তাই এই সংস্কারবাদীদের কাছে বিদ্যাসাগর ছিলেন
ব্রাত্য। পশ্চিমী ধ্যান-ধারণা এবং
কাঠামোকে ধারণ করে এবং তাত্ত্বিক ও
দার্শনের অনুকরণ করে আড়ালে হিন্দু ধর্মকে উজ্জীবিত করার অভিপ্রায় ছিলো এই
সংস্কারবাদীদের। পরবর্তি সংযোজিত আচার-অনুষ্টান, যা পশ্চিমীদের কাছে ছিল ঘৃণ্য ও
আদিম বর্বরতার নিদর্শন, সেই রীতিগুলোকে পরিহার করে (সতীদাহ – বিধবা বিবাহ প্রভৃতি)
হিন্দুধর্ম – দর্শনকে উজ্জীবিত করার
অভিপ্রায়ে তাঁদের পশ্চিমী তত্ত্ব ঢাল হিশেবে ব্যবহার করতে হয়েছিল এই অবক্ষয়ই
বর্ণাশ্রম-প্রথা, প্রাচীন অনুপযোগী ব্যবস্থাকে মেরামত করার উদ্দেশ্যে। উনবিংশ
শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে এই সংস্কারবাদীদের মধ্যে হিন্দু ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করার
প্রবনতা দেখা দেয়। চিন্তা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই বিবর্তন শুরু হয় প্রধানত উনবিংশ
শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে। শিল্পী-সাহিত্যিক বঙ্কিম পরিনত হলেন হিন্দু বঙ্কিমে। রামমোহন
দ্বারা প্রতিষ্টিত ব্রাম্ম্য সমাজ এই বিবর্তন প্রক্রিয়ায় জন্ম দিলো আর্য সমাজে,
হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থানের অভিপ্রায়ে। হিন্দু ধর্মীয় বিধিতে সতীদাহ, বর্নাশ্রম,
বহুদেবতার উপাসনা প্রভৃতি প্রথার পশ্চিমী
সমালোচনা এবং সমাজসংস্কারবাদী ধারণাকে
সমর্থন জানিয়েছিলেন। কিন্ত আবার হিন্দু সমাজে প্রাচীন অমানবিক প্রথাযাত ধর্মান্তকরণ
ও খৃষ্টান ধর্ম ব্যাপ্তির প্রক্রিয়ায় আশঙ্কিত ছিলেন। তিনি সচেতন ভাবেই হিন্দু
ধর্মের মহত্ত্বকে সংস্কারবাদী কাঠামোতে রক্ষা করার অভিপ্রায়ে ব্রতি হয়েছিলেন। ব্রাম্ম্য
সমাজ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশ প্রধানত বোম্বে প্রেসিডেন্সি থেকে হিন্দু
সমাজসংস্কারবাদীদের আকর্শন করেছিল। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন
স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ছিলেন একজন গুজরাটি ব্রাহ্মণ যিনি
সন্যাস ব্রত অবলম্বন করেছিলেন। ১৮৭৩ সালে তিনি কলকাতায় এসে তৎকালীন প্রখ্যাত
ব্রাম্ম্যসমাজের নেতা কেশবচন্দ্র সেনের সাথে দেখা করলেন। কেশবচন্দ্র সেন সবেমাত্র
তখন ইংল্যান্ড থেকে ফিরে বিদেশীদের নৈতিক অবক্ষয় দেখে মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দে পড়ে
গিয়েছিলেন। তিনি এবার এই ধারণা এবং আদর্শ প্রচার করতে লাগলেন যে ভারতবর্ষ বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তিতে বিদেশ থেকে পিছিয়ে থাকলেও আত্মোন্নতিতে বিদেশ থেকে অনেক এগিয়ে। (সুত্রঃ
– This aspect of neo-Hinduism is scrutinized in
T.Raychaudhuri, Europe Reconsidered : Perceptions of the West in Nineteenth -
Century Bengal, Delhi, Oxford University Press, 1988)।
স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী
দয়ানন্দ সরস্বতী রামমোহন ও
কেশবচন্দ্র সেনের বৌধিক উতকর্ষকে পূঁজি করে, ভিন্ন পথে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলেন। ব্রাম্ম্য
সমাজীরা বৈদিক ‘সোনালী যুগ’ এর একেশ্ববাদী
ধর্মীয় ধারার ও আচার-অনুষ্ঠানের মাহাত্য ও প্রচলনের পক্ষপাতি ছিলেন সংযোজিত
ধর্মীয়বিধি নির্দেশিত সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানকে পরিহার করে। (সুত্রঃ – B. C. Roberson, Raja Rammohan Roy : The Father of
Modern India, Delhi, Oxford University Press, 1995)। দয়ানন্দ
সরস্বতী কেশবচন্দ্র সেনের আত্মোন্নতি ঔতকর্ষের ধারণকে আরো পল্লবিত করে ভারতীয় সমাজের মাহাত্য
প্রচার করতে শুরু করলেন তার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মাহাত্যের, মহিমা কির্তনের
মাধ্যমে। তার মতে বৈদিক সময়ের উতকর্শ
শুধুমাত্র আত্মোন্নতির মাধ্যমে প্রকাশিত
নয়, কিন্ত তার ব্যাপ্তি ও বিস্তার, এই দেশের মানুষ,
সংস্কৃতি ও ভারতভূমিতে প্রতিভাত। দয়ানন্দ ধারনায় বৈদিক যুগের আর্য্য গোষ্টী
হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পবিত্র ভুমির আদি বাসিন্দা। তাঁরা ভগবান দত্ত সকল
ভাষার জনক উতকৃষ্ঠ সংস্কৃত ভাষার অধিকারী ছিলো। এই ধারণা আরো প্রবল হয় অষ্টাদশ
শতাব্দীর চিন্তাবিদ ও দার্শনিক উইলিয়াম জোন্সের তত্ত্বে। সেই সময়ে এই ধারণা বহুল
প্রচলিত হয়ে গিয়েছিলো যে সংস্কৃত ভাষা থেকে সকল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার উদ্ভব। (সুত্রঃ-
P.J. Marshall, The British
Discovery of Hinduism in the Eighteenth Century, Cambridge, Cambridge
University Press, 1970 and W. Halbfass,
India and Europe : An Essay in Philosophical Understanding; New York , State
University of New York, 1988)। দয়ানন্দ আর্য্য সমাজে এক মহান আদর্শ, মানব- সাম্য ও
ভগবান দত্ত ন্যায়-নীতির চরিত্র প্রতক্ষ্য করেছিলেন। তিনি বর্নাশ্রম প্রথাকে উপেক্ষা করেননি কিন্ত এই মতাদর্শকে পূনর্ব্যাখ্যা করলেন এই ধারনায় যে
এই প্রথা উত্তরাধিকারের অধিকারের অপরে প্রতিষ্টিত নয় বরং বৌধিক গুনে শ্রমবিভাজনকে
অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতি বর্ণকে তার ধর্ম পালনে নির্দেশ দেয়। দয়ানন্দের মতে
আদি-আর্য্য সমাজে শিক্ষক –গুরুরা শিষ্যদের তাঁদের দোষ-গুন বিচার করে এই
বর্নভিত্তিক শ্রমবিভাজনে নির্দিষ্ট করতেন। দয়ানন্দের পুনরুজ্জীবন তত্ত্বে প্রধানত
আগ্রাসী পশ্চিমী সংস্কৃতির প্রতি এক অদ্ভুত ঘৃণা এবং অনুকরণ ধারণার মিশ্রন ব্যক্ত
হয়। আদি – ব্রাম্ম্য সমাজীদের তুলনায় দয়ানন্দ বৃটিশ উপনিবেশবাদকে হিন্দু সভ্যতার ওপর
এক আগ্রাসী বিধ্বংসী চ্যালেঞ্জ হিশেবে
দেখতেন। (উদাহারণ স্বরূপ সতীদাহ, বর্নাশ্রম প্রথা প্রবৃতি বিষয়ে পশ্চিমি দের
মূল্যায়নে)। দয়ানন্দ এই চ্যালেঞ্জকে প্রশমিত করার জন্যে পশ্চিমি সভ্যতা-সংস্কৃতির
কিছু উপাদান অনুকরণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। দয়ানন্দের কাছে সংস্কার ভারতকে পশ্চিমের
মতন তৈরি করা নয়, বরঞ্চ ভারতের সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্তরকে উন্নিত করে পশ্চিমিদের
কাছে গ্রহণযোগ্য ও অনুমোদনযোগ্য করার নিরিখে। দয়ানন্দ হিন্দু ধর্মের চালু
পশ্চাৎগামী আচার অনুষ্টানকে বৃটিশদের দ্বারা আইন দ্বারা নিষিদ্ধ বা পরিমার্জন করার
বিরোধিতা করতেন এবং হিন্দুদের পশ্চিমিদের তারিফ করা এবং ধর্মান্তরিত হবার ব্যাপারে
নিরুৎসাহ করতে চাইতেন। তিনি তর্কের দ্বারা প্রমাণিত করতে চাইতেন যে পশ্চিমি সভ্যতা
এবং আধুনিকতা যা দেশের হিন্দুরা কদর করতো, মোহিত করতো , সেই সব প্রলুব্ধকারী
উপাদান দেশের পুর্বপুরুষের দ্বারা প্রতিষ্টিত মহান ঐতিহ্যের মধ্যেই প্রোথিত আছে। পশ্চিমি
প্রভাবকে প্রতিহত করার জন্যে আবার পশ্চিমি অনুকরণের আংগশিক সমর্থন তিনি করতেন
নিজের দেশের ঐতিহ্য গৌরবকে পুনরুদ্ধারের অভিপ্রায়ে। হিন্দুদের ধর্মান্তকরণ বিশেষ
করে নিম্নবর্ণ মানুষের খৃষ্টীয় ধর্মে ধর্মান্তকরণ হিন্দু ধর্মের কাছে বিপদ এবং ধংসাত্বক
প্রক্রিয়া হিশেবে দয়ানন্দের কাছে মনে হয়েছিল। তার জীবনের শেষের দিকে তিনি আবার
পূণর্বার হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তকরণের আচার চালু করেন যদিও হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রে
এই বিধির কোনো নির্দেশিকা পাওয়া যায় না। দয়ানন্দ প্রাচীন আচার ‘শুদ্ধি’ প্রথা চালু
করেন যার মাধ্যমে উচ্চবর্ণ হিন্দুরা যারা ‘পতিত হয়েছে, তাঁরা আবার নিজেদের বর্ণের
সাথে সংযুক্ত হতে পারবেন। খৃষ্টান ধর্মথেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে দয়ানন্দ শুদ্ধি প্রথা
কে এক সামাজিক আন্দোলনে পরিনত করলেন মূলত খৃষ্টান ধর্মান্তকৃত মানুষকে লক্ষ্যে
রেখে, কিন্ত ওনার মৃতুর পর এই আন্দলনে, দয়ানন্দের শিষ্যদের
মূল লক্ষ্য হয়ে গেলো মুসলমান ও শিখেরা। (সুত্রঃ – K.Jones, ‘Ham Hindu Nahin; Arya-Sikh Relations,
1877-1905, Journal of Asian Studies, Vol. 32, No.3, May1973)।দয়ানন্দ পাঞ্জাব
প্রদেশে আর্য্য সমাজ প্রতিষ্ঠিত করলেন ১৮৭৫ সালে, যেখানে, অন্যান্য প্রদেশের
তুলনায় হিন্দুরা মুসলমান ও শিখেদের তুলনায় সংখ্যালঘু ছিলো। দয়ানন্দের
মৃত্যুর পরে পাঞ্জাবে আর্য্য সমাজ বিকশিত ও বর্ধিত হতে থাকলো এবং শেষপর্যন্ত
রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করলো। (সুত্রঃ – On the Arya Samaj, K.Jones, Arya Dharm- Hindu Conciuosness in Nineteenth –
Century Punjab; Berkley, University of California Press, 1976, Lajpat Rai, The
Arya Samaj : An Account of its Aims, Doctrine and Activities, with a
Biographical Sketch of the Founder, New Delhi, DAV College, 1914…etc)।

No comments:
Post a Comment