বাঙালি ব্রাহ্মণ মূলত রাঢ়ি
এবং বারেন্দ্রি। রাঢ়ি এসেছে রাঢ়ভূমি থেকে এবং বারেন্দ্রিরা এসেছে বরিন্দ অঞ্চল
থেকে। বরিন্দ বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত থেকে আট কিলোমিটার মধ্যে অধুনা বাংলাদেশে অবস্থিত। রাঢ়িদের মধ্যে
আবার দুই ভাগ আছে যেমন উত্তররাঢ়ি এবং দক্ষিণরাঢ়ি। যেহেতু আবার বাঙলার রাজারা
বারবার বাঙলার বাইরে থেকে ব্রাহ্মণদের এ রাজ্যে আমদানি করেছে, সেই ব্রাহ্মণরাও আজ
বাঙালি সমাজের অন্তুর্ভুক্ত। বহিরাগত ব্রাহ্মণদের মধ্যে আছে মৈথলি ব্রাহ্মণ, যারা
বাঙলায় এসেছে মিথিলা থেকে। এঁদের মধ্যে আছে মালদাহ ও বারেন্দ্রভূমি কেন্দ্রিক
মিশ্র, ঝা, ওঝা, উপাধ্যায়, তেওয়ারী প্রভৃতি উপাধিধারী। মেদিনীপুরে আছেন এদের মধ্যে
আবার কিছু উৎকল ব্রাহ্মণ। বৈদিক ব্রাহ্মণদের আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়। পশ্চিম
ভারত থেকে আগত পাশ্চাত্য বৈদিক এবং দক্ষিণ ভারত থেকে আগত দাক্ষিণাত্য বৈদিকা
ব্রাহ্মণরা। কিন্তু কালের প্রবাহে বাঙালির জাতি গঠনের ঐতিহাসিক বিবর্তন স্তরে
এনারা আজ সবাই বাঙলারই অংশ ও বাঙালি। রাঢ়ী ব্রাহ্মণদের মধ্যে আছে ৫৯ টি এবং
বারেন্দ্রীদের মধ্যে আনুমানিক শতখানেক গাঁঞ্জী নামে উপাধি। এই সমস্ত পদবীগুলি
পরবর্তিকালে বিবর্তিত হয়েছে আবার বর্তমানে কিছু ব্যবহার হয় না। মৎস্যাশী, তোড়ক,
ঝমপটি, গোচন্ড, কাছরি ইত্যাদি উপাধি বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির দিকে। কিন্তু এরা
সবাই বারেন্দ্র গোষ্টীভূত। বর্তমানে প্রচলিত ও ব্যবহৃত বারেন্দ্রি ব্রাহ্মণ
পদবীগুলি হলো বাগচি, লাহিড়ী (লাহিড়ি নামক গ্রাম থেকে আগত), ভাদূড় (উৎস অঞ্চল বা
গ্রামের নাম ভাদর বা ভাদুড়িয়া), মৈত্র, আতর্থী (গ্রামের নাম আতথী) ইত্যাদি। অতিমাত্রায়
প্রচলিত এবং ব্যবহৃত রাঢ়ি ব্রাহ্মণদের পদবিগুলি হলো চট্টোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়,
বন্দ্যোপাধ্যায়, গঙ্গোপাধ্যায় (গাঙ্গুল গ্রাম থেকে আগত), যেগুলি বৃটিশ কতৃর্ক
বিকৃত হয়ে দাড়িয়েছে চ্যাটার্জি, মূখার্জি, ব্যানার্জি বা গাঙ্গুলিতে।
চট্টোপাধ্যায়ের আদি উৎস স্থল বর্ধমান জেলার চাটুতি পরগণায় যেখানে এনারা পরিচিত
ছিলেন চট্টরাজ, চট্ট উপাধিতে এবং এনাদের মুল পদবি হলো চাটুতি। বন্দ্যোপাধ্যায়দের
মূল পদবি বাডুড়ি, এনাদের মূল উৎস স্থল বীরভূম জেলার বন্দিরহাট পরগনায়।
মুখোপাধ্যায়দের উৎপত্তি স্থল বাঁকুড়া জেলার অম্বিকার পরগনার মূখুটি গ্রামে, মূল
পদবি মুখুটি। যদিও অনেক ঐতিহাসিক এবং নৃতাত্ত্ববিধ দের মতে মুখোপাধ্যায়-এর অর্থ
মুখ্য উপাধ্যায়, অর্থাৎ প্রধান পেশা পুজা-পাঠ। আবার অন্য অনেকের মতে কোনো ব্রাহ্মণ
যদি অধ্যাপনাও করতেন, তাঁকে গঙ্গ, চট্ট, মূখ্য প্রভৃতি উপাধি মূল পদবীর সাথে
সংযুক্ত করা হতো। গঙ্গোপাধ্যায়দের
উৎপত্তিস্থল বর্ধমান জেলার গঙ্গার তীরে । মূল পদবি গাঙ্গুর। স্থানিক উৎপত্তি স্থল
ছাড়াও মূল পদবি প্রভাবিত হয়েছে এবং ঐতিহাসিক ভাবে বিকশিত বা বিকৃতি লাভ করেছে পেশাগত কারণে এবং তার কালিক বিবর্তনের নিয়মে। উৎসস্থল থেকে উপাধির
বুৎপত্তি নিদর্শন পাওয়া যায় আরও। কিছু পদবির উদাহারণ পাওয়া যায় যা পূর্বপুরুষ থেকে
আজও পর্যন্ত ব্যবহৃত হচ্ছে। কুশারি পদবি এসেছে কুশ গ্রাম থেকে, গড়গড়ি এসেছে গড়গড়ে
গাঁঞী থেকে, কাঞ্জিলাল, স্যান্নাল, দীর্ঘাঙগী (দিঘড়ী গ্রাম থেকে), নন্দী এসেছে
নন্দীয়াল গ্রাম থেকে, পালোধি এসেছে পালোধি গ্রাম থেকে ইত্যাদি। স্যান্নালদের
গ্রামের নাম সণ্ডামিনী। প্রাপ্ত বা সম্মানিত বা পেশাগত কারণে উপাধি যেমন এসেছে
দিল্লির সুলতান, নবাব বা বাদশাহদের কাছ থেকে, তেমনি রাজাদের কাছ থেকে আবার আধুনা
বাঙলার বাইরের অন্য কোনো রাজ্য থেকে। পদ থেকে পদবি প্রাপ্তির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা
আছে কোচবিহারের রাজবংশ থেকে। কোচবিহারের এমন কিছু স্বাতন্ত্র পদবি আছে যা
রাজপরিবারের কাছ থেকে প্রাপ্ত এবং তা অবিভক্ত বাঙলার অন্যত্র কোথাও পরযায়ী পেশাগত স্থানান্তরের কারণে কচিত-কদাচিত পাওয়া যায়।
উদাহারণস্বরুপ কিছু পদবি যেমন ঈশোর। কুচবিহারের রাজবংশের কোনো দুহিতার রাজবংশ ছাড়া
অনত্র কোনো বংশে বিবাহ হতো, তাঁর গর্ভজাত কুচবিহারের রাজপরিবারের সেই দৌহিত্র
সন্তানেরা ঈশোর পদবিতে অলংকৃত হতেন। কার্জি উপাধি দেওয়া হত কুচবিহারের রাজা নয়,
এমন কোনো বহিরাগত পরিবারে, বিবাহের পর সেই রাজশ্বশুরকে। এই উপাধি বংশপরম্পরায় এই
উপাধি গৃহিত ও সংরক্ষিত হয়েছে। খাজনা আদায় করা বা জমি মাপজোকের সাথে সম্পর্করুক্ত
পেশায় নিয়োজিত গোমস্তাদের কারকুন উপাধি দেওয়া হত। ভিনরাজ্য থেকে আগত মুসলমান
রাজাদের দেওয়া মল্লিক উপাধিধারীরা, যারা কুচবিহারের রাজাদের অধীনে কাজ করতেন তাদের
পুত্র পৌত্রেরা হতেন গাবুর। রাজকীয় ডাকবিভাগে কর্মরত কর্মচারীদের ডাকুয়া উপাধি
দেওয়া হত। রাজবংশের পুরোহিতদের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া হত দেউড়ি পদবি। গ্রামের
প্রধান বা মোড়লরা পেতেন ঠাকুরিয়া উপাধি। এসব প্রাপ্ত উপাধি থেকে এই সিধান্তে উপনীত
হওয়া যেতে পারে যে কুচবিহারের রাজাদের দেওয়া বহু পদবি আছে যেগুলি পেশাগত কাজে
সম্পর্কিত এবং এর অধিকাংশ উপাধি প্রাপ্ত হয়েছে রাজাদের ব্যক্তিগত কাজ থেকে। রাজাদের
মাথায় ছত্রধারীদের দেওয়া হতো ছত্রধারী বা ছত্রধরা। রাজাদের প্রাত্যহিক ক্রিয়াদির
পর শৌচকার্যে ঝাড়ি দিয়ে যারা জল ঢালতেন তাঁরা হলেন ঝাড়িধরা। যারা পাখায় বাতাস
করতেন, তাঁরা হলেন পাখাধরা। রাজাদের ভ্রমণকালে যারা রাজাদের পোশাকআশাকের দেখাশোনা
করতেন তাঁরা হলেন পোঁটলাধরা। রাজাদের শয়নকক্ষে যারা বিছানার বন্দবস্ত করতেন তাঁরা
হলেন বোখনাধরা। রাজাদের শিকারে যারা রাজাদের সহায়তা করতেন এবং শিকারে দক্ষতা অর্জন
করতেন তাঁরা হতেন পেলান। রাজার রাজদণ্ড ও পাগড়িবহণকারীরা পেতেন সোতাপাগধরা উপাধি।
পাগড়ির বিকৃতি হচ্ছে পাগ শব্দ, যেমন পেধা বা দণ্ড ছিল লাঠিসোটার মূল শব্দ। রাজাদের
মনোরঞ্জনের জন্য পেশাদার গল্পকারিদের প্রাপ্ত উপাধি হলো গোপ্পি। ত্রিপুরার রাজবাড়ীর
স্বাতন্ত্র ও সেই রাজবংশে সীমাবদ্ধ হলো মানিক্য উপাধি। গৌড়ের সুলতান সামসুদ্দিনের
রাজত্বকালে ত্রিপুরার রাজাদের এই উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বিভিন্ন বর্ণ-উপবর্নতেও
প্রাপ্ত উপাধির নিদর্শন পাওয়া যায়। ঠাকুর উপাধি যেমন রাজাদের কর্তৃক প্রাপ্ত আবার
জনগনের তরফ থেকেও দেওয়া হত। কবিগুরুর পূর্বপুরুষের আদি উপাধি ছিল কুশারি। এনারা
সাধারণত নিম্নবর্ণের পূজাপাঠ করতেন। সেই সুবাদে জনসাধারণ তাদের ঠাকুর উপাধিতে
সম্মানিত করতো। তবের থেকেই এই পদবির পরিবর্তিত পদবি ঠাকুর। সরকার পদবি বিভিন্ন
জাতি-উপজাতিতে পাওয়া যায়। এই উপাধি ব্রাহ্মণ থেকে নিম্নবর্ণের মধ্যে পাওয়া যায়। শেরশাহ
তাঁর শাসনকার্যের সুবিধের জন্য সরকারকে বিভিন্ন পেশাভিত্তিক শ্রেণীতে ভাগ করলেন।
যারা তাঁর সরকারের কর্মচারী ছিলেন, তাঁরা হলেন সরকার। অর্থাৎ শেরাশাহ সরকারের প্রতিনিধি।
এর ফলে বিভিন্ন জাতি ও বর্ণে সরকার উপাধি থেকে গেলো এবং বংশপরম্পরায় চলে আসল।
সরকার শব্দের বুৎপত্তি ফারসি শব্দ ‘শরকার’ থেকে। বর্তমানে উত্তরভারতে হিন্দিভাষী
এলাকাগুলিতে সরকারি কর্মচারিদের ‘সরকার’ দ্বারা সম্বোধিত করা হয়। কানুনগো পদবি
শুধুমাত্র বাঙলার বিভিন্ন বর্নে বা উপবর্ণে পাওয়া যায় না, এই পদবির বিস্তৃতি বাঙলা
থেকে গুজরাট অবধি। কানুনগো শব্দের বাঙলায় মানে আইন, এর সাথে ‘গো’ যোগে জ্ঞানকারী।
এই পদবিও মুঘলসাম্রাজ্যের সময় থেকে প্রাপ্ত
ও প্রচলিত। বিশ্বাস পদবিও বিভিন্ন বর্ণ ও উপবর্ণে পাওয়া যায়। এই পদবি হিন্দুরাজাদের
থেকে সুলতান, পাঠান এবং মুঘল আমলেও প্রচলিত ছিল। বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী থেকে
বিশ্বাস পদবি প্রাপ্ত। এই পদবি যেমন বর্ণ হিন্দুদের মধ্যে আছে তেমন আবার বাঙালী মুসলমানদের
মধ্যেও পাওয়া যায়। পণ্ডিত প্রাপ্ত পদবি। যিনি শাস্ত্রবিশেষজ্ঞ তিনি এই উপাধিতে
ভূষিত হতেন রাজাদের, সামন্ত জমিদার বা সাধারণ মানুষের দ্বারা। মূর্খ হলেও
বংশপরম্পরায় এই উপাধি বহন করেন এনারা। সিকদার, আমীন, খান, মুন্সি, পাইক, হালদার,
লস্কর, মৃধা, চৌধুরী, রায়চৌধুরী, মণ্ডল প্রভৃতি পদবি হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান
নির্বিশেষে বিভিন্ন বর্ন-উপবর্ণে পাওয়া যায়। খাঁ উপাধি পাঠান আমলে প্রাপ্ত হলেও
ইংরাজের আমলে খাঁ অপভ্রংশ হয়ে হল খান। পাঠানদের আমলে নবাবদের প্রিয়পাত্র হিন্দু –মুসলমান
নির্বিশেষে খাঁ উপাধিতে ভূষিত করা হত। নিয়োগী-রা হিন্দু রাজাদের সময় থেকে
রাজাকার্যে উপযুক্ত কর্মচারী নিয়োগ করতেন। পাঠানদের আমলে রাজস্ব আদায়ের কাজে যারা
নিযুক্ত থাকত তাদের প্রাপ্ত উপাধি ছিল সিকদার। মৃধা শব্দের বুৎপত্তি নবাবদের কামান
মিরদাহ থেকে। বিষেনপুরের রাজা নবাবদের ঐতিহাসিক কারণে প্রিয়পাত্র হবার সুবাধে এই
কামানের নমুনা পেয়েছিলেন। বিষেনপুরে হিন্দু রাজাদের আমলে এই কামানের গোলাইয়ের কাজে
হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে যে সব শ্রমিক নিয়জিত হত এবং দক্ষতা অর্জন করেছিল তারা
এই উপাধি পেষাগত কারণে পেয়েছিলো। আবার অনেক বিষেজ্ঞদের মতে যুদ্ধে নিয়োজিত পদাতিক
সৈন্যদের উপাধি ছিল মৃধা। মণ্ডল এমন এক পদবি যা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে,
জাতি-উপজাতি, বর্ণ-উপবর্ণে , ধর্মে ব্যাপৃত। মণ্ডলের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ গ্রামের
প্রধান ব্যক্তি। ভারতবর্ষের সুদুর অতীত থেকে জনগনের মূল জীবন ছিল গ্রামীণ জীবন। গ্রামের
প্রধাঙ্কেই তাই জনগন মানত, সাম্রাজ্যের হস্তান্তর সাধারণত মানুষের গ্রামীণ জীবনকে
প্রভাবিত করত না। অবশ্য ইংরেজ কোম্পনীর সাম্রাজ্যে উপনিবেশের সুত্রপাত থেকে এই
প্রস্তরীভূত গ্রাম্য আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। সে যাবতকাল অবধি মণ্ডলই
ছিলেন গ্রামের সর্বেরসর্বা , মান্যগন্য ও অভিভাবক। এদের গ্রাম্য ভাষায় মণ্ডলপতি বা
মণ্ডলেশ্বর হিসেবে অবিহিত করা হত। এদের সঙ্গে যে রাজপ্রতিনিধি যোগাযোগ রাখতেন তিনি
হলেন মাণ্ডলিক বা মহামাণ্ডলিক। মণ্ডলপতি বা মণ্ডলেশ্বর চলিত ভাষায় হয়ে গেলেন মণ্ডল
বা মোড়ল। একইভাবে অন্যভাষায় যিনি গ্রামের জনগনের প্রধান বা বিশেষ হতেন তিনি
হলেন গনাই বা বিশী। এনারাই গ্রামের সালিশী
সভায় বিবাদের নিষ্পত্তি করতেন এবং নানান সামাজিক সমস্যার বিধান দিতেন। এখনকার
অর্থে অঞ্চল বা গ্রামপ্রধান। বিভিন্ন সময়ে ভিনজাতি বা ভিনদেশী শব্দ বাঙলা পদবিতে
ঢুকেছে। দাম পদবি গ্রিক শব্দ দ্রম্ম থেকে
এসেছে। দ্রম্ম কথার অর্থ মুদ্রা বা পয়সা। সেই সুত্রে কেউ উপনিত হচ্ছেন
ব্যবসায়ী পেশায়। কিছু বিশেষজ্ঞদের ধারণা প্রাচীনকালে ব্যাক্ট্রিয়ান গ্রিকরা যখন
গান্ধার প্রদেশে (বর্তমান আফগানিস্তানে কান্দাহার) অনুপ্রবেশ করেছিল তখন তাদের
আধুনিক যুগের মুদ্রা তৈরি করার কারখানা ছিল না, তখন মুদ্রা পিটিয়ে তৈরি করা হতো যা
পরবর্তিকালে ছাঁচে ঢ়েলে পয়সা বা মুদ্রা তৈরি করা হত। বাঙালি রাজা বা নবাবরাও
মুদ্রা তৈরির কারখানা বসিয়েছিলেন। এই মুদ্রা তৈরির কাজে যারা নিয়োজিত হয়েছিলেন
তারাই হলেন দ্রম্ম। এই দ্রম্ম পেশা থেকেই কালের প্রবাহে দাম পদবি এসেছে।
পূর্ববঙ্গে দাম পদবি রাঢ় বাঙলায় দাঁ হয়ে বিবর্তিত হয়েছে। কয়াল শব্দের উৎপত্তি আরবি
শব্দ ‘কাইল’ থেকে। বাজারে দ্রব্য কেনাবেচার মাপজোক তদারকি করা, অসাধু কারবার ও লোকঠকানো
বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণ যারা করতেন তারাই ছিলেন কয়াল। এই কয়ালদের পেশা খুবই গুরুত্বপূর্ণ
ছিল কারণ শরিয়তি আইন অনুযায়ী যারা অসাধু ব্যবসায়ী তাদের দণ্ড হবে। আলাউদ্দিনের
জামানায় ফতোয়া জারি হয়েছিল যে যারা লোক ঠকাবে তাদের দক্ষিন হস্ত কেটে ফেলা হবে। ওয়াদেদ্দার
হয়েছে আরবি ওহদেদার থেকে। নবাব বা জমিদারকে করপ্রদানে অসমর্থ ব্যক্তিদের সম্পত্তি
বা জমি যারা নিলামে তুলতেন তাদেরই পেশাগত
ভাবে ওহদেদার বলা হত। কাঁঠাল পদবির সাথে কাঁঠাল ফলের কোনো সম্পর্ক নেই। এই পদবিটি
কাটাল থেকে বিকৃতি হয়ে কাঁটাল হয়েছে। নবাব-বাহাদুরদের হুকুমে বিভিন্ন জায়গায়
জলকষ্ট দূর করার জন্য জলাশয়, দীঘি বা পুকুরের খনন কার্যে যারা তদারকি করতেন তারাই
ছিলেন ‘কাটাল’ যা পরবর্তিকালে হয়ে দাঁড়াল কাঁঠাল। নবাবের নিজস্ব ব্যক্তিগত সচিব বা
কেরানিকে বলা হত খাসনবিশ। আরবি খাস শব্দের অর্থে যারা নবাবদের জমি-জমা, সম্পত্তি
দেখাশোনা ও তদারকি করতেন তাদের বলা হত খাসনবিশ। জানা পদবির উৎপত্তি নবাবি আমলে
ফারসি শব্দ ‘জাহান’ থেকে। এই শব্দের উচ্চারণ রুপ ‘জান’। আর এই জান থেকে বিবর্তিত
হয়ে জানা , যিনি জমিজায়গা দেখাশোনা করতেন। আবার উর্দুতে ‘জান’ এর অর্থ প্রাণ। তোপদারদের পূর্বপুরুষেরা গোলন্দাজ ছিলেন
বা তোপ দাগতেন। শব্দটির উৎস ফারসি। ‘তরফ’ শব্দটি আরবি মানে জমিদারির অংশ। ‘দার’
শব্দটি ফারসি। জমিদারীর এক একটি অংশের যিনি মালিক তিনিই হতেন তরফদার। আরবি শব্দ
‘তৌল্লকু’ থেকে এসেছে তালুক, অর্থে ভূসম্পত্তি। তালুকদার পদবি অবশ্য বাঙলার বাইরেও
আছে। এই পদবি ভূসম্পত্তির সাথে সম্পর্করুক্ত। সুলতান, নবাব, বাদশাদের দ্বারা যাদের
একটি নির্দিষ্ট ভূসম্পত্তি দান করা হতো, তারাই হলেন তালুকদার। মেদিনীপুরের ঠান্ডার
উপাধি এসেছে ‘থানাদার’ শব্দ থেকে, যারা আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যে পুলিশ চৌকিতে
কর্মরত ছিলেন , চলতি কথায় তারই অপভ্রংশ ঠাণ্ডার। দস্তি কথাটা আরবি মানে যারা পেশায়
নবাব, সুলতানদের দলিল, দস্তাবেজ, চিঠিপত্র নিজেদের জিম্মায় রাখতো এবং দেখভাল করতো।
সেই অর্থে দস্তিদার। আরবি ‘ফুত্বহ’ এবং ফারসি ‘দার’, এই দুই শব্দের সমন্বয়ে
পোদ্দার কথাটির উৎপত্তি। এনারা তৎকালীন সময়ে নবাব-বাদশাহ বা সরকারী অনুমতিক্রমে
সোনারুপা ও মুদ্রার কেনাবেচার সাথে যুক্ত ছিল। সরকারি চিঠিপত্র ও দলিল গালা দিয়ে
বন্ধ করার জন্য চোঙ এর প্রয়োজন ছিল। এই চোঙ যারা সরবরাহ করতেন তাঁরা হলেন চোঙদার। ‘মজহৌম’ শব্দটি ফারসি অর্থাৎ মৌজার অধিকর্তা।
সুলতান এবং নবাবি আমলে এক বা একাধিক তালুকের খাজনা আদায়ের ইজারা যাদের দেওয়া হতো
তাঁরা হলেন ‘মজমদার’ এবং চলিত কথায় মজুমদার। বিভিন্ন জাতি ও বিভিন্ন রাজ্যে এই
পদবির উপস্থিতি বর্তমান। শিকদার উপাধি
দেওয়া হত তাদের যারা খাজনা এবং রাজস্ব আদায়ের সাথে জড়িত ছিল। গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের
প্রধান বা প্রতিনিধিকারী ছিলেন সর্দার। এনারা সাধারণের জন্যে কাজ করতেন। ফারসি
শব্দ দিওয়ান থেকে উৎপত্তি দেওয়ানের। এই উপাধি বাঙালীদের মধ্যে খুব কম পাওয়া যায়।
এনারা ছিলেন রাজস্ব আদায়ের প্রধান কর্মচারী। সুবে বাঙলা বা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ
থেকে রাজস্ব আদায়ের সাথে জড়িত ছিলেন। উত্তর ভারতে হিন্দিভাষী বলয়ে এই উপাধি ব্যাপক
সংখ্যায় পাওয়া যায়। ‘পাঞ্জা’ একটি ফারসি শব্দ , যেখান থেকে এসেছে পাঁজা। রাজা,
নবাব , সুলতান বা বাদশাহদের তরফ থেকে দান-দক্ষিণা কোনো সরকারী ঘোষণাপত্র যেত সেই
ঘোষণাপত্রে আঙুল সমেত হাতের তালুর ছাপ থাকতো কারণ সেই সময়ে সইসাবুদের বা সিলের
প্রচলন ছিল না। যারা এই পাঞ্জার বলে দানগ্রহীতা, তাঁরাই হলেন পাঁজা। ‘মালিক’
শব্দটি ফারসিজাত, যার অর্থে সে ব্যক্তিকে নবাব, বাদশাহরা সম্মানিত করতেন। এই মালিক
শব্দটি অপভ্রংশ হয়ে হল মল্লিক। এই মল্লিক বা মালিক উপাধি দেওয়া হত প্রধানত পাঠান
আমলে, যারা বিশেষ করে জমি-বা জায়গীর দান হিসেবে পেতেন। আরবি ‘মহল্ল’ শব্দের অর্থ নগর। বর্তমানে মহল্লা
শব্দের অর্থ পাড়া। মুঘল আমলে মহলানবিশ পদবিটি এসেছে, যারা প্রধানত নগরের বিভিন্ন
সরকারি লেখালেখির কাজ করতেন। মুন্সি শব্দটা ফারসিজাত, অর্থে কেরানী। মুঘলযুগে যারা
আদালতে বা অন্যত্র কেরানীর কাজ করতেন, তাঁরা ছিলেন মুন্সি। এই পদবি বাঙালা বাদ
দিলেও সমগ্র উত্তর ও পশ্চিম ভারতে আছে। একইভাবে মুস্তাফি শব্দের ফারসি অর্থ
পরীক্ষক। এনারা রাজস্ব সম্বন্ধীয় হিসাব পরিক্ষা করতেন। ফারসি ‘লস্কর’-এর অর্থ
পদাতিক সৈন্য বা সৈনিক বিভাগের কর্মী বা জাহাজের কর্মী হতে পারে। পাঠানদের আমলে এই
উপাধি দেওয়া হত। নস্কর হচ্ছে লস্করের বিকৃত বা বিবর্তিত রূপ। মুঘল আমলে ‘হাজার’
মানে হাজার সৈন্যের অধিপতি। বাঙলায় তা হাজরা, উত্তরভারতে হাজারি, পশ্চিমভারতে
হাজারে আর অসমে হাজারিকা। বাঙলাতে সমস্ত বর্ণে এবং উপবর্ণে এই পদবি পাওয়া যায়। সাহা
হচ্ছে সাহূর অপভ্রংশ এবং প্রকৃতপক্ষে সাধুর অপভ্রংশ। সাধু শব্দের নানান অর্থের
মধ্যে পড়ে বনিক বা ব্যবসায়ী। বাঙলায় সাহা, বিহার ও উত্তরপ্রদেশে সাহূ,
সিন্ধূপ্রদেশে সাহানা, দিল্লি, পশ্চিমভারতে এবং মধ্যপ্রদেশে সাহানী, একই পেশার
সাথে যুক্ত ছিলেন, অর্থাৎ ব্যবসা, বনিক বা ব্যবসায়ী। বাঙলায় গোস্বামী অসমে গোঁহাই,
বড়ো গোস্বামী হয়ে যায় বড়ো গোঁহাই। সংস্কৃত পটকিল পশ্চিমভারতের গুজরাতে প্যাটেল,
মহারাষ্ট্রে পটেল ও বাঙলায় পটল। দাস পদবির দুটি অর্থ আছে। দাস
মানে সেবক বা ভৃত্য, আর দাশ শব্দের অর্থ
মহাপণ্ডিত। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নর্ডিক আগ্রাসীরা এদেশের আদিম অধিবাসীদের দাস বা
দস্যু হিসেবে অভিহিত করতেন, এদের মধ্যে যারা মহাবলি বা শক্তিধর বা মহাপরাক্রমশালী
তাদের অসুর হিসেবে অভিহিত করা হত। সেতুয়া উপাধিধারীরা সেতু নির্মানে পারদর্শি
ছিলেন। উৎকলে এই উপাধি পাওয়া যায়। গাইনরা রাজা বা সামন্ত জমিদারদের দরবারের গান
গাইতেন আর বাইন নানান বাজনা বাজাতেন। এই দুই উপাধি অপভ্রংশ বা বিকৃত হয়ে বায়েন এবং
গায়েন হয়েছে। গুপ্ত পদবির সাথে গোপনীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই। এই পেশা প্রধানত
মধ্যসত্বভোগী। এনারা রাজার বা সামন্ত জমিদারদের হয়ে কৃষকের কাছ থেকে ফসলের দেয় অংশ
কর আদায় করতেন। হাটি বা হাটুই সমার্থক। সংস্কৃতিতে হাটির বুৎপত্তি হট্টারিক থেকে।
অর্থাৎ যারা হাটে ব্যবসা করতেন তাঁরাই প্রধানত হাটি। এরই অপভ্রংশ হাতি পদবি। হাতির
আরো অপভ্রংশ হলো আড্ডি বা আড়ি। যারা ব্যবসা, বানিজ্য থেকে ধনলাভ করেছেন তাঁরা হলেন
ধনাঢ্য। এই ধনাঢ্য থেকে আঢ্য, আঢ্য থেকে আড্ডি বা আড়ি। ব্যবসা বানিজ্যে যারা
অর্ধভাগের অধিকারী হতেন তাঁরা হলেন আদক। করণিক থেকে এসেছে করণ। মূলত মেদিনীপুরে
অনেকেই এই পদবিধারী। অর্থাৎ পেশায় রাজার কেরানি। ঘড়ামিরা সাধারণত গাঁ-গঙ্গে ভেঙ্গে
যাওয়া ঘর পূনর্নির্মান বা নতুন ঘর নির্মান পেশায়
যুক্ত ছিলেন। বাগেদের কাজ ছিল বাগ
বা বাগান বা বাগিচা নির্মান ও দেখভাল করার। নাগ পদবির অর্থ সাপ। এই পদবি আমাদের
টোটেম বা ট্যাবু উপাধিধারী সাঁওতাল, ওঁরাও, মুণ্ডাদের মতন বর্ণহিন্দুদের মধ্যে আছে। বেসরা অর্থে গোসাপ, এই পদবি বহুল প্রচলিত। আদিত্য
পদবি বহুল প্রচলিত, এর থেকে বিকৃত হয়ে এসেছে আইচ। দুটো শব্দের অর্থ এক, মূলত
সুর্যের উপাসক। চন্দ্রের উপাসক হলেন চন্দ্র, অপভ্রংশে চন্দ। পশ্চিমভারতে পদবিটা
চাঁদ বা চাঁন্দ। বর্ধমানে বিষ্ণু প্রধানত বিষ্ণুর উপাসক। উপাসনা বা পূজা গোছগাছ
যারা করতেন তাঁরা হলেন গুছাইত। কুন্ডু শব্দটির মূল উৎস দ্রাবিড় ভাষায় কুন্ডা থেকে।
এত পদবি প্রধানত প্রটো-দ্রাবিড় রক্ত শংকরের সাক্ষ্য বহণ করে। বল্লাল সেনের আমলে
পাঁচঘর কায়স্থকে কনৌজ থেকে বাঙলায় আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিল গুহ। এই পদবির সাথে
গুহাবাসীর কোনো সম্পর্ক নেই। এনারা ছিলেন আদি যুক্তপ্রদেশের বাসিন্দা। দত্ত,
বসুরাও এসেছিলেন কনৌজ এবং পাঞ্জাব থেকে। ব্রাম্মণদের মধ্যেও পেশাগত কারণে পদবির
উৎস প্রতীয়মান হয়। যজ্ঞের প্রধান পুরোহিত বা প্রধান অধ্যাপককে, অর্থাৎ আধুনা
প্রিন্সিপাল, তাঁর প্রাপ্ত উপাধি ছিল আচার্য। যে ব্রাহ্মণ রাজপরিবারের
পূজা-অর্চনা, গুনকির্তন বা তোষামোদি হতেন তিনি লাভ করতেন ভট্ট। আবার এই ভট্টই যখন
অধ্যাপনার কাজে লিপ্ত হতেন, তখন তিনি উপাধি লাভ করতেন ভট্টাচার্য্য। অবশ্য
বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রাম্মণদের মধ্য থেকে পেশাগত কারণে প্রাপ্ত উপাধি। এই আচার্যরা
ছিলেন ব্রাম্মণদের শ্রেনী বিন্যাস স্তরে একদম উচ্চে অবস্থিত। এদেরই কেউ কেউ আবার
যখন যাজ্ঞ-যজ্ঞাদি, অধ্যাপনার কাজ ছেড়ে, পরবর্তিকালে জীবিকার তাগিদে বর্ণ-শ্রেনী
বিন্যাসে নিম্ন স্তরে বৈশ্য বা ক্ষত্রিয়ের পেশা অবলম্বন করতেন তখন তাদের উপাধি
নিতেন আচার্য চৌধুরি। উদাহারণস্বরূপ
মৈমনসিংহের রাজাদের, স্নেহাংশুকান্ত আচার্য্য চৌধুরিদের পরিবার। এনারা
রাজত্ব করা হচ্ছে ক্ষত্রিয়ের পেশা।
লেখা টি কার?
ReplyDeleteবেশ তথ্যবহুল :)
অসম্ভব ভাল এবং তথ্যপূর্ণ!
ReplyDelete