ব্যাক্তিক, পারিবারিক,
সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে স্বগঠনের বা আত্মনির্মাণের
কাল থাকে। তখন মানুষ আত্মঅভাব পুরণের, আত্মস্বার্থ রক্ষার ও আত্মপ্রতিষ্ঠার
স্বপ্নে, চিন্তায় ও কর্মে নিয়োজিত থাকে প্রায় অনন্যচিত্ত হয়েই। ব্যক্তিজীবনের
অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের সাক্ষ্যই এর প্রমাণ। যে দিন-মজুর, সে যেমন পরার্থে, ভাববার
করবার সময়-সুযোগ পায় না, তেমনি দুর্বল দরিদ্র নিঃস্ব জাতি বা সম্প্রদায়ও সর্বদা
আত্মস্বার্থের চিন্তায় ও কর্মে নিরত থাকে। এ জন্যই নতুন দল যখন গড়ে ওঠে, তখন
সদস্যদের দলনিষ্টা ও স্বাতন্ত্র্যচেতনা প্রবল থাকে। সে দল সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি
বা জীবন-জীবিকার যে-কোন স্বার্থ বা চাহিদা
সম্পৃত হোক না কেন। পরে কাল-প্রভাবে উদ্যম, উদ্যোগ, নিষ্টা ও স্বাতন্ত্র্যচেতনা
হ্রাস পেতে থাকে এবং বিস্মৃতি, বিকৃতি ও নিষ্ক্রিয়তা আসেই। কারণ, কালের নিয়মেই
সৃষ্টি বিকাশ লয় হয়। এ কারণেই ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক, কিংবা
আর্থিক-সাংস্কৃতিক জীবনেও উত্থান ও পতন থাকেই। এ প্রাকৃতিক নিয়ম। কাল-প্রবাহের মতো
প্রজন্ম –স্রোতও চলমান। গতিশীল সৃষ্ঠি ও ধ্বংস, জীবন ও মৃত্যু, উত্থান ও পতন। এ
সত্যই প্রমাণ করে যে মানুষকে স্বকালে স্বসমাজকে স্বচিন্তায় স্বচেতনায় স্বয়ম্ভর হয়ে
বাঁচতে হয়। সুখে হোক, সমস্যায় হোক, এমনি বাঁচাই হচ্ছে স্বাভাবিক বাঁচা, প্রাকৃতিক
নিয়মানুগ বাঁচা। কেননা এ পুরোনো পৃথিবী, এ-প্রকৃতি, এ-সুর্য, এ-চন্দ্র প্রতি নতুন
চোখে চোখে রঙ বদলায়, রূপ পালটায়। বলা যায় ‘এক অঙ্গে এতো রূপ নয়নে না হেরি’। এর
কারণ ‘যত মন তত রূপ’। চন্দ্র বা সুর্য একটি বটে, কিন্ত কাড়াকাড়ি না করেই বিশ্ব ভূবনের যে কেউ একে
অখন্ডরুপে এককভাবে একান্ত করে পায়। কাল বহমান বলেই জীবনও অস্থির। অসচেতন মানুষের
জীবন কালস্রোতে অন্তিম ক্ষয়ের দিকে ভেসে চলে কচুরিপানার মতো। অন্ধ পথ চলে আনন্দ
পায় না, কিন্ত চক্ষুষ্মান পায়। তেমনি সচেতন মানুষও কালস্রোতে
তৃণখন্ড বটে, কিন্ত তার জীবনে ভোগ-উপভোগের আনন্দ ও যন্ত্রণা দু-ই
থাকে। নতুন সূর্্যের উদয়ে নতুন দিন শুরু। সে – নতুন দিনে জীবনও সমস্যা তাই নতুন। সেজন্য
কোন ঐতিহ্য, পুরোনো জ্ঞান বা পুরানো কলাকৌশল স্বকালের সমস্যার কালোপযোগী সমাধান
দিতে পারে না, যদিও স্থূলদৃষ্টির মানুষের কাছে অতীতের সবকিছু বর্তমান কালেও পাথেয়
বলে প্রতীয়মান হয়। তাদের এই ধারণার ফলেই তাদের জীবনে, সমাজে, রাষ্ট্রে, মনে-মেজাজে
সমকালতা অবহেলিত ও অনুপস্থিত থাকে। তাদের পিছিয়ে পড়ার কারণ এটাই।
ঐতিহ্যের অনুরণন অনুসরন
বাঞ্ছনীয় হতে পারে, কিন্ত অনুকরণ কিংবা রুপায়ন কখনো কাম্য নয়। তাছাড়া
অতীতে যারা আমাদের জন্যে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেন, তাঁরা কোনো সমকালীন
রাজনোইতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক কাঠামোয় থেকে বৈপ্লবিক ধারা, দার্শনিক চিন্তা ,
রীতি-রেওয়াজ প্রভৃতি সৃষ্টি করেছিলেন মানব-সভ্যতার প্রগতির নিরিখে, কিন্ত তাঁরা
সেই আদর্শকে নিত্যকালের জন্যে ধরে রাখেননি। তাঁরা নতুন নতুন ঐতিহ্য সৃষ্ঠি করেছেন
আমাদের জন্যে তাঁদের প্রাত্যহিক ভাব, চিন্তা কর্ম ও আচরণের মাধ্যমে। একবারের
সৌভাগ্যের ও সাফল্যের উপায়কে তাঁরাও চিরকালের উপায় বলে গ্রহণ করেননি। তাই
ঐতিহ্যমাত্রই অতীতের। সেই পরিত্যক্ত রীতি পদ্ধতি ও কর্ম চিন্তা লোকস্মৃতির
প্রশ্রয়ে কিংবাদন্তীর আশ্রয়ে বেঁচে থাকে কালান্তরে। স্রষ্টারই পরিত্যক্ত সামগ্রীকে
তাঁর উত্তর – পুরুষেররা মহামূল্যজ্ঞানে যদি পাথেয় রূপে জীবনযাত্রায় প্রয়োগ করে, তা
হলে তাদের চলা চক্রের আবর্তন ছাড়া কিছুই নয়। এতদ্বারা বিবর্তন বা অগ্রগতি ঘটে না। মূলধন যেমন উপার্জনের ভিত্তি, ঐতিহ্যের পূঁজিও
তেমন অগ্রগতির ভিত্তি। মূলধনে হাত পড়া
যেমন লোকসানের চিহ্ন, ঐতিহ্য ধরে বসে
থাকাও অধোগতির দিক নির্নয় করে। নিজ ভাব চিন্তা প্রকাশ ও বিকাশের জন্যে মানুষ যখন
চারপাশে কোনো ভিত্তি পায় না, তখন সে অতীতের দিকে ফিরে তাকায়, অতীতের ঘটনা, চিন্তা
বা কাহিনী সে উপস্থাপিত করে বর্তমানে ভাব চিন্তা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে এবং
উদাহারণ। রূপক ও কাহিনীরুপে ব্যবহ্রত হয়ে তা ভাবকল্প ও চিত্রকল্পের অবয়ব তখন প্রতিভাত হয়। বর্তমানকে স্বকালে,
স্বস্থানে ও স্বরূপে খুঁজতে না জানার অসামর্থ্যের কিংবা বর্তমানকে দিয়ে বর্তমানকে
দিয়ে বর্তমানকে ভাবচিন্তা প্রকাশের অক্ষমতা স্বাক্ষর থাকে। কাজেই ঐতিহ্য নির্ভরতা
বর্তমান অবস্থার পরোক্ষ প্রকাশের বাহন মাত্র-প্রত্যক্ষ অভিব্যক্তির উপায় নয়। অপরের
সৌভাগ্যে ও পীড়নে যারা ঈর্ষান্বিত ও ক্ষুব্ধ অথচ অসহায় ও অক্ষম, তাদের চিত্তে জন্ম নেয় অতীতকে পুনরায় জাগরিত
করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার প্রয়োগ ঘটানোর উদ্যোগ ও উৎসাহে, বর্তমান সমাজে তা
অপ্রাসঙ্গিক ও পশ্চাতগতিশীল হলেও। এই
পুনর্জাগরনের উদ্যোগকেই বলে ‘Revivalism’ । অসহায় ও অক্ষমের মনে জন্ম নেয় এই ‘Revivalism’ । তাদের
বর্তমান অযোগ্যতা তাদেরকে অতীত গৌরবগর্বী করে তোলে। তাতে তারা বর্তমানে আত্মগ্লানি
ও আর্তনাদ গৌরবময় ঐতিহ্যের আস্ফালনে ঢাকা দিতে চায়। বর্তমান দীনতার দুঃখ, লাঞ্ছনা
ভুলবার উপায় হিসেবেই ঐতিহ্যের আশ্রয়ে তারা প্রবোধ ও প্রশান্তি খোঁজে। উপার্জনে
অক্ষম ব্যক্তির যেমন পিতৃসম্পদই ভরসা ও নির্ভরতা, ‘Revivalism’ এ আসক্তি অনেকটা সেইরূপ। কাজেই ‘Revivalism’ অক্ষমের
সান্ত্বনা। পুরাতনকে পুনরুজ্জীবিত করার আগ্রহের মধ্যেই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে
প্রত্যাশাহীনতা। বর্তমানে কিছু করার নেই, ভবিষ্যতের কোনো দিকনির্দেশিকা নেই এমনি
প্রত্যয়হীনতাই মানুষকে করে অতীতমুখী। তাদের চোখে পৃথিবী যেন হঠাত স্তব্ধ বা স্থবির
হয়ে যায়। তার গতিপ্রবাহ যেন চিরকালের জন্যে থেমে গেল, যেন আর এগোবার পথ নেই,
প্রয়োজনও নেই। তাই বর্তমানে দুর্দিনের সম্বল করতে হবে অতিতের সঞ্চিত সম্পদ থেকে।
কেননা অতীতের সে পরিবেশে আমামদের পূর্ব পুরুষ একদিন স্বগোউরবে, স্বশক্তিতে ও
স্বমহিমায় বেঁচেছিলেন। তাই এমন অপবুদ্ধি সহজেই মনে জাগে যে সেই অতীতের কোঠরকেই
সম্বল করার। ‘Revivalism’ এ মনের বিকাশ বিস্তার হওয়া তাই অসম্ভব। সৃষ্টিতত্ত্বে
বিবর্তনের নিয়মে মানুষের চোখ যখন সামনে স্থাপিত ও পায়ের পাতা সামনেই প্রসারিত, তখন
বুঝে নিতে হবে পিছু হঠা নির্বোধ, মস্তিষ্কবিকৃতীর, বিকলাঙ্গের চিহ্ন মাত্র।
কোন ব্যক্তি, দেশ বা জাত
সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করলে দেখা যাবে, যে বা যারা দেহে-মনে, বিদ্যায়-বুদ্ধিতে,
শক্তিতে – নৈপুন্যে, সাহসে-প্রত্যয়ে যত অসম্পূর্ণ, সে বা তারা সেই পরিমাণেই
অতীতমুখী, ঐতিহ্যগর্বী ও পিতৃসম্পদনির্ভর। অর্থাৎ অক্ষমের অতীতপ্রীতি, ঐতিহ্যগর্ব
ও আর্তনাদ- লুকানো আস্ফালন অধিক। তারাও জানে পিতৃধনে ক্ষয় আছে, ম্লানিমা আছে,
বৃদ্ধি বেই, জৌলুস নেই। কাজেই এ
নির্ভরতার আস্ফালনের মূলে রয়েছে অক্ষমতা
বা অসামর্থ্য। নির্জিত মানুষের বাঁচার এও এক অবলম্বন। কিন্ত আমরা জানি ‘ উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে।
তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে’। তার কারণ আত্মপ্রত্যয়ী উত্তম জানে তস্র হারাবার
কিছু নেই, আর অধম আকাঙ্ক্ষা বিরহী বা নিরীহ-নির্বোধ বলেই উত্তমের কাছে তার
সম্মানবোধ থাকে না-থাকে বরং কৃপালাভ ও ভয়জাত সঙ্কোচ । যার নিচে পড়বার আশঙ্কা এবং
উপরে উঠবার প্রয়াস সার্বক্ষনিক, সে-ই হচ্ছে মধ্যম। কাজেই তাকে সাবধানে, সতর্ক
দৃষ্টিতে, গা-পা বাঁচিয়ে চলতে হয় সর্বক্ষণ। কেননা একবার পা পিছলে পড়ে গেলে কিংবা
সুযোগ হারালে এ জীবনে উঠবার আর উপায় থাকে না। যে-দল ঐতিহ্যের গন্ডী আগে অতিক্রম
করে অগ্রসর হয়, সে –দল হল আকাঙ্ক্ষাবান ঈহাপূর্তিকামী মধ্যমের-অধমের নয়। আত্মরক্ষা
ও আত্মপ্রসারের জন্যে তাকে উত্তমের সান্নিধ্যজাত চাপ এড়িয়ে ও স্বাতন্ত্র্যসচেতন
হয়ে চলতে হয় বটে, কিন্ত প্রণোদনা – প্রেরণা পায় উত্তম থেকেই, উত্তমই তার
আদর্শ ও অনুকরণীয়।
হাজার বছর ধরে ভারতের
ইতিহাসে আমরা এই অভিলাষী মধ্যমের লীলাই প্রত্যক্ষ করি। কাসেমপুত্র মুহম্মদের
সিন্ধু বিজয়ের ফলে কেরলার শঙ্করাচার্যের মনে জাগে অদ্বৈত্ববাদী চিন্তা। বিজয়ের
আদলে আত্মোন্নয়নের স্পৃহাই এ চিন্তা-চেতনার উৎস। এ চেতনার ম্লান ও বিকৃত অনুসৃতি
রয়েছে মাধব, নিম্বার্ক, রামানুজ, ভাস্কর ও বল্লভের মতবাদে। উত্তর ভারতেও
তুর্কি-প্রভাবে একইভাবে মুক্তিচেতনা ও আত্মজিজ্ঞাসা জাগে চিরবঞ্চিত প্রতারিত ও
শোষিত নিম্নবর্নের মানুষের মনে। দ্রোহী হয় তারা, হয়ে ওঠে অদ্বৈত্ববাদী। সন্তধর্মের
উদ্ভব ও ভক্তিবাদের বিকাশ ঘটে এভাবেই। চৈতন্যদেবের প্রেমবাদ এর উৎকৃষ্ট পরিণতি।
একই স্পৃহা বলে রামমোহনও হয়েছিলেন স্বধর্মদ্রোহী, ইংরেজের আদলে মন-মনন গঠন ও
ব্যক্তিক- সামাজিক জীবন রচনাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। পৃথিবীব্যাপী সংস্কৃতি-সভতা গড়ে
উঠেছে, বিবর্তিত হয়েছে ও এগিয়েছে দীপ থেকে দীপ – জ্বালানো পদ্ধতিতেই। মৌলিক
চিন্তা-চেতনা চিরকালই বিরলতায় দুর্লভ।
আমরা বাঙালীরা আগে ছিলাম animist, পরে হলাম Pagan, তারও
পরে ছিলাম হিন্দু-বৌদ্ধ, এখন আমরা হিন্দু
কিংবা মুসলমান। আমরা বিদেশের ধর্ম নিয়েছি, ভাষা নিয়েছি, কিন্ত তা কেবল নিজের মতো করে রচনা করবার জন্যই। তার
প্রমাণ নির্বাণকামী ও নৈরাত্ম ও নৈরাত্ম-নিরীশ্বরবাদী বৌদ্ধ এখানে কেবল যে
জীবনবাদী হয়ে উঠেছিল, তা নয়, অমরত্মের সাধনাই ছিল তাদের জীবনের বৃত। বৌদ্ধচৈত্য
ভরে উঠেছিল অসংখ্য দেবতা ও উপদেবতার প্রতিমায়। হীনযান-মহাযান ত্যাগ করে এরা তৈরি
করেছিল বজ্রযান-সহজযান, হয়েছিল থেরবাদী, এতে নিহিত তত্ত্বের নাম গুরুবাদ। এই বিকৃত
বৌদ্ধ জীবন-চর্যায় মেলে এদেশের মানুষ চিরকাল এই কাদামাটিকে ভালবেসেছে, এর লালনে
তার দেহ গঠিত ও পুষ্ঠ, এর দৃশ্য তার প্রাণের আরাম ও মনের খোরাক। সে এই আশ্চর্য
দেহকেই জেনেছে সত্য বলে, দেহস্থ চৈতন্যকে মেনেছে আত্মা বলে – পরমাত্মারই খংন্ডাংশ
ও প্রতিনিধি বলে। তাই চৈতন্যময় দেহ তার কাছে মানুষ আর দেহ বহির্ভূত অখণ্ড চৈতন্য হচ্ছে তার
কাছে মনের মানুষ, রসের মানুষ কিংবা ভাবের মানুষ। সে জীবনবাদী, তাই বস্তুকে সে
তুচ্ছ করে না, ভোগে নেই তার অবহেলা। তাই জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে যা কর্তব্য,
তাতেই সে উদ্যোগী। সে জন্যেই সে তার গরজ মতো জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার দেবতা
সৃষ্ঠি করেছে। পারলৌকিক সুখী জীবনের কামনা তার আন্তরিক নয়, নেহাত পোষাকই। তাই সে
মুখে বৌদ্ধ ও ব্রাম্মণ্যবাদ গ্রহণ করেছিল, অন্তরে কোনদিন বরণ করেনি। তার পোশাকী
কিংবা পার্বনিক জীবনে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম এবং আচার, আবরণ ও আভরণের মতো কাজে
দিয়েছে, কিন্ত তার আতপৌরে জীবনে ঠাঁই পায়নি। া জানে, চৈতন্যের
অবসানে এ দেহ ধ্বংস হয়, চৈতন্যের স্থিতিতে এ দেহ থাকে সুস্থ, স্বস্থ ও সচল। তাই সে
দেহকে জেনেছে কালস্রোতে ভাসমান তরী বলে। প্রাণকে বুঝেছে শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র
বলে আর চৈতন্যকে মেনেছে মন বলে। তাই এই জীবনতাই তার কাছে মন-পাবনের নৌকার চলমান
লীলা রূপে প্রতিভাত হয়েছে, কাজেই পার্থিব জীবনই তার কাছে সত্য এবং বাস্তব ও প্রিয়। জীবনেতর জীবন অর্থাৎ
ইহলোকে ও পরলোকে প্রসারিত জীবন তার কল্পনায় দানা বেঁধে উঠতে পারেনি কখনো। তাই
বৈরাগ্যে সে উৎসাহ বোধ করেনি, বাউলেরা তাই গৃহী, যোগীরা তাই অমরত্বের সাধক। তার
দর্শন সাংখ্য, তার শাস্ত্র। তাই দেহতত্ত্বই তার সাধ্য। বৌদ্ধ তান্ত্রিক, হিন্দু
তান্ত্রিক এবং মুসলমান সুফীরা এ দেশের এই ঐতিহ্যই নিষ্ঠার সঙ্গে অনুসরণ করেছিলেন।
চর্যাপদে, বৈষ্ণব সহজিয়া পদে, বাউল গানে, বৌদ্ধ বজ্র-সহজ-কালচক্র ও মন্ত্রযানে,
শৈব-শাক্তসাহিত্যে, বাউল-সুফী সাহিত্যে, বাউল-সুফী সাহিত্যে আমরা দেহকেন্দ্রী
তত্ত্ব ও সাধনার সংবাদ পাই। ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে বৌদ্ধধর্ম এখানে
যক্ষ-দানব-প্রেত ও দেবতা –পূজায় রূপান্তরিত হয়েছিল। সেনদের নেতৃত্বে প্রচারিত ও
প্রতিষ্ঠিত উত্তর ভারতিক ব্রাম্মণ্যবাদ এখানে কার্যত টেকেনি। আদিবাসী বাঙালীর জীবন-জীবিকার মিত্র ও অরি দেবতা
– শিব, শক্তি (কালী), মনসা, চণ্ডী, শীতলা, ষষ্ঠী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ প্রভৃতি
পেয়েছেন পূজা। ওয়াহাবী-ফরাজী আন্দোলনের পূর্বে শরীয়তী ইসলাম এখানে তেমন আমল পায়নি।
এখানে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করেছেন পাঁচগাজী ও পাঁচপীর। নিবেদিত চিত্তের ভক্তি
লুটেছে খানকা, অর্ঘ্য পেয়েছে দরগাহ, আর শিরনী পেয়েছেন সত্যপীর – জাফর-ইসমাইল-খান
জাহান গাজীরা কিংবা বদর-বড়খাঁ-সত্যপীর। এঁদের কেউ পাপপূণ্য তথা বেহেস্ত-দোজখের
মালিক নন, তাহলে এঁদের খাতির কেন? সে কি পার্থিব জীবনের সুখ ও নিরাপত্তার জন্যে
নয়?
এখনকার দিনে বাঙলাভাষী
অঞ্চল বহুবিস্তৃত। উড়িয়া- আসামীকে অন্তর্ভুক্ত করলে গোটা প্রাচ্য-ভারতই বৃহত্তর ও
প্রাচীন সংজ্ঞায় অভিন্নভাষী অঞ্চল। সাম্প্রত-পূর্বকালে এ অঞ্ছলের আদি অধিবাসী
সম্বন্ধে আমামদের জ্ঞান ছিল সামান্য এবং বহুলাংশে অনুমিত। উত্তর ভারতীয় আর্যদৃষ্ঠিতে
এরা দাস, দস্যু, অসুর, পক্ষী তথা বর্বর। এদেশে ভাষা অবোধ্য, সংস্কৃতি ঘৃণ্য, অবয়ব
শ্রীহীন। সাম্প্রতিক গবেষণায় আমাদের এসব ধারণার প্রায় আমূল পরিবর্তন হচ্ছে।
‘বেসসান্তর জাতক’ – এর আলোকে সন্ধান করে জানা গেছে আড়াই হাজার বছর আগেই বৌদ্ধযুগে
রাঢ় অঞ্চলে দুটো ক্ষুদ্র সামন্ত বা স্বাধীন রাজ্য ছিল। একটি শিবিরাজ্য- ট্বলেমী
বর্ণিত সিব্রিয়াম, ওপরটি চেতরাজ্য। শিবিরাজ্য ছিল বর্তমান বর্ধমান জেলার অনেকখানি
জুড়ে আর এর রাজধানী ছিল জেতুত্তর নগর (মঙ্গলকোটের নিকটে শিবপূরী)। এর দক্ষিণে ছিল
চেতরাজ্য, এর রাজধানী চেতপুরীই সম্ভবত বর্তমান ঘাটাল মহাকুমার ‘দেতুয়া’ এলাকা।
দুটো রাজ্যই ছিল কলিংগরাজ্যে সীমান্তে। এখানে প্রতিভাত হয়, মৌর্যবিজয়ের আগেও এ
অঞ্চলে সভ্য রাজা রাজ্য ও প্রশাসন চালু ছিল, অতএব কৃষি-শিল্পে-বানিজ্যেও ছিল।
ট্বলেমী প্রমুখ বর্ণিত গঙ্গারীড়কে গঙ্গাতীরস্থ ‘রাঢ়’ বলে যদি মানা যায় তাহলে বুঝতে
হবে আলেকজান্দার – শ্রুত গজারোহী সৈন্যবাহিনী রক্ষিত প্রবল প্রতাপ রাজ্য ছিল এই
‘রাঢ়’। আর তাম্রলিপি, গঙ্গা, সমন্দর প্রভৃতি আন্তজার্তিক বানিজ্য বন্দরও
সুপ্রাচীন। সভ্য ও সংস্কৃতিবান হওয়ার জন্যে যে বাঙালীর জৈন- বৌদ্ধ মতবাদ গ্রহণের
কিংবা মৌর্য-শুঙ্গ-কন্ব-গুপ্ত শাসনে থাকার প্রয়োজন ছিল না, বরং উক্ত
সাম্রাজ্যবাদীদের শাস্ত্র, শাসন ও সংস্কৃতি যে বাঙালীর শাস্ত্র, সংস্কৃতি ও ভাষা
বিলুপ্তির কারণ হয়েছিল, তা ‘পান্ডুরাজারঢিবি’ উৎখননে প্রাপ্ত নিদর্শনাদিই প্রমান
করে। উত্তর ভারতীয় শাস্ত্র, শাসন ও সংস্কৃতি বাঙালীকে দুই-হাযার বছর ধরে
আত্মবিস্মৃত রেখেছে। তাই স্বতন্ত্র সত্তায় পরে আর কোনোদিন আত্মবিকাশের ঈহাও তাদের
মনে জাগেনি। বিজাতির শাস্ত্র, শাসন ও সংস্কৃতি বরণ করে এমনি সত্তা হারিয়েছিল উত্তর
আফ্রিকার মিসর-লিবিয়া-মরক্কো-আলজিরিয়া, পশ্চিম এশিয়ার মেসোপটেমীয়া-ব্যাবিলোনীয়া ও
আশশীরিয়া, আর ইরান হারিয়েছিল হরফ ও ধর্মমত। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৯২৮ থেকে ১৯৭০
সাল অবধি নরকঙ্কালাদি নানান প্রত্নবস্তু আবিস্কারের ফলে এখন প্রাচীন বাংলার
ইতিহাসে একটি পূণর্মূল্যায়ণ বা কাঠামোগত তত্ত্ব আভাসিত করা সম্ভব হচ্ছে।
বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়
এখন এরূপ ঃ আদি অস্ট্রিকরাই (আদি অস্ট্রাল) এদেশের প্রাচীনতম বাসিন্দা। এরা মূলত
ভূমধ্যসাগরীয় জনগোষ্ঠী। এরা সম্ভবত জলপথে বাঙলায় প্রবেশ করে। অথবা স্থলপথে দক্ষিণ
উপকূল হয়ে এসে বাঙলায় -উড়িষ্যায় এবং ছোটনাগপুরে অবধি পরিব্যাপ্ত হয়। পরে
ভূমধ্যসাগরীয় আর একদল উপকূলীয় স্থলপথে বা জলপথে দক্ষিণ ভারতে প্রবেশ ও বসবাস করে।
তারাই দ্রাবিড় নামে পরিচিত। তাদেরও কিছু মানুষ অস্ট্রিকদের সঙ্গে বাস করে। এবং
কালে উভয়ের রক্তমিশ্রণ ঘটে। ফলে তাদের অবয়বে ঘূচে যায় এবং মানসে মুছে যায় তাদের
গোত্রীয় স্বাতন্ত্র্যবোধ। এর পরে আসে হ্রস্বশির আলপাইনীয় আর্যভাষী জনগোষ্টী। এরা
সম্ভবত জলপথে কেবল প্রাচ্য ভারতেই প্রবেশ করে। তাই বিহারের উত্তরে এদের কোনো
নিদর্শন মেলে না। এর সমসময়ে বা আরো আগে হিমালয় ও লুসাই পর্বতের মালভূমি-উপত্যকা
অঞ্চলে নেমে আসে বিভিন্ন গোত্রের মঙ্গোল জনগোষ্ঠী। তাদের রক্ত মিশ্রিত হয়েছে এ
অঞ্চলের অস্ট্রিক-দ্রাবিড়-আলপীয় নরগোষ্ঠীর রক্তের সঙ্গে। পরে আর যেসব বিজেতা,
ব্যবসায়ী বা যাযাবর এদেশে এসেছে, তাদের রক্তও এদেশী মানুষের মধ্যে রয়েছে তবে তা
সামান্য ও বিরল, তাই দুর্লক্ষ্য। অবশ্য নিগ্রোরক্তের মিশ্রণের কিছু লক্ষণও কিছু
মানুষে দুর্লভ নয়। এবং পরবর্তীকালে আঞ্চলিক বা গোত্রীয় ঐতিহ্য বা টোটেম পরিচয়ে
পুণ্ড্র, বঙ্গ, রাঢ়, সুম্ম প্রভৃতি গোষ্ঠী নামে অভিহিত হয়। এভাবেই আজকের
আসামী-বাঙালী-উড়িষ্যার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। চোখ-চুল-চোয়াল, নাক, মুখ, মাথার গড়ন আর
দেহের বর্ণ ও আকার ধরেই নৃতাত্ত্বিক বিজ্ঞানে শ্রেনী ও পর্যায় নির্ধারণ করা
হয়।
১) অস্ট্রেলিয়ার আদিম
অধিবাসীদের সঙ্গে মিল রয়েছে বলেই নৃতত্ত্বের পরিভাষায় আমাদের ‘অস্ট্রিক’ (Proto Austroloid) বলা হয়। আদি অস্ট্রিকদের দেহ খর্বাকার দেহ
খর্বাকার মাথা লম্বা ও মাঝারি, নাক চোওড়া ও চ্যাপটা, দেহবর্ণ কাল, মাথার চুল ঢেউ
খেলানো কোঁকড়া। কোল, ভীল, মুন্ডা, সাঁওতাল, কোরওয়া, জুয়াঙ, কোরব প্রভৃতি প্রায় –
বিশুদ্ধ অস্ট্রিক এবং এরা আমাদের নিকট জ্ঞ্যাতি। মুন্ডা বা মুন্ডারী ভাষাই আদি
অস্ট্রিক ভাষার বিবর্তিত রূপ। অস্ট্রিকরাও মূলত ভূমধ্যসাগরীয় বর্গের নরগোষ্ঠী। ২)
ভূমধ্যসাগরীয় ওপর বর্গের নরগোষ্ঠী হল দ্রাবিড়রা। এরা সম্ভবত স্থলপথে উপকুল ধরে
দাক্ষিণাত্যে প্রবেশ করে। এরা দেহে মধ্যমাকার, এদের মাথা লম্বা, নাক ছোট, দেহবর্ণ
শ্যামল। ৩) আলপাইনীয় আর্যভাষী নরগোষ্ঠী ও আর্যভাষী ইরান-ভারতের (ইন্দো-ইরানী)
নরগোষ্ঠী একই ভাষী বটে, কিন্ত নৃতত্ত্বের সংজ্ঞায় গোত্রে পৃথক। মূলত আলপাইনীয়
বা আলপীয় ও ইন্দো-ইরানী-ইউরোপীয় আর্যভাষীরা রাশিয়ার উরাল মালভূমি ও দক্ষিণের
সমতলভূমি থেকে দানিয়ুব নদীর উপত্যকা অবধি ছড়িয়ে বাস করত, তাদের মধ্যে তাই স্থানিক
ভাষার সাদৃশ্য রয়েছে। বিদ্বানদের মতে তাই ‘আর্য’ নামটি তাই ভাষা জ্ঞাপক- ‘[জাতি’
বাচক নয়। আলপস পার্বত্য অঞ্চলে যে দল ছড়িয়ে পড়ে তারা আলপীয় আর যারা পশ্চিম ইউরোপে,
মধ্যএশিয়ায়, ইরানে ও ভারতে প্রবেশ করে তারা সম্ভবত অভিন্নবর্গের নরগোষ্ঠী। তারা
‘নর্ডিক’ বর্গের নরগোষ্ঠী বলে পরিচিত। আলপীয়রা ছিল কৃষীজীবি আর নর্ডিকরা বহুকাল
ধরে ছিল যাযাবর ও পশুজীবী। আলপীয় আর্যরা হ্রস্বশির, মধমাকার, মাথার খুলি ছোট ও
চওড়া, খুলির পিছনের অংশ গোল, নাক লম্বা, মুখ গোল, দেহবর্ণ – গৌর। আলপীয়রা পরে
এশিয়া মাইনর হয়ে ভারতের পশ্চিম উপকূলে ধরে বেলুচিস্থান, সিন্ধু, গুজরাট ও মারাঠা
অঞ্চলে এবং পূর্ব উপকূল ধরে বাংলা – উড়িষ্যায় বাস
করে। ৪) মঙ্গোলীয় বর্গের লোকেরা সাধারণভাবে লেপচা, ভুটিয়া, চাকমা, গারো,
হাজঙ, মরুঙ, মেচ, খাসিয়া, মগ, ত্রিপুরা, মার্মা প্রভৃতি বিভিন্ন, গোত্রীয় নামে
পরিচিত। দুনিয়ায় এককভাবে মঙ্গোলীয় বর্গের লোকের সংখ্যাই অধিক। জাপান থেকে মধ্য
এশিয়া ও রাশিয়া অবধি অঞ্চলে এদের বাস। রক্ত-মিশ্রণের ফলে নৃতত্ত্বের একক মাপে
অবশ্য এখন তাদের চিহ্নিত করা যায় না। সাধারণভাবে মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীর মাথা গোল, চুল
কালো ও ঋজু, মাথার খুলির পেছনের অংশ স্ফীত, গাত্রবর্ণ পীত ঈষৎ ও ঘন পিঙ্গল, ভ্রূ
অনুচ্চ, মুখায়ব ছোট বা স্বল্পপরিসর, চিবুকের হাড় উঁচু, নাকের গড়ন মাঝারি ও
চ্যাপটা, মুখে ও দেহে লোম স্বল্প, চোখের খোল বাঁকা এবং দেহ মধ্যমাকার। ৫) নর্ডিক আর্যরা সাধারণভাবে গৌরবর্ণ, দীর্ঘ
(লম্বা) ও সরুনাসা, দীর্ঘ (লম্বা) শির বা দীর্ঘ কপাল, দেহ দীর্ঘ ও বলিষ্ঠ। নর্ডিক
আর্যরা প্রাচীনকালে গ্রীসে, ইরানে ও ভারতে এবং এ যুগে ইউরোপে
জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-দর্শণে-সাহিত্যে ও কৃৎকৌশলে প্রাধান্য পাওয়ায় দুনিয়ার তাবৎ জাতির
ইর্ষারপাত্র। এ জন্যে এশিয়ার ও ইউরোপের অনার্য বর্গের লোকেদের ‘আর্য’ পরিচয়ের গৌরব
লাভের লোভও প্রবল। তাই এ বিষয়ে কিছু আলোচনা প্রয়োজন। . মানব সভ্যতার সার্বিক অগ্রগতি কোনো প্রথাগত সমীকরনের মাধ্যমে এগোয় না। এই
সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বা দার্শনিক চিন্তা ভাবনার বিকাশ ও উতকর্শ দেশ কাল ভৌগলিক
নিরিখে ভিন্ন স্ত্রোতে প্রবাহিত হয়।প্রকৃতি ও ভৌগলিক বৈচিত্র কারণে মানব গোষ্টীর
ওপর তার প্রভাব ফেলে আর সেই নিরিখে মানব প্রকৃতি , তার চিন্তা- চেতনা, জীবন জিজ্ঞাসা ও জগত চিন্তা প্রভাবিত হয়। উৎপাদন
পদ্ধতির প্রাথম স্তর কৃষীক্ষেত্রে যেখানে মানব গোষ্টী উর্বর জমি ও সহায়ক পরিমণ্ডল
পেয়েছে, সেখানেই তার জগত-ভাবনা ও জিজ্ঞাসা বিকশিত হয়েছে অন্যান্য জাতির তুলনায়।
তাই উৎপাদন পদ্ধতির ও উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের ওপর নির্ভর করেছে মানুষের
চিন্তা-চেতনা বিকাশের পরিসর। নীল নদ, টাইগ্রীস, ইউফ্রেটিসের ধারে তাই উন্নত কৃষি
উৎপাদন পদ্ধতির ও উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের ওপর নির্ভর করেছে বিভিন্ন সমষ্টির
সভ্যতার অগ্রগতি এবং তার প্রকার ভেদ। সিন্ধু নদী সংলগ্ন মহেনঞ্জোদারো সভ্যতা তাই
নর্ডিক দের নিরিখে অনেক উন্নত ছিল কারণ উৎপাদন পদ্ধতির স্তরে তারা অনেক এগিয়ে
ছিলো। প্রকৃতি বিজ্ঞানের বিচারে যেমন পরিবেশগত বৈচিত্র সারা পৃথিবীর প্রকৃতিতে
বিরাজমান, ঠিক সেই নিরিখেই মানুষের, যে নিজেই প্রকৃতির এক অংশ, সেই গোষ্টিগত
ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। এই নিয়মেই সভ্যতার অগ্রগতি সার্বিকা ভাবে কোনো সমান্তরেখায় চলে না,
বা এই অগ্রগতির কোনো প্রথাগত সমীকরণ প্রতিষ্টা করা যায় না। মানব সভ্যতা অগ্রগতির
মূল সূচক দেশ কাল বিশেষে প্রকৃতি, পরিবেশ বা মানুষের সম্বন্ধে সম্যক ধারণা ও
চেতনার বিবর্তন, তা সাধারণত নির্ভর করে জায়গা এবং অবস্থান বিশেষে ভিন্নতা ও
অবস্থানের নিরিখে।
আসলে মিসরীয়, আশশিরীয়,
সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, সিন্ধুদেশীয় কিংবা চৈনিক সভ্যতার কালে আর্যরা ছিল বর্বর ও
যাযাবর। উরাল ও দানিয়ুব অঞ্চলে বাসকালে তারা ছিল অন্য বর্বরদের মতো নরমাংস ভোজী,
পরে অশ্ব, তারপরে ষাঁড়, গাভী, মহিষ, তারপরে মেষ এবং তারও পরে তারা অজভোজী হয়। সমাজ
বিবর্তনের ধারায় নরমেধ থেকে অজমেধ অবধি পরিবর্তনে নিশ্চয় হাজার হাজার বছর লেগেছিল।
তার প্রমান ভারতেও বৈদিক সাহিত্যে রিচিক – পুত্র শুনঃশোপের, কর্ণের শিবিরাজা
প্রভৃতি গল্পে অতিথির ভোজনার্থে পুত্র বা নরবলির কাহিনী রয়েছে। শুক্ল যজুর্বেদে
ভূতসিদ্ধির (‘অতিষ্ঠা’) জন্যে ব্রাহ্মণ – ক্ষত্রিয়রা নরমেধযজ্ঞ করত বলে বর্ণিত
রয়েছে। অম্বরীষ, হরিশ্চন্দ্র ও যাতি এ যজ্ঞ করেছিলেন। এসব নরমেধ বা প্রাণিমেধযজ্ঞ
প্রজনন ও সন্তান-সম্পদ কামী সমাজের আদিম যাদুবিশ্বাস যুগের স্মারক। পশুজীবী বলে
তারা ছিল আরণ্য ও যাযাবর এবং নগর সভ্যতার শত্রু। নর্ডিক আর্যরা নগর সভ্যতা বিনাশে ছিল
উৎসাহী। তাদের আদি নিবাস থেকে তারা যখন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তারা উন্নততর
সভ্যতা ও নগর ধ্বংস করেই- সম্পদ লুঠ করেই পেয়েছে স্বস্তি। যাযাবর বলেই ওরা লুণ্ঠন
করে সম্পদ অর্জনে ছিল উৎসাহী। কেননা যাযাবরের পক্ষে লুন্ঠনই ছিল ধনপ্রাপ্তির
একমাত্র উপায়। এখানে অন্ন ও সম্পদের দেবতা বৈদিক ইন্দ্রের (পুরন্ধর- নগর বা পুর
ধ্বংসকারী) লুন্ঠন কাহিনী স্বর্তব্য। ভারতেও আর্যরা সিন্ধু সভ্যতা তথা
মহেঞ্জোদারো- হরপ্পা নগর (লোথাল ও কালিবঙ্গনও) ধ্বংস করেছিল। অবশ্য ধ্বংস করেও
বর্বর ও যাযাবর আর্য ঐ সভ্যতার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে নি, বরং শাস্ত্র, সমাজ
ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ওই প্রভাব গ্রহণ করেই হয়েছিল কৃষিজীবী ও স্থিতিশিল এবং নগর
সভ্যতার ধারক। চলমান জীবনে যাযাবরের মানস বা ব্যবহারিক সভ্যতার বিকাশ বাস্তব
কারণেই হতে পারে না। স্থায়িনিবাসী ও কৃষিজীবী হওয়ার আগে আর্যরা কোথাও উল্লেখযোগ্য উন্নতর
সভ্যতা সংস্কৃতির স্রষ্ঠা ছিল না। আসলে আমরা যাকে বৈদিক আর্য বা ব্রাহ্মণ্য সভ্যতা
বলি, তার চোদ্দ আনাই আর্যপুরী দেশী জনগোষ্ঠীর অবদান। শিব, বিষ্ণু ও ব্রহ্মা, নারী,
বৃক্ষ, পশু ও পাখি দেবতা, মূর্তিপূজা, মন্দিরোপাসনা, ধ্যান, তন্ত্র, ভক্তিবাদ,
অবতারবাদ ( ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নবীবাদ স্মর্তব্য), জন্মান্তরবাদ, প্রেতলোক,
ঔপনিষদিক তত্ত্ব বা দর্শন, সাংখ্য, যোগ এবং স্থাপত্য, ভাস্কর্য্য সবকটাই দেশী।
যাযাবর আর্যের স্থাপত্য-ভাস্কর্যের জ্ঞান থাকার কথা নয়। ইরানের নর্ডিক আর্যরাও
আশিরীয়, সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয় প্রভাব স্বীকার করেই হয়েছে সভ্যতা-সংস্কৃতিতে উন্নত।
প্রাচীন বাঙলায় নিষাদরা
অস্ট্রিক – দ্রাবিড়, আর কিরাতরা মঙ্গোল। বাংলার দেশজ মুসলমানেরা ও তথাকথিত
নিম্নবর্ণের মানুষেরা (তফসীলী)অস্ট্রিক – দ্রাবিড় আর সম্ভবত উচ্চবর্ণের হিন্দুর
মধ্যে আলপীয় রক্ত বেশী। নর্ডিক আর্যরক্তের মানুষ বাঙলায় বিরল- নেই বললেই চলে।
নর্ডিক আর্য- রক্ত বাঙলায় বিরল বটে, তবে নর্ডিক আর্যশাখার বৈদিক আর্যদের শাস্ত্র,
সমাজ ও সংস্কৃতি (জৈন-বৌদ্ধসহ) দু’হাজার বছর ধরে বাঙালীর মন-মনন ও জীবন-জীবিকা
নিরন্ত্রণ করছে। বৈদিক আর্যরা সুরের এবং
তাদের নিকট-জ্ঞাতী ইরানী আর্যরা অসুরের পূজারী। পূজ্যদেবতা নিয়েই হয়তো এক
সময়ে তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্ঠি হয়, যখন তারা মধ্য এশিয়ার আমু ও শিরদরিয়ার
উপত্যকায় বাস করত। তারও আগে এক সময় উভয় দলের পূজ্য দেবতা ছিল অসুর (অহোর)। পরে
ইরানীরা (অহোরামজদা) এবং ভারতীয় বৈদিক আর্যরা দেইবো ‘দইব’ বা ‘দেব’ পুজারী হয়। ফলে
ইরানীর কাছে দেব (দেও) হলেন অরি ও অপদেবতা এবং তেমনি অসুর হলেন ভারতীয়দের অরি ও
অপদেবতা। তাছাড়া জেন্দাবস্তের ও ঋগ্বেদের ভাষার মিলও তাদের অভিন্নত্বের প্রমাণ।
কোনো কোনো বিদ্বানের মতে অসুরপন্থীরা ছিল কৃষিজীবী
ও উন্নতরুচি সম্পন্ন এবং স্থাপত্য ভাস্কর্যে নিপুন, আর সুরপন্থীরা ছিল যাযাবর,
দুধর্ষ ও অপরিশীলিত। অসুরপন্থীদের প্রধান দেবতা বরুণ আর সুরপন্থীদের প্রধান দেবতা
ইন্দ্র। অহিপ্রতীক বৃত্র (বেতরো) উভয় পক্ষেরই শত্রু।
পান্ডুরাজার ঢিবির খনন
প্রক্রিয়ায় আমরা চারটি যুগের নিদর্শন পেয়েছি। ফলে রাঢ় অঞ্চল যে অতি প্রাচীন ভূমি,
সে- সম্বন্ধে যেমন নিশ্চিত হওয়া যায়, তেমনি এখানকার লোকবসতিও যে সুপ্রাচীন, তা
নিশ্চিতভাবে স্বীকৃত হয়। এ সভ্যতা মহেনজোদারো ও হরপ্পার নগর সভ্যতার সঙ্গে তুলনীয়।
নব্যপ্রস্তর যুগের পাথুরে অস্ত্র ও অন্যান্য হাতিয়ার যেমন এখানে পাওয়া গেছে, তেমনি
তাম্রযুগের ও তাম্রাশ্ম বা ব্রোঞ্জযুগের নিশ্চিত নিদর্শন পাওয়া গেছে। বাংলার তামা
বিদেশে রফতানীও হত। ব্রোঞ্জ যুগেই
মহেনজোদারো ও হরপ্পার নগর সভ্যতার উদ্ভব। পান্ডুরাজার ঢিবির প্রমাণে রাঢ়েও তা ছিল
বলে দাবি করা চলে। রাঢ়ে তখন সুপরিকল্পিতভাবে নগর ও রাস্তা-ঘাট, ঘর ও দুর্গ নির্মিত
হত। কৃষি-শিল্প বস্তু বাণিজ্যিক পন্য হিশেবে সুদূর ক্রীট দ্বীপেও যে রপ্তানী হত
তার প্রমাণও পাওয়া গেছে। ক্রীট দ্বীপে প্রচলিত প্রাচীন লিপি সম্বলিত একটি গোল
সীলমোহর পাওয়া গেছে পান্ডুরাজার ঢিবিতে। রাঢ়ের পণ্য-সামগ্রীর মধ্যে মসলা, তুলা,
বস্ত্র, হস্তিদন্ত, তাম্র এবং সম্ভবত এখো গুড়ও ছিল ( কেননা এখো গুড়ের এলাকা বলেই
অঞ্চলের নাম ‘গৌড়’ হয় বলে কারো কারো ধারণা)। বাংলার এখো গুড় ও চিনি এক সময়ে
রোমসাম্রাজ্যেও রপ্তানী হত। খৃষ্টপূর্ব যুগেও বাঙলাদেশের বহির্বানিজ্যের আর একটি
সাক্ষ্য হচ্ছে মৃন্ময় লেবেল বা ফলক। এটি পণ্যগর্ভ ঝুড়ির সাথে বাঁধা থাকত। পণ্যের ও
মূল্যের হিসেব লেখা থাকতে ওই মাটির ফলকে।
বাণিজ্য উপলক্ষ্যে বাঙালীর
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গমন এবং সেখানকার বণিকের এদেশে আগমন ছিল আবশ্যিক। তাই
ক্রীটবাসীর সঙ্গে প্রাচীন বাঙালীর সাংস্কৃতিক যোগও ছিল স্বাভাবিক। এর প্রমাণও
মেলে- যেমন উভয় দেশের মাতৃদেবীর বাহক সিংহ, ক্রীটদ্বীপের নারীরা যেমন দেহের
উর্ধাংশ অনাবৃত রাখত, তেমনি বাৎস্যায়নের ‘কামসুত্র’ থেকে জানা যায় – অভিজাত নারীরা
(রানীরা) শরীরের উর্ধাংগ অনাবৃত রাখত। ডক্টর অতুল সুরের মতে ক্রীটের প্রচলিত লিপির
সঙ্গে, বাংলার ‘পাঞ্চ মার্কযুক্ত’ মুদ্রায় উতকর্ণ লিপির সাদৃশ্য ছিল। তাঁর মতে
আলপীয় বর্গে (আরামিক?) বণিক ‘হিট্টি’ নামে ছিল পরিচিত। প্রাচীন বাঙলায়ও বণিকেরা
‘হট্টি> হাটি’ নামে ছিল আখ্যাত। ডক্টর অতুল সুর বলেন বর্ধমান জেলায় ‘হাটি’ জাতি
এখনো বর্তমান। সমার্থক ‘শ্রেষ্ঠী’ শব্দ এই সুত্রে স্মর্তব্য। এই ‘হাটি’ যে বনিক বা
বাণিজ্যিক পণ্যবাচক হিট্টি সংপৃত্ত নাম তাতে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। ঋগ্বেদে বণিক
‘পণি’ নামে অভিহিত, বৌদ্ধযুগে বনিক ছিল ‘সার্থবাহন’, পরে হয় ‘সাধু’ নামে পরিচিত।
পণির ক্রয় – বিক্রয় দ্রব্যই ‘পণ্য’। আলপীয় আর্যভাষীরা কি বণিক হিসেবেই এশিয়া
মাইনর, আশশিরীয়া, দক্ষিণ ইরান হয়ে অসুরপন্থীরুপে বাঙলায় উড়িষ্যায় প্রবেশ করেছিল-
যার ফলে এখানে আলপীয় নর-গোষ্ঠীর বাহুল্য দেখা যায়? এবং এ জন্যই কি বৈদিক আর্যরা এ
অঞ্চলের লোককে অসুর (পূজক) নামে অভিহিত করত? উল্লেখ্য যে অসুর আশশিরীয়দেরও পূজ্য
এবং অহোম্রামজদার উপাসক জোরথুস্ত্রেরও জন্ম আশশিরীয়রাজ্য সীমান্ত ইলাম অঞ্চলে।
জর্জ গ্রিয়ার্সন গুজরাঠী মারাঠীর সঙ্গে উড়িয়া-বাঙলা আসামীর সাদৃশ্য লক্ষ্য
করেছিলেন। মনে হচ্ছে এ সাদৃশ্য আলপীয় বর্গের আর্যভাষী নরগোষ্টীর প্রভাবজ। বাংলার
প্রাচীন ভাষাকে অসুর ভাষা বলার মুলেও হয়তো অসুরপন্থী আলপীয়দেরই নির্দেশ করা হত। প্রত্নপ্রস্তর,
নবপ্রস্তর, তাম্রাশ্ম বা ব্রোঞ্জ যুগেও যে অন্তত রাঢ় অঞ্চলে জনবসতি ছিল, বাঁকুড়া,
বর্ধমান, মেদিনীপুর প্রভৃতি অঞ্চলে প্রাপ্ত পাথুরে হাতিয়ার থেকে তা ধারণা করা যেতে
পারে। নবপ্রস্তর যুগে কৃষি ও বয়নশিল্পের উদ্ভব, পশুপালন ও যাযাবর জীবনাবসানের আভাস
পাওয়া যায়। এ সময়ে এরা মৃতকে কবরস্থ করত এবং খাড়া লম্বা পাথর বসিয়ে চিহ্নিত রাখত
(বীরকাঁড় নামে)। পান্ডুরাজারঢিবি থেকে আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছরের আগের
রাঢ়বাসীর খবর পাওয়া যায়। আমরা জানি বাংলাদেশে উচ্চবিত্তের বা উচ্চবর্ণের শ্রেণী
হচ্ছে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থ। আর সবাই নির্দিষ্ট বৃত্তিজীবী। ব্রাহ্মণরা গুপ্ত
যুগে রাজশক্তির প্রয়োজনে নগণ্য সংখ্যায় বাংলায় আসে, তারা যজ্ঞের পৌরহিত্য জানত না।
কিংবাদন্তীর আদিশূর কিংবা বল্লাল সেন কর্তৃক নতুন করে বেদজ্ঞ ও যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণ
আনয়নের তাই প্রয়োজন। এবং তাদের অনুচর বা ভৃত্য হিশেবে আসে ঘোষ, গুহ, বসু, মিত্র,
দত্ত (দত্ত কারো ভৃত্য নয়, সঙ্গে আসে)। বাংলাদেশে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য কখনো ছিল না।
বাংলায় ব্রাহ্মণের সংখ্যাধিক্যের আলোকে বিচার করলে মেল-পটিবিন্যাসের সময় দেশী লোকও
ব্রাম্মণ্য-বৈদ্য হয়েছে বলে মানতে হবে। দাক্ষিণাত্যের অনার্য অবয়বের ব্রাহ্মণ্যদের
কথাও এ সূত্রে স্মর্তব্য। আসলে বাংলায় বৌদ্ধ বিলুপ্তির সুযোগে
ব্রাম্মণ-বৈদ্য-কায়স্থ সমাজ গড়ে ওঠে সেন আমলে কৃত্রিম (বল্লাল সেনের কৌলিন্য
প্রথা) বর্ণ বিন্যাসের ফলে যার জের চলে জাতিমালা কাচারী, গাঁই-পটি-মেল বিন্যাস প্রভৃতির
মাধ্যমে সতেরো শতক অবধি। (সুত্রঃ- ডঃ আহমেদ শরীফ) নৃ-বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় কিন্ত বাংলার জনগণের মধ্যে বৈদিক আর্যের রক্ত কিংবা
অবয়ব মেলে না। তাঁদের মতে বাংলার উচ্চ বর্ণের লোকগুলো (ব্রাম্মণ-বৈদ্য-কায়স্থরা)
আলপীয় আর্য এবং অস্ট্রিক- দ্রাবিড় পরে সমুদ্র পথে বাঙলায়-উড়িষ্যায় প্রবেশ করে এরা।
এরাই প্রভূত্ব করতে থাকে অস্ট্রীক – দ্রাবিড়দের উপর। এদের জীবিকার এ সেবার
প্রয়োজনে অস্ট্রিক-দ্রাবিড়দের মধ্যে থেকে যাদের এরা সহযোগী ও সেবক হিশেবে গ্রহণ
করে, তারাই হচ্ছে বৃহদ্ধর্ম পুরাণের শূদ্র- উত্তম ও মধ্যম সঙ্কর তথা স্পর্শযোগ্য বা
জলাচর শ্রেণীর নির্দিষ্ঠ পেশার ও প্রশ্রয়ের অস্ট্রিক –দ্রাবিড় গোষ্ঠির মানুষ (সৎ
শূদ্র ও সদগোপ)। অন্যেরা রইল নির্দিষ্ঠ হীনবৃত্তিজীবী রূপে, চিরনিঃস্ব
অস্পৃশ্যরুপে – যারা ‘অন্ত্যজ’ রূপে অভিহিত। বৌদ্ধ যুগে হয়তো অস্পৃশ্য ছিল না ওরা।
মোটামুটি বলা যায় বৌদ্ধ বিলুপ্তির থেকে অস্ট্রিক-দ্রাবিড় নরগোষ্টীর তথা আদি
বাঙালীর দারিদ্রের সঙ্গে সামাজিক ঘৃণা ও দুর্ভোগের বৃদ্ধি। আলপীয় যুগেই যারা
অরন্যাশ্রিত হয় তারা কোল-ভীল-মুণ্ডা প্রভৃতি গোত্রীয় নামে আজও স্বাতন্ত্র রক্ষা
করছে উপজাতি অভিধায়, এদের নিঃস্ব নিবৃত্তি জ্ঞাতিরা হাড়ী- ডোম-চন্ডাল-শবর,
কাপালি-বাগদি –মুচি-মেথররুপে দাস ও হীন কর্মের লোক। আর মঙ্গোলীয় নরগোষ্টী তাদের
কাছে ম্লেচ্ছ। অস্ট্রিক –দ্রাবিড়দের মধ্যে সদগোপ কৈবর্তরা বৌদ্ধ যুগে এবং মল্লরা
মধ্যযুগে বাহুবলে কোথাও কোথাও স্থানিক প্রাধান্য লাভ করে (দিব্যক-রুদ্রক-ভীম কিংবা
সোমঘোষ – ঈশ্বরঘোষ অথবা মধ্যযুগে রাঢ়ের মল্লদের উদাহারণ দেওয়া যায়)। অতএব পান্ডুরাজার
ঢিবি – সভ্যতার স্তর অতিক্রম করার আগেই এখনকার বাঙলাভাষী অঞ্চলে
জৈন-বৌদ্ধ-ব্রাম্মণ্য মত প্রচারিত হতে থাকে এবং বাংলাদেশ পরবর্তী দুই হাজার বছর
ধরে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীর কবলিত থাকে। এ দুই হাজার বছর ধরে তাদের স্বত্তার
স্বাতন্ত্র্য রক্ষার কিংবা আত্মবিকাশের কোনো সুযোগ ছিল না।
মৌর্য-শুংগ-কণ্ব-গুপ্ত-পাল-সেন-তুর্কী-মুঘল-বৃটিশ শাসকদের সবাই ছিল বিদেশী। তাদের
শাস্ত্রীক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক শাসণে-শোষণে দেশীলোক আর কখনো
সমষ্টিগতভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। ক্ষুদ্র ও স্বাধীন সামন্ত ও আঞ্চলিক
রাজারা-চন্দ্র, বর্মণ, খড়গ, গুপ্ত, দেবরাও দেশী ছিল না। দেশের আদি অধিবাসী ও আসল
মালিকরাই প্রবল প্রতাপ প্রভুদের সেবাদাসরুপে মানবিক অধিকার বঞ্চিত হয়ে প্রায়
প্রাণী রূপেই বেঁচে রইল মাত্র। গৃহপালিত পশুর আদর-কদর-যত্নও তারা কোনোদিন পায়নি।
তাদের মধ্যে প্রাক্তন প্রধান শ্রেণী আলপীয় নরগোষ্ঠী এবং কিছু বুদ্ধিমান যোগ্য
অস্ট্রিক – দ্রাবিড়ও ব্যক্তিগতভাবে প্রভুশ্রেনীর প্রয়োজনে উচ্চ শ্রেণীভুক্ত হবার
রাজণিতিক নিয়মেই সুযোগ লাভ করেছিল নিশ্চয়ই। বিভিন্ন সময়ের ও পর্যায়ের বর্ণবিন্যাস
কালে তারাও উচ্চতর বার্ণিক স্তরে উঠেছে ঐতিহাসিক নিয়মেই। তাই আজকের বাঙলায় আমরা
বর্ণ হিন্দুর বহুলতা প্রত্যক্ষ করছি। বাঙালীর আবর্তন-বিবর্তন – উন্নয়ন চলেছিল
বিদেশী ভাষা-শাস্ত্র-সংস্কৃতি-শাসনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে ও নিয়ন্ত্রণে। তাই বাঙালীর
চিন্তা-চেতনায়, জীবন-জিজ্ঞাসায় ও জগত
ভাবনায় একটি অদৃশ্য স্বাতন্ত্র ও মৌলিকতা থাকলেও বাহ্যত তার সব কিছুই অনুকৃত। বিদেশী-বিভাষী-বিধর্মী-বিজাতীর
শাসন তার স্বসত্তা-চেতনার বৃদ্ধি রোধ করেছিল। বাঙালী রইল ব্রাম্মণ্যবাদীদের
দৃষ্ঠিতে উত্তম সঙ্কর, মধ্যম সঙ্কর ও অন্ত্যজ নামের কামার – কুমোর-চামার-কাঁসার-তাঁতী-হাড়ি-ডোম-জেলে-
চাঁড়াল-বাগদী-ধোপা-নাপিত –তেলী-মোদক – গোপ-কেউট; প্রভৃতি পেশাজীবী হয়ে। বাঙলা-আসাম-উড়িষ্যা এবং দক্ষিণ পূর্ব বিহারের
অস্ট্রিক-দ্রাবিড় মানুষের – দেশজ বৌদ্ধ- হিন্দু- মুসলিম নির্বিশেষে দুই হাজার বছর
ধরে এই ছিল অবস্থা। বস্তুত উনিশ শতকের শেষ
পাদ থেকেই উক্ত বিস্তৃত অঞ্চলের নির্জিত নির্যাতিত গনমানব বিরুদ্ধ পরিবেশেও
আত্মপ্রতিষ্টার সামান্য সুযোগ পাচ্ছে। বিদেশী প্রভাব ও পরাধীনতা যে আত্মবিকাশের
পথে কি দুর্লংঘ্য বাধা-দুহাযার বছরের খাঁটি বাঙালীই তার প্রমাণ। দাক্ষিণাত্যের
দ্রাবিড় বর্গের নরগোষ্ঠী বহুকাল উত্তর ভারতীয় আর্য প্রভাব মুক্ত ছিল বলে আর্য
শাস্ত্র গ্রহণ করেও তারা স্বাতন্ত্র্যে ও স্বাধিকারে স্বস্থ ছিল। রাষ্ট্রকূট-
চৌল-চালুক্য- পল্লব সাম্রাজ্য ও ভাষাগুলো তার প্রমাণ।
অতহেব, বাঙলার প্রচলিত
শাস্ত্রিক, রাজনৈতিক ইতিহাসে বাঙালী নেই। সেখানে
রয়েছে উত্তর ভারতীয় জৈন- বৌদ্ধ-ব্রাম্মণ্যবাদীদের ও তুর্কি-মুঘলের কৃতি ও কীর্তির
বিবরণ। সে-ইতিহাস পড়ে আমরা যে কেবল আত্মপরিচয় ভুলি তা নয়, নিজেদের জ্ঞাতিদেরও ঘৃণা
করতে শিখি। অস্ট্রিক-দ্রাবিড়-মঙ্গোল বাঙালীর ঐতিহাসিক ভাবে গঠিত মুল পরিচয় মেলে
জিবন-চেতনায় ও জগত-ভাবনার ফসল সাংখ্যে, যোগে, তন্ত্রে, কায়াসাধনতন্ত্রে, রজ-শুক্র
চর্যায়, দারু-টনা-বাণ-উচাটন – বশীকরণ শক্তির চর্চায়, ডাক-ডামিনী, যোগী- যোগিনীর
মাহাত্ম্য ও প্রভাব স্বীকারে, সহজ যানে, লোকায়ত শাস্ত্রে ও লৌকিক দেবতার উদভাবনে,
বৈষ্ণব সহজিয়া মতে, বাউলতন্ত্রে, চৈতন্যের প্রেমবাদে, পীর-নারায়ণ সত্যের
উপলব্ধিতে; আর বেদে-তাঁতী – পোদ-কিরাত-নিষাদ পভৃতি অন্ত্যজশ্রেণীর আচারে-সংস্কারে
এবং তথাকথিত উপজাতির জীবন পদ্ধতিতে। শিব-বিষ্ণু-ব্রম্মা, নারী-পশু-পাথর ও বৃক্ষ
দেবতা, মূর্তি পূজা, জন্মান্তরবাদ, অবতারবাদ (নবীবাদ), কায়াসাধন, মন্ত্র-শক্তি ও
যাদুবিশ্বাস, শবরোতসব, নবান্ন পৌষ পার্বণ, চড়ক – গাজন প্রভৃতি; শুভকর্মের যাদু
প্রতিক চাউল, খই, কলা, নারিকেল, পান, সুপারি, আম্রসার, হলুদ, দুর্বা, দধি, মাছ,
ঘট, আলপনা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, গোময় ইত্যাদি আর চণ্ডী, মনসা, বাসুলী, ষষ্ঠী,
শীতলা, ধর্মঠাকুর, জাঙ্গুলি প্রভৃতি বাঙালীর লোকায়ত দেবতা এবং কালিক তিথি –
নক্ষত্র-লগ্ন প্রভৃতি অস্ট্রিক দ্রাবিড়-মঙ্গোল বাঙালীর নিজস্ব। এসব আচার ও সংস্কার
তাই তাদের মন-মনন প্রভৃতি। পরবর্তীকালের পীর-নারায়ণ স্ত্য ও তাঁর দেবকল্প অনুচর
পীর ও উপদেবতারাও সমকালীন জীবন- জীবিকার নিরাপত্তার দেবতা হিসেবে পরিকল্পিত।
বিদেশী
ভাষা-শাস্ত্র-সংস্কৃতি-শাসনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে ও নিয়ন্ত্রণে বাঙালা ভাষারও আবর্তন-বিবর্তন – বা একরকম বিকৃতি চলছিল। আত্মীয়তা
ও ঐক্যবন্ধন হিসেবে রক্ত সম্পর্কের পরেই ভাষার স্থান। গভীরভাবে বিবেচনা করলে মনে
হবে ভাষার গুরুত্ব রক্ত-সম্পর্কের থেকেও বেশী। ভাষার মাধ্যমেই ভাব-চিন্তার বিকাশ
ঘটে বলেই সৌজন্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতা অগ্রগতির এক সহায়ক শক্তি হয় ভাষাই। স্বভাষার
বিকাশ-বিরহী-বিরোধী কোনো মানব গোষ্ঠীই সভ্য হয় না। কারণ ভাষার মাধ্যমেই শ্রেয় ও
প্রেয়বোধ সমাজে বিস্তার লাভ করে। অভিন্ন ভাষার মাধ্যমেই বিছিন্ন গোত্রগুলো
পরস্পরের সন্নিহিত হয়ে সংহত ও সঙ্ঘবদ্ধ জীবন-ভাবনায় ও জীবনরচনায় ব্রতী হয়। সুতরাং
জাতী গঠনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় এক মূল উপাদান হচ্ছে ভাষার বিবর্তন ও বিকাশ যা রূপ
ধারণ করে সমকালীন জাতি কর্তিক ব্যবহ্রত
ভাষা। এক ও অভিন্ন ভাষা জাতি গঠন ও জাতি সজ্ঞ্যায় এক গুরুত্বপূর্ণ পুর্বশর্ত। জন্মসূত্রে
মানুষ যে ভাষা পায় অর্থাৎ আশৈশব মানুষ যে ভাষার অভ্যস্ত হয়, সেটাই তার স্বভাষ বা
মাতৃভাষা। ঐ ভাষাই তার চেতনা, জ্ঞান, ধারণা, সিধান্ত প্রকাশ ও বিকাশের নিয়ামক বলে
তা তার দৈনন্দিন জীবনের ক্রিয়া-প্রনালীর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। জ্ঞান,
ভাষার আকারে উৎপাদনের উপায় হিসেবেই
প্রতিভাত হয়। শৈশব অতিক্রান্তে পড়ে-পাওয়া ও শুনে শেখা ভাষা এই ভাষার মতো
চেতনা-সম্পৃত্ত হয় না, প্রিয় হয় না। ফলে স্বভাষী ব্যতীত অন্য ভাষী লোকও প্রীতির
ক্ষেত্রে আনুপাতিক দূরত্বে অবস্থান করে। বিদ্বজনের মতে, মানুষের বাক-যন্ত্রে কোনো
ধ্বনিই অবিকলভাবে দ্বিরুক্ত হতে পারে না। প্রতি মুহূর্তেই তা পরিবর্তিত হচ্ছে। কায়িক-অসামর্থ্যই
তার মুখ্য কারণ। যেহেতু প্রতি মানুষেরই রয়েছে তার নিজ বৈশিষ্ঠে স্বতন্ত্র অবয়ব,
সে-হেতু কোনো দুটো মানুষের ধ্বনি-সৃষ্ঠির শক্তি অভিন্ন নয়। তাছাড়া অজ্ঞতা ও
অনবধানতাবশেও ধ্বনি বিকৃত হয়। অতহেব,
দৈহিক অসামর্থ ও অজ্ঞতাই ধ্বনি বিকৃতির কারণ। ভাষার ক্ষেত্রে এই বিক্ররতিকে আমরা
সৌজন্যবশে বিবর্তন বা রূপান্তর বলে থাকি। একটা পরিমিত দীর্ঘকালের ব্যবধানে এই
বিবর্তন – বিকৃতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমনি করেই এক মূল ভাষা বিবর্তিত হয়ে অসংখ্য বুলি ও ভাষাতে পরিণত
হয়। আমাদের আর্য ভাষাও এমনি করেই এশিয়া – ইউরোপে অসংখ্য ভাষা হয়ে বিকাশ লাভ করেছে।
ঋগ্বেদের আমলের ভাষার ক্রমবিবর্তনে গড়ে ওঠে, উত্তর ভারতের আধুনিক ভাষাগুলি। বাঙলাও
এদের একটি। ভাগলপুর থেকে কক্সবাজার, মালদহ থেকে গোয়ালপাড়া অবধি এ ভাষার লেখ্যরূপ
আজও চালু আছে। কিন্ত আঞ্চলিক বুলি হয়েছে বিচিত্র ও স্বতন্ত্র। বুলিতে
বুলিতে প্রার্থক্য এতো বেশী যে, আনাড়ির চোখে এদের গৌত্রিক অভিন্নতা সহজে ধরা পড়ে
না। অতএব কেবল লেখ্যরূপের মাধ্যমেই ভাষাভিত্তিক বাঙালীর জাতির উদ্ভব সম্ভব হয়েছে।
এ লেখ্যরূপের উদ্ভব বিলম্বিত হলে আমরা আজকের বাঙালী জাতিকে এতো বড়ো ভূখণ্ডে এত
সংখ্যায় পেতাম না। প্রমানস্বরুপে বলা যায়। এক সময়ে মাগধী – প্রকৃত চালু ছিল
বিহারে, উড়িষ্যায়, বাঙলায় ও আসামে। মাগধী প্রাকৃতের ক্রমবিকৃতিতে উদ্ভূত হয়
অবহট্টের। তখনো আঞ্চলিক পার্থক্য তেমন প্রকট ও প্রবল হয়ে ওঠেনি। তাই লেখ্য অবহট্ট
ছিল এসব অঞ্চলে অভিন্ন। প্রাকৃত-পৈঙ্গল, দোহাকোষ প্রভৃতিই তার প্রমাণ। আরো পরে
অর্বাচীন অবহট্ট যুগেও লেখ্যরূপে আনুগত্য ছিল অবিচল। তাই চর্যাগীতিতের পাই
বংগ-কামরুপ ও বিহার- উড়িষ্যার পদকার। একছত্র শাসনই অভিন্ন ভাষার উদ্ভবের মুখ্য
কারণ। দশ শতক অবধি মোটামুটিভাবে এসব অঞ্চলে গুপ্ত ও পাল শাসন ছিল। তাই অর্বাচীন অবহট্ট যুগেও ভাষিক ঐক্য দৃশ্যমান।
পালরাজত্বের অবসানে এই রাষ্ট্রিক ঐক্য বিঘ্নিত হয়। তাই যদিও তেরো শতক অবধি বাঙলা-
উড়িয়া এবং ষোল শতক অবধি বাঙলা –আসাম অভিন্ন ছিল, তবু একছত্র শাসনের অর্থাৎ
এককেন্দ্রিক শাসন-সংস্থার অনুপস্থিতির দরুণ অর্বাচীন অবহট্টউত্তর ভাষা সর্বজন
লেখ্যরূপ পায়নি। তাই আঞ্চলিক বুলিই স্থানীয় প্রয়োজনে লেখ্য ভাষায় উন্নীত হয়। ফলে
বিহারে, উড়িষ্যায়, বাঙলায় ও আসামে চালু হল চারটি স্বতন্ত্র লেখ্য ভাষা। আর এর
সুদুর প্রসারী ফল দাঁড়াল যে মাগধী প্রাকৃত – ভাষী একটি ভাষিক জাতি বা সম্প্রদায়
কালে চারটি ভাষিক জাতিতে পরিণত হল। যদি গুপ্ত ও পাল আমলের মতো একচ্ছত্র শাসন
আধুনিক বুলিগুলির স্বরূপ প্রাপ্তির সময়েও লেখ্যরূপে গ্রহণ কালে চালু থাকত, তা হলে
বিহার, উড়িষ্যা, বাঙলা ও আসাম জুড়ে একটি বিরাট ভাষিক জাতি গড়ে উঠতে পারত, এবং
সেক্ষেত্রে আর্থিক, রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক শক্তিরূপে পূর্ব – ভারতে একটা
মর্যাদাবান রাষ্ট্রের স্থিতি অবধারিত ছিল। কিন্ত এই একছত্র শাসনসংস্থার চিরকালীন অবস্থান
ঐতিহাসিক নিয়মেই সম্ভব নয়। অবশ্য অভিন্ন ভাষা দিয়ে যে একক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে এমন
নিশচয়তা আগেও কখনো ছিল না, এখনো নেই। তবে একথা সত্য যে এই অভিন্ন উপাদান আবার একক
রাষ্ট্র গঠনের সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যাই হোক আমাদের অবিভক্ত বাঙলায় বাঁকুড়া ও
চট্টগ্রামের এবং মালদহ ও গোয়ালপাড়ার মানুষ যে একই লেখ্য ভাষার বন্ধনে ধরা দিয়েই
বাঙালী হয়েছে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। না হলে তাদের স্থানিক বুলি এতই পৃথক
যে তারা কোনো ক্রমেই অভিন্ন ভাষী জাতি হতে পারত না। মালদহ কিংবা বাঁকুড়ার লোক
সহজেই হতে পারত বিহারী, যেমন মেদিনীপুরের লোক হতে পারত উড়িয়া এবং সিলেটিরা হত
আসামী। কাজেই আজকের বাঙালীর জাতী গঠনের মূল উপাদান এবং উৎস স্বভাষা। কেননা এ জাতি
নৃতত্ত্ব, গোত্র-চিন্ন, ধর্মমত ও বর্ণবিন্যাস অস্বীকৃত। এমন কি আঞ্ছলিক অভিমানও
এক্ষেত্রে অবহেলিত। তাই পুরোনো রাঢ়, সুস্ম, সমতট, বরেন্দ্র, বঙ্গ, গৌঢ় প্রভৃতি
গোত্রবাচক ও অঞ্চলনির্দেশক পরিভাষাগুলো আজ অবলুপ্ত।
এক কালের অবজ্ঞেয় যে বঙ্গ
সেই নামেই সব কয়টি অঞ্চল হয়েছে সংহত। যদিও লেখ্য ভাষাটি রূপ নিয়েছে দক্ষিণ রাঢ়ের
বুলি ভিত্তি করেই। মুঘল আমলে প্রায়ই বিহার-উড়িষ্যা যুক্ত থাকত বাঙলার শাসন-সংস্থার
সঙ্গে। বস্তুত ১৯০৫ সাল অবধি ‘সুবে
বাঙ্গালাহ’ বা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ছিল
বাঙলা, বিহার ও উড়িষ্যাকে নিয়ে। এ ব্যবস্থা যদি পাল রাজাদের আমলের পরেও চালু থাকত,
তা হলে সেই ‘সুবে বাঙ্গালাহ’-ই হত আজকের বাঙালীর স্বদেশ বা মাতৃভূমি। কেন না, তা
হলে লেখ্য ভাষা রূপে রাজধানী অঞ্চলের বাঙলাই গৃহীত হত সর্বত্র। এবং সে-ভাষা হত
সবারই মাতৃভাষা। ইতিহাসের সাক্ষ্যে প্রমানিত হয় যে দেশে লেখ্য ভাষার অনুপস্থিতির
সুযোগে বহিরারোপিত ধর্মের কিংবা বহিরাগত শাসকের ভাষা শাসিত অঞ্চলে লেখ্য ভাষারূপেও
স্থায়ীত্ব লাভ করে। যেমন আমরা বাঙালীরা কেউ আর্য ছিলাম না। আমরা (আগেই আলোচিত)
অস্ট্রিক ও ভোটচীনার রক্ত-সঙ্কর মানুষ। আমাদের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে এক সময়ে অস্ট্রিক
(দ্রাবিড়) ও মঙ্গোলীয় বুলি চালু ছিল। কিন্ত উত্তর ভারতীয় ধর্ম ও লেখ্য ভাষা গ্রহণ করে
আমাদের পূর্ব পুরুষেরা স্বভাষা ও স্বাজাত্য পরিহার করে- বিস্মৃত হয়ে 'আর্যত্বের’
মিথ্যা গৌরব – গর্বে স্ফীত হয়েছিল এবং এই গৌরব এখন বহমান। ফলে আমাদের নৃতাত্ত্বিক
স্বাতন্ত্র্য, গৌত্রিক অভিমান। মাতৃভাষার মমতা, জীবনযাত্রার রীতিনীতি প্রভৃতি সব
কিছু সানন্দে বিসর্জন দিয়ে হয়তো তারা ‘আর্য’ হয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিল। নৃতাত্ত্বিকসাতন্ত্র্য
ও গোত্র-চেতনা বিলুপ্তির কারণে ধর্মের চেয়ে ভাষার প্রভাব যে অধিক এবং অনিবার্য
কার্য-কারণে সম্পৃত্ত, তা দুনিয়ার অন্যত্র দেখতে পাওয়া যায়। এখানকার আরব জাতি বলতে
ইরাক থেকে জিব্রালটার অবধি বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের অধিবাসীদের নির্দেশ করে, অথচ তারা
আদিতে এক গোত্রীয় কিংবা অভিন্ন ভাষী ছিল না, বেবেলীয়, ককেশীয়, আশিরীয়, ফিনীশীয়,
হিট্টাইট, কপ্ট, আর্য, শক, হুণ প্রভৃতি নানা পুরোনো স্বতন্ত্র ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর
ও সভ্যতার পতনের পরে, সমবায়ে গড়ে উঠেছে এ আরব জাতি। এবং তা ধর্মের অভিন্নতায় সম্ভব
হয়নি, ভাষার ঐক্যেই নির্মিত হয়েছে। আজকের ইউরোপীয় কিংবা ল্যাটিন আমেরিকানদের
(আইমারা প্রমুখ) জাতিচেতনাও রক্তনির্ভর নয়- ভাষাভিত্তিক।
যারা ভাষিক স্বাতন্ত্র্য
বজায় রেখেছে, তাদেরকে অভিন্ন ধর্মের বন্ধন কিংবা অভিন্ন ভৌগলিক সংস্থিতি অপরের
মধ্যে আত্মমিশ্রণে প্রেরণা পায়নি। তারা অন্যদের সঙ্গে থেকেও স্বতন্ত্র। অন্য ভাষীর
সঙ্গে সহবস্থান করেও স্বকীয় বৈশিষ্ঠ্যে অসংলগ্ন। পূর্বের ইউরোপে এবং আধুনিক ভারতে,
কানাডায়, আফ্রিকায় ও ল্যাটিন আমেরিকায় এটিও সামামজিক অথবা রাষ্ট্রিক বিরোধের ও
বিপর্যয়ের মুখ্য কারণ। আজকের পাকিস্তানেও এ সমস্যা থেকে মুক্ত নয়। পশ্চিম
পাকিস্তানে সিন্ধি, বেলুচ এবং পাখতুন অসন্তোষও মূলত ভাষিক স্বাতন্ত্রজাত অর্থাৎ এর
যতটা ভাষিক স্বাতন্ত্র্য চেতনাপ্রসূত, ততটা আঞ্চলিক ব্যবধানগত কিংবা গোত্র
–চেতনাজাত নয়। পাঞ্জাবের সারাইকি ভাষী মুলতানীদের সাম্প্রতিক মনোভাবই এ ধারণার
সমর্থক। পূর্ব বাঙলার বাঙালী-বিহারী দ্বন্দ্বেরও উৎস এই ভাষাই। ভাষাগত ঐক্য ও
স্বাতন্ত্র্যই এই মিলন ও বিরোধের, এই আপন-পর পার্থক্যের মূলে ক্রিয়াশীল। আবার
আমাদের পাহাড়াঞ্চলে বিভিন্ন গোষ্টী, গোত্র, জাত ইত্যাদি ঐতিহাসিকভাবে অভিন্ন
নেপালী ভাষা গঠনের প্রনালীর মাধ্যমে গোর্খা জাতিস্বত্তার বহিপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, যদিও
তাদের মধ্যে বহু রকম গোষ্টীদের আচার-আচরণ, ধর্মীয় রীতি রেওয়াজ, খাদ্যাভ্যাসে
ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। বলতে গেলে আজকের যুগে তাবৎ মানুষ বর্ণ-সঙ্কর বা রক্ত-সঙ্কর।
বিচিত্র কারণে যুগ যুগ ধরে যাযাবর মানুষ স্থানান্তরে গেছে, নিঃশেষে মিশে স্থানীয়
মানুষের মধ্যে এবং ভাষার ঐ্ক্যে গড়ে তুলেছে সংহত সমাজব্যবস্থা। যেখানে ভাষা অভিন্ন
হয়ে ওঠেনি, সেখানে বিরোধ – বিদ্বেষ চিরন্তর থেকে গেছে। আদিম গোত্র-ফাত্রী- উপজাতি
পরিষদ ভেঙ্গে হল প্রথম কেদ্রভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা। ঐতিহাসিক চাহিদায়, পূঁজির
সঞ্চালন, ব্যবসা-বানিজ্যের তাগিদেই এই কেন্দ্রভূত সাম্রাজ্য প্রতিষ্টিত হলো। কিন্ত দাসব্যবস্থা, ভূমিদাস, সামন্ততত্র এবং
আধুনিককালের পূঁজিবাদ এই জাতীগত বা ভাষাগত বিরোধের নিষ্পত্তি করতে পারে নি, কারণ
লেনিন এর বিশ্লেষণে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য পূঁজিবাদ বিকাশের
অনিবার্য নিয়ম এবং ফল। সাবেক সোভিয়েতে সমাজতন্ত্রের পতনের পরেই সব জাতি গুলো
বিছিন্ন হয়ে পৃথক রাষ্ট্র তৈরি করলো।
যুগোস্লাভিয়া সমাজতন্ত্র পতনের জাতির ভিত্তিতে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে
গেলো। সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের পতনের প্রধান উৎস ও কারণ সন্ধান এই
আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নয়, সেখানে সমাজতান্ত্রীক ব্যবস্থায় বিভিন্ন জাতিগুলি
তাদের সাংস্কৃতিক, ভাষিক বিকাশে রাষ্ট্রের সহায়তা পেয়েছিল। তাই জারশাসনের পরে সেখানকার
নিপীড়িত সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্পদায় ও
জাতীগুলি সোভিয়েতের আমলে মুক্তির পরিমণ্ডলে নিজেদের সাংস্কৃতিক বিকাশের
সুযোগ পেয়েছিল।
a lot of misleading wrong information.
ReplyDelete