Friday, 24 January 2014

ধর্ম, ধার্মিক, মৌলবাদ ।

ধর্ম, ধার্মিক ও মৌলবাদ  কে এক আসনে বিচার করা ঐতিহাসিক নিরিখে সঠিক নয়। কোনো জাতি গঠনের ঐতিহাসিক বিকাশের স্তরে ধর্ম এক নির্ধারক উপাদান। ‘ধর্ম’ হলো যা ধারণ করে। ধর্ম মানে শুধুমাত্র জপতপমন্ত্র আচার অনুষ্টান নয়। সমাজ বিকাশের স্তরে  উৎপাদন  পদ্ধতির বৈষয়িক নিয়মের সাথে সামঞ্জ্যস্যপূর্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারা উপলব্ধ কতকগুলি প্রত্যয়, বিশ্বাস, ধ্যানধারণা, ন্যায়-অন্যায়, নীতিবোধ, মূল্যবোধ ইত্যাদি যা মূলত কোনো জাতির সত্তাকে যুগ যুগ ধরে ধারণ করে থাকে, সমস্ত বিপর্যয়ের মধ্যেও সেই জাতির প্রাণসম্পন্দন রক্ষা করে চলে, এবং সমাজবিকাশের সাথে সাথে এই গুনাগুলির গুনগত পরিবর্তন হয় , এই গুনাগুলির সমন্বিত রুপ হলো ধর্ম। আবার সব  ধর্মের মূল পরিচয় কতকগুলি বিশেষ ধর্মশাস্ত্রের বিধান। ভগবদগিতায় কৃষ্ণের মুখে ধুঅরমের এই সংজ্ঞাই শোনা যায়। অর্জুনকে বর্ণভেদভিত্তিক ক্ষত্রিয়ধর্ম অনুযায়ী যুদ্ধে প্রবৃত্ত করাবার উদ্দেশ্যে কৃষ্ণ বলছেনঃ (বাংলায় অনুবাদিত) –  “যে লোক শাস্ত্রের বিধান না মেনে ইচ্ছেমত আচরণ করে, সে সিদ্ধি, সুখ কিংবা পরম গতি পায় না। অতএব কার্যাকার্য ব্যবস্থার জন্য শাস্ত্রই তোমার একমাত্র প্রমাণ।  শাস্ত্রের বিধান জেনে নিয়ে সে অনুযায়ী তোমার কর্ম করা উচিত”(শ্রীমদভগবদগীতা, ১৬/২৩-২৪)। সকলেই জানেন যে প্রাচীন ভারতে শাস্ত্র বলতে মনুস্মৃতি এবং তার আগেকার বিভিন্ন ধর্মসুত্র এবং ধর্মশাস্ত্রকেই বোঝাত।আর সে ধর্মশাস্ত্রের মর্মকথা ছিল জাতিবর্ণভেদ। মীমাংসা দর্শণেও ধর্মের সংজ্ঞা নিয়ে আলোচিত হয়েছে। পকৃতপক্ষে ধর্মের অর্থ সম্বন্ধে প্রশ্ন নিয়েই জৈমিনীসুত্র – এর ‘পূর্বতন্ত্র’ আরম্ভ হচ্ছে ঃ “অথাতো ধর্মজিজ্ঞাসা”। (মীমাংসদর্শনম, ১/১/১)। পূর্বপক্ষীয়রা বলছেন যে ধর্ম যেহেতু অতীন্দ্রিয় এবং এর কোন জাগতিক লক্ষণ নেই, অতএব ধর্মের কোন প্রমাণ নেই। এ কারণে ধর্মবিশ্বাস অর্থহীন। (মীমাংসদর্শনম, ১/১/২, শবরভাষ্য)। এই যুক্তি খন্ডন করতে গিয়ে সিদ্ধান্তীরা বলছেন যে ধর্ম প্রকৃতপক্ষে কোন অতীন্দ্রিয় সত্তা নয়, এটি একটি প্রসিদ্ধ পদার্থ, যার লক্ষণগুলি শাস্ত্রে বিধৃত আছে। পূর্বপক্ষীয়রা বেদ উদ্ধৃত করে বলছেন, বেদে যেহেতু স্বর্গলাভের আকাংক্ষায় যজ্ঞ করবার নির্দেশ আছে, আর সকলেই স্বর্গলাভ করতে চায়, অতএব শূদ্রদেরও যজ্ঞ করবার অধিকার থাকা উচিত। সিদ্ধান্তীরা উত্তর দিচ্ছেন যে শাস্ত্রের (অর্থাৎ ধর্মশাস্ত্রের) বিধানে শূদ্রদের যজ্ঞ করবার অধিকার নেই, অতএব এটাই ধর্ম। এভাবে স্মৃতির সাহায্যে শ্রুতির, অর্থাৎ ধর্মশাস্ত্রের সাহায্যে বেদের অর্থ নির্ণয় করতে হবে। ((মীমাংসদর্শনম, ১/১/৪, শবরভাষ্য)। যেহেতু সিদ্ধান্তীদের মতের শ্রেষ্টতাই মীমাংসা দর্শনের প্রতিপাদ্য বিষয়, অতএব মীমাংসা দর্শণের মতে ধর্মশাস্ত্রের বিধানই ধর্মের লক্ষণ, ধর্মের অন্য কোন সংজ্ঞা নেই। এ প্রসঙ্গে অনেকে বেদান্তের অদ্বৈত্ববাদকে ধর্মের সারমর্ম বলে থাকেন।  কিন্ত  তাঁরা একথা ভুলে যান যে  অদ্বৈত্ববাদ একটি মরমিয়া দর্শণ মাত্র, ধর্ম নয়। সমাজ জীবনে এই দর্শনের প্রয়োগ ধর্মশাস্ত্রের বিধানকে অতিক্রম করতে পারে না। শঙ্করভাষ্যে ব্যাক্ত করা আছে ---- (বাংলায় অনুবাদিত) ধর্মাধর্ম বিজ্ঞানের শাস্ত্রই একমাত্র উৎস । ধর্মের অতীন্দ্রিয়তা বশত কোনটি ধর্ম আর কোনটি অধর্ম তা একমাত্র শাস্ত্ররূপী বিজ্ঞানেই বিধৃত আছে। দেশকালের পার্থক্য বশতও একথা সত্য। যা এক দেশে এবং কালে ধর্মরুপে অনুষ্ঠিত হয়, তা-ই অন্য দেশে বা কালে অধর্ম রুপে গন্য হয়। অতএব কোন মানুষের পক্ষেই ধর্মাধর্ম বিষয়ে শাস্ত্র ছাড়া আর কোন বিজ্ঞান নেই। (বেদান্তদর্শনম, ৩/২/২৫, শাংকরভাষ্য)। সুতরাং ধর্মশাস্ত্রের প্রতিটি উক্তি অলৌকিক উৎস ( এই প্রসঙ্গে জার্মান দার্শনিক ফয়েরবাখের ধর্মপ্রসঙ্গে আলোচনায় ও  বিশ্লেষণে  ভিত্তি পাওয়া যায়) এবং একমাত্র ধর্মশাস্ত্র নির্দিষ্ট ব্যবহারিক জীবনই অভ্রান্ত, এই বিশ্বাসকেই ধর্ম বলা হয়। বাস্তব ক্ষেত্রেও এ ধরনের ধর্মশাস্ত্রভিত্তিক ব্যবহারিক জীবনধারাই বিভিন্ন ধর্মের প্রধান পরিচয়। সব ধর্মের সম্বন্ধেই একথা সাধারণ ভাবে সত্য। আর এই শাস্ত্রভিত্তিক ব্যবহারিক ধর্ম পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই জন্মগত ভাবে পেয়ে থাকেন, নিজ বিচারবুদ্ধির নিরিখে নয়।   
ধার্মিক তিনি, যিনি এই রুপকেই তার দৈনন্দিন বৈষয়িক জীবনে চলার পথে,  এই রুপকেই বস্তুজগতের সাথে নিজের স্বত্তার সমন্বয়ে কাজে লাগানযারা আক্ষরিকভাবে শাস্ত্রের বিধিনিষেধ মেনে চলেন তাদের আমরা শাস্ত্রনিষ্ঠ আদর্শ এক আস্তিক ও শ্রেষ্ট মানুষ বলে ভক্তি শ্রদ্ধা করি। এমনকি তাদের মধ্যে কাউকে আমরা অলৌকিক শক্তিধর ঈশ্বরের প্রসাদপুষ্ঠ ব্যক্তি বলে মানি। বাহ্যত ও কার্যত এরা রক্ষণশীল, এরা অনেকটা রোবটের মতোই, এদের ত্যাগ, কৃপা, করুণা, দয়া-দাক্ষিণ্য, পরার্থপরতা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ সবটাই আন্তরিকভাবে শাস্ত্রনির্দিষ্ট নিয়মে সীমিত ও পার্বনিক, এর সঙ্গে হৃদয়াবেগের সম্পর্ক থাকে না। দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের সযত্ন প্রয়াস থাকে মাত্র। মর্ত্যজীবনকে এরা তুচ্ছ বলে মানে, পারত্রিক জীবনের সুখ স্বস্তির নিশ্চিত লক্ষ্যেই এদের জাগ্রত মুহূর্তগুলোর ভাব-চিন্তা-কর্ম-আচরণ নিয়ন্ত্রিত। অবশ্য রক্ত-মাংসের মানুষের প্রানিসুলভ প্রাকৃতিক ভোগবাঞ্ছা অন্তরে কতটুকু সংযত ও নিষ্ক্রিয় নিবৃত্ত থাকে, তা জানা বোঝা অন্যের পক্ষে সম্ভব নয়। তবু আমরা ধরে নিই যে প্রবৃত্তিকে এরা প্রশ্রয় দেয় না, নৈবৃত্তিক গুরুত্ব দিয়ে সংযমসাধনায় এরা সিদ্ধ মানুষ। এরা নিঃসন্দেহে সজ্জন, তবে অনুদার এবং কিঞ্চিৎ ও ক্বচিৎ অসহিষ্ণু।  আর মৌলবাদী তিনি যিনি সঠিক অর্থে বা ভাববাদী নিরিখে ধার্মিক ননএনারা ঠিক আচার-আচরণে মর্ত্যজীবনে বিমুখ নন। তারা আদর্শ হিসাবে শাস্ত্রকেই পার্থিব জীবনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে সমাজে-সরকারে শাসনে-প্রশাসনে-আইনে-কানুনে নীতি-নিয়মে স্বীকৃত রাখতে চায় মাত্র। এর মধ্যে একটা স্বধর্মের, স্বশাস্ত্রের, স্বসমাজের, ও স্বসংস্কৃতির অভিমান এবং গুণ-গৌরববোধ কাজ করে। এ হচ্ছে একটা আদর্শিক ও নৈতিক সাধারণ স্বীকৃতি মাত্র, লাভ- লোভ-স্বার্থের ক্ষেত্রে, ভোগ-উপভোগ-সম্ভোগের ক্ষেত্রে, মর্ত্যজীবনের নানা কালিক, দৈশিক, আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এ সব আদর্শিক- নৈতিক নীতিনিয়ম যে উপেক্ষা বা লঙ্ঘন করা যায় না-করবে না, তা নয়। এ তাৎপর্যে  মৌলবাদী গোঁড়া রক্ষণশীল নয়। ইনি  স্বাশাস্ত্রিক স্বাজাতিক গৌরবগর্বী মাত্র। ইনি   বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রের সমাজপ্রগতির ইতিবাচক বস্তুগত , মানবিক, সমকালীন বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা, উদারবাদী ধ্যানধারণা “নির্লিপ্তে” ও সচেতন ভাবেই এড়িয়ে চলেন,  কিন্ত  নিজের সত্তাকে সেই “মূলের” মধ্যেই আচ্ছাদন করে  রাখেন নিজের “বস্তুগত” স্বার্থস্বীদ্ধির তাগিদেই। তাই তিনি মৌলবাদী কারণ সেই “মূল” কেই তিনি ধারণ করে রাখেন যেমন যিশু-বুদ্ধ-মহম্মদ-রাম এর অনুগামীরা নরহত্যা করে, যুদ্ধ করে। কেননা রাজাদের জরে-জুলুমে পররাজ্য কাড়ায় পাপ আছে বলে কোন শাস্ত্র বলে না- কাজেই শাহ-সামন্তের নরহত্যায় অবাধ অধিকার আছে।  কোনো সমাজের উৎপাদনী সম্পর্কের পরিধিতে এই মৌলবাদী শ্রেণী , ধর্মের রীতিনীতির আবরনের মাধ্যমেই রাষ্ট্র যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করেন, সেই সব রীতিনীতির সাহায্যে যা কোনো অতীত সমাজব্যাবস্থায় প্রাসঙ্গিক ,  কোনো অংশে বৈপ্লবিক ছিলো  কিন্ত  মানব সমাজ প্রগতির ধারায় এইসব রীতিনীতি রেওয়াজ  কিয়দংশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় এবং প্রগতির প্রতিবন্ধক হিসেবে অনেকাংশে  প্রতিভাত হয় 








No comments:

Post a Comment