ব্যবহারিক ধর্মের একটি প্রধান দিক খাদ্যাখাদ্য সম্বন্ধে
নিয়মকানুন, রীতিনীতি ও বিধিনিষেধ। খাদ্যাভ্যাস মানুষের ব্যবহারিক জীবনের একটি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই কারণে ধর্ম বনিকেরা এবং তাদের পৃষ্টপোষক কায়েমী
স্বার্থের ধারক ও বাহকেরা (এই ক্ষেত্রে সেই মূল ধরে থাকা মৌলবাদী) , খাদ্যরীতি
নিয়ে ধর্মীয় লোকাচারের বৈচিত্রকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতে
এদেশে সর্বদাই সক্রিয়ভাবে চক্রান্ত করেছে।
গত শতক এবং এযাবৎ কাল অবধি এদেশে অনেক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পেছনে এটি একটি বড়
কারণ। ষাটের দশকের মাঝামাঝি গোহত্যা বন্ধের সমুচ্চারিত দাবী নিয়ে সাম্প্রদায়িক
রাজনীতি উত্তাল আকার ধারণ করেছিল। বর্তমানে ধর্মীয়
মৌলবাদ এবং মৌলবাদী রাজনীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আর এই মৌলবাদেরই আঙ্গিক
হিসেবে গোহত্যা বন্ধের দাবী কোন কোন মৌলবাদী রাজণৈতিক দল এবং আধা-রাজনৈতিক মৌলবাদী
সংগঠন জোরের সংগে তুলে ধরেছে। তাদের নির্বাচনী ইস্তাহার সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অথবা
ধর্মীয় প্রচারে এ দাবী সোচ্চার হয়ে উঠেছে। আর আশংকার বিশয় এই ইয়ে এসব মৌলবাদী অশুভ
শক্তি সমকালীন সমাজে খুব দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে যার কার্য্য-কারণ সম্পর্ক সমকালীন
আর্থ-সামাজিক পেক্ষাপটে পর্যায়ক্রমে আলোচিত
হবে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যদি গরুর মাংস অথবা গোহত্যার
বিরুদ্ধে কোন গুরুতর বিধান থাকতো, তবুও আমাদের এই দেশের গনতান্ত্রিক ও
ধর্মনিরপেক্ষ্য রাষ্ট্রকাঠামোতে মুসলমান এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষের উপর
তাদের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাসকে জোর করে চাপিয়ে দেবার দাবী সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্ত প্রকৃত ঘটনা এই যে হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ
এবং মহাকাব্যগুলিতে গোহত্যা কিংবা গোমাংস খাবার বিরুদ্ধে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। প্রকৃতপক্ষ্যে
প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত গরুর মাংস খাওয়া এদেশের হিন্দু সমাজে বহূল
প্রচলিত ছিল। এ বিষয়ে অকাট্য তথ্যপ্রমাণ
উপস্থাপিত করা এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে মৌলবাদী রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য উন্মোচিত
করাই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।
বৈদিক সাহিত্যে তথা স্মৃতিশাস্ত্রে ও অর্থশাস্ত্রে
নির্দিষ্ট ধর্মীয় এবং সামাজিক বিধানগুলিকে কল্পকাহিনীর মাধ্যমে জনমনের গভীরে
প্রোথিত করাই ছিল মহাকাব্য রচয়িতাদের মূল উদ্দেশ্য। সেই কল্পকাহিনীর কল্পকথার সারমর্ম্য যথাক্রমে
আলোচনার সুত্রে আসবে। অতএব বিশেষ গুরুত্ব
অনুযায়ী রামায়ণ-মহাভারত এ খাদ্যাখাদ্যের বিধান অনুধাবন করা প্রয়োজন। ঋগবেদ সংহিতা
– য় অগ্নির কাছে নিবেদনে “গাভীদের খণ্ড
খণ্ড করে ছেদন” করবার উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যত্র ইন্দ্রের কাছে নিবেদনে উল্লিখিত
আছে, “তুমি আমার জন্যে পনের-কুড়িটি বৃষ রান্না করে দাও, আমি তা খেয়ে আমার উদরের
দুদিক পূর্ণ করি, আর আমার শরীর স্থূল করি”। (ঋগবেদ সংহিতা, ১০/৭/৬, ১০/৮৪/১৪)।
ইন্দ্রের কাছে নিবেদনে অন্যত্র আছে, “গোহত্যাস্থানে যেমন গরুরা হত হয়, আমাদের
শ্ত্রু রাক্ষসেরা তেমনি যেন তোমার অস্ত্রের দ্বারা নিহত হয়ে পৃথিবীতে শয়ন করে”। (ঋগবেদ
সংহিতা, ১০/৮৯/১৪)। সহজেই অনুধাবনযোগ্য যে এই গোহত্যা প্রথা বিশেষ ভাবে প্রচলিত না
থাকলে গোহত্যার জন্যে বিশেষ স্থান নির্দিষ্ঠ করা সম্ভব নয়। অগ্নির কাছে নিবেদনে
বলদ, ষাঁড় এবং দুগ্ধহীনা গাভী বলিদানের উল্লেখ আছে। (ঋগবেদ সংহিতা, ১/১৬২/১১-১৩,
৬/১৭/১১,১০/৯১/১৪)। ঋগবেদ
সংহিতার সুপ্রসিদ্ধ ‘বিবাহসূক্তে’ কন্যার বিবাহ উপলক্ষ্যে নিমন্ত্রিত অতিথিদের
কাছে গোমাংস পরিবেশনের জন্যে একাধিক গরু বলি দেবার বিধান আছে। (ঋগবেদ সংহিতা,
১০/৮৫/১৩)। অর্থববেদ সংহিতার অনূরুপ মন্ত্রেও (সামান্য পরিবর্তন ঋগবেদ সংহিতা থেকে
নেওয়া) একই বিধান আছে। (অর্থববেদ সংহিতা, ১৪/১/১৩)। তাছাড়া ঘোড়ার মাংস এবং মোষের
মাংস খাবার উদাহারণ ঋগবেদ – এ সর্বত্র পাওয়া যায়। বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্গত শতপথ
ব্রাহ্মণ – এ ঋষি যাজ্ঞবল্কের অনুশাসন উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে গরুর মাংস যদি নরম
হয় তবে তা খাওয়া যেতে পারে । (শতপথ ব্রাহ্মণ, ৩/১/২/২১)। তৈত্তিরীয়
ব্রাহ্মণ – এ শুধু যে গোহত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাই নয়, কোন দেবতার
কাছে কি ধরনের গরু বলি দিতে হবে তাও বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। বিষ্ণুর জন্যে ছোট ষাঁড়, ইন্দ্রের
জন্যে বাঁকা শিংযুক্ত বলদ, পূষনের জন্যে কালো গরু এবং রুদ্রের জন্যে লাল গরু বলি
দেবার বিধান দেওয়া হয়েছে। ঋগবেদ যেমন বৈদিক যুগের প্রাথমিক পর্যায়ের শুরু করে,
উপনিষদ তেমনি বৈদিক যুগের শেষ পর্যায়ের প্রতিফলন ও পরিচায়ক। এই বিষয় সন্দেহাতিত যে উপনিষদ কালেও গোমাংস ভক্ষণ বহূল
প্রচলিত ও প্রশংসিত ছিল। বৃহদারণ্যক উপনিষদ এর একটি শ্লোকে বলা হয়েছে “কোন
ব্যাক্তি যদি এমন পুত্র লাভে ইচ্ছুক হন, যে পুত্র হবে প্রসিদ্ধ পন্ডিত, সভাসমিতিতে
আদৃত, যার বক্তব্য শ্রুতিসুখকর, যে সর্ববেদে পারদর্শী এবং দীর্ঘায়ু, তবে তিনি যেন
বাছুর অথবা বড় বৃষের মাংসের সঙ্গে ঘি দিয়ে ভাত রান্না করে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে
আহার করেন”। (বৃহদারন্যকোপনিষদ,
৬/৪/১৮)। অর্থাৎ অন্যাতম প্রধান উপনিষদ বৃহদারন্যকোপনিষদ – এ অন্যান্য গুনাবলীর
সাথে বেদ সম্বন্ধে পারদর্শিতা অর্জনের উপায় হিসাবে বৃষমাংস বেদুয়ীন আরব
খাদ্যাভ্যাস সমতূল্য বিরিয়ানীর মতো রান্না করে খেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈদিক
সাহিত্যের অন্তর্গত গৃহ্যসূত্রগুলিতেও গরু বলি এবং গোমাংস ভক্ষণের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। অধিকাংশ গৃহ্যসূত্রে
ব্রাহ্মণ, আচার্য, জামাতা, রাজা, স্নাতক, গৃহস্থের প্রিয় অতিথি, অথবা যে
কোন অতিথির জন্যেই মধুপর্কের অনুষ্টানের বিধান আছে। আর সেই আনুষ্ঠানাদিতে গোমাংস পরিবেশন করাই ছিলো
সাধারণ বিধি ও সামাজিক রীতি। (পারস্কর গৃহ্যসূত্র, ১/৩/২৬-৩১; শাঙ্খ্যায়ন
গৃহ্যসূত্র, ২/১৫, গোভিল গৃহ্যসূত্র, ৪/১০/১৮-২৬; খাদির গৃহ্যসূত্র, ৪/৪/১৭-২৩,
হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্র, ১/৩/১৩-১৯; আপস্তম্ভ গৃহ্যসূত্র, ৫/১৩/১৫-১৬, আশ্বালায়ন
গৃহ্যসূত্র, ১/২৪/৩০-৩৩)। এই লোকাচারের ব্যাপকতা ও বাধ্যতামূলতার দরুন, আশ্বালায়ন
গৃহ্যসূত্র বিধান অনুযায়ী, বাড়ীতে অতিথি এলে গরুদের ছেড়ে দেওয়া হতো যাতে করে
অথিতিরা মনে করে যে বাড়ীতে গরু নেই। (আশ্বালায়ন গৃহ্যসূত্র, ১/২৪/২৫)। আশ্বালায়ন
গৃহ্যসূত্র- তে রদ্রের উদ্দেশ্য বৃষ বলি দেবার এবং তা ভক্ষণ করার সুস্পষ্ঠ বিধান
দেওয়া আছে, কারণে বলা হয়েছে এই বিধান পালিত হলে ভাগ্যোদয় হবে যথা বিত্ত, জমি,
পবিত্রতা, পুত্র, গবাদি, পশু, দীর্ঘায়ু এবং ঐশ্বর্য লাভ হবে। (আশ্বালায়ন
গৃহ্যসূত্র, ৪/৮)।
সমরুপের বিধান রয়েছে পারস্কর গৃহ্যসূত্র, আপস্তম্ভ গৃহ্যসূত্র এবং হিরণ্যকেশী
গৃহ্যসূত্র – তে। (পারস্কর গৃহ্যসূত্র, ৩/৮; আপস্তম্ভ গৃহ্যসূত্র, ৫/১৩/১৫-২০;
হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্র, ২/৫/১-১৩ )। হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্র – তে গরু বলি দিয়ে সে
মাংস ঘি এবং ভাতের সাথে মিশিয়ে প্রয়াত পূর্বপূরুষদের উদ্দেশ্যে উৎ সর্গ করার
নির্দেশ ও বিস্তারিত বিধান দেওয়া হয়েছে। (হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্র, ২/৫/১-১৩ )। শাঙ্খ্যায়ন গৃহ্যসূত্র- তে গুরুগৃহ থেকে
প্রত্যাবর্তনের সময়ে স্নাতককে গরুর চামড়ার আসনে বসে সব রকম ক্ষৌরকর্ম সম্পাদনা
করার কাজে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (শাঙ্খ্যায়ন গৃহ্যসূত্র, ৩/১/১-২)। বিভিন্ন
স্মৃতিশাস্ত্রেও গোমাংস ভক্ষণের বহুল পরিমাণে সমর্থন পাওয়া যায় যেমন বশিষ্টস্মৃতি-
তে আছে ব্রাহ্মণ, রাজা, অভ্যাগতের জন্য বড় ষাঁড় কিংবা বড় পাঁঠার মাংস রান্না করে
আতিথেয়তা করা বিধেয়। (বশিষ্টস্মৃতি, ৪/৮)। মনুস্মৃতি – তে সাধারণ ভাবে সকলকে মাংস
খেতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে, বিশেষত সে মাংস যদি যজ্ঞে উৎসর্গিত হয়। (মনুস্মৃতি,
৪/২৫০, ৫/৭, ৫/৩২, ৫/৩৬)। এমনকি একথাও ভবিষৎবানীর হিসেবে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে
যে কোনো অনুষ্টানে আমন্ত্রিত হয়ে যে ব্যক্তি মাংস খেতে অস্বীকার করবে সে পরবর্তী
একুশ জন্ম পশু হয়। (মনুস্মৃতি, ৫/৩৫)। মনু অবশ্য কোন কোন মাংস খেতে বারণ করেছেন তা
শ্রেনীভুক্ত করা আছে কিন্ত তার মধ্যে গরু পড়ে না। উদাহারণ স্বরুপ বলা যায়,
যে সব প্রানী এক ক্ষুর বিশিষ্ঠ, তাদের মাংস খাওয়ার বিশেষ বিধান ছাড়া বারণ। বলা
বাহুল্য, এই শ্রেনীতে গরু পড়ে না। অতিথিদের খেতে দেবার জন্যে, পোষ্যদের
প্রতিপালনের জন্যে, অথবা ক্ষুদা নিবৃত্তির জন্যে প্রয়োজনে যে কোন মাংসই বিধিসম্মত।
(মনুস্মৃতি, ৫/১২, ৫/১৮/৫/১৫,৫/২২, ৯০/০৮-১০৮)। সুতরাং দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ
মানুষেরই অধিকার আছে যে কোনো পুষ্ঠিকর মাংস খাওয়ার। মনুর বিধানে বারণ আছে গ্রাম্য
শুকরের মাংস খাওয়ায়। (মনুস্মৃতি, ৫/১৯)। এই বিধানে মনু নিজে কোন কারণ দেখান নি। এমনও হতে পারে এই
বিধানের কারণ বিশেষ শুকর দৃশ্যতই আবর্জনার মধ্যে বিচরণ করতে এবং নোংরা খেতে
অভ্যস্ত বা আরেকটা কারণ শূকর গ্রামের নোংরা পরিস্কারে কাজে লাগে। কিন্ত আবার মনুর বিধানে বন্য শূকরের মাংস নিয়ে কোন
নিষেধ নেই কারণ এই বন্য শূকর নোংরা খায় না, মূলত উদ্ভিদজাত খাওয়া থেকেই জীবন ধারণ
করে। রাম, লক্ষণ ও সীতা সর্বদাই বন্য বরাহের মাংস আগুনে ঝলসিয়ে খেতেন। তবে
মহাভারত-এর অনুশাসন পর্বের ৯১ অধ্যায়ে ভীষ্মের গ্রাম্য বরাহমাংস ভক্ষনে নিষেধাজ্ঞা
হিসেবে অনুশাসন পর্বে প্রতিভাত হয়। এই
বিষয়ে বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য যে কোরানে এবং তৎপূর্বের ইহুদিদের বিভিন্ন
ধর্মগ্রন্থে শূকরের মাংস ভক্ষণে নিষেধাজ্ঞা আছে। কারণ সহজেই অনুমেয় যে একই বিধিতে মধ্যপ্রাচ্যে এবং আরবভুখন্ড মরুপ্রধান
দেশে বন প্রায় ছিলোই না, এবং জলাভাবে নোংরা পরিস্কারের কাজে সম্ভবত শূকরকেই
প্রয়োজন ছিল, তাই স্বাবাভিক ভাবেই দৃশ্যত নোংরা পরিবেশের থাকার কারনেই শূকরের মাংস
ছিল পরিত্যজ্য (ইংরাজী তে বললে – aesthetically displeasing)। সেই কারণেও হয়ত ইসলাম ধর্মে শূকর মাংস ঘৃনিত। তবে খাদ্যাখাদ্যের প্রসঙ্গে বিজ্ঞানের
যুক্তি র সাথে ধর্মবিশ্বাস কে এক পংন্তিতে বিচার করা যায় না। হিন্দুদের এক
সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ গরু খান না, একি বিচারে মুসলিম ও ইহুদিরাও শূকর খান না। যদিও পশ্চিমের ক্রিষ্টান
ও অধার্মিক দেশের মানুষেরা প্রায় সর্ব্বভূক এবং বর্তমান কালে শিল্পে, বিজ্ঞানে,
অর্থনীতিতে, প্রযুক্তিতে, রাজনীতি তে সর্বত্র সারা জগতকে তারা নেত্রীত্ব
দিচ্ছে। এই বিষয়ে বাইবেল এর প্রসঙ্গ টেনে
বলা যায় যীশু খৃষ্ট তার জীবন কালে অনেক মহিমার বর্ননার মধ্যে, এক ব্যক্তির ভেতর
থেকে প্রেতাত্মা তাড়িয়ে পার্শ্বস্থ শূকরের পালের মধ্যে নিক্ষেপ করেছিলেন (মার্ক-Mark—5:9-13), যে ঘটনা থেকে ঐতিহাসিক ইহুদী জাতীয় সংস্কৃতির পরিচায়ক
হিসেবে প্রতিভাত হয় ইহুদী জাতী সংস্কৃতির শূকর বিদ্বেষ যার কারণ আগেই উল্লিখিত সামাজিক প্রতিফলন ও জীবন ধারণ
বিশেষ, কারণ যীশু খৃষ্ট ছিলেন জাতিতে ইহুদি। যদিও পিটার কে উদ্দেশ্যে করে যীশু
খৃষ্ট যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাতে সব রকম প্রানীর মাংস খাবার অনুমতি পাওয়া যায়। (অ্যাক্টস অফ দা অ্যাপোসোলস---Acts of the Apostles—10:10-15)। মদ্যপানের বিপক্ষ্যে যীশু খৃষ্টের কোনো প্রত্যক্ষ নির্দেশ
নেই কিন্ত তাঁর কালের পর খৃষ্টীয় ধর্মের স্বঘোষিত দার্শনিক
সাধু পল (Saint
Paul) মদ্যপান নিয়ে স্ববিরোধী ফতোয়া দিয়েছেন।
বাইবেলের কোনো জায়গায় তিনি নির্দেশ দিয়েছেন মদ্যপানের বিরুদ্ধে আবার তাঁর ভক্ত
টিমোথি কে শরীর সুস্থ রাখতে “কিঞ্চিত”
মদ্যপানের অনুমোদন দিয়েছেন। ইসলাম ধর্মে যীশু খৃষ্টকে এক উচ্চ সন্মানে
ভূষিত করে ঈশা নবী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মের একেশ্বরবাদ (দ্বেব-দিজ
দ্বৈত্যবাদ) এবং দর্শনেও যুডাইজম (ইহুদীদের ধর্ম ও সেমিটিক সভ্যাতার অবশেষ) এর
দার্শনিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বাইবেলের প্রসঙ্গে খাদ্য-পানীয় বিষয়ে যীশু
খৃষ্টের মুখনিষৃত কোনো নির্দেশ বা নিষেদাজ্ঞা নেই। তিনি সমাজের নিচু তলার শ্রেনীও
পিছিয়ে পড়া গোত্র ও গোষ্টির মধ্যেই ওনার প্রচার ও বিপ্লবী বানী বিতরণ করতেন। ওনার জীবিতকালে
সেণ্ট পল ওনার শিষ্ব্য ছিলেন না এবং যীশু খৃষ্টের শিষ্যদের সাথেও ওনার কোনও
যোগাযোগ খৃষ্টের জীবিতকালে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং যীশু খৃষ্টের তিরহণকালের পর
বাইবেল থেকে যানা যায় যে তিনি হিহুদি খৃষ্টানদের ওপর ধর্মান্তকরণের অপরাধে নানাবিধ
নির্যাতন করতেন। তিনি ছিলেন মূলত ইহুদি ধর্মের তাত্বিক পণ্ডীত ও দার্শনীক কিন্ত আবার সেই বাইবেল থেকেই জানা যায় যে হঠাৎ কোন দৈব
বানীর নিরিখে উনি খৃষ্টীয় ধর্মের অনুগামী হয়ে যান। ইতিহাসের সমকালীন বিশ্লেসনে
জানা যায় যে ইহুদী জাতি রোম সাম্রাজ্যের নানান উপনিবেশ এ মধ্যে একটি ছিলো যার
অর্থনীতির মূল ভীত্তি ছিল দাসব্যাবস্থা।
এই দাসভীত্তিক অর্থনীতি কৃষি ক্ষেত্রে ও গার্স্থকর্মে আস্তে আস্তে ক্ষয়মান হয়ে
যাচ্ছিল। সেই সমাজব্যবস্থা তার গর্ভে অনুভব করছিল মধ্যযুগীয় সামন্ত ভূমিসম্পর্কের
ও সমাজসম্পর্কের গর্ভযন্ত্রনা। রোমসাম্রাজ্যের নগররাষ্ট্রে এবং তাঁর বিস্তৃত
উপনিবেশ গুলি তে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কট প্রতিভাত হচ্ছিল সেই সমাজব্যবস্থার
উৎপাদন সম্পর্কে। দাসবিদ্রহের সাথে শ্রমজীবি মানুষের বিক্ষোভের অনুরণ শোনা যাচ্ছিল
দিকে দিকে যা অনেক ক্ষেত্রে অনূপ্রানীত ও
গতিলাভ করেছিল খৃষ্টীয় সাম্যবাদী
ধ্যান-ধারনায়। রোমোক
নগর রাষ্ট্রের নিজের ও তার উপনিবেশে ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং কাঠামো আস্তে
আস্তে ভঙ্গুর দশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো ;
তাই ঐতিহাসিক নিয়মে প্রাতিষ্টানিক ব্যাবস্থা টিকিয়ে রাখতে কালের নিয়মেই তাই
শাসক শ্রেনী কে খৃষ্টীয় ধর্মের শুধুমাত্র মানবপ্রেমবাদী তাত্ত্বিক ও দার্শনিক
ভিত্ত্বিকে অবলম্বন করতে হয়েছিল খৃষ্টীয় ধর্মকে রাষ্ট্রীধর্মের প্রাতিষ্টানিক রূপ
দিয়ে যাতে করে সমাজে দন্দ্বমান শ্রেনী কে খৃষ্টীয় প্রেমবাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা
যায় এবং নিরসন করা যায়। সেন্ট পল ছিলেন সেই রোম শাসক শ্রেনীর ইহুদি জাতির মূৎসূদ্ধি
প্রতিনিধি। তাই তার খৃষ্টধর্মের প্রচার শুধু ইহুদি জাতির মধেই সীমাবদ্ধ ছিল না,
অন্যান্য উপনিবশ যেমন করিন্থায়া তেও ব্যাপ্তি লাভ করেছিল। সেন্ট পলের
বাইবেলের বিভিন্ন ভক্তের কাছে চিঠির লেখনীতে স্বঘোষিত খৃষ্টীয় দার্শণিক হয়ে
মদ্যপান নিয়ে পরস্পরবিরধী বক্তব্য পেশ করে গেছেন। যেমন ইফিষীদের কাছে সুরাপানের
বিরুদ্ধে সওয়াল করেছেন, আবার তার শিষ্য টিমথী কে শরীর স্বাস্থের সতেজতার জন্যে
সুরাপানের পরামর্শ দিয়েছেন। সেন্ট পল
খৃষ্টীয় উদারবাদী, মানবপ্রেমবাদী দার্শনিক চিন্তা কে যুডাইজমের কঠোর
রক্ষণশীল কাঠামোর দ্বারা শৃঙ্খলিত করতে চেয়েছিলেন যাতে করে খৃষ্টীয় দর্শনে
ধনতান্ত্রীক শ্রেনীর প্রতি শ্লেষ ও খৃষ্টীয়
সাম্যবাদী উদারবাদী ধারণাকে এযাবৎকাল অবধি ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে। ইতিহাসে সাক্ষী
হিসেবে বনিক শ্রেনীর স্বার্থে খৃষ্টীয় ধর্মে মৌলবাধ মাথা চাড়া দিয়েছে বারে বারে
ইউরোপের মধ্যযুগে ক্রুসেড আন্দোলনে মানব সভ্যতা এগিয়ে গেছে লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের
রক্তে রঞ্জিত সভ্যতার রাজপথে। বস্তুত
খৃষ্টানিজম হয়ে দাড়ালো বকলমে সেণ্ট পলিজম। তবে মজার ব্যাপার যীশু খৃষ্টের প্রাথমিক
অনুগামীরা অর্থাৎ খৃষ্টান ইহুদিরা শূকর খেতেন কিনা জানা নেই কোথাও, তবে পরবর্তিকালে
পতনন্মূখ “সভ্যতার” সুর্য্য রোম সাম্রাজ্যের ছায়া ঘেরা ইউরপীয় পরিমন্ডলে “অসভ্য”
গথ, গল এবং স্যাক্সন রা, খৃষ্টধর্মের
অনুগামী হয়ে, শূকর, গরু ও জলে স্থলে সব
কিছুর মাংস খেয়ে মধ্যযুগের ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের শৃংখল থেকে মানব সভ্যাতা কে মুক্ত
করে প্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলো। অবশেষ পড়ে থাকলো আল্যেক্সান্দ্রীয়ায় আর ইস্তামবুলে।
যাইহোক আবার সেই স্মৃতিশাস্ত্রে ফিরে গিয়ে দেখি যে
মনুস্মৃতি – র মতন কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র – তেও গোমাংস খাবার সুস্পষ্ট বিধান
বর্তমান। কৌটিল্য রাজ্যে গবাদি পশুকে বিভিন্ন শ্রেনীভুক্ত করেছিলেন যেমন বিশেষ
বিশেষ চিহ্ন দ্বারা দুগ্ধবতী গাভী, হালটানা বা শকট টানা বলদ, প্রজননের উদ্দেশ্যে
সংরক্ষিত ষাঁড় এবং মাংসের যোগানের জন্যে গরু। (কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র- ২/২৯/১২৯)।
মাংসের ছাপ মারা ছাড়া অন্য কোন শ্রেনীর গোহত্যা নিষিদ্ধ ছিলো। রামায়ণেও প্রত্যক্ষ্য
আর পরোক্ষে গরুর মাংস খাবার কিছু নিদর্শণ পাওয়া যায়। বনবাসে ভরদ্বাজ মূনি রাম সীতা
লক্ষণের ভোজনের জন্যে বৃষ ও ফলমূলের
ব্যবস্থা করেছিলেন। (বাল্মীকি রামায়ণ, ২/৫৪)। নিষাদরাজের অতিথি হয়ে মদ্য, মৎস্য
এবং নানান রকমের শূষ্ক ও আর্দ্র মাংস ভোজন
করেছিলেন। (বাল্মীকি রামায়ণ, ২/৮৪)। তবে পৌরানিক যুগে গরুর মাংস খাবার প্রত্যক্ষ
এবং বিস্তারিত প্রমাণ রামায়ণের চেয়ে মহাভারতে অনেক বেশী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের
পরে কৃষ্ণ, যুধিষ্ঠিরকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে রাজা “রন্তিদেবের” মাহাত্য সম্বন্ধে
উদাহারণ দিতে গিয়ে বললেন যে
এই রাজা দ্বারা যজ্ঞে নিহত অসংখ্য পশুর চামড়া থেকে নির্গত রসে চর্মম্বতী নামক নদী
(আধুনিক চম্বল)সৃষ্টি হয়েছিল এবং তিনি অতিথি সৎকার ও সেবা করতেন কুড়ি হাজার একশত
গরু কেটে তাদের মাংস পরিবেশন করে। (বেদব্যাসী মহাভারত, ১২/২৯)। এই প্রসঙ্গে কৃষ্ণ রাজা রন্তিদেবের পূন্যতাকে যুধিষ্ঠিরের উর্ধে স্থান দেন। অতএব
দেখা যাচ্ছে যে দেবলোকও গোহত্যাকারী কে
যুধিষ্ঠীরের পূন্যের নিরিখে উর্দ্ধে স্থান দেন। মহাকবি কালিদাস তার মেঘদূত কাব্যে
এই রন্তিদেব ও তার কীর্তি চর্মম্বতী নদী প্রভূত প্রশংসা করেছেন। (মেঘদূত, ২/৪৬)।
মহাভারতের শান্তিপর্বে ভীষ্মের মুখে বিচখ্যু রাজার গোমেধ যজ্ঞ্যে অসংখ্য গরুর
আর্তনাদ ও ব্রাহ্মণদের নিষ্ঠুরতার বিবরণ
লিপিবদ্ধ হয়েছে। (বেদব্যাসী
মহাভারত, ১২/২৬৬)। প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ সুত্তনিপাত – এ কোশলরাজের এক যজ্ঞ্যে
পাঁচশ বলদ, পাঁচশ ষাঁড় এবং পাঁচশ গাভী
বলির জন্যে বেঁধে রাখা হয়েছিলো, ব্রাহ্মণ
পুরোহিতদের নির্দেশে বলি দেবার জন্যে। অতএব সেই সময়ে অসংখ্য গোহত্যা করা হত এবং এই
কাজের সাথ্যে ব্রাহ্মণকূল প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
তবে তৎকালীন সমাজে কালের অনিবার্য নিয়মে আর্থ-সামাজিক
প্রেক্ষাপটে যে গোসম্পদের একটা পুনর্মূল্যায়ন করা শুরু হয়েছিল তার প্রমাণ পাওয়া
যায় খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে মহাভারতে সংযোজিত অনুশাসন পর্বে, সমকালীন
অর্থনৈতিক কাঠামোয়, গোসম্পদ খাদ্যদ্রব্য
থেকে দীর্ঘমেয়াদী পূঁজি চরিত্রের পরিবর্তনে। শরশয্যায় শায়িত ভীষ্ম গোদান ও
গোসম্পদের পুনর্মূল্যায়ন করে বললেন “গোসমুদয়
দধি, দুগ্ধ, ঘৃত, গোময়, চর্ম, অস্থি, শৃংগ ও লোম দ্বারা লোকের মহোপকার সাধন করে।
শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষায় তাহাদের কিছুমাত্র ক্লেশ হয় না। তাহারা অবিশ্রান্ত পরিশ্রম
করিয়া কার্য্যসাধন করে। ...পূর্বকালে মহাত্মা রন্তিদেব যজ্ঞের পশু হিশেবে গাভিদের
ছেদন করিবার ফলে তাহাদের চর্মরসে চর্মম্বতী নদী প্রবর্তিত হইয়াছিলো। ...এখন তাহারা
দানের বস্তু হইয়াছে...গোসমুদয় প্রাণীদের প্রাণস্বরুপ; অতএব গোদান করিলে প্রানদান
করা হয়...নাস্তিক, পশুঘাতী এবং গোজীবীকে কদাপী গোদান করা উচিত নয়। এই পাপাত্মাদের
গোদান করিলে অনন্তকাল নরক ভোগ করিতে হয়। ব্রাহ্মণকে কৃশ, বিবৎসা, বন্ধ্যা, রোগযুক্তা, বিকলাঙ্গী অথবা পরিশ্রান্তা
গরু দান করা কখনও উচিৎ নয়। দশ হাজার গরু দান করিলে ইন্দ্রলোক এবং এক লক্ষ গরু দান
করিলে অক্ষয় লোক লাভ হয়”। (বেদব্যাসী মহাভারত, ১৩/৬৬)। এইরুপ উক্তি থেকে প্রতিভাত
হয় গরুর অর্থনৈতিক উপযোগিতা ও উৎপাদনের উপায় ও পূঁজি হিসেবে অর্থনৈতিক স্বীকৃতি।
আবার এই পূনর্গঠনকে সামাজিক বৈধতা দেবার জন্যে ধর্মীয় বাতাবরণে স্বর্গ-নরকের ভয়
দেখানোর তাগিদ থেকে যায় শাসকশ্রেনীর কাছে হিসাবে গরুর মতন সহজপ্রাপ্য ও পুষ্টিকর খাদ্যের
বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে এই ধর্মীয় দার্শনীক তত্ত্বই অমোঘ অস্ত্র।
প্রাচীন ভারতে চরক ও সুশ্রুত
সংহিতা আয়ুর্বেদ ও চিকিৎসা শাস্ত্রের ভিত্তি ছিল। গরুর মাংসের উপকারিতা নিয়ে এই
দুই গ্রন্থ প্রচুর সওয়াল করেছে। (চরকসংহিতা , ১/২৭/৬৫)। বাত, নাক ফোলা, জ্বর,
শুকনো কাসি, অত্যাগ্নি, কৃষতা প্রভৃতি রোগের প্রতিকারে গরুর মাংস বিশেষ উপকারী।
(চরকসংহিতা , ১/২৭/৭৯)। এ ছাড়াও সুস্বাস্থ্য লাভের উদ্দেশ্যে শূকর, মোষ, গণ্ডার
এবং কচ্ছপের মাংস সুপারিশ করা হয়েছে। (চরকসংহিতা , ১/২৪/৭৮-৭৯)। সুশ্রতের মতে গরু,
ঘোড়া, খচ্চর, বৃষ, গাধা, উঠ, ছাগ, ভেড়া প্রভৃতি গৃহপালিত পশুর মাংস ক্ষুধা
উদ্রেকারী , পুষ্টিকর, সুস্বাদু এবং সহজপাচ্য। এসব মাংস বায়ু প্রশমিত করে এবং কফ ও পিত্ত সৃষ্ঠিতে
সহায়তা করে। গরুর মাংস নিয়ে বলা হয়েছে যে এই মাংস পবিত্র এবং ঠাণ্ডা আর হাঁপানি,
সর্দিকাসি, জ্বর, অত্যাগ্নি এবং বায়ু বিভ্রাটের নিরাময় করে। (সুশ্রতসংহিতা ,
১/৪৬/৪৫-৪৬) (সুশ্রতসংহিতা , ১/৪৬/৪৭)।
বিভিন্ন পুরাণেও গরুর মাংস খাবার
এবং বিশেষ করে ব্রাহ্মণদের পরিবেশন করার
স্পষ্ট নির্দেশ ও প্রশংসা আছে। উদাহারণ স্বরুপ বিষ্ণুপুরাণ –এ গরু, শূকর, গণ্ডার,
ছাগ, ভেড়া প্রভৃতি বিভিন্ন মাংস খাইয়ে ব্রাহ্মণদের হবিষ্য করাবার বিধান দেওয়া
হয়েছে। এই স্থানে গোমাংসের মহার্ঘতা ও উৎকৃষ্ট কথার উল্লেখ প্রনিধানযোগ্য।
(বিষ্ণুপুরাণ, ৩/১৬)। ভবভূতির উত্তররামচরিত নাটক থেকেও প্রমান পাওয়া যায় যে
প্রকৃতপক্ষ্যে, এমনকি মুনিঋষিদের মধ্যেও, গরুর মাংস খাওয়ার প্রচলন ছিল। বর্তমান গোরক্ষা নিয়ে যে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ
যাবতীয় লম্ফঝম্ফ করছে, এই সংগঠনের আদি সংস্করণ আর্য প্রভৃতি সমাজ গোমাতা রক্ষা
করতে হবে বলে সাম্প্রদায়িক আন্দোলন শুরু করেছিল, তখন সেই গোমাতা সংরক্ষণ সম্বন্ধে
বিবেকানন্দ ঠাট্টা করে বলেছিলেন, Like mother Like son- যেমন মাতা তেমনি সন্তান। স্বামী বিবেকানন্দ
প্রাচীন ভারতে গোমাংস ভক্ষণের বহুল প্রচলন এবং ব্রাহ্মণরা যে বিনা বাধায় গরুর মাংস
খেতেন, তা নিয়ে তিনি বলেছেন “ এই ভারতবর্ষেই এমন এক দিন ছিল যখন কোন ব্রাহ্মণ গরুর
মাংস না খেলে ব্রাহ্মণই থাকতে পারতেন না। আমরা বেদ পড়ি যে যখন কোন সন্ন্যাসী,
রাজা, কিংবা বড় মানুষ বাড়ীতে আসতেন, তখন সবচেয়ে ভালো ষাঁড়টিকে কাটা হতো”। “There was a time in this very
India when, without eating beef, no Brahmin could remain a Brahmin, you read in
the Vedas how, when a Sannyasin, a King or great men came into a house the best
bullock was killed” (Collected works of Swami Vivekananda, Advaita Asharama,
Calcutta, 1963, Vol III, page 172)”। একথা অবশ্য সত্য যে
পরবর্তীকালে হিন্দু সমাজে গরুর মাংস
খাবার অভ্যাস ক্রমশ উঠে যায়। বর্তমানে নানান সামাজিক কারণের পাশাপাশি অনেক সময়ে আমাদের
গোমাংস ভক্ষণের বিপক্ষে যুক্তি তে আসে যে
আমাদের দেশের জলবায়ু্যোনিত কারণে এই মাংস ভক্ষণ স্বাস্থের পক্ষ্যে নেতিবাচক প্রভাব
ফেলে যদিও আমাদের দেশের থেকে অনেক বেশী গরম দেশের আধিবাসীরা গরুর মাংস খেয়ে ভাল
স্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে আছে। সুপণ্ডিত বিদেশী পর্যটক আলবিরুণীর বিবরণ থেকে জানা যায়
যে একাদশ শতাব্দীতে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে গরুর মাংস খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল
যদিও তাঁর বিবরণে এই বিধিনিষেধগুলি ব্রাহ্মণদের প্রতিই প্রযোজ্য ছিল। বস্তুত
গরুরমাংসের খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রধান কারণ যে ছিল অর্থনৈতিক, সেই দিকে
আলবিরুণীর বিশ্লেষণ ছিল যথার্থ । মহাভারতে গোহত্যা বা গোদানের ওপর যে নিয়ন্ত্রণের
শুরু আমরা লক্ষ্য করেছি,আলবিরুণীর মতে তার যুক্তিপূর্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। জনসংখ্যা
বৃদ্ধি এবং অনগ্রসরতার ফলে কৃষিপ্রধান দেশে ধন হিসেবে গরুর ব্যবহারিক মূল্য ক্রমশ
এর খাদ্য মূল্য কে অতিক্রম করতে থাকে। কৃষিকাজ, জ্বালানি, ঘরদোর পরিষ্কার রাখা,
দূধ, ঘি, ছানার জন্য, সারের জন্যে গরুর আর্থিক মূল্য দাঁড়াল গরুর মাংসের মূল্যের
থেকে বেশী। এই
বিষয়ে আলবিরুণীর মূল্যায়ন “ আমাদের মনে
রাখতে হবে যে গরু এমন একটি প্রানী যা মানুষের অনেক প্রয়োজনে আসে। গরু ভার বহন করে,
কৃষিক্ষেত্রে হালচাষ এবং বীজবপনে অপরিহার্য, দুগ্ধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য দিয়ে
পরিবারের ভরণপোষণ করে। গোবর অনেক ভাবে ব্যবহৃত হয়। শীতকালে এমনকি গরুর নিঃশ্বাসও
মানুষের কাজে লাগে। এজন্যই গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ হয়েছে। ব্যাবিলনের লোকেরা যখন
আল হাজাজের কাছে অভিযোগ করেছিল যে গোহত্যার ফলে দেশ ক্রমশ মরুভুমি হয়ে যাচ্ছে, তখন
তিনিও গোহত্যা নিষিদ্ধ করেছিলেন”। (Alberuni’s India)। আঠারো শতকের ফরাসী বিশিষ্ট চিন্তাবিদের ভলতেয়ার (Voltaire) এর এই নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক কারণকেই জোর
দিয়েছিলেন “ The
cow will not be sacrificed in the burning territory of the Indian peninsula,
because it supplies the necessary article of milk and is very rare in and
barren districts, and because its flesh, being dry and tough, and yielding but
little nourishment, would afford the Brahmins poor cheer. On the contrary, the
cow will be considered sacred in consequence of its rareness and utility” (The
Portable Voltaire, Penguin, 1979, Page 97)”। এই বিষয়ে স্বামীজী বক্তব্য স্বর্তব্য “….In time it was found that as we
were an agricultural race, killing the best bulls meant annihilation of the
race. Therefore the practice was stopped and a voice was raised against the
killing of cows”. (Collected works of Swami Vivekananda, Vol III, page 174)। বিবেকানন্দ যদিও বৈদান্তিক মায়াবাদ ও শঙ্করাচার্য্যের
দর্শনকেই অবলম্বন করেছিলেন, তথাপি সমাজদর্পনে ও খাদ্যাখাধ্যের বিষয়ে তার বিশ্লেষণ
ও ব্যক্তিগত অভ্যাস ছিল একান্তই উদার ও বিজ্ঞানসম্মত। এই বিষয়ে অনেক লেখায় ও বক্তব্যে তিনি বলেছেন, মানুষের পক্ষ্যে যে খাদ্য
পুষ্টিকর ও বলবর্ধক, সে খাদ্যই গ্রহণ করা বিধেয়। আমেরিকা বাসের সময়ে তিনি নিজেই
গরুর মাংস সহ সব রকম আমিষ খাদ্যই গ্রহণ করতেন। (লন্ডন থেকে লেখা আলাসিঙ্গা নামক
মাদ্রাজী শিষ্যকে পত্র ১৮ই নভেম্বর ১৮৯৫ তারিখ; Romain Rolland, The Life of Vivekananda, Advita
Ashrama, Calcutta, 1975, page 44)।

খুবই তথ্য সমৃদ্ধ এবং well researched তবে Headings & Subheadingsএর প্রয়োগ বেশী করলে পড়তে সুবিধা হবে ।
ReplyDelete