নিজেকে নারকীয় ও অশুভ
শক্তির ক্রিড়ানক হয়ে পরিচালিত হয়েছে।
রামায়ণে ধরে নেওয়া হয় ৬০০০ শ্লোক থেকে এটা হয়েছে ২৪০০০ শ্লোক। চারটি পর্যায়ে
বেড়েছে। শেষ পর্যায়টি ১১০০ সালে লেখা। মনে করা হয় প্রথম প্রর্যায়টি লেখা হয়েছে
২৪০০ বছর আগে। কিন্ত দশরথের অযোধ্যা কোথায় ছিল এ রামায়ণ থেকে পাওয়া
যায়না। অযোধ্যা তীর্থক্ষেত্র হিসেবে
বিষ্ণু স্মৃতি (পরিচ্ছদ ৮৫) লেখা হয়েছিল আনুমানিক ৩০০ খৃষ্টাব্দে। এবং তীর্থের
তালিকার মধ্যে এটাই সর্বপ্রথম রচিত। এতে ৫২ টি তীর্থের কথা আছে, অযোধ্যার নাম নেই।
১০০০ সালে গড়বাল রাজার মন্ত্রী ভট্ট লক্ষীধর তাঁর কৃত্য কল্পতরু ব্রাহ্মণ্য ধর্মের
তালিকা দিয়েছেন। তার মধ্যে অযোধ্যা বা রামের জন্মস্থানের কোন উল্লেখ নেই। অনাদিকাল
থেকে হিন্দুদের যে বিশ্বাসের কথা বলা হচ্ছে, তুলসিদাসের লেখায় অযোধ্যা যে তীর্থ
সেটা বলা হয়নি। বরং হিন্দুদের সবথেকে বড় তীর্থ বলে অভিহিত করেছেন প্রয়াগকে । ১৪২০
সালে বৃহস্পতি মিশ্র যে তীর্থের তালিকা দিয়েছে, তার মধ্যে অযোধ্যা নেই। আকবরের
রাজত্বকালে সেনাপতি টোডরমাল কাশীর পণ্ডিতদের নিয়ে যে তীর্থপরিক্রমা দেখান তার
মধ্যে অযোধ্যার উল্লেখ নেই। টোডারমাল তুলসিদাসের সঙ্গে দেখা করেছিলেন কাশীতে। আবুল
ফজল ১৬৯৫-৯৬ সালে আইন-ই-আকবারি তে অযোধ্যাতে রামের বাসস্থা ছিল বলেছেন, জন্মভূমি
বলেননি। ১৬০৮ থেকে ১৬১১ ব্রিটিশ পরিব্রাজক উইলিয়াম ফিঞ্চ অযোধ্যাতে এসেছিলেন। তিনি
রামকোট দূর্গ ও স্বর্গদ্বারের উল্লেখ করেছেন। রামের জন্মভূমি, বা রামমন্দিরের কথা
উল্লেখ করেননি। ১৭৫০-৬০ সালে রাই চতুরঙ্গ তাঁর বই ‘চাজার গুলসান’ শেষ করেন। ত্র
মধ্যে অযোধ্যার কথা আছে। তার মধ্যে অযোধ্যাকে রামচন্দ্রের জন্মস্থান ধরা হয় বলে
লিখেছেন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে বাবরি মসজিদ তৈরি হওয়ার ২২০ বছরের মধ্যে সমকালীন
লেখার মধ্যে এমন কোন ইঙ্গিত নেই যে ঠিক কোথায় রামচন্দ্রের জন্ম হয়েছিল বা মন্দির
ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। এ পর্যন্ত হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান কারও
লেখাতেই এটা পাওয়া যায়নি।
বিশ্বাস টা তাহলে চালু হল কবে থেকে? বিশ্বাস চালু হবার প্রথম উদাহারণ পাওয়া
যায় ১৭৮৯ সালে জার্মান জেসুইট পাদ্রী, জোসেফ টিফেন্থালারের ফরাসি ভাষায় ‘ডেসক্রিপশন
হিস্টোরিক এট জিওগ্রাফিক ডে- লিন্ডে’ বইটিতে। এখানেই প্রথম দেখা যায় হিন্দুদের বিশ্বাসের কথা।
কিন্ত তাতে তিনি মন্দিরের কথা বলেননি। লিখেছেন, রামকোট
(দুর্গ) আওরঙ্গজেব ভাঙ্গেন। কিন্ত আরও একটা মতও ব্যাক্ত করেন যে বাবর তৈরি
করেছিলেন। হিন্দুদের বিশ্বাসের উৎস তখন থেকেই প্রথম প্রতিভাত হয়। কিন্ত তার মধ্যে রামমন্দিরের কোন কথা নেই। রামের দূর্গ বলে ধরা হয়েছিল। টিফেন্থালারের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে তখন সবে
পরম্পরা তৈরি হচ্ছে মসজিদ ও আশপাশের এলাকাকে ঘিরে পূন্যভূমি হিসেবে দেখার। কিন্ত সামনের মাটির ছোট বেদীকে রামজন্মস্থান বলে ধরা
হচ্ছে। সমগ্র এলাকাটাকেই রামের দূর্গ বলে ধরা হচ্ছে এবং রামমন্দিরের কোন কথা নেই। মসজিদ তৈরি হবার প্রায় আড়াইশো বছর পরেও স্থানীয়
লোকের মনে বিশ্বাস ছিলনা যে ওখানে একটা রামমন্দির ছিল। বিশ্বাসটা তৈরি হয়
টিফেন্থালারের বই লেখার পর থেকে। ১৮১০
সালে প্রথম মন্দির ভাঙ্গার কথা শোনা যায়। ফ্রান্সিস বুখাননের লেখায়। তখনও পর্যন্ত দায়ী
করা হত সম্রাট আওরঙ্গজেবকে। কিন্ত বুখাননের বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার নয় যে
মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ করা হয়েছিল। মন্দির
ভেঙ্গে মসজিদ নির্মাণের প্রচার আগ্রাসী চেহারা নেয় ১৮৫০ সালে। ১৮৫৫-৫৬ সালে মীর্জা
জান নামে একজন দাবি করেন যে সম্রাট বাহাদুর শাহের এক কন্যার লেখা মোগল মহাফেজখানায়
একটা বই পড়েছিলেন। সেই বইতে লেখা আছে, হিন্দুরা মথুরা, বানারসী, অযোধ্যাতে মন্দির
তৈরি করেছিল। কৃষ্ণের জন্মস্থান, সীতার
রসুই ঘর এবং হনুমানের বাসস্থান – এখান থেকেই রাম লঙ্কা জয় করেছিলেন। মির্জা জান
নাকি ৪০ বছর আগেই বইটা পড়েছিলেন। এবং যে সম্রাট কন্যার কথা বলা হয়েছে সেই সম্রাট
নাকি বাহাদুর আলমগীর। কিন্ত আলমগীর মারা যান ১৭০৭ সালে। এ পর্যন্ত কোন
মহাফেজখানায় বা বাহাদুর শাহের মেয়ের লেখা এই বই পাওয়া যায়নি। পণ্ডিত বি এন মার্শাল
মোগলদের বইয়ের যে তালিকা প্রকাশ করেছিলেন তার মধ্যে এটা নেই। আবার মীর্জা জান
একথাও বলেছিলেন সীতা কা রসুই মন্দির ভাঙ্গা হয়েছিল এবং রামের জন্মস্থান
রামমন্দির ভাঙ্গা হয়েছিল। এরপর থেকে
কয়েকটা উর্দূ পত্রিকায় মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ গড়ার কাহিনী প্রকাশিত হয়। এই সময় থেকেই
হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মৌলবাদীরাও একই কথা বলতে শুরু করে। আরেকটা বিষয়
সর্বজনবিদিত, ইংরাজের বহুল প্রচলিত পদ্ধতি ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ এখানে কাজে লাগায়
এবং গোলমাল বাধানোর ও চালু রাখার পাকা বন্দোবস্ত করে দেয়। ওয়াহাবি আন্দোলনে ইংরেজদের নীতি অনেক স্পষ্ট হয়।
সাম্রাজ্যবাদী দূশমন ইংরেজ বেনেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র না শানিয়ে সৈয়দ ব্রেহেল্ভী
শিখদের বিরদ্ধে যুদ্ধ করতে তৎপর হয়ে ওঠেন। মুসলমান ধর্মণীতির বিরুদ্ধে হিন্দু
ধর্মের জাগরণে সাহায্য করার ও ফয়দা তোলার চেষ্ঠা করে ইংরেজ। সুতরাং বিশ্বাসের
ইতিহাস মাত্র দেড়শো বছরের। এই বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে মাত্র দেড়শো বছরে, অনাদি
অনন্তকাল থেকে নয়। উভয় সম্প্রদায়ের কিছু মৌলবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সযত্নে এই
বিশ্বাস লালনপালন করতে থাকে। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংঘটন সহমত (SAHMAT) আদালতের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে যে প্রত্নতাত্ত্বিক
দপ্তর কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারবে না মসজিদের মেঝে খুড়ে সংগৃহীত সেই সব নিদর্শন, নমুনা যার
মধ্যে আছে প্রানীর অস্থিসহ চুন, সুরকি জাতিয় নির্মানের অবশেষ প্রধানত মুসলিম
বা সুলতানি কায়দায় নির্মাণের নিদর্শণ যেখান থেকে কোনো ভাবেই হিন্দু মন্দিরের
অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় না।
১) “বৃহৎ” পোড়া ইটের কাঠামোটি নির্মিত হয়েছে একাদশ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর
মধ্যে।
২) এই কাঠামোটির ভার বহণ করছে নূনতম ৫০ টী স্তম্ভের ভীত, বিশেষ করে শেষ মেঝেটি
।
৩) মসজিদের মধ্য গম্বুজের কেন্দ্রের
পূর্ব দিকে একটা বৃত্তাকার ঘাটের মতন গর্ত আছে আর “বৃহৎ” পোড়া ইটের কাঠামোটির
পূরভাগে পশ্চিম দেয়ালের মধ্যভাগ ইটের তল দ্বারা ভাগ করা হয়েছে।
৪) নির্মানকার্যের যে চত্বরে খনন কার্য্য চালানো হয়, সেই এলাকা গুপ্ত যুগের
পরে লোকবসতি ছিল না। এই এলাকাটি জনসাধারণের দ্বারা ব্যবহৃত হত, অর্থাৎ ধর্মীয়
কাজেই ব্যবহৃত হত।
প্রত্নতাত্ত্বিক দপ্তর বাবরি মসজিদ চত্বরের নিচে “বৃহৎ” পোড়া ইটের কাঠামোর
অস্তিত্ব বা ইটের , পাথরের দ্বারা নির্মিত বিভিন্ন বৃত্তাকার, চৌকাকার
বা আয়তাকার ভীতের অস্তিত্ব দাবী করছে কিন্ত এই রিপোর্টে কিচ্ছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কে সচেতন
ভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, যে দিকে ডাঃ ভান আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন।
১) খননের ফলে স্বীদ্ধান্তে আসা করা
“বৃহৎ” পোড়া ইটের কাঠামো মূলত সুলতানী যুগের নির্মাণের নিদর্শন এবং কোনো মতেই
প্রাক-মধ্যযুগীয় নির্মাণের কির্তি নয় কারণ এই স্বাপত্যের মেঝে এবং পলেস্তরা করা
দেওয়াল চূণ ও সুরকী দ্বারা নির্মিত, যে নির্মাণ প্রযুক্তি আমদানী করা হয়েছিল
তূর্কি ও মোঘল শাসনকালে। স্তম্ভের ভীতগুলি চুন-সুরকি দ্বারা নির্মিত। তাছাড়া
পূর্বেই আলোচিত নির্মানী আঙ্গিক বা ডিজাইনে, ‘মেহেরাব’ এর মতন নক্সা দেখা যায় যা
কিনা মধুযুগীয় নির্মাণ প্রণালীর পরিচায়ক।
২) খননের ফলে “বৃহৎ” পোড়া ইটের কাঠামো ও তার ভীতের নকশা বাবরি মসজিদ ও তার
কেন্দ্রীয় গম্বুজের অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও কাঠামগত ভাবে সম্পর্কিত।
৩) খননের ফলে প্রাপ্ত “বৃহৎ” পোড়া ইটের কাঠামোটি হিন্দু মন্দির নয় কারণ এই
কাঠামো কোনোভাবেই উত্তরভারতীয় হিন্দু মন্দির নির্মানে প্রাক-মধ্যযুগীয় নাগর নক্সার সাথে কোনো মিল নেই। এই কাঠামোটির দক্ষিণ প্রান্তে হল ঘরের আয়তনের
নকশা মসজিদের ঙ্কসার সাথেই মিলে যায়। পূর্বে নির্মিত মন্দিরের মধ্যে এইরুপ বড়
আয়তনের হল ঘর নির্মানের নিদর্শণ পাওয়া যায় না। মন্দিরের ব্যবহৃত নানাবিধ আরতির
সামগ্রীর, ধূপদানীর কোনো প্রামানিক বস্তু পাওয়া যায় নি। এতদ্বারা প্রত্নতাত্ত্বিক
বিদ্যার অভিজ্ঞতায় প্রমানিত যে এই খনন করে আবিস্কৃত হওয়া কাঠামোটি সুলতানী যুগের
নির্মানের নিদর্শণ এবং কোনো ক্ষেত্রেই প্রাক-মধ্যযুগের নির্মান আঙ্গিকের সাথে মিল
খুজে পাওয়া যায় না। স্বাভাবিক ভাবেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়া যায় যে কাঠামোটি মসজিদের
অবশেষ, মন্দিরের নয়।
দস্যু রত্নাকর রপান্তরিত হয়ে মহাকবি বাল্মীকি হয়েছিলেন, রামায়ণ মহাকাব্য রচনা
করে অমর হয়েছিলেন। শারীরিকভাবে তিনি বেঁচে থাকলে বেদনায় তাঁর দু’চোখ জলে ভরে উঠতো।
আদালতের রায় তাঁর মাথা থেকে ‘মহাকবি’র
মুকুটটা কেড়ে নিয়ে তাঁকে ইতিহাসবিদ করেছে। তিনি তো মহাকবি হতে চেয়েছিলেন, ইতিহাসবিদ হতে চাননি। সাহিত্য,
কাব্য, নাটক কোনো ইতিহাস নয়, সমাজের দর্পণ। একটা যুগ বা সময়ের সমাজের অবস্থা, সেই
যুগের ব্যথা, বেদনা, জীবনযাত্রা, উতপাদনপদ্ধতি, রীতিনীতি, খাদ্যপ্রনালী, মুল্যবোধ
ইত্যাদি সবকিছুরই দর্পণ, যা কবি-সাহিত্যিকের কল্পনাপ্রসূত, সৃষ্ট পাত্র-পাত্রীদের
বকলমে প্রকাশ করেন। আজ থেকে হাজার বছর বাদে সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের
‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের গর্ভগৃহ খোঁজার চেষ্টা করেন, তাহলে বিড়ম্বনার শেষ থাকবে না।
মহাকাব্যের কল্পনায় নায়ককে অবতার বা দেবতা
বলা হয়েছে । কিন্ত মুল রামায়ণে মহাকব বাল্মীকি রামকে মানুষ হিসেবেই
চিত্রিত করেছেন। কবিগুরু ভাষায় “কবি যদি রামায়ণে নরচরিত্র বর্ণনা না করিয়া
দেবচরিত্র বর্ণনা করিতেন, তবে তাহা রামায়ণের গৌরব হ্রাস করিত...” (প্রাচীন
সাহিত্য)। ভারতে কালিদাসই প্রথম রামের ওপর দেবত্ব আরোপ করেন এবং রামায়ণের
উত্তরকাণ্ড মুল রামায়ণের অংশ নয়, কালিদাসের রচনার ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে এটি
সংযোজিত হয় এবং রামের ওপর দেবত্ব আরোপ করা হয়। যুক্তি এড়িয়ে যদি রামায়ণের ঐতিহাসিক
গুরুত্ব ও রামের দেবত্ব স্বীকার করাও হয়, তাহলেও পূর্বের আলোচনার সাথে সঙ্গতি
রেখেই সেই প্রশ্ন গুলো ঘুরে ফিরে আসবে যার উত্তর ইতিহাস স্বীকার করে না। বর্তমানে
অযোধ্যা কিভাবে রামের জন্মভূমি হলো? বাল্মীকির মত অনুযায়ী রামের জন্ম ক্রেতাযুগে,
অর্থাৎ অন্তত ৫ হাজার বছর আগে। ঐতিহাসিকদের জিজ্ঞ্যাসা – সে অযোধ্যা কোথায়? ২৫০০ বছর আগে বর্তমান অযোধ্যার নাম ছিল সাকেত।
খ্রীঃ পূঃ পঞ্চম শতাব্দীতে স্কন্দগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্য তাঁর বাসস্থান বা রাজধানী
নিয়ে আসেন সাকেতে এবং সম্ভবত রামায়ণের প্রভাবে নাম দেন অযোধ্যা।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে খ্রীঃ পূঃ অষ্ঠ শতকের আগে সাকেত বা বর্তমান অযোধ্যায় জনবসতির
কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সুতরাং রামের জন্মস্থান অযোধ্যা---- প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
মাননীয় বিচারপতিরা বলেছেন যে হিন্দুরা বিশ্বাস করে যে মসজিদের মধ্যে গম্বুজের
ঠিক নিচেই প্রভু রাম জন্মেছিলেন। সব হিন্দুরা এটা বিশ্বাস করলে ১৯৪৯ সালের ২৩ শে
ডিসেম্বর প্রথম রাত্রে যখন কয়েকজন হিন্দু দাঙ্গাবাজ প্রাচীর ডিঙিয়ে মসজিদের ভেতরে
রাম-সীতার একটা ছোট মূর্তি বসিয়ে লম্ফঝম্ফ শুরু করলো এই বলে যে ‘ রাম-সীতার উদয়
হয়েছে’, তহন হিন্দু কন্সটেবল মাতাপ্রসাদ কেন থানায় ডায়রি করলেন, কেনই বা
ম্যাজিস্ট্রেট নায়ার মুখ্যমন্ত্রী জানালেন, কেনই বা প্রধানমন্ত্রী নেহেরু মুর্তি
সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন ( যা মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দবল্লভ পন্থ মানেননি), কেনই বা
ফৈজাবাদের জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক অক্ষয় ব্রহ্মচারী নিপাট হিন্দু হয়েও এই জঘন্য
বর্বরতার বিরদ্ধে ১৯৫০ সালে দু’বার অনশন করলেন তার তো কোনো উত্তর নেই। কেনই বা
আদালত মসজিদ বন্ধ করে রামলালার পূজার অনুমতি দিয়েছিলেন—তাও বিস্ময়কর। একটা
গনতান্ত্রীক ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবী করা রাষ্ট্রে বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে রায় দান
নজিরবিহীন ঘটনা। দেশের একাংশের মানুষের মধ্যে এখনো এমন বিশ্বাস আছে যে ‘ডাইনী’ রা
মানুষের অমঙ্গলের জন্যে দায়ী এবং সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতে ডাইনী নাম দিয়ে হত্যা করা
হয়। এখন সেই গুলি কি আইনসিদ্ধ হবে? উত্তরভারতে কোনো কোনো রাজ্যে ভিন্ন জাতে বিয়ে
করলে, জাতের পবিত্রতা এবং সন্মান রক্ষা করার তাগিদে, এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে
বিবাহিত দম্পতিকে হত্যা করার নির্দেশ দেয় ‘খাপ পঞ্চায়ত’। এখন এই ঘৃন্য মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা
কি আইনসিদ্ধ হবে? আইন বিশারদরাই এসবের হয়তো তার উত্তর দিতে পারবেন। মাননীয়
বিচারপতিরা অবশ্য একটা কথা স্বীকার করেছেন যে, মসজিদের ঠিক নিচেই ‘রামের
জন্মস্থান’ ছিল, হিন্দুদের এই বিশ্বাস্টা শাশ্বত নয়। হাজার হাজার বছর আগে এ বিশ্বাস ছিল না।
ভারতে সাম্প্রদায়িকতার কোনো অতীত ইতিহাস ছিল না। সিপাহী বিদ্রোহে
হিন্দু-মুসলমান মিলিত সংগ্রামে আতঙ্কিত ব্রিটিশ সরকার বিভেদ নীতির এই চক্রান্ত
শুরু করে। সিপাহী বিদ্রোহের ১৩ বছর পরে ১৮৭০ সালে ফৈজাবাদের কালেক্টর পি কার্ণেগী
বলেন যে, বাবরি মসজিদ কোনো মন্দির ভেঙ্গে তৈরি হয়েছিল। ১৮৭১ সালে লর্ড মেয়োর নির্দেশে মিঃ হান্টার ‘দি
ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ গ্রন্থে লিখলেন যে- ভারতে মুসলমানরা পশ্চাৎপদ ব্রিটিশের হাত
ধরেই তাদের অগ্রগতি সম্ভব। ১৮৭০ এ হিন্দুদের ও ১৮৭১ এ মুসলমানদের উসকানি দেওয়া
হলো। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ কর্মচারী এইচ আর নেভিল গেজেটে আবার মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ
তৈরির কথা লিখলেন এবং ১৯০৬ সালে সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্টপোষকতায় মুসলিম লীগের জন্ম
হলো, সেই একই বিভেদ নীতির খেলা। ১৯২০ সালে এক ইংরেজ মহিলা এ এস বিভারিজ তার
“মেমৈরস অব বাবর’ এ লিখলেন – ইসলাম যেহেতু অন্য ধর্ম সহ্য করে না, তাই অনুমান করা
যায় যে, বাবর মন্দির ভেঙ্গে এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। ১৯২৫ সালে হিন্দু মহাসভার প্রতিষ্টা এবং
‘রামজন্মভূমি’ পুনরুদ্ধারের প্রচার ও প্রজ্ঞ্যাপন জোরদার হওয়া শুরু হলো। স্বামী
বিবেকানন্দ সত্যই বলেছিলেন যে সাম্প্রদায়িকতার জনক ধর্ম নয়, জনক রাজনীতি । একই খেলা
খেললেন রাজীব গান্ধী। মুসলমান মৌলবাদীদের সুন্তুষ্ট করার জন্য তালাকপ্রাপ্ত
মহিলাদের খোরপোশের অধিকার নাকচ করতে মুসলিম মহিলা বিল পাস করালেন এবং তার কিছুকাল
বাদেই তাঁর নির্দেশে সরকারী উকিলের আবেদনক্রমে রামলালার পূজার নিষেধাজ্ঞা উঠে
গেলো, পূজা শুরু হলো, মসজিদ বন্ধ রইলো। পরে রাম মন্দিরের শিলন্যাস করলেন, আর
নরসিমা রাও শেষ পেরেক পুঁতলেন মসজিদটাকে ভাঙতে দিয়ে।
বাল্মীকি রামায়ণে –এর বালকাণ্ডে যে ভাবে কাহিণির অবতারণা করা হয়েছে, তা থেকে
পরিষ্কার বোঝা যায় যে রাম নামক একজন নরপতির উপাখ্যানকে কেন্দ্র করেই এই মহাকাব্য রচিত
হয়েছে , কোন অবতারের বাস্তব ইতিহাসকে নয়। রামায়ণে –এর শুরুতেই বাল্মীকি নারদকে
বলছেনঃ “এক্ষণে এই পৃথিবীতে কোন ব্যাক্তি গুনবান, বিদ্বান, মহাবল, পরাক্রান্ত,
মহাত্মা, ধর্মপরায়ণ, সত্যবাদী, কৃতজ্ঞ, দৃঢব্রত ও সচ্চরিত্র আছেন? কোন ব্যক্তি সকল
প্রকার প্রাণীর হিতসাধন করিয়া থাকেন ? কোন ব্যক্তি লোকব্যবহারকুশল, অদ্বিতীয়,
সুচতুর ও প্রিয়দর্শন? কোন ব্যক্তিই বা রোষ ও অসূয়া বশবর্তী নহেন? রণস্থলে জাতক্রোধ
হইলে কাহাকে দেখিয়া দেবতারাও ভীত হন? হে তপোধন ! এইরুপ গুণসম্পন্ন মনুষ্য কে আছেন,
তাহা আপনিই বিলক্ষণ জানেন। এক্ষণে বলুন, ইহা
শ্রবণ করিতে আমার একান্ত কৌতুহল উপস্থিত হইয়াছে’’। (বাল্মীকি রচিত ও হেমচন্দ্র
ভট্টাচার্য্য অনুদিত রামায়ণ, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃঃ ১৭। এর পর
থেকে বাল্মিকি রামায়ণ বলা হবে)। বাল্মীকি
স্পষ্টতই একজন বহুগুনসম্পন্ন আদর্শ মানুষের পরিচয় পেতে চাইছেন। বাল্মীকির প্রশ্নের উত্তরে নারদও একজন
বহুগুনসম্পন্ন নরপতির নাম করছেন, একজন অবতারের নাম নয়। নারদ বলছেন ঃ “তাপস, তুমি
যে-সমস্ত গুনের কথা উল্লেখ করিলে, তৎসমুদয় সামান্য মনুষ্য নিতান্ত সুলভ নহে। যাহাই হউক, এরুপ গুণবান মনুষ্য এই পৃথিবীতে কে
আছেন, এক্ষণে আমি তাহা স্বরণ করিয়া কহিতেছি, শ্রবণ কর “।(বাল্মীকি রচিত ও
হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য অনুদিত রামায়ণ, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃঃ
১৭)। এরপর নারদ এই বলে কাহিনী শুরু করছেন
যে, “রাম নামে ইক্ষবাকুবংশীয় সুবিখ্যাত এক নরপতি আছেন”। “।(বাল্মীকি রচিত ও
হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য অনুদিত রামায়ণ, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃঃ
১৭)। তারপর রামের কিছু গুন বর্ণনা করে তার অভিষেকের মুখে কৈকেয়ীর ষড়যন্ত্র এবং
দশরথের কাছে বর প্রার্থনা থেকে আরম্ভ করে সীতাকে উদ্ধার করে লংকা থেকে অযোধ্যায়
প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত কাহিণী সংক্ষেপে বলে শেষে জানাচ্ছেন যে তখনও “অযোধ্যাপতি রাম
পিতার ন্যায় প্রজাপালন করিতেছেন”। (বাল্মীকি রচিত ও হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য অনুদিত
রামায়ণ, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃঃ ২২)। অর্থাৎ নারদ এ কাহিনী
বাল্মীকিকে বলবার সময় রাম অযোধ্যায় রাজত্ব করছেন। এই বিবরণী থেকেয় প্রতিভাত হচ্ছে
যে, নারদ স্মৃতি মন্থন করে বাল্মীকিকে একজন অসাধারণ রাজার কাহিনী বলছেন। অবতারের
কাহিনী নয়। দ্বিতীয়ত, এই অসামান্য রাজা সেই সময়েই বাল্মীকির আশ্রমের অনতিদূরে
অযোধ্যা নগরে রাজত্ব করছেন। রামায়ণের অন্যত্র রামরাজ্যের বিস্তৃতির পরিচয় থেকেয়
জানতে পারি যে, এই আশ্রম শুধু যে রামরাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল তাই নয়, রাজধানীর খুব
কাছেই ছিল। অথচ রামের কাহিনী তো দূরের কথা,তার নামও মহর্ষি বাল্মীকি জানতেন না।
ত্রিকালজ্ঞ এবং ত্রিভুবনে ঢেঁকি চড়ে অনায়াসে বিচরণকারী কল্পচরিত্র দেবর্ষি নারদকেও
এই নামটি বলবার জন্য স্মৃতি মন্থন করতে হল। এ ধরণের অবতরণিকাই কি এই প্রাথমিক
ইঙ্গিত বহন করে না যে রামায়ণ-এর রচয়িতা এ কাহিনীকে বাস্তব ইতিহাস হিসেবে প্রচার
করতে চান নি। এ ভাবে কথোপকথনের মাধ্যমে
একটা মৌলিক ত্তত্ব বোঝাবার রীতিই প্রাচীনকালে প্রচলিত ছিল। সাহিত্যিক বোঝাতে
চেয়েছেন যে, প্রথমে প্রধান চরিত্র সম্বন্ধে একটা নির্দিষ্ট ধারণা করে নিতে হয় এবং
তারপর কাহিনীর মূল প্লট ভেবে নিতে হয়। এখানে রাজার চরিত্র ছাড়া উপায় ছিল না, কারণ
প্রাচীন মহাকাব্য রাজাদের শৌর্য্যবীর্য্যকে কেন্দ্র করেই রচিত হত। সাধারণ মানুষের
জীবন নিয়ে নয়। আবার লংকা অবস্থান নিয়ে বহু
বিতর্ক আছে। পণ্ডিতেরা এ বিষয়ে প্রায় একমত যে রামায়ণের লংকা প্রকৃতপক্ষ্যে বর্তমান
শ্রীলঙ্কা নয়। কর্ণাটক থেকে বেশী দক্ষিণে নয় এমন কোন বড় নদীর ধারে কল্পিত অথবা
বাস্তব কোন পার্বত্য শহর। দশম-একাদশ শতাব্দীতে চোল সাম্রাজ্যের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার
বাণিজ্য শুরু হবার পর থেকেই ক্রমশ রামায়ণ- এর লংকা কে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে মিলিয়ে
ফেলা হয় এবং কোন কোন রামায়ণ- এর রুপায়ণে সেভাবে ভাষা এবং ভাবের রুপান্তর ঘটে। (J L Backington)।
জাতিরাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্কটঃ
ধর্মীয়
সম্প্রদায়িকতা আবার বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রাধান্য বিস্তার করে ধর্মনিরপেক্ষতা,
গণতান্ত্রিক মুল্যবোধ, বহুমাত্রিক
সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে বর্তমানে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। ধর্মীয়
ও জাতিগত পরিচিতিস্বত্বা , ভাবাবেগ দ্বারা উৎসাহিত সন্ত্রাসবাদ এর দিকে দিকে
উত্থান ঘটছে। বিশ্বের সমকালীন কর্তৃত্ত্ববাদী আর্থ-সামাজিক অবস্থা , ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধর্মীয়
সম্প্রদায়িকতা ও রক্ষণশীলতা বৃদ্ধির উর্বর জমির সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। পৃথিবির
সবথেকে সাম্রাজ্যবাদের কেন্দ্রভূমি কর্তৃত্ত্বকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
স্বঘোষিত গনতান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ আজ প্রহসনে প্রতিভাত। স্ট্যাচু অফ লিবার্টি থেকে
এক অভিন্ন ভোগবাদী আকাঙ্ক্ষার আগুন দুর্গম গিরিপথ, আসমুদ্র-হিমাচল পেরিয়ে আমাদের
মানবিকতা কে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে আমাদের বানিয়ে তুলছে হিংস্র , স্বার্থপর,
ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ভোগবাদী রোবট। অর্থনৈতিক সঙ্কটের আবর্তে সামাজিক সঙ্কট ঘনীভূত
হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় সম্প্রদায়িকতা মানুষের মনের গহণে ধর্মীয় ভাবাবেগের
স্পর্শকাতর বিষয়গুলির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে নিজ স্বার্থস্বীদ্ধির তাগিদে।
মার্কসের মতে “ধর্মীয় আশঙ্কা একধারে বাস্তবজীবনে আশঙ্কার
প্রতিফলন আবার সেই বাস্তব আশঙ্কার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাধ”।
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটে নানাবিধ ‘কৃচ্ছসাধনের’ বোঝায়
সর্বসাধারণ এই চরম সঙ্কটের আবর্ত থেকে মুক্তি পাবার পথ খুঁজে পায় ধর্মের
মধ্যে, নিজেকে এই হৃদয়হীন পৃথিবীর কঠোর
বাস্তব থেকে মুক্তি পাবার উদ্দেশ্যে । মার্ক্সের ভাষায় ইংরাজি অনুবাদে দাঁড়ায় they find religion “as the sign
of the oppressed creature, the heart of a heartless world, just as it is the
spirit of a spiritless situation”। বিভিন্ন গবেষণার
দ্বারা প্রমানিত হচ্ছে যে নানাবিধ আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা আমাদের আরও ভাববাদী ও ধর্মীয়
গোঁড়ামিতে আবদ্ধ করে। সমকালীন রুশ দেশে বর্তমানে এই অভিজ্ঞতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দুই
দশক অধিক সোভিয়েত ব্যবস্থা ভেঙ্গে যাবার পরে, রুশ দেশে রক্ষণশীল চার্চ আবার প্রাধান্য
ও জনপ্রিয়তা বিস্তার করছে। এইসবই জনগনের আশঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তির সাথে
সম্পর্কিত। বর্তমানে প্রতি দেশেই গত কয়েক বছর ধরেই জনমনে ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধির
সাক্ষ্য পাওয়া যাচ্ছে। গত কয়েকবছরেই
ভারতবর্ষে ধর্মের প্রভাব জনগনের মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। (সুত্র ঃ – State of Nation Survey conducted
by the Centre for the Study of Developing Societies CSDS----2007)। দেখে মনে হয় সমাজের সব অংশের, সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৃহৎ অংশে
বিশেষত ধনী, উঁচু জাত এবং শিক্ষিত ভদ্রমণ্ডলিতে। ধর্মীয় ও আত্মিক পরামর্শের
পাশাপাশি বর্তমান পরিবর্তি বিশ্বের ব্যস্ত জীবনে সাথে সমন্বয় সাধনের জন্যে
তথ্যপ্রযুক্তি মারফৎ ই-পূজো বা ই- দর্শনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়াও নানবিধ
গুরুবাবা, অলৌকিক শক্তিধারী সর্বরোগ নিরাময়ের অধিকারী ঈশ্বরের প্রেরিতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের
আবার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে নানাবিধ মন্ত্রী, সান্ত্রী, আমলা ও নায়ক নায়ীকার
সহায়তায়। এইসব ধর্মীয় ভাবধারণ প্রচার ও পজ্ঞ্যাপনের জন্যে দৃশ্য-শ্রাব্য গনমাধ্যমেও
এনাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং বর্তমান ভারতবর্ষ ধর্মীয় ব্যাক্তিত্ব ও
ধর্মীয় ভাবাদর্শ প্রচারের এক দানবীয় বাজারে পরিনত হচ্ছে যেখানে সাংস্কৃতিক মোড়কে
ধর্মীয় অধ্যাদেশ এবং দার্শনিক পন্য বেচা-কেনা হয়। আমাদের দেশের পর্যটকদের প্রধান
আকর্ষণ অন্ধ্রপ্রদেশের তিরুমালা মন্দির শহর। প্যাকেজ টূরিজিমের অর্ধেক এখন ধর্মীয়
স্থান দখল করে বসে আছে। রাষ্ট্র এখন এই ধর্মীয় পর্যটনকে নানান সহায়তা দিচ্ছে, মদত
দিচ্ছে। নানাবিধ ধর্মীয় তীর্থস্থানের উন্নয়ন, ধর্মীয় স্থানের পরিকাঠামগত উন্নয়ন,
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিলাসবহুল বাণিজ্যিক রিসর্টের পরিকাঠামগত প্রমুখ
নানাবিধ সহায়তা দানে এখন রাষ্ট্রীয় সহায়তা বৃদ্ধি প্রত্যক্ষ্য করা যাচ্ছে। ধর্মীয়
বিষয় ও ব্যাপারে রাষ্ট্রযন্ত্রের
অনুপ্রবেশ আমাদের ধর্মিনিরপেক্ষ্য চরিত্রের পরিপন্থী হলেও, এই সব বৈধতা পাচ্ছে
সংস্কৃতি বিকাশের নামে। ধর্মের ধারণার
সাথে সংস্কৃতির ধারণা কে সমার্থক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে আর আমাদের দেশে এই প্রবণতা
একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে। আমাদের সিনেমা, টি ভি সিরিয়ালে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার নামে আমাদের পুজা,
পার্বণ , পর্ব পালনকে প্রদর্শিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির
নিরিখে। ধর্মের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও আনুগত্য এবং ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে হিন্দু
ধর্মীয় সংস্কৃতিকে পৃথক করার অক্ষমতাকেই
পূঁজি করছে মৌলবাদীরা ।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও এক পরস্পরবিরোধী প্রবণতার স্বীকার। শিক্ষা ব্যবস্থায়
এই মৌলবাদী শক্তির প্রভাব এবং শিক্ষাকে
ব্যবহার করা হয় তাদের দর্শন কে প্রচারের উদ্দেশ্যে আবার আরেক দিক হলো মুল্যবোধ ও
সৃজনশীল হীনতা যেখানে মানব সম্পদকে কাজে লাগানো হয় শুধুমাত্র উৎপাদিকা শক্তি বিকাশ
ও মুনাফা স্ফীত করার তাগিদে। শিক্ষার গুনগত উপাদান হয় মুনাফালোভী শ্রেনী দর্শনের
প্রচারে ও সেই দর্শনের কর্তীত্ব সমাজে
প্রতিষ্টার তাগিদে। শিক্ষাক্ষেত্রে বহুমাত্রিক বিচার ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ কে নিরুসাহিত
করা হয়, দমিয়ে রাখা হয় কারণ এইসব বিচার- বিশ্লেষণ শোষণভিত্তিক শ্রেনীসমাজে উৎপাদন
সম্পর্কের চরিত্র নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে এবং শাসক শ্রেণীর কর্তিত্বকারী
প্রতিষ্টানিক ব্যবস্থা কে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। মার্কসের শিক্ষায় ও
বৈজ্ঞ্যানিক সমাজতন্ত্রের বাস্তব প্রয়োগে প্রতিভাত হয় যে উৎপাদিকা শক্তি বিকাশের এক
পর্বে, উৎপাদন সম্পর্কের গুনগত পরিবর্তন জরুরী হয়ে পড়ে, তাই সাংস্কৃতিক সংগ্রাম
যার অন্যতম উপাদান ধর্ম ও শিক্ষা, এই পরিবর্তনের পক্ষ্যে এক জরুরী ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হয়।
লেনিনের মতে “ শ্রমিক জনগনের অন্তহীন শোষণ ও কাকর্শ্য যে সমাজের ভিত্তি,
সেখানে বিশুদ্ধ প্রচার মাধ্যমে ধর্মীয়
কুসংস্কার দূরীকরণের প্রত্যাশ্যা বুদ্ধিহীনতার নামান্তর। মানুষের ওপর থেকে থাকা
ধর্মের জোয়াল যে সমাজমধ্যস্থ অর্থনৈতিক জোয়ালেরই প্রতিফলন ও ফল, এটা বিস্মৃত হওয়া
বুর্জোয়া সংকীর্ণতারই শামিল”। কেন ধর্ম টিকে থাকছে শহূরে গরিব
সর্বসাধারণের মধ্যে, পশ্চাতপর স্তরগুলোর মধ্যে , কৃষকদের মধ্যে ? এই বিষয়ে লেনিনের বক্তব্য “ জনগণের অজ্ঞতাবশে, উত্তর দেয় বুর্জোয়া
প্রগতিবাদী, র্যাডিকাল অথবা বুর্জোয়া বস্তুবাদী। সুতরাং ধ্বংস হোক ধর্ম,
নিরীশ্বরতা জিন্দাবাদ, নিরীশ্বরবাদী মতের প্রচারই হল আমাদের আমাদের প্রধান
কর্তব্য। মার্কসবাদী বলে, তা ঠিক নয়। এ মত হল ভাসা - ভাসা, বুর্জোয়া – সীমাবদ্ধ
সংস্কৃতিপনা। এ মত ধর্মের মূল ব্যাখ্যা করছে যথেষ্ট গভীরে নয়, বস্তুবাদীর মতো নয়,
ভাববাদীর মতো। সমসাময়িক পুঁজিবাদী দেশগুলিতে এ মূল প্রধানত সামাজিক। মেহনতী জনগনের
সামাজিক দলিতাবস্থা, পূঁজিবাদের অন্ধ শক্তির সামনে তাদের বাহ্যত পূর্ণ অসহায়তা, - যুদ্ধ ভূমিকম্প
ইত্যাদি যত কিছু আসাধারণ গটনার চেয়েও এ পূঁজিবাদ সাধারণ মেহেনতী মানুষের ওপর
প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায়, হাজার গুন বেশী ভয়ংকর কষ্ট, প্রচণ্ডতম যন্ত্রণা চাপিয়ে
দিচ্ছে এ হল ধর্মের গভীরতম সাম্প্রতিক শিকড়। দেবতাদের জন্ম ভয় থেকে। পূঁজির অন্ধ
শক্তির সামনে ভয় – সে শক্তি অন্ধ কারণ জনগনের কাছে তা আগে থেকে গোচরীভূত নয়,
প্রলেতারীয় ও ক্ষুদে মালিকদের জীবনের প্রতি পদে তা আচম্বিত অপ্রত্যাশিত আকস্মিক
সর্বনাশ, ধ্বংস, নিঃস্বতা, কাঙ্গালবৃত্তি, গনিকাবৃত্তি ও অনশন মৃত্যুর হুমকি দেয় ও
তা ঘটায় এই হল সাম্প্রতিক ধর্মের শিকড়, বস্তুবাদী যদি শিশু পাঠের বস্তুবাদী হয়ে না
থাকতে চায়, তাহলে সর্বাগ্রে ও সর্বপরি এটা তার খেয়াল রাখতে হবে। পুঁজিবাদী
কয়েদখাটুনিতে জর্জরিত, পূঁজিবাদের অন্ধ-ধ্বংস শক্তির অধীনস্থ, জনগন যতদিন নিজেরাই
সম্মিলিত, সংগঠিত, সুপরিকল্পিত ও সচেতন ভাবে ধর্মের এই শিকড়ের বিরুদ্ধে, পুঁজির সব
ধরণের প্রভূত্বে বিরুদ্ধে লড়াই না করতে শিখছে, ততদিন কোনো জ্ঞানপ্রচারনী
পুস্তিকাতেই এই জনগনের মধ্য থেকে ধর্ম মোছা যাবে না”।
শোষকশ্রেনীর বুদ্ধিজীবিরা শোষনের দার্শনিক ও মতাদর্শগত তত্ত্ব প্রচার করে যার
মধ্যে ধর্ম একটি প্রধান উপাদান। মেহেনতী
জনগনের চিন্তাচেতনায় প্রভাব বিস্তার করে এই দর্শন । এই দর্শন আবার শোষক
শ্রেণীস্বার্থের রক্ষক রাষ্ট্র বৈধতা দেয় তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মারফৎ । এই বিষয়ে
ইতালিয় মার্কসবাদী দার্শনিক গ্রামস্কির বক্তব্য “ মেহেনতী মানুষের চেতনা সাধারণত
এক দ্বান্দিক মতাদর্শের মিশ্রণের ফলশ্রুতি, একাধারে শাসকের কাছে প্রাপ্ত ন্যায়নীতি
এবং অন্যাদিকে বাস্তব অভিজ্ঞ্যতা থেকে প্রাপ্ত ধারণা। এই দুই মতাদর্শ দ্বন্দমূলক
সম্পর্ক বিরাজমান এবং জনমনে আভ্যন্তরীণ বিরোধ উৎপন্ন করে’’।
আমাদের তাই দক্ষিণপন্থী মৌলবাদের বিরদ্ধে লড়াই সংঘটিত হোক পূঁজির
অন্ধ শক্তির
বিরুদ্ধ, পুঁজিবাদী অর্থনীতি, সংস্কৃতি আর মতাদর্শের বিরদ্ধে এবং বর্তমান উৎপাদন সম্পর্ক
পাল্টাবার লক্ষ্যে। আমাদের দেশের সমস্ত গণতান্ত্রিক সাম্প্রদায়িকতা
বিরোধী রাজনৈতিক দল, সংঘটন ও গনতন্ত্রপ্রীয় শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে তাই এই আর
এস এস এর নেতৃত্বে চলা গৈরিক অক্টোপাস এর
নারকীয় সঙ্কল্পগুলিকে প্রত্যক্ষ্য করতে হবে। আমরা সবাই যারা এই প্রজাতান্ত্রিক দেশের
গণতান্ত্রিক সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী
চরিত্র বজায় রাখতে ও সমৃদ্ধ করতে ইচ্ছুক, তাদের সবাই কে এগিয়ে আসতে হবে দেশ ও
দেশের ঐক্য সার্বভৌমতা বিরোধী এই
শত্রুভাবাপন্ন দানবীয় শক্তিকে যৌথ প্রয়াসে প্রতিহত ও পর্যুদস্ত করা। ফ্যাসীবাদের
বিরুদ্ধে স্পেনের লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবিদের স্লোগান “নো পাসারণ”
ধ্বনিত হোক আমাদের দেশের আকাশ বাতাসে, পরিবেশে, পরিমণ্ডলে।











No comments:
Post a Comment