Sunday, 26 January 2014

সজ্ঞ্যার্থে ধর্মনিরপেক্ষতা (সেকুলারিজম) , সমাজ অগ্রগতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রয়োজনিতা।


আমাদের দেশের সংবিধান প্রণেতারা গণপরিষদে ধর্মীয়, গোষ্টীক, জাতিক, ভাষিক, আঞ্চলিক নানান ভিন্নতার উপাদান নিয়ে বহুত্ববাদের  এক মহার্ঘ আদর্শের ভিত্তির ওপর সংবিধান রচণা করেছিলেন।  অভিন্নতার মধ্যে ঐক্যবদ্ধ জাতিগঠনের মহান অভিপ্রায় প্রতিভাত হয় আমাদের সংবিধানে।  কিন্ত  দুঃখের বিষয় যে সমকালীন দেশের রাজনীতিতে কিছু উগ্র দক্ষিণপন্থী মৌলবাদী রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সংবিধানে প্রণীত ধর্মনিরপেক্ষতার এই মহান উপাদানের কার্যকারিতাকে বিকৃত করার প্রয়াসে,  আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়াছে। ধর্মনিরপেক্ষতাকে হিন্দুত্বের মোড়কে জনমনে প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ধর্মনিরপেক্ষতার এই মহান আদর্শকে বিদ্রূপের, হেয় এবং ঠাট্টার (Pseudo-secularism) লক্ষ্যবস্তু হিসেবে প্রচারিত হচ্ছে অনবরত।
গোষ্ঠী, গোত্র, বর্ণ, ধর্ম, ভাষা, নিবাস নিয়ে স্বাতন্ত্র্যচেতনা গড়ে উঠেছিল আদি ও আদিম অসহায় মানুষের যুথবদ্ধ হয়ে পারস্পরিক সহযোগিতায়  স্বনির্ভরতায় সহঅবস্থানের জৈবিক গরজে। শিল্পবিপ্লব এবং তার প্রধান চালিকাশক্তি বিজ্ঞানের নতুন নতুন উদ্ভাবনের আগে মানুষের অবস্থানের ও অবস্থার আবর্তনই ছিল, বিবর্তন ও পরিবর্তন ছিল ক্বচিৎ এবং মন্থর আর তা ছিল অসামান্য মগজী লোকের নতুন চেতনার, চিন্তার, উদ্ভাবনের, আবিস্কারের ও নির্মাণ প্রসূত, যদিও তৎকালীন সামাজিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি  হিশেবে সেই উপাদানগুলি ছিল অপ্রতুল। এমনি সমাজে ছিল জাতি, ধর্ম, অঞ্চল ও ভাষা- এর স্বাতন্ত্র্যের গুরুত্ব। ছিল স্বাতন্ত্র্যে, পার্থক্যে ও বৈপরীত্যেই অস্তিত্বের নিরাপত্তা। যোগাযোগের আদিম ব্যবস্থায়, সমুদ্র-পর্বত-অরন্য ছিল অলঙ্ঘ্য দুর্লঙঘ্য। কাজেই সামান্য দুরত্বের ব্যবধানেও এক একটি কৌম- গোষ্ঠী- গোত্রকে আদিম সীমিত পরিসরে স্ব-উদ্ভাবিত আদিম উৎপাদনের  হাতিয়ার, ভাষা, যুথবদ্ধ জীবন যাপনের গরজে নীতিনিয়ম, রীতিপদ্ধতি , উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করতে হয়েছে তাঁদের জাগ্রত জীবনের আচার ও আচরণে। স্থানগত উর্বরতার, ভৌগলিক বৈচিত্রের  দরুন জীবিকাপদ্ধতির ও জীবিকার উপকরণের ধরণ বিভিন্ন হয়। এভাবেই গোটা পৃথিবীর সর্বত্র এক সময়ে দুরধিগম্যতাজাত বিচ্ছিন্নতার ব্যবধান, অপরিচয়ের ও অননুকৃতির ফলে আঞ্চলিক ও গৌত্রিক ভাবে মানুষের স্থানিক অবস্থানে স্ব স্ব ভাষা, উৎপাদনের হাতিয়ার, নীতিনিয়ম তথা নীতি-আদর্শ শাস্ত্র নামে নীতিশাস্ত্র এবং জীবিকা-পদ্ধতি যেমন স্বাতন্ত্র্য বা পৃথকভাবে গড়ে উঠেছে, তেমনি সামগ্রীক, সামূহিক ও সামাজিক জীবনচেতনায় ও জগতভাবনায় ও লৌকিক ও স্থানিক বৈশিষ্ঠ্য, স্বাতন্ত্র্য, পার্থক্য, বৈপরীত্য প্রকট হয়ে উঠেছে কালক্রমে। একালে যা জাত, জন্ম, বর্ণ, ধর্ম, ভাষা, নীতিনিয়ম, রীতিরেওয়াজ, প্রথাপদ্ধতি, পালা-পর্বণ, আচার-আচরণ, খাদ্য, পোশাকআশাক, রুচি-সংস্কৃতি, জগত-জীবন সম্বন্ধে বিশ্বাস সংস্কার-ধারণা রূপে বিস্তর ব্যবধান ও বৈচিত্র সৃষ্টি করেছে মানুষে মানুষে এবং বিজ্ঞানের ও বিজ্ঞানীর বদৌলত সৃষ্ট এ যন্ত্রযুগে, যন্ত্রজগতে ও তথ্যপ্রযুক্তির অকল্পনীয় ও  অপ্রতিরোধ্য প্রগতির যুগে আর এ যন্ত্রনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রতথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর ব্যক্তিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক তথা ইহজীবনেও আমরা বিদ্যায় বিত্তে বেসাতে ঋদ্ধ, পুষ্ট ও হ্রষ্ট হয়েও সেই অজ্ঞতার, অসামর্থ্যের, বিচ্ছিন্নতার, অপরিচয়ের ব্যবধানের কালের স্বাতন্ত্র্য, পার্থক্য ও বৈপরীত্য সযত্নে লালনে বজায় রাখতে প্রয়াসী।  এ ক্ষেত্রে মনোভাবের দিক দিয়ে আমরা দ্বিধাবিভক্ত। একদল উন্মত্ত, অন্যদল অধম্মন্য। একদল ঘৃণায়, অবজ্ঞায়, উন্নাসিকতায় আত্মশ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার গরজবোধে, অন্যদল ঈর্ষায়, অসুয়ায়, আত্মগ্লানির যন্ত্রণায় অস্তিত্ব বিলুপ্তির আশঙ্কায় গ্রহণ বিমুখ স্বভাব প্রবনতায় স্বাতন্ত্র্যধর্মী। ফলে পৃথিবীর কোথাও মানুষ আজো বৈশ্বিক ও আন্তজার্তিক স্তরে নিজেদের কেবল মানুষ রূপে এবং অন্যদের যোগ্যতা-বর্ণ-ভাষা-নিবাস-জীবন-চেতনা নির্বিশেষে মানুষে হিশেবে জানতে , বুঝতে ও মানতে চায় না। দেশ - কাল – প্রজন্মের দাবি অস্বীকার করে, অতীত  ঐতিহ্যমুখী হয়ে ব্যক্তি, পরিবার, সম্প্রদায়, জাতি, সমাজ, রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না সমকালী হয়ে। ঐতিহ্যমুখীনতার দৈন্যতার পরিনাম আগেই আলোচিত হয়েছে। একালে মনে-মগজে-মর্মে-মননে-মনীষায় নতুন চেতনা-চিন্তা সৃজনে এবং গবেষণায়, আবিস্কারে-উদ্ভাবনে, নির্মানে – সৃষ্টিতে আর বৈচিত্র, বহুতত্ববাদের সম্মেলন  সাধনে নিত্য উন্মেষশীল, বিকাশশীল ও উতকর্ষপ্রবণ থাকাতেই নিহিত বাঁচার সার্থকতা এবং প্রগতির পূর্বশর্ত। কালোপযোগী হয়ে সুষ্ঠুভাবে সমাজের ও রাষ্ট্রের প্রতিবেশে আর বৈশ্বিক ও আন্তজার্তিক স্তরে টিকে থাকার, সার্থক জীবনযাত্রার ও জীবনযাপনের লক্ষ্য হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কারণ এখণ আসমুদ্র-হিমাচল-অরন্যের জ্ঞান অর্জনে মানুষ দিন কে দিন এগিয়ে যাচ্ছে, মহাকাশ কে নিয়ে মানুষের জিজ্ঞাসা ও সন্ধিৎসার বিষয়, জন্ম-জীবন-মৃত্যু তত্ত্বও এখন জানা এবং মানুষ জীব- জীবনও স্রষ্টা, জিন বা কোষ- ক্লোন জ্ঞান মানুষকে অশেষ জ্ঞানের ও শক্তির অধিকারী করবে অচিরে। সৃষ্টিতত্ত্বের আদিম ও মধ্যযুগীয় মতাদর্শ খারিজ হয়ে যাচ্ছে আয়ন্টি-ম্যাটার আবিস্কারে। হিগস-বোসনের তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে মানুষ নতুন ভাবে পুনর্মূল্যায়ণ করছে তাঁর নিজের  অস্তিত্বের সুত্র। নতুন নতুন প্রযুক্তি, যন্ত্র আর বিজ্ঞানের তথা প্রকৃতির তত্ত্ব, তথ্য, সত্য ও সম্পদ মানুষকে করবে অমিত শক্তিধর জীবন ও জগত-নিয়ন্তা নিয়ামক।  অতহেব, একালে ব্যক্তিচিত্তে বৈশ্বিক ও আন্তজার্তিক নাগরিক চেতনা প্রত্যাশিত। আমরা জাত জন্ম বর্ণ ধর্ম ভাষা নিবাস যোগ্যতা প্রভৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও এক অভিন্ন আঙ্গিক ও মগজী সংস্কৃতির বরণে ও অনুশীলনের পক্ষপাতী; আমাদের মানব প্রজাতির সবার মধ্যেই অভিন্ন উৎকৃষ্ট মানবিক গুনের, মনুষ্যত্বের, মানবতার ও মানববাদিতার উন্মেষ বিকাশ ও উতকর্ষ ঘটানোর লক্ষ্যে। তাহলে দেশে-রাষ্ট্রে-সমাজে ও জীবিকাক্ষেত্রে মানুষ হবে সেকুলার।
ধর্মনিরপেক্ষতা, ইহজাগতিকতা, বিভিন্ন শাস্ত্রিক সম্প্রদায়ের সংযমে-সহিষ্ণুতায় –সৌজন্যে নির্বিরোধে প্রতিবেশীরুপে বসবাস প্রভৃতি কোনটাই সেকুলারিজমকে স্বরূপ জানার, বোঝার ও মানার সহায়ক হয় না। ঐহিক জীবনবাদে কিংবা মর্ত্যজীবনবাদে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন জাত জন্ম বর্ণ ভাষা নিবাস পেশার লোক অধ্যুষিত আধুনিক গনতান্ত্রীক বা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক নির্বিশেষকে কেবল প্রানীর মানবপ্রজাতিরুপে দেখা-জানা- বোঝা ও যথাযোগ্য সুযোগসুবিধে দেয়াই জীবনজীবিকার সর্বক্ষেত্রে  সেকুলারিজমের মর্মকথা। অতএব সেকুলারিজম স্বরূপে কেবল ‘মানুষ’ পরিচিতই স্বীকার করে। ব্যক্তির, গোষ্টীর, গোত্রের, সম্প্রদায়ের শাস্ত্রিক বিশ্বাস-সংস্কার-ধারণার – আচারের-আচরণের – পার্বণের স্বাতন্ত্র ও অস্তিত্ব, ভাষার পার্থক্য আঞ্চলিক বা নৈবাসিক ব্যবধান সেকুলার রাষ্ট্র বা সরকার স্বীকার করে না। সেকুলার রাষ্ট্র বা সরকার নাগরিক নির্বিশেষের মর্ত্যজীবন- জীবীকার সর্বপ্রকার চাহিদা মেটানো ও সাচ্ছল্য-স্বাচ্ছন্দ্য উন্নয়ন লক্ষ্যেই কাজ করে। প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার এবং প্রতিটি মানুষকে কাজ দিয়ে বা ভাতা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে সরকারের তথা রাষ্ট্রের। আস্তিক মানুষের শাস্ত্রিক বিশ্বাস- সংস্কার-ধারণা, আচার-আচরণ-পার্বণ প্রভৃতি ব্যক্তিক, পারিবারিক কিংবা গোষ্টিক- গৌত্রিক বিষয়রুপেই সরকার জানবে।  কিন্ত  লেখকের মতে সমাজজীবনে এসবের প্রাধান্য রাষ্ট্র বা সরকার স্বীকারই করবে না। এই বিষয়ে মার্কসবাদী তাত্ত্বিক লেনিনের এর বক্তব্য, ‘ধর্ম নিয়ে রাষ্ট্রের কোন গরজ থাকা চলবে না এবং ধর্মীয় সংস্থাসমূহের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত হওয়া চলবে না। যেকোন ধর্মে বিশ্বাস অথবা কোন ধর্মই না মানায় ( অর্থাৎ নাস্তিক হওয়া- যেমন প্রতিটি সমাজতন্ত্রী) সকলেই থাকবে সম্পূর্ণ স্বাধীন। ধর্মবিশ্বাসের জন্য নাগরিকদের অধিকারে কোন প্রকার বৈষম্য কোনক্রমেই সহ্য করা হবে না। এমনকি সরকারি নথিপত্রে যেকোন নাগরিকদের ধর্মের উল্লেখমাত্র প্রশ্নাতীতভাবে বর্জিত হবে। রাষ্ট্রানুমোদিত গির্জাকে কোন অর্থ-মঞ্জুরি অথবা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক সংস্থাকে কোন প্রকার সরকারী বৃত্তিদান করা চলবে না।  এগুলোকে হতে হবে সমমনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ স্বাধীন, সরকারী সংশ্রব – বর্জিত প্রতিষ্টান’। সাবেক সোভিয়েত কিভাবে লেনিনের এই মহান সুত্রকে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম প্রভৃতি গোষ্টি ও সম্প্রদায়কে কে নিয়ে সাত দশকের ওপর যে সঙ্ঘবদ্ধ জাতি-ধর্ম বৈরতা বিহীন পরিমণ্ডল স্থাপন করেছিল তার জাজ্জল্যকর  উদাহারণ সোভিয়েত বিরোধীরাও অস্বীকার করতে পারবে না।  

যাইহোক বূর্জোয়া উদারনৈতিক গনতান্ত্রীক রাষ্ট্রেরেরও  দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকমাত্রকেই মানুষকে কিংবা ব্যক্তিমানুষমাত্রকেই শুধু নাগরিক বলেই জানা এবং তার মর্ত্যজীবনের প্রয়োজন মেটানো। সরকার পূজো, ঈদ বা পার্বণের ছুটি দেবে শ্রমিক-কর্মচারীদের যেমন দেয় বিয়ের জন্য, মৃতের সতকারের-শ্রাদ্ধের জন্যে ব্যক্তিকে।  কাজেই আস্তিক মানুষের শাস্ত্রিক বিশ্বাস ও জীবন হবে ব্যক্তিক ও স্বসম্প্রদায়ে সামাজিক সীমায় নিবদ্ধ। অতএব যথার্থ তাতপর্যে সেকুলারিজম স্বরূপে হবে জাত-জন্ম-বর্ণ-ধর্ম-ভাষা-নিবাস-পেশাজাত পার্থক্যের, বৈচিত্রের ও স্বাতন্ত্র্যের এবং শাস্ত্রের ও আস্তিক্যের স্থিতি বা অস্তিত্ব রাষ্ট্রিক বা সরকারী স্তরে অস্বীকৃতি।
সমাজ পরিবর্তনের জন্যে মন-মানসিকতার পরিবর্তন আব্যশ্যিক। কারণ নতুন তত্ত্ব, তথ্য ও সত্য গ্রহণ-বরণের জন্যে পুরোনো বিশ্বাস-সংস্কার-ধারণা, নীতি-নিয়ম, রীতি-রেওয়াজ, বিধি – নিষেধ, প্রথা- পদ্ধতি, ন্যায়- নীতি সম্যক ধারণা বর্জন করে মনে-মগজে-মননে ঠাঁই শূন্য করা প্রয়োজনযেমন নতুন পত্রের জন্যে বৃক্ষ-লতা পুরোনো পাতা বর্জন করে, যেগুলো আগে ওঐ বৃক্ষের জন্যে খাদ্য সংগ্রহ এবং প্রস্তুত করতো। বৃদ্ধি পেতে গেলে, এগিয়ে যেতে হলে পুরোনোকে পরিহার করতেই হয়, নইলে জীবন বাড় পায় না, গতি পায় না, অভীষ্ট সিদ্ধ হয় না। প্রগতি এবং অগ্রগতির নিরিখে আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে আমাদের আশৈশব শ্রুত, দৃষ্ট, লব্ধ, অভ্যস্ত, লালিত বিশ্বাষ- সংস্কার-ধারণা, ভয়-ভক্তি-ভরসা, লাভ- লোভ-স্বার্থবোধ পরিহার করার সচেতন সযত্ন প্রয়াস বা অনুশীলনে নিষ্ঠ হওয়া। সূর্য্যের নৈকট্য ও দূরত্বই জীব-উদ্ভিদ জগতে বৈচিত্র সৃষ্টি করেছে, একেই বলে এক পরিধির মধ্যে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য। জল- মাটি-বায়ু-মাটি-তাপের তারতম্যই বৈচিত্রের কারণ, বিনা কারণে কোনো কার্য্য হয় না। মানুষ যেহেতু প্রকৃতির অংশ, প্রকৃতিকে পরিবর্তন করেও নিজে পরিবর্তিত হয়, মানুষও এই নিয়মের রাজ্বত্বের বহির্ভূত নয়আমাদীর বিজ্ঞানমনস্ক হতেই হবে। বিজ্ঞানের তত্ত্বে, তথ্যে ও সত্যে আস্থা রাখা দরকার। বিজ্ঞানীর আবিস্কার, উদ্ভাবন, সৃষ্টি, প্রমাণিত ও প্রমানসম্ভব জ্ঞান-আন্দাজ-অনুমান-ধারণা প্রভৃতির মতো প্রাতিভাসিক সত্য ও তথ্য নয়। বিজ্ঞানলব্ধ জ্ঞান অসম্পূর্ণ হতে পারে,  কিন্ত  মিথ্যা বা ভিত্তিহীন নয়। জাগতিক জ্ঞান আপেক্ষিক  কিন্ত  দন্দ্ব সবসময় চিরসত্যে বিরাজমান। মানুষকে জাত জন্ম বর্ন ধর্ম ভাষা নিবাস যোগ্যতা নির্বিশেষে কেবল মানুষরূপে জানতে, মানতে ও গ্রহণ করতে হবে। এই অনিবার্য পুর্বশর্ত মানলেই এবং প্রয়োগ পদ্ধতির দ্বারাই আমাদের মানবিক গুনের তথা মনুষ্যত্বের বিকাশ, উতকর্ষ এবং প্রয়োগ ব্যক্তিক জীবনে, সমাজে, সরকারে ও রাষ্ট্রে সম্ভব। এবং বৈশ্বিক – আন্তজার্তিক ক্ষেত্রেও মানুষে মানুষে ভেদ ঘুচে যেতে পারবে এই চেতনার উন্মেষে, বিকাশে ও সংরক্ষণে। আমরা সহজেই হতে পারব মনে-মর্মে-ভাব-চিন্তা-কর্ম-আচরণে যথার্থ সেকুলার। মানুষের প্রথম ও শেষ পরিচয়, সে মানুষ। আমাদের মানতেই হবে যে মর্ত্যজীবনই বাস্তব ও প্রত্যক্ষ। কাজেই আমামদের পক্ষে সেকুলার চিন্তা- চেতনাকে ও কর্ম-আচরণকেই কল্যানের জন্যেই গুরুত্ব দেয়া আমাদের ব্যক্তিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রিক জীবনে-প্রশাসনে আবশ্যিক ও জরুরী। কেননা জীবনের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ ও জীবন নয়, তেমনি মানুষের জীবনের জন্যে রাজনীতি, রাজনীতির জন্যে মানুষ নয়, তেমনি ধর্মের জন্যেও রাজনীতি নয়, রাজনীতির জন্যেও ধর্ম নয়। তাহলেই সরকার, রাষ্ট্র ও রাজনীতিকরা নিবদ্ধ থাকবে মানুষের মর্ত্য জীবনের, পার্থিব জীবনের চাহিদা, সঙ্কট- মোকাবিলা ও সমস্যা প্রভৃতিতে। সরকার তো মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান প্রভৃতি বিষয়ের চাহিদা মেটানোর দায়িত্বেই নিযুক্ত থাকার কথা। লোকের পরলৌকিক জীবনের সুব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য হতে পারে না। আধুনিক উদারনৈতিক ধনতান্ত্রীক রাষ্ট্র কমবেশী গনমানবের অধিকার স্বীকার করে। আর গনমানবেরা সাধারণত বিভিন্ন ধর্মের ও মতবাদী সম্প্রদায়ের হয়ে থাকে। কাজেই সরকারের পক্ষে সব ধর্মশাস্ত্রে বিশ্বাসীদের ঐহিক ও পারত্রিক উপকার একাধারে ও যুগপৎ করা অসম্ভব। এ জন্যেই গনতান্ত্রীক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সেকুলার হওয়াই বাঞ্ছনীয়। আধুনিক  রাজনীতি হচ্ছে বাস্তব জীবন ও জীবিকা সম্পৃত। পার্থিব জীবনের লাভ-ক্ষতি, আয়-উন্নতি, গনমানুষের জীবনের নানা চাহিদা-সরবরাহ সম্পৃত কাজই সরকারী ও রাষ্ট্রীক দায়িত্বের ও কর্তব্যের বিষয়।  এখানে শাস্ত্রীয় বিধি-বিধানের স্থান নেই। ধর্মবিশ্বাস থাকবে ব্যক্তির মনে ও মুখে, মর্মে, আচার ও আচরণে, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে। কাজেই আধুনিক যুগের রাজনীতি নিতান্ত মাটিলগ্ন মর্ত্যের বিষয়, আর ধর্ম হচ্ছে ইহ-পরলোকে প্রসূত জীবনের কল্যাণ সম্পৃত। তার স্থান ভাত-কাপড়, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, লাভ- লোভ-স্বার্থ- জীবিকা সম্পৃত্ত হতেই পারে না। কেননা সব ধর্মশাস্ত্রের বিধি- নিষেধ একরকম নয়।


No comments:

Post a Comment