Friday, 24 January 2014

গরু নিয়ে রাজনীতি

গরু নিয়ে রাজনীতি শুরু হয় স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই। ১৮৮২ সালে আর্য সমাজ প্রতিষ্টাতা দয়ানন্দ সরস্বতী জো-রক্ষার জন্যে সমিতি গঠন করেন। এরপর অসংখ্য গো-রক্ষা সমিতি তৈরি হয়। কংগ্রেসের প্রভাবশালী একটা অংশ  এবং অনেক দেশীয় রাজ্যের হিন্দু মহারাজেরা এর পৃষ্টপোষকতা করেন। ১৮৯৩ সালেই প্রথম গো-রক্ষার প্রশ্ন নিয়ে উত্তরপ্রদেশের পূর্ব্বভাগে আগুন জ্বলে ওঠে। ঐ বছর জুলাই মাসে বকর – ঈদ-এর সময়ে গাজিপুর ও বালিয়া জেলায় মুসলিমরা আক্রান্ত হন। গোটা এলাকা জুড়ে দাঙ্গা হয়, গোরখপুরের কমিশনার এম আই কেরার রিপোর্টে দেখা যায় “মুসলিমরা হিন্দুদের দয়ার ভিখারী হয়ে পড়ে। বহূ ক্ষেত্রে তারা গো-হত্যা করবে না এমন লিখিত প্রতিশ্রুতি (কোয়ামনামা) দিতে হয়। ভারতে প্রথম এতবড় দাঙ্গা হলো। ১৯১৭ সালে উত্তরপ্রদেশে ও বিহারের দাঙ্গা আরও খারাপ চেহারা নেয়। সবথেকে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলো বিহারের শাবাদ জেলায়। ৩০ হাজারের এক উন্মত্ত জনতা মুসলিম নিধন ও  সম্পত্তি  লুঠে মেতে উঠল। রিপোর্টে দেখা যায়, দাঙ্গায় অংশগ্রহনকারীরা উঁচু জাতের মানুষ- ব্রাহ্মণ , রাজপুত আর ভূমিহারা সম্প্রদায়। স্বাধিনতার পরও গরু নিয়ে কম গোলমাল হয়নি। মন্দিরে গরুর মাংস ছুঁড়ে কিংবা মসজিদে শুয়োরের মাংস ছুঁড়ে দুষ্কৃতিরা দাঙ্গার বাতাবরণ তৈরি করেছে। গরুকে কেন্দ্র করে সারা পৃথিবীর কাছে আমরা হাস্যাস্পদ হয়ে গেছি। এখানে মানুষের চেয়ে গরু অনেক মূল্যবান।  ধর্মীয় বিধানে এমন কিছু যজ্ঞ আছে যা করতে হলে পঞ্চগব্য খেয়ে পবিত্র হতে হবে।  বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারতের জয়লাভের জন্য সেই সময়ে কলকাতা শহরে কিছু কিছু যুবক যজ্ঞ করেছিলেন। যজ্ঞ্যের অবর্থ ফল পেতে হলে যজ্ঞকারীদের পঞ্চগব্য ভক্ষণ করতে হয়। পঞ্চগব্য হল গরুজাত পাঁচটা দ্রব্য। দই, দুধ, ঘি, গোবর এবং গো-মুত্র। যজ্ঞকারীরা তা জানতেন কিনা জানা নেই। জানলেও সম্ভবত ভক্ষণ করেননি, না হলে ফল উলটো হল কেন? আমাদের ধর্মগুরুরা জানাচ্ছেন, গো-মূত্রের মধ্যে নাকি মা গঙ্গা বসবাস করেন অবশ্য এখন গঙ্গাজল আর আর গোমূত্র কোনটা দূষিত তা নিয়ে কিঞ্চিৎ গবেষণা করাই যেতে পারে। গোবরের নাকি অনেক গূণ। কলেরা, প্লেগ নিরাময় করতে পারে আর সাপ কিংবা কাঁকড়া বিছের কামড়ের অবর্থ্য ওষুধ। গোবর যদি কলেরা, প্লেগের ওষুধ হয়, তবে কেন গ্রামবাংলায় অতীতে কলেরায় গ্রামের পর গ্রাম উজার হয়ে যেত, কেনই বা প্লেগ একবার মহামারীর আকার নিয়েছিল?  তখন তো আর দেশে গোবরের অভাব ছিলো না। কেনই বা সাপের কামড়ে প্রতি বছর এত লোক মারা যায়, হাতের কাছে কি গোবর মেলে না?  এখন আবার গো-মাতার পুত্ররা এমন কথা বলতে শুরু করেছেন, যুদ্ধের সময় যদি বাড়িতে বোমা পড়ে তবে বাড়ীটাও অক্ষত থাকবে, তবে একটা শর্তে যদি বাড়িটা গোবর দিয়ে তৈরি হয় (Outlook March, 10-2003)   পাকিস্তানের হাতে যখন পারমানবিক বোমা আছে তখন ত আমাদের বি জে পি র সাংসদ মন্ত্রিদের উচিত ম্লেচ্ছ প্রযুক্তি তে তৈরি প্রাসাদপ্রমান বাড়ীতে না থেকে গোবরের তৈরি বাড়ীতে থাকার---- মন্ত্রী-সান্রীদের ত একটা নিরাপত্তার ব্যাপার আছে কি না।  বি জে পি শাসন কালে মানব সম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের রথী মহারথীরা এক নতুন আবিস্কার করেছিলেন – ‘গো-হত্যার জন্যই নাকি ভূমিকম্প হচ্ছে”। যে বিজ্ঞানী এমন যুগান্তকারী আবিস্কার করেছেন, তিনি “ভারতীয়  গো-রক্ষণ সংবর্ধন পরিষদের একজন কর্মকর্তা। তাঁর লিখিত পুস্তিকায় ( গো-মাংস, আত্মরক্ষা, রাষ্ট্ররক্ষা – একটি তথ্যভিত্তিক বৈজ্ঞ্যানিক বিবর্তন) এমন সুভাষিতাবলি লিপিবদ্ধ করেছেন।  মিত্তাল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের এক অজানা গবেষণাপত্র থেকেয় উদ্ধৃতি দিয়েছেন---- “যখন মা বসুন্ধরা দেখেন তাঁর সন্তানদের (গরু) নির্মম্ভাবে খুন করা হচ্ছে, তখুন তিনি তীব্র যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে ছটফট করে ওঠেন। ওটাই হলো ভূমিকম্প।  এই নিরিখে  কিন্ত  একটা বিষয় সহজবোধ্য হল না, পশ্চিমবঙ্গে বা অনেক রাজ্জ্যে গো-হত্যা হলে সেখানে ভূমিকম্প না হয়ে গুজরাট, মহারাষ্ট্র বা উত্তরপ্রদেশের উত্তরকাশী, উত্তরাখণ্ডে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা ভূমিকম্প হয় কেন? যেখানে গো-হত্যা সমাজ বিরুদ্ধ কাজ। কেনই বা কেরল, বা বাংলায় হয় না? বাংলাদেশে এত গরুহত্যা হয়, আরব দেশের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম,  ভূমিকম্প সেখানে হয় না কেন?  পৃথিবী গরু মাতা  এ দাবী না হয় মানা গেল,  কিন্ত  পৃথিবী মানুষের ও তো মা। তাহলে আমেরিকা, আফগানিস্তান , লিবিয়া, ইরাকে এত লোক মেরে ফেলল, মা  বসুন্ধরা একটুও যন্ত্রণা পেলেন না কেন ? একটুও নড়াচড়া করলেন না কেন? আমরা চাই না যে তা হোক,  কিন্ত  বিজ্ঞানের নিয়মে তা হলে আমেরিকায় ভূমিকম্প হয় না কেন? মা ধরিত্রীর তাহলে কি মানুষের চেয়ে গরু বেশী মূল্যবান? 

No comments:

Post a Comment