Friday, 24 January 2014

ধর্ম ও রাজণিতিঃ দেশ ভাগের প্রেক্ষাপটে কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, মুসলিম লীগ ও কম্যুনিস্ট পার্টির অবস্থান।

ইতিহাসকে জার্মাণ দার্শনিক হেগেল (Hegel) তিনভাগে ভাগ করেছেন মৌলিক ইতিহাস (Original History), ভাবমূলক ইতিহাস (Reflecting History) এবং দার্শনিক ইতিহাস (Philosophical History)মৌলিক ইতিহাস হিসাবে হেগেল চিহ্নিত করেছেন গ্রিক ইতিহাসবিদ হিরোটাস বা থুকুডিডিসদের।  আমাদের স্বাধীনত্তর দেশে বিভিন্ন সময়ে সভা, সমিতি , আলোচনাচক্রে  এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যে দেশভাগের দায় মুসলিম লিগ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবনতা দেখা যায়। এই প্রবনতা আজও বিদ্যমান এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষ্য রোপণের উর্বর জমি তৈরি করে। আমরা প্রধানত মৌলিক ইতিহাসের নিরিখে ঐতিহাসিক দলিল ও প্রামানিক তথ্যাদি এবং চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে দেশ ভাগ কেন্দ্র করে  বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘটনের ভূমিকা আলোচনা করবো।
জার্মানির বার্লিনে রাইখষ্ট্যাগের মাথায় রক্তপতাকা উত্তোলন করছে লালফৌজ  
রাজপথে আজ যেন লাল –এর ঢল নেমেছে। রক্তপতাকার ঢেউ তুলে কাতারে কাতারে চলেছে উদ্বেল মানুষ। তাদের মাথার ওপর যদিও অগ্নিবর্ষী আকাশ আর পায়ের নীচে গলন্ত পিচের করাল উত্তাপ এবং জ্বলন্ত রোদে সেদিন কলকাতা ঝলসে যাচ্ছে কিন্ত  তাতে কি আসে যায়; বার্লিনের উপর উড়ছে লাল পতাকা। ফ্যাসিস্ট ঔদ্ধত্যের প্রধান ঘাঁটি চুর্ণ। আজ উৎসবের দিন- বার্লিন বিজয় উৎসব। তাই রুদ্র বৈশাখের গলে-পড়া সূর্য্য ও তাদের উদ্দীপনার কাছে নিষ্প্রভ। সে দিনটা ছিল ৪ ঠা মে, ১৯৪৫। বিভীষিকার কালরাত্রি শেষ। ১ মে লালফৌজ বার্লিন জয় করেছে-উড়িয়ে দিয়েছে রাইখস্টাগের মাথায় লাল পতাকা। ফ্যাসিবাদের হিংস্র থাবা থেকে লালফৌজ ছিনিয়ে নিয়েছে মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সভ্যতা ও সংস্কৃতি। ইউরোপের ঘরে ঘরে তাই মুক্তির শিহরণ। স্বস্তির আমেজে ভরপুর বিশ্বের প্রতিটি দেশের মানুষ। মানবইতিহাসে এই পরম লগনের প্রতীক্ষায় এদেশের কমিউনিস্টরাও এতকাল প্রহর গুনেছে। কমিউনিস্টদের কাছে স্বদেশ ও পৃথিবী একাকার। ফ্যাসিবাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ঘনিয়ে আসবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অন্তিমকাল আর ত্বরান্বিত হবে ভারতের মুক্তি- এই বিশ্বাসে কমিউনিস্টরা অবিচল এবং তাঁর ভিত্তিতেই অনুসিধান্ত ঃ

‘ভারতের জাতীয় স্বাধীনতার একমাত্র সংগ্রাম আজ ফ্যাসিস্ট-বিরোধী সংগ্রাম। স্বাধীনতা যুদ্ধ আজ সামগ্রিক জনযুদ্ধ’ । ফ্যাসিজিমের পতনের সঙ্গে সঙ্গে তাই আজ নতুন যগের অভ্যুদয়; মানব মুক্তির সিঙ্ঘদুয়ার অর্গলমুক্ত। স্বদেশের বন্ধনমুক্তির আর দেরি নেই। তাই বিশ্বজনীন আবেগোচ্ছাসের শরিক এই দেশের কমিউনিস্টরাও। পতাকা, ফেস্টুন, পোস্টার আর কার্টুনের সমারোহে তারা পার্টির ডাকে আজ হাজারে হাজারে সামিল এই উৎসব -মিছিলে! পার্টির বাংলা সাপ্তাহিক মুখপাত্র ‘জনযুদ্ধ’র প্রতিবেদকের লিখছেন ঃ ‘ওয়েলিংটন স্কোয়ার। শহরতলীয় দূর-দূরান্ত হইতে মজুররা আসিয়া হাজির হইয়াছে। হাজিনগর, মেটেবুরুজ, গৌরীপুর, ঘুসুড়ি, শিবপুর, কাশিপুর, আলমবাজার, পানিহাটি, বেলঘরিয়া, বজবজ, শ্রীরামপুর – সমস্ত অঞ্চল হইতে হাজার হাজার মজুর আসিয়াছে। ইহার উপর খিদিরপুর, বেলেঘাটা, কলকাতার মজুর তো আছেই- বারাসাত ও সোনারপুর হইতে কৃষকরাও আসিয়াছে। ছাত্ররাও আসিয়াছে দলে দলে। আসিয়াছে মেয়েরা, শিল্পী, সাহিত্যিক, সোভিয়েত সুহৃদ, মেডিকেল ইউনিটের ডাক্তার। কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য, দরদী সবাই আজ এই মহা উৎসবে আসিয়া মিলিয়াছে’।  (সুত্রঃ – জনযুদ্ধ, ১০ ৫ ১৯৪৫)।
 কিন্ত  দ্বিতিয় বিশ্বযুদ্ধের মুল্যায়নের ক্ষেত্রে মানুষের অবস্থান কমিউনিস্টদের বিপরীত মেরুতে। যুদ্ধ চলাকালীন সাধারণ মানুষের চেতনা উল্টোখাতে বইছিল। ফ্যাসিজম নয়, তাদের কাছে একমাত্র সত্য- ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন অস্তিত্ব। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পদানত থেকেও বলতে হবে- এই যুদ্ধ, জনযুদ্ধ! যেহেতু রাশিয়া আক্রান্ত। এবং ইংরেজ সরকার ও সোভিয়েত রাশিয়া এখন একই শিবিরে—নিছক এই কারণে। এতখানি বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি দেশের অগনিত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত কি? অতএব কমিউনিস্ট পার্টির ‘জনযুদ্ধ’ স্লোগান সেদিন মধ্যবিত্ত মনে বিশেষ দাগ কাটেনি। এই বিষয়ে সুমিত সরকারের মন্তব্য ঃ কী করেই বা কাটবে। যে সব ব্রিটিশ মার্কিন ও অস্ট্রেলীয় ফৌজ ভারতে এসেছে জাপানকে রুখতে- তাদের বেশিরভাগের আচরণ মোটেই ‘জনযুদ্ধে’ র আদর্শ পতাকাবাহীদের মতো নয় ( সুত্রঃ – মর্ডান ইন্ডিয়া, পৃ ৩৯২)। যুদ্ধ চলাকালীন সৈন্যদের দাপাদাপিতে সাধারণ গৃহস্থের জীবন দুর্বিষহ। এহেন অবস্থায় লোকে কি করে বুঝবে – এটা হচ্ছে অ্যান্টি – ফ্যাসিস্ট আর্মি (ফ্যাসিবাদ বিরোধী বাহিনী? তাই দেশের মানুষ দিন গুনছিল, কবে ইংরেজ এ –যুদ্ধে হারবে। অন্নদাশংকর রায়ের ‘ক্রান্তদর্শী’ উপন্যাসে অন্যতম চরিত্র সুকুমার দত্ত বিশ্বাস সদ্য বিলাত থেকে এসে অনুভব করেছেন ঃ- ‘এদেশে দেখছি হিটলারের অগণ্য ভক্ত। অনেকের বিশ্বাস হিটলার আসলে নিষ্ঠাবান হিন্দু। তার প্রমাণ হিন্দুদের স্বস্তিক হিটলার তার বাহুতে ধারণ করেন। স্বস্তিক তাঁর নাৎসিদলের প্রতীক।  ওরাও নাকি আসলে হিন্দু। জার্মানরা জিতলে আর্যরা ভারতে আসবে। এদেশের আর্যদের সঙ্গে হাত মেলাবে। এদের যা কিছু আক্রোশ তা ইংরেজের বিরুদ্ধে’। (ক্রান্তদর্শী, ২য় খন্ড, পৃ ৩১)। সমর মুখার্জির মতে, ‘যুদ্ধ চলাকালীন মধ্যবিত্ত মানসিকতার অদ্ভুত প্রকাশ। মধ্যবিত্ত মানুষ হিটলারের জয় কামনা করেছে- অথচ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা অত্যন্ত প্রবল’। আসলে ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনার উর্ধে উঠে কেউই বিশ্বজনীন প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের স্বরুপ বিশ্লেষণে রাজি নন। কি সুভাস বসুর অনুগামীরা- কি দক্ষিনপন্থী গান্ধিভক্ত কংগ্রেসী বা জয়প্রকাশের কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট দল, কি হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদীরা যারা ততদিনে ভারতের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে বিশেষ স্থান অধিকার করে বসে আছেএই হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদীরা  মুসলিম লিগপন্থীদের সাথে জাতিমুক্তি আন্দোলনে ও দেশের হিন্দু জনমনে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষবৃক্ষের চারা ততদিনে রোপণ করতে শুরু করেছে।   সাম্প্রতিক নানান গবেষণায় একটি বিষয়ে প্রকাশ্য আলোয় উন্মোচিত হয়ে গেছে যে, আর এস এস – মহাসভা নেতৃত্ব যে কেবল হিটলার এবং মুসোলিনির প্রতি সপ্রশংস ছিল তাই নয়, বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে তাঁদের সুদৃঢ় গোপন আঁতাত ছিল। নাজি জার্মানির প্রতি সাভারকার এবং সেই সঙ্গে গোলওয়ালকরের মোহাবিষ্ট সংযোগের তথ্যভিত্তিক সযত্ন অনুসন্ধান করেছেন মার্জিয়া কাসোলারি। (সুত্রঃ- হিন্দুত্ব’স ফরেন টাই-আপ ইন দি ১৯৩০, আর্কাইভাল এভিডেন্স, ইকনমিক এয়ান্ড পলিটিকাল উইকলি, ২২ জানুয়ারি, ২০০০, পৃষ্টা ২১৮-২৮)। ‘From 1924 to 1935 Kesari regularlypublished editorials and articles about Italy,
fascism and MussoliniThe Marathi newspaper gave considerable
space to the political reforms carried out by Mussolini, in particular the substitution of the election of the members of parliament
with their nomination (ibid, January 17, 1928) and the replacement of parliament itself with the Great Council of Fascism.


 বেনিটো মুসোলিনী

Mussolini’s idea was the opposite of that of democracy and it was expressed by the dictator’s principle, according to which ‘one man’s government
is more useful and more binding’ for the nation than the democratic institutions (ibid, July 17, 1928).( The article quotes a speech of Mussolini, without specifying its date.) Is all this not reminiscent
of the principle of ‘obedience to one leader’ (‘ek chalak anuvartitva’) followed by the RSS? ... The first Hindu nationalist who came in
contact with the fascist regime and its dictator was B S Moonje, a politician strictly related to the RSS. In fact, Moonje had been Hedgewar’s mentor, the two men were related by an intimate friendship. Moonje’s declared intention to strengthen the RSS and to extend it as a nationwide organisation is well known. Between February and March 1931, on his return from the round table conference, Moonje made a tour of Europe, which included a long stop-over in Italy. There he visited some important military schools
and educational institutions. The highlight of the visit was the meeting with Mussolini. An interesting account of the
trip and the meeting is given in Moonje’s diary, and takes 13 pages (Nehru Memorial Museum and Library (NMML),
Moonje papers, microfilm, rn 1... Unfortunately there is no Italian report of the meeting, not even among the prime minister’s
papers. But there are the routine papers,recording Moonje’s request for an audience, dated March 16, 1931 and the response of the cabinet of the minister of the external affairs,dated March 18: Archivio Storico Ministero degli Affari Esteri (Historical Archives
Ministry of External Affairs ASMAE), Rome, Udienze (Audiences), 1930-33, bundle 27, letter from the British Embassy in Rome, to
the Ministry of External Affairs, March 16, 1931 and reply from the cabinet of the minister, n 1102, March 18, 1931. The British authorities in Rome managed Moonje’s audience.)... ‘The Indian leader was in Rome during March 15 to 24, 1931. On March 19, in
Rome, he visited, among others, the Military College, the Central Military School of Physical Education, the Fascist
Academy of Physical Education, and, most important, the Balilla and Avanguardisti organisations. These two organisations,
which he describes in more than two pages of his diary, were the keystone of the fascist system of indoctrination – rather
than education – of the youths. Their structure is strikingly similar to that of the RSS. They recruited boys from the age of six,
up to 18: the youths had to attend weekly meetings, where they practised physical exercises, received paramilitary training
and performed drills and parades. According to the literature promoted by the RSS and other Hindu fundamentalist organisations and parties, the structure of the RSS was the result of Hedgewar’s
vision and work. However Moonje played a crucial role in moulding the RSS along Italian (fascist) lines. The deep impression
left on Moonje by the vision of the fascist organisation is confirmed by his diary(সুত্রঃ - http://www.sacw.net/DC/CommunalismCollection/ArticlesArchive/casolari.pdf) হিটলারের চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতেন অঞ্চল এবং অস্ট্রিয়া দখলকে সাভারকার সমর্থন করেছিলেন। গোলওয়ালকর, আরেক বিশুদ্ধ হিন্দু জাতীয়তাবাদী, হিটলারের পাশবিক ইহুদি বিনাশকে প্রশংসা করেছিলেন। (সুত্রঃ http://www.sacw.net/DC/CommunalismCollection/ArticlesArchive/casolari.pdf, পৃষ্টা ২২৩-২৪)।  হিটলারের বিকৃত আর্য্য রক্তের গর্ব এবং আর্য্য স্বাজত্যাভিমান প্রতিফলিতে হয়েছে তাঁর আত্মজীবনীতে যেখান থেকে সম্ভবত অনুপ্রানিত হয়েছিলেন আমাদের দেশের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা।  হিটলারের মতে মানবসভ্যতার  অগ্রগতিতে  উচ্চ সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্যে, বিজ্ঞান প্রভৃতিতে আর্য্যদের প্রাধান্য ও ভূমিকা   ছিল প্রশ্নাতীত এবং তাদের সৃজনশীল ক্ষমতা ছিলো অন্য নিচু জাতীগুলির অপেক্ষা অনেক উন্নত।  মানবসভ্যতার অগ্রগতির ও চালিকাশক্তির যাবতীয় উপাদান আবিস্কারে ছিলো আর্য্যদের অবদান।  কিন্ত  তাদের সামগ্রিক অবনতি এবং মানসিকা ও শারীরিক অবক্ষয়ের কারণ হিশেবে উনি দায়ী  করেছেন আর্য্যদের বিভিন্ন অনার্য্য ও নিচুস্তরের জাতির সঙ্গে রক্ত শংকরের প্রক্রিয়াকে ‘History furnishes us with innumerable instances that proves this law. It shows, with a startling clarity, that whenever Aryans have mingled their blood with that of an inferior race the result has been the downfall of the people who were the standard-bearers of a higher culture. In North America, where the population is prevalently Teutonic, and where those elements intermingled with the inferior race only to a very small degree, we have a quality of mankind and a civilization which are different from those of Central and South Amercia. In these latter countries the immigrants- Who mainly  belonged to the Latin races- mated with the aborigines, sometimes to a very large extent indeed. In this case we have a clear and decisive example of the effect produced by the mixture of races. But in North America the Teutonic element, which has kept its racial stock pure and did not mix it with any other racial stock, has come to dominate the American Continent and will remain master of it as long as that element does not fall a victim to the habit of adulterating its blood.
In short, the results of miscegenation are always the following:
(a)       The Level of the superior race became lowered;
(b)       Physical and mental degeneration sets in, thus leading slowly but steadiliy towards a progressive drying up of the vital sap.
The act which brings about such a development is a sin against the will of the Eternal Creater. And as a sin this act will be avenged’. (Mein Kampf Page 253, gbd books)এই পাপমোচনের স্বঘোষিত দ্বায়িত্ব হিটলার ভগবানের কাছ থেকে পেয়ে হত্যার ‘পবিত্র’ বৈধতা দিতে  হিহুদী এবং অন্যান্য জাতিদের ওপর হত্যা ও নানাবিধ জাতিগত নিপীড়ন শুরু করেন  হিটলার এখানে অবশ্য জীবন্ত ইতিহাসের আরো কিছু ইতিহাস হিটলার ভুলে গেছিলেন বোধহয়। গ্রীক-রোমক সভ্যতার শাসকশ্রেণী  হিটলারের পূর্বশুরী  গথ, ভান্ডাওলদের অসভ্য, বর্বর বলে অভিহিত করতো। নিজের আত্মজীবনীতে আরো এক জায়গায় হিটলারের উগ্র জাত্যাভিমানের পরিচয় পাওয়া যায়। ‘It would be futile to attempt to discuss the question as to what race or races were the original standard-bearers of human culture and were thereby the real founders of all that we understand by the word humanity. It is much simpler to deal with this question in so far as it relates to the present time. Here the answer is aimple and clear. Every manifestation of human culture, every product of art, science and technical skill, which we see before our eyes today, is almost exclusively the product of the Aryan creative power. This very fact fully justifies the conclusion that it was the Aryan alone who founded a superior type of humanity; therefore he represents the archetype of what we understand by the term : MAN. He is the Prometheus of mankind, from whose shining brow the divine spark of genius has at all times flashed forth, always kindling anew that fire which, in the form of knowledge, illuminated the dark night by drawing aside the veil of mystery and thus showing man how to rise and become master over all the other beings on the earth. Should he be forced to disappear, a profound darkness will descend on the earth; within a few thousand years human culture will vanish and the world will become a desert.

 এডলফ হিটলার  
If we divide mankind into three categories-founders of culture, bearers of culture, and destroyers of culture- the Aryans alone cane be considered as representing the first category. It was he who laid the groundwork and erected the walls of every great structure in human culture’(Mein Kampf Page 256-57, gbd books) হিহুদি নিধন যজ্ঞের সময়ে হিটলারের বোধহয় হিহুদি নিউটন আর আইন্টাইনের কথা মনে পড়ে নি, যাদের অবদানে জ্ঞান-বিজ্জানের আকাশ আজো আলোকিত।
যাই হোক সকলের চোখে এক সুবর্ণ সুযোগ এই যুদ্ধ। সব  পুঁজিপতি ও জোতদার-জমিদার শ্রেনির স্বার্থরক্ষাকারী দলেরই নিজস্ব স্বার্থে এই সুযোগ কে কাজে লাগানো হলোএই যুদ্ধে যে ইংরেজ হারছে- এ বিষয়ে সবাই নিঃসংশয়। ইতিমধ্যে সিঙ্গাপুর-রেঙ্গুনের পতন ঘটেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নাভিশ্বাস উঠেছে নিজ উপনিবেশ ও প্রভাবিত অঞ্চলে দখলদারী জারি রাখতে। অতএব শেষ আঘাত হানতে হবে। এই সন্ধিক্ষণে আন্তর্জাতিকতা ও জাতিয়তাবাদী মতাদর্শগত দ্বন্দে কমিউনিস্টদের সাথে অন্যদের মধ্যে সৃষ্ট হলো এক দুস্তর ব্যবধান। আন্তর্জাতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কমিউনিস্টদের দৃষ্টিতে মুল শত্রু ফ্যাসিজম। এবং যুদ্ধে ফ্যাসিজিমের জয় ও লালফৌজের পরাজয়ের অর্থ মানবসভ্যতার বিনাশ ও সমাজবিকাশের ধারায় ছেদ। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ শত্রু  কিন্ত  আশু কর্তব্য ফ্যাসিজিমের প্রতিরোধ এবং এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলো।  কিন্ত  অপরদিকের জ্বলন্ত বাস্তব হল, দেশের মাটিতে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন অস্তিত্ব এবং তাদের আর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণ। বিশ্ব ও স্বদেশকে মেলাতে গিয়ে এক সংকটের  মুখে পড়তে হল কমিউনিস্টদের। এই বিষয়ে ডঃ গঙ্গাধর অধিকারীর লিখেছেন ঃ “ফ্যাসিবাদ-বিরোধী যুদ্ধে আমাদের সাধারণ সমর্থন ঘোষণা সঠিক ছিল। তাছাড়াও জাপানী আক্রমণের বিরুদ্ধে আমাদের দেশকে রক্ষা করতে হবে, এই কথা বলাও সঠিক ছিল।  কিন্ত  জাতীয় আন্দোলন ছাড়া কি কমিউনিস্ট পার্টি দেশকে রক্ষা করতে পারত? একথা কল্পনা করা কি বাস্তবানুগ ছিল যে আক্রমণের মুখোমুখি হয়ে দেশের জনসাধারণ, জাতীয় নেতৃত্ব ফ্যাসিবাদের পক্ষে চলে গেছে বলে তাদের ত্যাগ করবে এবং ফ্যাসিবাদ –বিরোধী দেশপ্রেমিক কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে মিলিত হবে? ... একমাত্র পথ ছিল জাতীয় আন্দোলনের  সঙ্গে যুক্ত হওয়া--- তার বিরোধিতা করা নয়। জাতীয় আন্দোলনের এই আবর্তের মুখে, সেই সম্পর্কে আমাদের ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি--- প্রলেতারীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ সম্পর্কে আমাদের মতান্ধ উপলব্ধি ও জাতীয় আন্দোলন সম্পর্কে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্ভূত হয়েছিল’। (কমিউনিস্ট পার্টি অ্যান্ড ইন্ডিয়াজ পাথ, পৃ ৮১)।  ১৯৪২ সালের আগে অবধি গান্ধীজি দেশে নানাবিধ সামাজিক আন্দোলন ও সমাজসেবার কাজে ব্রতি ছিলেন।  কিন্ত  ১৯৪২ সালের গ্রীষ্মকালে হঠাত দেশের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে ওনার পুনরায় আবির্ভাব ঘটলো। জাতিমুক্তি সংগ্রামে কমুনিস্টদের অংশগ্রহণের ফলে দেশের শাসনক্ষমতা শ্রমজীবি মানুষের হাতে চলে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের তল্পিবাহক দেশীয় ধনতান্ত্রীক-জমিদার শ্রেণী নানান প্রতিক্রিয়ার জাল বোনা শুরু করলো। এই ষড়যন্ত্রের অংগ হিসেবে জনমনে প্রথিত করা হলো সাম্প্রদায়িকতার বীজ। আন্তরজার্তিকতাবাদ, ফ্যাসিজিমের বিরুদ্ধে মানব সভ্যতা কে রক্ষা করার যুদ্ধের সাথে জাতি মুক্তি আন্দোলনের সম্মেলন ও সংযোগ  ঘটাতে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে দেখা গেলো নানান দোদূল্যমানতা ও  ভ্রান্তি। এইদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দেশীয় মূসুদ্দিদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে রাশিয়ার বলসেজিমের ভূত।  ফ্যাসিজিমের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের জনযুদ্ধ তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা জনমনে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেনি। এই সুযোগটিকে কাজে লাগালো কংগ্রেস, লিগ আর হিন্দু জাতীয়তাবাদিদের বূর্জোয়া-জমিদার শ্রেণী। সুমিত সরকারের ভাষায়, ১৯৪২ সালের গ্রীষ্মকালে গান্ধীজি আকস্মিকভাবে জঙ্গি মেজাজের পরিচয় দিতে থাকেন। তিনি বারবার বলতে থাকেন – ইংরেজ তুমি এদেশ ছেড়ে চলে যাও। হয় ভগবানের কাছে নয়তো অরাজকতার কাছে আমাদের ছেড়ে চলে যাও। ‘এই সুশৃঙ্খল অরাজকতার তুলনায় কল্পনাহীন নৈরাজ্য বরঞ্চ শ্রেয়’।

 মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী
১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট ভোর রাত্রীতে সংগ্রামের শীর্ষস্থানীয় নেতারা গ্রেফতার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় আন্দোলন প্রচণ্ড বিস্ফোরণের আকার নেয়। সুমিত সরকার লিখেছেন ‘ এতটা বোধহয় বড়লাট লিনলিথগো কল্পনা করতে পারেননি। এক অসম যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে কংগ্রেসের নেতাদের আন্দোলনকে তিনি চূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। তাঁদের হিশেবে, কংগ্রেস বড় জোর ১৯৩২ সালের মতো এখানে অখানে অসহযোগ আন্দোলনের ধঁচে কিছু সরকার-বিরোধী জমায়েত হয়তো গড়ে তুলতে পারবে। সরকার বিব্রত হলেও, তার দ্বারা যুদ্ধ-প্রচেষ্টা তেমন ব্যাহত হবে না।  কিন্ত  যা ঘটল তা অভাবনীয়। ১৯৪২ সালের ৩১ আগস্ট বড়লাট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে এক গোপন তারবার্তায় জানাচ্ছেন ঃ ‘১৮৫৭ সালের পর এতবড় বিদ্রোহ ভারতে বুকে ঘটেনি। এর ব্যাপ্তি ও মারাত্মক চেহারার কথা আমরা সামরিক নিরাপত্তার খাতিরে কারও কাছে প্রকাশ করিনি’। (মর্ডান ইন্ডিয়া, পৃঃ ৩৯১)। ‘নজিরবিহীন অত্যাচার চালিয়ে আগস্ট বিদ্রোহ দমন করা হয়। ১৯৪৩ সালের শেষাশেষি সরকারি বিবরণ থেকে জানা যায় যে, এ পর্যন্ত মোট ৯১ হাজার ৮৩৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছে এবং পুলিশ ও মিলিটারির গুলিতে ১০৬০ জন প্রাণ হারিয়েছে। বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে লাঠি – গুলি-টিয়ার গ্যাস প্রভৃতি চিরাচরিত ব্যবস্থা অবলম্বন ছাড়া বিমান থেকে মেশিনগান চালানোর দৃষ্টান্তও রয়েছে। পিটুনি কর আদায় করা হয় ব্যাপকভাবে। তাছাড়া প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত ও নারীধর্ষণ প্রভৃতি ঘটনার সংখ্যাও কম নয়। অপরদিকে বিদ্রোহিরা ২০৮ টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি, ৩৩২ টি রেল স্টেশন এবং ৯৪৫ টি ডাকঘর ধ্বংস করেছে। বিদ্রোহিদের হাথে ৬৩ জন পুলিশ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বিদ্রোহিদের দলে যোগ দিয়েছেন ২১৬ জন পুলিশ। অন্তত ৬৫৪ ক্ষেত্রে বিদ্রোহিরা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে’। (মর্ডান ইন্ডিয়া, পৃঃ ৩৯৫-৯৬)’। আগস্ট আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও গভীরতার কথা এবং দেশে তার সুতীব্র অনুরণ কমিউনিস্ট নেতারা স্বীকার করলেও তারা এই সাম্রাজ্যবিরোধি বুর্জোয়া-গনতাত্রীক চরিত্রের জাতি মুক্তি আন্দোলনের মধ্যে বৈপ্লবিক কোনো উপাদান খুঁজে পাননি। সাম্রাজ্যবাদ মদতপূষ্ট ফ্যাসীবাদ বিরোধী জনযুদ্ধের সাথে জাতিমুক্তি আন্দোলনের মধ্যে সম্মনয়ের সম্ভবনাকে প্রতক্ষ্য  করতে পারেননি।তাদের কাছে এই আন্দোলন ছিলো লক্ষ্যভ্রষ্ট। কারণ বিশ্বের জনগনের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের আঙিনার বাইরে এই আন্দোলন। সোমনাথ লাহিড়ীর ভাষায়, ‘ কথা নয়, প্রত্যক্ষ কাজের মধ্যে দিয়া দেখাও, ইউরোপ-আমেরিকার ফ্যাসিস্ট – বিরোধী জনগনের যুদ্ধ তুমিও লড়িতেছ—তাহা হইলে তোমার দাবীর পিছনে  তাহাদের ক্রম-বর্ধমান সমর্থন নিশ্চয়ই লাভ করিবে’প্রসঙ্গত, পার্টি জনগনের আচরণের সমালোচনা করেনি-নিন্দা করেছে বৃটিশের দমনপীড়ন নীতিকে। ‘সাম্রাজ্যবাদী আমলাতন্ত্র যে পাশবিক দমন ব্যবস্থাকে বিদ্যুতগতিতে দেশের মধ্যে বিচরণ করিতে দিতেছে, তাহাই দেশে আগুন জ্বালাইয়াছে। জনগনের সঞ্চিত ক্রোধ ও  অসন্তোষকে সংগঠনহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের পক্ষে ঠেলিয়া দেওয়ার চেষ্টাই উহারা করিয়াছে। তাহার পর সে বিক্ষোভকে উহারা লাঠি, বুলেট ও কাঁদুনে গ্যাস দিয়া ঠেকাইতে চাহিয়াছে। ...তাহার জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত করিতে দেয় নাই। এখন তাহারা আমাদের একমাত্র সংগঠিত শক্তি কংগ্রেসকে চুর্ণ করিতে চাহিতেছে। কারণ একমাত্র কংগ্রেসই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করিয়া উহাদের অনিচ্ছুক হস্ত হইতে জাতীয় সরকার ছিনাইয়া আনিতে পারে’। (পিপলস ওয়ার, ১৬ ৮ ১৯৪২)।  কিন্ত  জাতিমুক্তি আন্দোলনের বিকাশ ও শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে সহায়তা দানে তখন কেই বা এগিয়ে আসবে? নাতসীদের সামলাতে রাশিয়ার লাল- ফৌজ দাঁতে-দাঁত চেপে লড়ছে। ইংল্যান্ডে কমিউনিস্ট পার্টির শক্তি সীমিত। ইউরোপের সোশাল – ডেমোক্রাটরা সাম্রাজ্যবাদীদের লেজুড়ে পরিনত হয়েছে। রুশ দেশে রাজতন্ত্রের উৎখাত করেছিলেন সে দেশেরই মানুষ। কিভাবে সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের  মধ্যে দ্বন্দের সুযোগে দেশের মধ্যে জাতিমুক্তি আন্দোলনকে গৃহযুদ্ধে পরিনত করা যায়  , চোখের সামনে তার প্রতক্ষ্য নিদর্শণ দেখাচ্ছিল চিনা কমিউনিস্ট পার্টি, যদিও দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক  বিকাশের এক নির্দিষ্ট ধারায় তা বিচার্য। ইতিহাসের তার সাক্ষ্য বহন করে। 

 নেতাজি সুভাষ বোস
১৯৪২ এর ঘটনার ফলস্বরুপ দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গড়ে ওঠে এক তিক্ততার পরিবেশ। আগস্ট আন্দোলনকে কেন্দ্র করে, সুমিত সরকারের বক্তব্য, ‘ কমিউনিস্ট – বিরোধীরা কমিউনিস্টদের ইংরেজের দালাল আখ্যা দেয় আর কমিউনিস্টরা সোশ্যালিস্ট ও সুভাষ বোসের অনুগামীদের ‘পঞ্চম বাহিনী’ বলে সম্বোধন করতে থাকে। তার ফলে গড়ে ওঠে উভয়ের মধ্যে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। তার জের চলতে থাকে দীর্ঘদিন- এমনকি পরবর্তী প্রজন্ম অবধি এই তিক্ততার রেশ অব্যাহত থাকে’। (মর্ডান ইন্ডিয়া, পৃ ৪০৫)। বস্তুত এই ভ্রান্তি ও দোশারোপের পালা এখনো চলছে। সুভাষ বোস সম্বন্ধে তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্বের মূল্যায়ন ছিলো একজন বিভ্রান্ত দেশপ্রেমী। প্রায় একদশক কাল পরে পার্টির সাধারণ সম্পাদক অজয় ঘোষ এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন, ‘কমিউনিস্টরা নেতাজীকে দেশদ্রোহী বলিয়াছিলো। আমরা তাঁহার সম্পর্কে এইরূপ কথা বলিবার জন্য দুঃখিত। ১৯৪২ সালে অন্যান্য দেশপ্রেমিক দলের সহিত আমাদের অনুসৃত নীতির বিভেদ ছিল। এইসব মতভেদ সম্পর্কে বাদানুবাদ অত্যন্ত তিক্তভাবে করা হইত। আমামদিগকে বলা হইত বৃটিশের অনুচর, আমরাও বিপক্ষকে বলিতাম ফ্যাসিস্তদের অনুচর ইত্যাদি। ইহা নিঃসন্দেহে শোচনীয়। আমরা বলিয়াছিলাম যে যদি অক্ষশক্তি যুদ্ধে জয়ী হয়, দুনিয়াময় স্বাধীনতা ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্টার সংগ্রাম গুরুতরভাবে দুর্বল হইয়া পড়িবে। যুদ্ধ পরবর্তী ঘটনা হইতে প্রমানিত হইয়াছে যে আমাদের কথাই ঠিক। জাপানের সাহায্যে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের যে নীতি নেতাজী গ্রহণ করিয়াছিলেন আমরা বিবেচনা করিয়াছিলাম যে সেই নীতি সঠিক নয়। ব্রহ্মদেশের দৃষ্টান্ত ইহার চূড়ান্ত প্রমাণ।  কিন্ত  তাঁহাকে দেশদ্রোহী আখ্যা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্পূর্ণ ভুল হইয়াছিল। আমরা তাহার জন্য দুঃখিত। সুভাষ বসু দেশপ্রেমিক এবং ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করিয়াছিলেন যদিও অক্ষশক্তি সম্পর্কে তিনি যে নীতি অবলম্বন করিয়াছিলেন তাহা ভুল ছিল ইহাই আমাদের ধারণা’। (যুগান্তর, ২৬ ১২ ১৯৫৭)।  ১৯৪৫ সালে কংগ্রেসের বড়, মাঝারি ও খুদে নেতারা সব একে একে ছাড়া পেলেন। কারাবাস তাদের জনমনে বিশেষ স্থান অধিকার করে নিয়েছে। দামোদর ধর্মানন্দ কোসম্বীর মতে মানুষ ততদিনে ভুলে গেছে কংগ্রেস মন্ত্রিসভার সাদা- মাটা কীর্তিকলাপের কথা। ্যোশী বক্তব্য, ‘...কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থী- উভয় তরফের নেতারা আনলেন কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ। দক্ষিণপন্থী কংগ্রেস নেতাদের মুখপাত্র ছিলেন সর্দার প্যাটেল। বামপন্থী ফরওয়ার্ড ব্লক তো বটেই, তাছাড়া ছিলেন জয়প্রকাশ ও মাসানি প্রমুখ কংগ্রেস-সমাজতন্ত্রী নেতারা- ্যাঁরা আগস্ট বিপ্লবের গৌরবমুকুট পরে সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছিলেনআমি মহাত্মাজীর সঙ্গে বারকয়েক দেখা করে তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম-  কিন্ত  তাঁর মনোভাবের তেমন কিছু ইতরবিশেষ ঘটল না’। (এ ডেডিকেটেড টিচার, এসেজ ইন অনার অফ প্রফেসর এস সি সরকার, পৃঃ৮)। আবার ১৯৪৫ সালে যোশী লেখেন, ‘কংগ্রেস দেশের সর্ববৃহত জাতীয় প্রতিষ্টান- বিভিন্ন দেশপ্রেমিক শক্তিগুলিকে নিজ সংগঠনের মধ্যে স্থান দিয়া কংগ্রেস আর শক্তিমান হইয়া উঠিয়াছে’। (কমিউনিস্ট ও কংগ্রেস, যোশী)। কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্ব ও শক্তি সম্পর্কে যোশী দাবী করেন, ‘১৯৩০-এর আন্দোলনের মধ্য দিয়া বামপন্থী সংগঠন গড়িয়া উঠিয়াছিল, ১৯৪০ এবং তারপর সেইসব দল ধবসিয়া পড়িয়াছে।

 পি সি যোশী

একমাত্র পার্টিই ক্রমাগত লড়িয়া চলিয়াছে, এবং আজ নিজ শক্তির বলে আমাদের পার্টিই কংগ্রেস এবং লীগের পরেই দেশসের মধ্যে, তৃতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিরূপে প্রতিষ্টালাভ করিয়াছে’। (কমিউনিস্ট ও কংগ্রেস, যোশী)। ওই একই রচনায় যোশী এমনকিছু মন্তব্য করলেন যার ফলে কমিউনিস্ট পার্টির বিকাশধারায় ও গতিপথের  ভবিষ্যৎ নির্নয় হয়ে গেলো আগামী কয়েক দশকে ।   যোশী আগস্ট আন্দোলনকে কংগ্রেসের আন্দোলন বলে অভিহিত করতে অস্বীকার করেন। ওনার মতে এই আন্দোলন জয়প্রকাশের দলের একক কীর্তি।  এই আন্দোলনে জনসমর্থন বাড়াবার তাগিদেই কংগ্রেসের নাম জাল করা হয়েছে। এই আন্দোলন ফ্যাসিস্ট শক্তির সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সুভাষ বোসকে যোশী নীতিহীন সুবিধাবাদী বলে  দোষী সাবস্ত করেন এবং বলেন যে এই কারণেই সুভাষ বোস কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। যোশীর মতে কংগ্রেসের মধ্যে  কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে এবং তারই ফলস্বরুপ তারা কমিউনিস্টদের বিতাড়নের দাবী করছেন। ‘আমরা মনে করি, কংগ্রেসসেবীদের মনে আমাদের সম্বন্ধে ভুল ধারণা রহিয়াছে তাহা হইতেই এই বিদ্বেষের জন্ম এবং এই ভুল ধারণাকে দূর করাই আমাদের কর্তব্য’। (কমিউনিস্ট ও কংগ্রেস, যোশী)।  কিন্ত  কংগ্রেসদলের মধ্যে থেকে এই বিদ্বেষ দূর করা গেলো না। প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের পদ থেকে কমিউনিস্টদের সরিয়ে দেওয়া হতে থাকলো। কংগ্রেস নেতৃত্বের মতে, ‘তাহারা সর্বতভাবে কংগ্রেসের আস্থা হারাইয়াছে। কংগ্রেসের নির্বাচিত কমিটিসমূহের দ্বায়ীত্বশীল পদে অধিকারী থাকার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। সম্ভবত তাহারা তাহাদের অবস্থা উপলব্ধি করিয়াছে। জ্ঞানপাপী বলিয়াই তাহারা কংগ্রেসের নির্বাচিত কমিটিসমূহ এবং কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্য পদেও ইস্তফা দিয়াছে। আমরা ওই আটজন এ আই সি সি সভ্যকে কংগ্রেস হইতে অনুমোদন করিতেছি এবং সমস্ত প্রাদেশিক কমিটিকে কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যদের কংগ্রেসের নির্বাচিত কমিটি সমূহ হইতে বহিস্কার করিবার নির্দেশ দিতে সুপারিশ করিতেছি’।  এই সিধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে যোশীর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া, ‘অতীতে আমাদের মধ্যে কোথায় মিল আর কোথায় গরমিল ছিল, তাহা আমরা জবাবে তুলিয়া ধরিয়াছি। আজ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বহুকালের বন্ধু মুনাফাখোর, চোরাকারবারী ও মধ্যযুগের পরগাছা জমিদার খোলাখুলিভাবে কংগ্রেসের মধ্যে নেতৃবর্গ অভ্যর্থনা জানাইতেছেন। আর যে – কমিউনিস্টরা দেশে মজুর ও কিসানের মধ্যে যাহা কিছু সংগঠন গড়িয়া তুলিয়াছে, তাহাদের কংগ্রেসের হইতে বহিস্কার করিতেছেন। এই নবাগত ও বহিস্কৃতদের মধ্যে কাহারা কংগ্রেসের মর্যাদা ক্ষুন্ন করিবে- তাহা প্রমাণ করিবে ভবিষ্যতের ইতিহাস’। ( বোম্বে ক্রনিকল ১৩ ১২ ১৯৪৫, ১৪ ১২ ১৯৪৫)।
কমিউনিস্টদের প্রতি কংগ্রেসের দৃষ্ঠিভঙ্গি অত্যন্ত নিন্দনীয় হলেও অন্যদের বেলায় কংগ্রেস অতিমাত্রায় উদার। এই যথার্থতা ও প্রমাণ পাওয়া যায় সুমিত সরকারের লেখায়, ‘...এটাও উল্লেখযোগ্য যে রাজগোপাল আচারীর মতো দক্ষিণ ভারতের স্বনামখ্যাত গান্ধীবাদী নেতা আগস্ট আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। উপরন্তু তিনি পাকিস্তান দাবিকে ভিত্তি করে মুসলিম লীগের সঙ্গে আলাপ আলোচনার শুরু করার পরামর্শ দেন। অথচ কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে নেহরু যখন বিষোধগার করেন এবং কংগ্রেসী জনতা মুম্বাইতে কমিউনিস্টদের সদর দপ্তর আক্রমণ করে- তখন রাজগোপাল আচারীর ভূমিকা সম্পর্কে তারা নীরব। এমনকি হিন্দু মহাসভার কয়েকজন নেতা যে ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনের সময় মন্ত্রিত্ব করে গেছেন- সে বিষয়েও উচ্চবাচ্য হয় না। তাদের মারধোর করা দূরে থাকুক’। (মর্ডান ইন্ডিয়া, পৃঃ ৪১১-১৩, ৪২০)। জাতীয় কংগ্রেস ও কমিউনিস্টদের মধ্যে পাকাপাকি বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক উপসংহার এভাবে ঘটল। সাধারণ মানুষের কাছে  কিন্ত  প্রশ্ন দেখা আই এন এ-র জোয়ানেরা যদি দেশপ্রমিক হয়, তাহলে নেতাজী সুভাষ বোসকে কি কারণে দেশপ্রমিক বলা যায়? কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্বের কাছে তখন এর কোন উত্তর ছিলো না। দেশের তৃতীয় ক্ষমতাশীল  পার্টি হয়েও পার্টি হয়ে গেলো অপাংক্তেয়। বিশ্বযুদ্ধের রঙ্গমঞ্চে লালফৌজ জয়যুক্ত  কিন্ত  দেশের আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক মঞ্চে কমিউনিস্টরা এক প্রবল সমস্যার ঘুর্নাবর্তের কবলে গিয়ে পড়ল।
ফ্যাসিবাদের অমানবিক কুৎসিত রুপ ও বিকৃত দর্শণের প্রয়োগ  আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জানার কথা নয় অসহায় চোখে সে দেখে বিদেশী সৈন্যদের স্বেচ্ছাচারিতা, দেখে রাজপথে ক্ষুদিত কঙ্কালের মিছিল রাত তার আতঙ্কে কাটে সাইরেনের তীব্র আর্তনাদে বাংলার আকাশে তখন ঘনীভূত হচ্ছে দূর্ভিক্ষের করাল ছায়া কংগ্রেস, লীগ মদতপুষ্ঠ মুনাফাখোর , মজুদদারদের দল যুদ্ধের বাজারে কৃত্তিম খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করল বিপুল লাভের আশায় এবং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে গেলো অর্ধাহার, অনাহারের
 আকাল ও মড়কের চরম দশায়। রুদ্ধ দুয়ারে ক্ষুধাতুর শিশুর কান্নাকে ছাপিয়ে গেলো তীব্র সাইরেনের আর্তনাদে। আগস্ট আন্দোলনের পরে বাংলা দেখলো শহরে, গ্রামে, গঞ্জে ক্ষুদার করুন আর্তনাদ ও মৃত্যু মিছিল।  মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলি ক্ষুধার আর দারিদ্রের জ্বালায় কেমন যেন ভোঁতা হয়ে গেছে। ১৯৪৩-৪৪- বছর দুটি যেন মানুষের জীবনে দুঃসহ যম হয়ে উপস্থিত হয়েছে। দিবা-রাত্রীতেও দুঃস্বপ্নের অন্ত নেই। আকাল, ক্ষুধা, শারীরিক ও মানসিক অবক্ষয় বুঝি  মানুষের বিধি। অরাজকতা ও অর্থনৈতিক নৈরাজ্যে সর্বাত্মক ধংসের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে গোটা সমাজ- তার বর্তমান ও তার ভবিষ্যৎ। এই সন্ধিক্ষণে ঐতিহাসিক চাহিদায় কনিউনিস্ট পার্টির কাছে নিয়ে এসেছে এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ দ্বায়ীত্ব।  আগস্ট আন্দোলনের ঠিক একবছর পরে সোমনাথ লাহিড়ী লিখছেন ঃ ‘দেশ জুড়িয়া ক্ষুদার করুন ক্রন্দন, আর্তনাদের শক্তিও নিঃশেষ হইয়াছে।  সমগ্র বাংলার জীবনই যেন আমি বিকীর্ণ কঙ্কালের মুর্তি ধরিয়া পথের ধারে ধারে ধুঁকিতেছে। মৃত্যুই তাহাদের একমাত্র গতি’।  ‘১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসেও ধান বিক্রি হয়েছিল চৌদ্দ আনা মণ দরে। ১৯৪৩ সালে মাত্র তিন মাসের মধ্যে সেই চালের দর তিন টাকা মণ থেকে ছাপান্ন টাকায় গিয়ে পৌঁছাল। তারপর দেখা গেলো শতাব্দীর করুনতম দৃশ্য। লক্ষ্য লক্ষ্য নিরন্ন মানুষের কলকাতামুখী মিছিল। ভাত নয় – তারা ফ্যান চাইছে শহরবাসীর কাছে’। গোপাল হালদার লিখছেন, ‘ নিরন্ন জোয়ার গ্রাম ছাপিয়ে এসে পড়েছে শহরে-রাসবিহারী এভিন্যু ছাপিয়ে বন্যা পৌঁছেচে রসা রোডে- পৌঁছেচে তা চৌরঙ্গীর সীমানায়। চব্বিশ পরগণা, মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি- বুঝি সমস্ত বাঙলার হতভাগারা দেখতে এসেছে তাদের রচিত ঐশ্বর্য—প্রাসাদপুরি কলকাতা’। (তেরশ পঞ্চাশ, পৃ ; ১৮৭-৮৮, ৩৩৭)।  এই মর্মান্তিক পরিস্থিতে পড়ে পার্টি সদস্যরা দিশেহারা। এই সার্বিক সংকটের পরিস্থিতি চিত্রিত হয়েছে  কমিউনিস্ট পার্টির চিঠিতে ঃ- ‘ক)  দুর্ভিক্ষের আঘাতে বাংলায় অনুমান দেড় কোটি লোক দুঃস্থ হইয়াছিল, তাহাদের মধ্যে বোধ হয় পঞ্চাস লক্ষ লোক মরিয়া গিয়াছে, বাকি এককোটি এখনও দুঃস্থাগারে। ইহাদের অধিকাংশই কৃষি মজুর  কিন্ত  কাজ করিতে তাহারা অক্ষম। অথচ সরকারের তরফ হইতে রিলিফের কাজ বন্ধ করিবার কথা শুনা যাইতেছে। খ) দুর্ভিক্ষের পর আসিয়াছে দুরন্ত সংক্রামক ব্যাধি, বিশেষত ম্যালেরিয়া। ব্যাপক অগ্নিকান্ডের মত এই ম্যালেরিয়া সারা বাংলায় ছড়াইয়া পড়িয়াছে। প্রায় অর্ধেক লোক ম্যালেরিয়ায় শয্যাগত এবং এককোটি লোক মৃত্যুর সম্মুখীন। অথচ উপযুক্ত পরিমাণে কুইনিন সরবরাহের ব্যবস্থা নাই। লোভী মজুতদারেরা কুইনিন মজুত করিয়া চোরা কারবার চালাইতেছে। ত্রিশ টাকার কুইনিন তিনশত টাকায় বেচিতেছে। গ) অনাহারে এবং রোগের আঘাতে গ্রাম অঞ্চল ভীষণ শ্রম সঙ্কট বা মজুরের অভাব দেখা দিয়াছে। গ্রাম্য মজুরদের তিন ভাগের এক ভাগ মাত্র কার্য্যক্ষেত্রে সচল আছে। চট্টগ্রাম, মেদিনীপুর, বরিশাল প্রভৃতি জেলায় মজুরের অভাবে মাঠের ধান মাঠে পড়িয়া আছে, সময়মত কাটা হইতেছে না। এইভাবে প্রচুর ধান এবার নষ্ট হইবে। নৌকা গরুরগাড়ি প্রভৃতি গ্রাম্য যানবাহন একরকম অমিল। গ্রাম হইতে শহরে ধান রপ্তানি করা বা শহর হইতে গ্রামে কাপড়, নুন, কেরোসিন, চিনি প্রভৃতি আমদানি করা অত্যন্ত ব্যয়সাধ্য এবং বহুক্ষেত্রে একবারেই অসম্ভব। ফলে শহরের সঙ্গে গ্রামের এবং এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের যোগাযোগ নষ্ট হইয়া যাইতেছে। ঘ) শহরে চাউল এখনও দুষ্প্রাপ্য, দাম আবার বাড়িতে আরম্ভ করিয়াছে, অথচ পুরো রেশনিং এখনও চালু হয় নাই। ঙ) কয়লার অভাবে শিল্প উৎপাদন বন্ধ হইবার উপক্রম বন্ধ হইবার উপক্রম। উৎপাদন বন্ধ হইলে লক্ষ লক্ষ মজুর দুঃস্থ শ্রেণিতে পরিণত হইবে এবং সকলরকম জিনিসেরই দারুন দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে’।
সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক চিত্র স্পষ্ট এই দলিলে।  কিন্ত  এই দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ দেশী পুঁজিপতি-জমিদার ও সাম্রাজ্যবাদের আঁতাতে সৃষ্ট, তা অস্পষ্ট থেকে গেছে। জনগনের প্রকৃত শত্রু নির্ধারণে এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই  করার রণকৌশল নির্ধারণে এই দলিল ব্যর্থ।  পরে পার্টির দলিলে এই ব্যর্থতা অকপটে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। (ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতিয় পার্টি কংগ্রেসে উত্থাপিত সংস্কারবাদী বিচ্যুতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন, পৃ ঃ ১২৮) সেইদিনের এই সঙ্কট  কিন্ত  পার্টিকেও রেহাই দেয়নি। ওনেক কমরেড নানারোগে অকালে মারা গিয়েছেন। কলেরা ও বসন্তরোগেই সবচেয়ে বেশি কমরেড মারা যান।  ১৯৪৩ সালের নভেম্বরে পার্টি জনগনের কাছে আহ্বান জানায়, ‘মৃত্যু ও মহামারীর বিরুদ্ধে খাদ্যের জন্য লড়’। বাংলার অভ্যন্তরে সমাজের সর্বস্তরের প্রগতিশীল মানুষ, বিশেষত শিল্পী, বুদ্ধিজীবিদের  দ্বারা এবং জনগনকে পাশে নিয়ে সারা ভারতকে বাংলার পাশে দাঁড়াবার আবেদন জানায়। ব্যাপক হারে শুরু হয় রিলিফের কাজ। এই সার্বিক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটের আবর্ত থেকে, জনগনের সাথে বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে, জনসমাজে প্রবেশ করার সুযোগ এল পার্টির কাছে। কমিউনিস্টরা শুধু নিজেরা নিরন্ন, অভুক্ত, অর্ধভুক্ত থেকে, নিরন্ন মানুষকে অন্ন যোগায় নি, তাদের দৈনন্দিন সুখদুঃখের ভাগীদার হয়েছিলেন। যোশীর ভাষায়, কমিউনিস্টরা সেদিন নিজেদের বিবেককে বাঁচাতে পেরেছে। সংকটে অভিভূত হয়নি। অথচ এই সেবাকার্য্য কোনো চিরস্থায়ী সমাধান হতে পারে না। কালোবাজারি, মজুতদারী ও ঠিকাদারীদের দাপটের বিরুদ্ধে এবং তাঁদের পৃষ্টপোষক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতিমুক্তি আন্দোলনের প্রেরণা জাগানো গেলো না। এটা ছিলো মহান আদর্শে দীক্ষিত হয়েও এক আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা মাত্র।  বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক ভবানী সেন স্বীকার করেছেন, ‘ মোটামুটি একথা বলা যায় যে এ যুগে আমরা আত্মরক্ষাই করতে পারলাম, জনগনের মধ্যে স্বদেশপ্রেম জাগাতে পারলাম না, জাতীয় ঐক্যর পথে স্বাধীনতার জন্য গণ-আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারলাম না’। (তৃতীয় বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে রাজনৈতিক - সাংগঠনিক রিপোর্ট)।  
জাতিয়াতাবাদী আন্দোলন  যেমন দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার বাসনায় প্রবল আত্মত্যাগের ঢেউ সারা দেশকে কম্পিত করেছে তেমন আবার  এই  জাতিমুক্তি আন্দোলনের মধ্যেও একটি বিপরিত স্রোত বইছিল। কিছু মির্জাফর, রাজবল্লভ ও জগতশেঠের দল ব্রিটিশ ক্ষমতার যেটুকু ছিটেফোঁটা ও উচ্ছিট্ট গ্রহণ করতে স্বীকৃত হয়েছিলো। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সযত্ন উদ্যোগে ভারতবর্ষে সাম্পদায়িক বিরোধের সুত্রপাত ঘটে। সমাজে প্রথিত হয় সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষের চারা।বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাদের উপনিবেশিক শাসন ও শোষণকে টিকিয়ে রাখতে ও দৃঢ় করতে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ বাধানোর উদ্যোগ নেয়। ১৮৫৭ সালে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রচেষ্টাকে বৃটিশকে বিশেষ একটা শিক্ষা নিয়েছিল।  ঐ যুদ্ধের সেনানীরা অধিকাংশই ছিলেন ধর্মে হিন্দু অথচ যুদ্ধে জয়ী হয়ে তারা সিংহাসনে বসালেন দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে। এই মহান সম্প্রীতির উদাহারণ বৃটিশ শাসকদের খুবই বিচলিত করে।   ফলে তারা কাজে, কর্মে, সরকারী নথীতে, ইতিহাসের চর্চায় ও মূল্যায়নে তাদের দৃষ্ঠিভঙ্গিতে হিন্দুকে মুসলমানের শত্রু এবং মুসলমানকে হিন্দুদের শত্রু বলে প্রমাণ করার উদ্যোগ নেয়। এর এক কদর্য পরিনতি লাভ করে হিন্দু-মুসলমানের দ্বিজাতি বিকৃত তত্ত্ব।  এছাড়াও চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের প্রভাবে হিন্দুধর্মীয় ভাবনা  জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মধ্যে যে মিশ্রণ ঘটেছিল তা মুসলমান বুদ্ধিজীবি ও সাধারণ মুসলমানেদের মনে এক বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
উত্তর ভারতে আলিগড় কলেজের মাধ্যমে উচ্চবিত্ত মুসলমানেদের আধুনিক শিক্ষার পথে নিয়ে আসতে সৈয়দ আহমেদ খান সচেষ্ট ছিলেন। কংগ্রেসের উষাকাল থেকেই সৈয়দ আহমেদ খান ও তার উচ্চশ্রেণীর অনুগামীরা কংগ্রেসের বিরোধিতার সাথে সেখানে মুসলমানদেরও প্রবেশের বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের আশংকা ছিলো কংগ্রেসের দাবী অনুযায়ী এদেশে যদি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। ১৮৯০ এর দশকে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের উত্থান তাদের আরও সন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত করেছিলো। হিন্দি না উর্দূ, এই নিয়ে বিতণ্ডা এবং তৃণমূল স্তরে গোরক্ষা আন্দোলনের হাত ধরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলি ভারতের অনেক জায়গাতে ঘটেছিল।
এর ফলে এই মুসলমান নেতৃত্বের আশংকা আরও বেড়েছিল। এর বিপরীতে ১৮৯০ এর শেষের দিকে সৈয়দ আহমেদ খান মুসলমান সাম্প্রদায়িক সংঘটন গড়ে তোলার দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। এর পরিণতিতে কয়েক বছর পরে ১৯০৬ খৃষ্টাব্দে মুসলিম লীগের জন্ম হলো।
এমত অবস্থায় ইংরেজ সরকার তাদের বিভেদনীতি প্রয়োগ করলো। ১৯০৯ সালে শাসনতান্ত্রীক সংস্কারের প্রচলন হলো যা মিন্টো-মরলি সংস্কার নামে পরিচিত। এই সংস্কারের বিধি অনুযায়ী আইনসভায়, পুরবোর্ডে ইত্যাদি সংস্থায় মুসলমানদের প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য আলাদা নির্বাচকমন্ডলীর প্রস্তাব করা হলো। বিংশ শতাব্দী ভারতের রাজনৈতিক জীবনে ও শাসনতান্ত্রীক কাঠামোয় এই বিভেদ পন্থা সাম্প্রদায়িক বিরোধকে আরো বাড়িয়ে তুলেছিল। (ঠিক ১০০ বছর পরে অর্থাৎ ১৮৯০ এর পর ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে আর এক বাল গঙ্গাধর তিলক, যিনি লালকৃষ্ণ আদবানী নামে পরিচিত, গেলেন রামলালার জন্মস্থান মন্দির গেটে। আর আজ তার পদাঙ্ক অনুসরণকারী নরেন্দ্র মোদী তুলেছেন হিন্দুত্বে জিগীর জার কোনো সারবত্তা নেই, অথচ সাম্রাজ্যবাদীরা যে পথে হেটেছিলেন এবং যে পথে আমাদের দেশবাসীকে চালিত করার চেষ্টা করছেন বর্তমানে, সেই একই পথের দিশা দেখাচ্ছে বি জে পি)এখানে আর বেশী তাতপর্য্যপূর্ণ মিন্টো- মরলি সংস্কার, মণ্টেগু-চেমসফোর্ড আয়কোর্ড আর ১৯৩২ সালের বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের কমিউনাল আওয়ার্ড। আজ স্বদেশ বাসীকে যারা প্রতারিত করে বলে দেশ ভাগ হয়েছে একমাত্র মুসলিম লীগের জন্যে, কংগ্রেস আর মহাসভার সক্রিয়তার অসংখ্য উদাহারণ, সমসাময়িক তথ্য, বই এবং সংবাদপত্র থেকে তুলে ধরা যেতে পারে।
 
১৯১৭ থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে  ‘বিপ্লবী’ ও ‘স্বাধীনতাসংগ্রামী’ সাভারকার ও তার অনুচরেরা এই যুক্তি-সংস্কার প্রক্রিয়া  ব্রিটিশের কৃপাধন্য লাভ করতে স্থীর ছিলো। ১৯৩৮ সালে সাভারকার এই বিষয়েই বলেন ‘বর্তমান সংবিধানের আওতাধীন পৌরসভা, বোর্ড এবং সংসদে হিন্দুদের জন্য নির্দিষ্ট আসনগুলি যদি হিন্দু সঙ্ঘাবলম্বী মানুষজন দখল করে নিতে পারে, তবেই হিন্দু আন্দোলনে আকস্মিক সজীবতার সঞ্চার নজরে পড়বে।   তখনি তোমার সর্বগ্রাসী অসহায়তার নিরিখে এই আন্দোলনকে অদৃষ্টপূর্ব ক্ষমতার অধিকার করে তোলা যাবে’। (সুত্রঃ- H I N D U  R A S H T R A  D A R S H A N V D Savarkar ‘If but the Hindu Sanghatanists capture the seats that are allotted to the Hindus under the present constitution in Municipalities, Boards and Legislatures you will find that a sudden lift is given to the Hindu movement so as to raise it to an incredible power in relation to your present all-round helplessness.)অর্থাৎ ‘ বর্তমান সংবিধানের আওতাধীন পৌরসভা,  বোর্ড এবং সংসদে হিন্দুদের জন্য নির্দিষ্ট আসনগুলি যদি হিন্দু সঙ্ঘাবলম্বী মানুষজন দখল করে নিতে পারে, তবেই হিন্দু আন্দোলনে আকস্মিক সজীবতার সঞ্চার নজরে পড়বে। তখনি তোমার বর্তমানের সর্বগ্রাসী অসহায়তার নিরিখে এই আন্দোলনকে অদৃষ্টপূর্ব ক্ষমতার অধিকারী করে তোলা যাবে’। এই কারণেই সাভারকারের অন্ধ সমর্থক শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বাংলায় ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেন এবং হিন্দু মহাসভার সদস্যরা যোগ দিলেন সিন্ধের মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভায়। ইতিহাসবিদ পট্টবি সীতারামাইয়া লিপিবদ্ধ করেন ঃ ‘ এটা লক্ষনীয় যে, সিন্ধের হিন্দু (মহা) সভার মন্ত্রীরা সিন্ধু বিধানসভায় পাকিস্তানের পক্ষে নেওয়ার প্রস্তাবে নীরব দর্শক হয়ে রইলেন এবং যেটুকু প্রতিবাদ করে তাঁরা সন্তুষ্ট রইলেন সে  নিতান্তুই...মামুলী।(সুত্রঃ – সীতারামাইয়া, দি হিষ্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস, বোম্বে, পদমা, ১৯৪৭, দ্বিতীয় খন্ড, ১৯৩৫-১৯৪৭, পৃ ঃ ৫১৩-৫১৪)। ‘তাঁরা নিজেদের দপ্তর থেকে পদত্যাগ পর্যন্ত করলেন না।  মুখার্জি কেবলমাত্র যে ‘আমার নেতার প্রতি বিশ্বস্ততা’- য় মুক্তকণ্ঠ হলেন তাই হয়, বাংলার গভর্নর স্যার জন হার্বাটকে লেখা একটি দীর্ঘ চিঠীতে কেমন করে ‘ভারত’ ছাড়ো’ আন্দোলনকে দমন করা যায় সে পরামর্শও দিলেন। যেন তাঁর মতো একজনের কাছ থেকে গভর্নরের কোনো পরামর্শ দরকার ছিলো! মুখার্জি লিখলেন ঃ  এইরকম একটি কঠিন সময়ে গভর্নর হিএবে আপনার সঙ্গে আপনার সহকর্মীদের সম্পূর্ণ বোঝাপড়া থাকা উচিত। এটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ...কংগ্রেসের ডাকা সারা ভারত ব্যাপী আন্দোলনের ফলে এই প্রদেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে আমাকে এখণ তার উল্লেখ করতে হবেযুদ্ধের সময়কালে যদি কেউ গণ-অনুভবকে এমনভাবে নাড়া দেবার পরিকল্পনা করে যাতে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তাহীনতা ঘটতে পারে, তবে যে কোনো সরকার, তার কার্যক্রম মেয়াদ যদি স্বল্পকালীনও হয়, তবু সে অবশ্যই এই আন্দোলনকে প্রতিহত করবে।  কিন্ত  নিছক নিপীড়নই এর সমাধান হতে পারে না। কেননা এই আন্দোলনের প্রচারকেরা একটা বিষয়ে অত্যন্ত জোর দিচ্ছেন এবং মানুষকে বিশ্বাস করাতে চাইছেন যে তাঁরাও শত্রুর এই বিঘ্ন উৎপাদনকারী আক্রমণকে প্রতিহত করতে চান।  কিন্ত  একটি ক্রীতদাস দেশ হিশেবে নয়। এক মুক্ত দেশের মানুষ হিশেবেই এ কাজে যোগ দিতে চান তাঁরা। অথচ শাসক সম্প্রদায় এ দেশের সন্তানদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতার হস্তান্তর না করার বিশয়ে একবারে স্থির প্রতিজ্ঞ...
ইংলন্ডের প্রতি ভারতবর্ষের মনোভাবের প্রসঙ্গে বলা যায়, পরস্পরের মধ্যে যদি কোনো লড়াই-ও থাকে, এই সন্ধিক্ষণে সেটা ঘটতে দেওয়া অনুচিত। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের স্থায়িত্বকে কেন্দ্র করে বর্তমানের এই যুদ্ধ সংঘটিত হচ্ছে না। সাম্রাজ্যবাদ সংক্রান্ত পুরোনো ধারণাকে এখন মাটির নিচে সমাধিস্থ করতে হবে। বর্তমান যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, কবর খুঁড়ে তাকে আর পুনরায় বাঁচিয়ে তোলা চলবে না...
আপনার আনেকদিনের পুরোনো আধিকারিকবৃন্দ এবং আমার বিশ্বাস আপনিও আন্দোলনকারীদের মতামতে প্রভাবিত। আপনারা সকলেই দেশপ্রেমিক বাঙালিদের সহযোগিতা স্বীকার করার ভাবনাতেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। কেননা খুব খারাপ পরিস্থিতির কথা ভাবলে ধরে নেওয়া যায় যে, এইসব বাঙালিরা এখনো পর্যন্ত ভারতবর্ষে ব্রিটিশ নীতির প্রতি চরম শত্রুভাবাপন্ন। আপনি যদি এই পরিস্থিতিতে আপনার দপ্তরে পূর্ণ দায়িত্ব পালন করার আশা করেন, তবে এখানেই আপনার কূটনৈতিক ক্ষমতার পূর্ণ-প্রয়োগের জন্য আপনাকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাকে যদি আমার নিজের রাস্তায় তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে দেন, তবেই এই মুহূর্তেই আমি তাদের সকলের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগ করতে পারি এবং তাদের সদিচ্ছাপূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাবকে দিতে পারি’। (সুত্রঃ– সীতারামাইয়া, দি হিষ্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস, বোম্বে, পদমা, ১৯৪৭, দ্বিতীয় খন্ড, ১৯৩৫-১৯৪৭, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, লিভস ফ্রম এ ডায়রি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৩, পৃঃ ১৭৫-৯০)।
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি


জাতীয়তাবাদী ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে  মুখার্জি ব্রিটিশকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার ইচ্ছা স্পষ্টব্রিটিশ যদি সম্মত হয়, তবে মুখার্জি অত্যন্ত উৎসাহে ব্রিটিশের আজ্ঞাবহ হয়ে তাদের সেবায় নিয়োজিত হবেন। ১৯৩৯ সালের ৯ ই অক্টোবর মুম্বই –এ তাঁদের নেতা যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তারই আওনুসরণে এটি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মহাসভা-ব্রিটিশ জোট হয়ে উঠতে পারে। মুখার্জি এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো  অবকাশই রাখেননি। ‘প্রশ্ন হলো, বাংলায় এই আন্দোলনের বিরোধিতা কীভাবে করা যায়? প্রদেশের প্রশাসন ব্যবস্থা এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে, যাতে কংগ্রেসের সর্বোত্তম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই প্রদেশের কোথাওএই আন্দোলন দানা বাঁধতে ব্যর্থ হয়। আমাদের পক্ষেই এটা করা সম্ভব। বিশেষত আমরা যারা দায়ীত্বশীল মন্ত্রী তারাই মানুষকে বলতে পারি, যে স্বাধীনতার জন্য কংগ্রেস এই আন্দোলনকে শুরু করেছে, সেটি ইতিমধ্যেই এই গণ-প্রতিনিধিত্বের মধ্যেই বিরাজমান’। (সুত্রঃ – শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, লিভস ফ্রম এ ডায়রি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৩, পৃঃ ১৭৫-৯০)। আন্দামানে পোর্ট ব্লেয়ারের নামকরণ প্রসঙ্গে বর্তমান হিন্দুত্বের প্রবক্তা সাভারকারকে জাতীয় বীরের সম্মানে মহিমান্বিত করলেন। তিনি সঙ্কেত পাঠালেন যে, তিনি এবং তাঁর দলের কেউই হিন্দুত্ব তত্ত্বের বিশয়ে ক্ষমাপ্রার্থী নন। আদবানী বললেন, ‘আজ হিন্দুত্ব একটি আপত্তিকর শব্দ হিসেবে পরিগনিত।  কিন্ত  আমাদের মনে রাখা উচিত যে, বীর সাভারকার এবং আর এস এস – এর প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ারের মতো হিন্দুত্ব অগ্রগামী প্রচারকেরা উগ্র-জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনার যে আগুন প্রজজ্বলিত করেছিলেন, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে তার অবদান রয়ে গেছে’। (সুত্রঃ – শেখর আয়ার, দি হিন্দুস্তান টাইমস, ৫ ৫ ২০০২)। নির্লজ্জ এবং ঘৃণ্য মিথ্যাভাষণ। কংগ্রেস যে মাসে সমস্ত প্রদেশে তার যত মন্ত্রী আছে সবাইকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিচ্ছে, ১৯৩৯ সালের ৯ ঐ অক্টোবর তারিখে সাভারকার বোম্বেতে ভারতবর্ষে সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূ ভাইরয় লিনলিথগো-র সঙ্গে দেখা করে বৃটিশের সপক্ষে অত্যুতসাহী সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তদানীন্তন ভারতবর্ষ বিষয়ক রাষ্ট্রসচিব জেটল্যান্ডকে লিনলিথগো রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন ঃ – ‘However, it is a fact that at a meeting with Linlithgow in Bombay on October 9, 1939, Savarkar adopted a decidedly conciliatory position vis-a-vis the British.According to Linlithgowthe situation, he [Savarkar] said, was that His Majesty’s Government must now turn to the Hindus and work with their support.After all, though we and the Hindus have
had a good deal of difficulty with oneanother in the past, that was equally trueof the relations between Great Britain and the French and, as recent events had shown, of relations between Russia and Germany. Our interests were now the same and wemust therefore work together. Even though now the most moderate of men, he had
himself been in the past an adherent of a revolutionary party, as possibly, I might be aware. (I confirmed that I was). But now that our interests were so closely bound together the essential thing was for Hinduism and Great Britain to be friends; and the old antagonism was no longer necessary.’ (সুত্রঃ - India Office (IO), Mss Eur F 125/8 1939, Letters to the Secretary of State for India: the letter is dated October 7, but the report of the meeting is in the postscript on October 9; সুত্রঃ - Hindutva’s Foreign Tie-up in the 1930s Archival Evidence, MARZIA CASOLARI, পৃ ২২৬)।  (http://www.sacw.net/DC/CommunalismCollection/ArticlesArchive/casolari.pdf)১৯৪০ সালে মহাসভা ভাইসরয়ের প্রশাসনিক পরিষদের যোগ দেওয়ার সিধান্ত নেয়।  ১৯৪২ সালে মহাসভা এবং আর এস এস ভারতছাড়ো আন্দোলনে যোগ দেয়নি। তারা গণতান্ত্রিক পরিকাঠামতে পরিচালিত সরকারের নীতির বিরোধিতা করে স্বৈরাচারী প্রথাকে সমর্থন করতেন। (সুত্রঃ - Hindutva’s Foreign Tie-up in the 1930s Archival Evidence, MARZIA CASOLARI, পৃ ২২৬)
(http://www.sacw.net/DC/CommunalismCollection/ArticlesArchive/casolari.pdf)
পণ্ডিত গবেষক জয়া চ্যাটার্জির প্রাচীন ইতিহাস সংক্রান্ত গবেষণায় দেখতে পাওয়া যায় যে, মুখার্জির সাভারাকারীর দ্বিজাতি – তত্ত্বকে অনুমোদন করে, সাভারকারের মুসলিম বিদ্বেষের সাথেও সুর মিলিয়েছেন। ‘অনেকে হিন্দু ভদ্রলোকের (এর মধ্যে মুখার্জিও রয়েছেন) মুসলমানদের প্রসঙ্গে উচ্চমন্যতার যে ধারণা সেটি এই বিশ্বাসে পুষ্ঠ ছিল যে, বাঙালি মুসলমানেরা কমবেশি হিন্দুসমাজের একেবারে পতিত শ্রেণী থেকে আসা ‘একদল ধর্মান্তরিত’। (সুত্রঃ – জয়া চ্যাটার্জি, বেঙ্গল ডিভাইডেড। হিন্দু কম্যুনালিজম এয়ান্ড পার্টিশান, কেমব্রীজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৫, পৃঃ ১৮৯। একটি পাদটিকায় দেখা যায় যে, মুখার্জি নিজের একটি তারিখবিহীন টীকা থেকে এটি নেওয়া হয়েছে)সাভারকার, গোলয়ালকর এবং মুখার্জির হিন্দু ও মুসলিম , দুই জাতি তত্ত্বেকে স্বীকৃতি দেবার সাথে সাথে মনে করতেন মসলিমরা মানবজাতির ইতরযোনিত। এই বিকৃত যুক্তিবোধের আলোতে তাঁরা দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সুওচনাকে সাভারকার কি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতেন সেটার নিদর্শন তুলে দেওয়া হল।
If India, becuase it was a territorial unit and called a country must be a national unit as well, then all of us must also be Indians only and cease to be Hindus or Moslems, Christians or Parsees. So they, the leaders of those first generations of English educated people, being almost all Hindus, tried their best to cease themselves to be Hindus and thought it below their dignity to take any cognizance of the divisions as Hindus and Moslems and became transformed overnight into Indian patriots alone. ... It is to be noted that the British Government favoured the movement and it was a Viceroy who sponsored it ! Many a prominent British civilian like Mr. Hume, Wedderburn and others led it for a long time. Great Hindu leaders from the most public-spirited motives nursed it and it became the organised and authoritative spokesman of the new cult of Indian Patriotism.(সুত্রঃ- V D Savarkar, H R D, Page 22,23)অর্থাৎ ‘ ভারতবর্ষ যেহেতু বিভিন্ন আঞ্চলিক বিভাগে বিভক্ত একটি স্থান কাজেই একে যদি একটি দেশ হিসাবে কল্পনা করতে হয় তবে তার যেমন একটি জাতীয় সীমারেখা থাকতে হবে, তেমনি এরই সঙ্গে নিজেদের হিন্দু, মুসলিম বা খৃস্টান বা পার্শী বলে না ভেবে অবশ্যই ভারতীয় বলে ভাবতে হবে। সেকারণেই তারা, আমাদের প্রথম যুগের ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষজনের নেতারা, যাদের প্রায় সকলেই ছিলেন হিন্দু, তাঁরা প্রাণপণে নিজেদের হিন্দু না ভাববার চেষ্টা করতেন। তাঁদের চিন্তায়, হিন্দু-মুসলিম বিভাজন যে কোনোরকম স্বীকৃতিই তাঁদের কাছে মর্যাদাহানিকর ছিল। রাতারাতিই তাঁরা সকলেই কেবলমাত্র ভারতীয় দেশপ্রেমিক হয়ে উঠেছিলেন... তাই বৃটিশ সরকার যে এই আন্দোলনকে প্রশ্রয় দিয়েছিল এবং একজন ভাইরয় এতে যোগও দিয়েছিলেন, একথা মনে রাখতে হবে। মি হিউম, ওয়েডারবার্ন এবং আরো অন্যান্য অনেক বৃটিশ রাজকর্মচারী দীর্ঘকাল এই আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। জন- উন্মাদনী উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য মহান হিন্দু নেতারাও একে লালনপালন করেছেন। অবশেষে এটি ভারতীয় দেশপ্রেমের নতুন ঘরানার সংঘটিত এবং কর্তৃত্বকারী মুখপাত্র হয়ে উঠল’। অতএব সাভারকারের মূল্যায়নে কংগ্রেস হলো ব্রিটিশের সৃষ্টি এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও তার বিকাশকে কে প্রতিহত করতে সাভারকার বিকৃত সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদীর  অন্ধ-পঙ্কিল আবর্তে হিন্দুদের প্রবেশ করার জন্যে প্ররোচিত করলেন।  ‘হিন্দু সঙ্ঘাবলম্বীরা, আসুন আমরা সেই মৌলিক ভুলটি সংশোধন করি। সেই আদিম রাজনৈতিক পাপ, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসী আন্দোলনের সূচনাতেই আমাদের হিন্দু কংগ্রেসীরা যে ভুলটি করেছিলেন। আর অঞ্চলগত ভারতীয় রাষ্ট্রের মরীচিকার পিছনে ছুটে বেড়িয়ে আর তাঁরা সেই একই ভুল করে চলেছেন। একটি সজীব হিন্দু রাষ্ট্রের জন্ম ও বিকাশের সম্ভাবনাকে এই ভুলের কারণেই তাঁরা অঙ্কুরে বিনাশ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন’। ( সুত্রঃ – HRD)Hindu Sabhaits and Hindu Sanghatanists ! Only see to it that on the eve of such a probable, miraculous development in near future, do not play coward to your conscience under the weight of the present or get stampeded by the pseudo-nationalistic forces into any unbecoming pacts and do not sell you birth-rights for the mess of pottages, and play coward to your own conscience ! Hold fast to the programme chalked out above for the present, plain though it may seem and get not yourselves trapped into any untimely ourburst, which, instead of bringing you near success may only serve to find you entirely disabled, to catch the tide of fortune which in all probability is likely to reach your shores under the pressure of the war !
In any case, hold fast to the crux of the Hindu Sanghatanist ideology which shall serve you in any event, the Future may infold, namely :-
‘Hinduise all politics and Militarise Hindudom !’
Hindu Dharm ki Jaya ! Hindu Rashtra ki Jaya !
Vande Mataram
নিজের বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় সাভারকার জাতীয় পতাকা হিসেবে ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকাটিকে প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জাইনিয়েছিলেন ‘গেরুয়া পতাকা-ই হবে ভারতের জাতীয় পতাকা। বৈদিক যুগ থেকে আমাদের জাতিগোষ্টী যে ভাবাবেগের জয়গান গেয়ে এসেছে, ওম, স্বস্তিক এবং তরবারি, এই পতাকাই সেই ভাবাবেগের কাছেই তার আবেদন জানাবে’।  The Pan-Hindu Flag :- The 'कुंडिलनी कृपाणां􀇑कत' Gerua Flag shall be the Flag of the Hindu Nation. With its OM, the Swastik and the Sword, it appeals to sentiments cherished by our race ever since the Vaidic days. Those who like to realise the inner spirit and know the raison d'etre of its design and the symbols would do well to read the special tract I have written styled 'the Pan Hindu Dhwaj.' It must be emphasized in this connection that all those Hindu flags other than this which are current amongst the Hindus as the colours of the different constituents which go to form our Pan-Hindu Spirit. Nor should it be supposed that the Hindu Flag implies any inherent antagonism to the several colours of our non-Hindu countrymen. The Moslems are welcome to have their own religious colours to represent their own community. In short we shall respect any Flag which any section of our countrymen adopts whether religious or political, whether it is the Moslem League Flag or the Congress Tri-colours or the Red one,-so long as it continues to respect in return the pan-Hindu Flag and does not antagonise it but continues as allied colours. But Hindudom as a whole will be represented by the pan-Hindu Flag alone.(সুত্রঃ – HRD, Page 46) অর্থাৎ ‘না ঃ একমাত্র ভাগোয়া, (গৈরিক পতাকা) যার বুকে অঙ্কিত আমাদের জাতিসত্তার আপন উপস্থিতিরর প্রকাশে উদ্ভাসিত কূণ্ডলিকা এবং কৃপাণ, সেটি ছাড়া সিন্ধু থেকে সমুদ্র অবধি বিস্তৃত অবিচ্ছিন্ন, অবিভক্ত আমাদের মাতৃভূমি হিন্দুস্থানের আর অন্য কোনো কর্তৃত্বপ্রকাশী জাতীয় পতাকা হতে পারে কি! এটি কারো ফরমাশে গড়া নয়, আমাদের জাতিস্বত্তার অভিব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে এটি স্বতোদ্ভাষিত... গেরুয়া পতাকা-ই হবে ভারতের জাতীয় পতাকা। বৈদিক যুগ থেকেই আমাদের জাতিগোষ্ঠী যে ভাবাবেগের জয়গান গেয়ে এসেছে, ওম, স্বস্তিক এবং তরবারী লাঞ্ছিত এই পতাকা সেই ভাবাবেগের কাছেই তার আবেদন জানাবে’। ৮ই আগস্ট, ১৯৪২ সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটি ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সিধান্ত গ্রহনের সামান্য পূর্বে গান্ধীজী এক বিখ্যাত ভাষণে বললেন ঃ- ‘ডঃ মুঞ্জে এবং শ্রী সাভারকারের মতো যেসব হিন্দু, মুসলমানদের হিন্দুদের আধিপত্যে রাখার জন্য তলোয়ারের রাজত্ব প্রতিষ্টায় বিশ্বাসী, আমি হিন্দুদের সেই অংশের প্রতিনিধি নই। আমি কংগ্রেসের প্রতিনিধি’। (সুত্রঃ- রুদ্রাংশু মুখার্জী সম্পাদিত দি পেঙ্গুইন গান্ধী রিডার, পেঙ্গুইন বুকস, ১৯৯৩, পৃ  ১৬৭)। গান্ধী এবং সাভারকারের অবস্থান একেবারে দুই বিপরীত জগতে। তাঁদের উভয়ের মতাদর্শ তীব্রভাবে পরস্পর সংঘাতী। গান্ধীজি ভারতীয় জাতীয়তাবাদ প্রচার করে গেছেন  কিন্ত  সাভারকার সেই জাতীয়তাবাদী মতবাদকে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে বিকৃত করেছিলেন। স্বভাবতই, সেই কারণেই সাভারকার ১৯৪৭ সালের ২২ শে জুলাই ভারতীয় সাংবিধানিক গণপরিষদে গৃহিত ভারতের জাতীয় পতাকাটি – ও বাতিল করে দিয়েছিলেন। ‘সমগ্র গন-পরিষদে উঠে দাঁড়িয়ে’ সর্বসম্মতিক্রমে এই পতাকাটির  প্রবর্তনা করেছিল।  এই আলোচনার শেষ বক্তা শ্রীমতি সরোজিনী নাইডু তাঁর মর্মস্পর্শী উপসংহারে বললেন, ‘আমরা যাই হই না কেন, হিন্দু বা মুসলমান, জৈন, খৃষ্টান, শিখ কিংবা জরথুষ্ট্রীয় এবং অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী, আমাদের ভারত জননী অভিন্নহ্রদয়া, অবিভক্ত উদ্দীপনায় উদ্ভাসিতা। পুনর্জাত এই ভারতভূমির সমস্ত নারীপুরুষ উঠে দাঁড়াও, এই পতাকাকে অভিবাদন জানাও’। গণপরিষদের রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ এই একতার সুরটি অনুভব করে বললেন,  ‘সদস্যরা আমি বলবো, যে সিধান্ত অনুসারে তাঁরা পতাকার প্রতি তাঁদের সম্মান প্রদর্শন করেছেন, আধ মিনিট নিজ নিজ অবস্থানে উঠে দাঁড়িয়ে সেই সিধান্তের প্রতি তাঁদের সমর্থন ব্যক্ত করুন’। 
এক সপ্তাহ পরে, জুলাই মাসের ২৯ তারিখে সাভারকার, একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন, যেখানে গান্ধীজির পরতি তির্যক কটাক্ষে তিনি ‘চরকা’-র পরিবর্তে সারনাথের অশোক-স্তম্ভের ‘চক্র’- টিকে সংযুক্তিরকে স্বাগত জানান। তার বয়ানে চরকাটি তার সঠিক স্থান কোনো বয়ন সঙ্ঘের প্রতিক হিসেবে বেশ মানাসই। ‘
It is interesting to note that the Constituent Assembly with a large majority of Congressites should have unanimously removed the Charkha from the Flag which it adopted as the colours of the Indian Union and just as I had suggested publicly in the telegram sent to the Flag Commitlee-with a sincere desire to render the Flag as unobjectionable-as possible, should have replaced it by the Chakra as it obtained on the Ashok’s Pillar at Sarnath. It constituted indeed a standing insult to the. intelligence of the Congressites that at they should have continued so long to inscribe the fantastic spinning wheel on their flag and should have hotly demanded that it must be recognised as a national Standard of India! This old altitude of the Congressites provoked naturally a sturdy opposition which led by the Hindu Sanghatanist? in particular had at last succeeded in getting the-symbol Charkha removed and relegated to its proper sphere-—the khadi bhandar, where it may fittingly serve as a trademark of any spinning association
এর সঙ্গে তিনি আরও বলেন,
Having thus noted impartially the good points in the new Flag adopted for the Indian Union which render it much less objectionable, I must emphatically state it can never be recognised as the National Flag of Hindusthan. Firstly, because the state of Indian Union and the so-called - Constituent Assembly are the creation of the British will and not of the free choice of our people ascertained by a national plebiscite and their ultimate sanction even to-day is the British bayonet and not the national consent or national strength. Secondly, the very mention of the Indian Union reminds us of the break-up of the Unity of India as a nation and a state, the vivisection of our Motherland, and the treacherous congressite abetment of that crime. How can a genuine nationalist salute such a Flag adopted by such a party with no mandate from the nation as a National Flag!
No! The authoritative Flag of Hindusthan, our Motherland and Holyland, undivided and indivisible from the Indus to the Seas, can be no other than the Bhagava with the Kundalini and the Kripan inscribed on it to deliver expressly the message of the very Being of out Race! It is not made to order hut it is self-evolved with the evolution of our National Being. It mirrors the whole panorama of our Hindu History, is actually worshipped by millions on millions of Hindus and is already flying from the summits of the Himalayas to the Southern Seas. Other Party Flags will be tolerated, some may even be respected in corresponding courtesy but Hindudom at any rate can loyally salute no other Flag but this Pan-Hindu Dhwaja. this Bhagava Flag, as its national Standard. (সুত্রঃ-  Historic Statements by Savarkar, Popular Publications, Mumbai, 1967, Edited by S. S. Savarkar and G M Joshi)

মিথ্যা আর গুজব হলো সাম্প্রদায়িকতার  পুরোণো হাতিয়ার। সাভারকারের বিভিন্ন বক্তব্য ও লেখনিতে তার চিহ্ন পাওয়া যায়। ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে সাভারকার গান্ধী আর নেহেরুর প্রস্তাবনাকে এই বলে দোষারোপ করেছেন যে, তাঁদের ভাবাদর্শ ছিলো পশ্চাদগামী। কিছু মন্তব্য এখানে প্রাসঙ্গিক।
It is interesting to remind you here how two prominent Congress Presidents proposed to solve this problem of a National tongue and a National Script. Pandit Nehru thinks, leaving even Maulana Abul Kalam Azad far behind who only proposes Hindusthani which he assures us is tantamount to Urdu,-that the highly Arabianised Urdu of the Aligarh School or the Osmania University School is best fitted to be the National Language of India Including of course some twenty-eight crores of Hindus.’ (HRD, Page 48) অর্থাৎ ‘মৌলানা আবুল কালাম আজাদ যিনি হিন্দুস্থানীকে উর্দূর তুল্যমূল্য বলে আমাদের আশ্বস্ত করে তবে এর স্বপক্ষে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেই আজাদকেও পেচনে ফেলে পণ্ডিত নেহরু ভাবছেন, ভারতবর্ষ, যেখানে প্রায় আটাশ কোটি বা ঐরকম সংখ্যক হিন্দু রয়েছেন, সেখানে ভারতের জাতীয় ভাষা হিসেবে আলিগড় কিংবা ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘরানার উর্দূই জাতীয় ভাষা’। 
In demanding three votes for one Moslem, the Moslem League is outrageously communal : while in calling upon the Hindus to yield to this demand and acceed to the proposal of one vote for three Hindus, the Congress is cowardly communal !’ (HRD, Page 53)
What is most surprising to note is the fact that these Hindu leaders outbid even the Ali Brothers, the 'National' Maulana Azad and other Moslem leaders in maintaining that if the Amir succeeded in capturing Delhi, we would have won Swaraj !-for, they definitely stated that the rule of the Afghans was in itself a Swaraj( HRD, Page 55) অর্থাৎ ‘ একজন মুসলিম পিছু তিনটি ভোট এই দাবী তুলে মুসলিম লীগ একেবারে খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে। তেমনি সেই দাবির প্রতি সমর্থন এবং তিনজন হিন্দু পিছু একটি ভোট এই প্রস্তাব অনুমোদন করার জন্য হিন্দুদের আহ্বান জানিয়ে কংগ্রেস কাপুরুষের মতো সাম্প্রদায়িক হয়ে পড়েছে’। ‘যে তথ্যটি লক্ষ্য করে সবচেয়ে বিস্মিত হতে হয় তা হলো, এইসব হিন্দু নেতারা, অন্য সব মুসলিম নেতাকেও এমনকি আলি ভ্রাতৃদ্বয়, ‘জাতিয়তাবাদী’ মৌলানা আজাদকেও ছাড়িয়ে গেছেন। আমির যদি দিল্লি দখল করতে পারে তাহলে আমরা স্বরাজ জয় করে নিতে পারবো এমন ধারা কথাই তাঁরা বলে চলেছেন!—অর্থাৎ আফগানদের শাসনই হলো আসলে স্বরাজ এই কথাটাই নির্দিষ্টভাবে তাঁরা বললেন’। ‘In his own Young India, Gandhiji admitted that the Afghans if successful were sure to establish their kingdom in India (see Young India 1-6-21)-and yet these Congressite Hindu leaders did not dissociate themselves from the Moslem leaders in their open and secret activities to peg on the Afghan Invasion, but on the contrary promised support to this treacherous move.(HRD. Page 55) অর্থাৎ ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে, প্রাক্তন আমির আমানুল্লা খানকে ভারতে ইসলামের ভাগ্যনির্ধারিত উদ্ধারকর্তার ভূমিকা পাল্পন করতে হয়েছিল। আর গান্ধীজীর পরোক্ষ্য বিশ্বাসঘাতী সম্মতির সহায়তায়, দুই মহান ‘জাতীয়তাবাদী’ নেতা, আলি ভ্রাতৃ-দ্বয় ভারতের সম্ভাব্য অভিষিক্ত সম্রাট হিসেবে তাঁকে দিল্লি নিয়ে আসার ষড়যন্ত্র করলেন’।

 ভি ডি সাভারকার

১৯৪৬ সালের ভাত্রীঘাতী যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িকতার দোষে উন্মত্ত গৃহযুদ্ধ দেশের শ্রমজীবী মানুষের কাছে ছিল এক নিদারুণ স্বপ্নভঙ্গের ট্র্যাজেডি। দেশের মজুর শ্রেণী স্বপ্ন দেখেছিল, সে তামাম দেশের সমাজ কে বদলিয়ে দেবে,  কিন্ত  সেই স্বপ্নের ফুল ফুটতে না ফুটতেই ঝরে গেল। মজুরের স্বপ্ন  পুড়ে ছাই করে দিল ভাত্রীঘাতী যুদ্ধ। বিপ্লবের সামনে দানবাকারে প্রতীয়মান হল প্রতিবিপ্লব। প্রতিবিপ্লবের বিষাক্ত ছোবলে ঝিমিয়ে গেলো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী –জাতিমুক্তি-সমাজবদলকারী প্রগতিশীল শক্তি। ডঃ গঙ্গাধর অধিকারীর মতে ‘যে-জনগণ মাত্র কয়েকমাস---এমনকি কয়েকদিন আগে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের যুক্ত হিন্দু-মুসলিম সংগ্রামের অত্যাশচর্য ঘটনা ঘটিয়েছে ও ব্রিটিশ প্রভুদের ভেতরে ভেতরে আতঙ্কের তরঙ্গ সঞ্চার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের প্রতি –আক্রমণ হল দাঙ্গা’। (রিসার্জেন্ট ইন্ডিয়া, পৃ ঃ ১২)।   ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান সমস্যা ঃ হিন্দু-মুসমান সমস্যা । প্রধান প্রশ্ন ঃ জাতি ঐক্যের প্রশ্ন- যার ভিত্তি কংগ্রেস-লীগ বোঝাপড়া।  কিন্ত  সাম্রাজ্যবাদীদের পরিকল্পনা এবং প্রতিক্রিয়ার স্রোত এই ধারণার বিপরীতে বইছিল। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নেতৃত্বের মধ্যে দ্বিজাতি তত্ত্বকে কখনো  প্রকাশ্যে আবার কখনো পরোক্ষে মদত যুগিয়েছে এই সাম্রাজ্যবাদীরা এবং তাদের তাবেদার দেশীয় মুসুদ্দি শ্রেণী।  কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও জাতি-ধর্মের সম্পর্কের নিরিখে এই ভ্রান্ত ধারণা বিরাজ করছিলো। তাদের এযাবৎ ধারণা ছিল- পাকিস্তানের দাবী যুক্তিসঙ্গত, কারণ এই দাবির পেছনে রয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য স্বাভাবিক ব্যাকুলতা। লেনিন ও পরবর্তিকালের স্তালিনের জাতি গঠন প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণে, জাতি গঠনে ঐতিহাসিক  প্রক্রিয়ায় যে উপাদনগুলি সম্মেলিত ও বিকশিত হয়, সেই ধারণার  সম্যক উপলব্ধির বোধহয় অভাব ছিলো কমিউনিস্ট পার্টিতে। A nation is a historically constituted, stable community of people, formed on the basis of a common language,territory, economic life, and psychological make-up manifested in a common culture. It goes without saying that a nation, like every historical phenomenon, is subject to the law of change, has its history, its beginning and end. It must be emphasised that none of the above characteristics taken separately is sufficient to define a nation. More than that, it is sufficient for a single one of these characteristics to be lacking and the nation ceases to be a nation(সুত্রঃ- স্তালিন রচনাবলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃঃ ৩০৭)।
 
 জে ভি স্তালিন।
তৎকালীন বাস্তব পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের তাবেদার দের মধ্যে জাতিমুক্তি আন্দোলনে এই বিষবৃক্ষ্য যে ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত ও পল্লবিত হয়ে দানবাকারে এক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, সেই উপলব্ধি করার এবং প্রতিহত করার শক্তি তখনও সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি কমিউনিস্ট পার্টি। কানপুর ষড়যন্ত্র , মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার প্রভৃতি যাবতীয় দমন-পীড়ন ও অবৈধ থাকা কালীন দেশের জাতিমুক্তির আন্দোলনের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে থেকে প্রায় দুই  দশকের অধিক দূরে থাকতে হয়েছে এই বিপ্লবী পার্টিকে। মীরাট ষড়যন্ত্রের মামলা চলাকালীন এই নবজাত পার্টির ওপর সাম্রাজ্যবাদী দমনপীড়নের স্টীমরোলার চলেছে। নেতারা সব কারারুদ্ধ। চারদিকে বাধার অন্ত নেই।  কিন্ত  দুনিয়াজোড়া বিপ্লবী মজুদের আন্দোলন, রুশ বিপ্লবের বিজয় ছিলো দেশের কমিউনিস্টদের আলোকবর্তিকা  ও অনুপ্রেরণা। যাই হোক, ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে ভারত সফরে এসে রজনী পাম দত্ত সরাসরি দেশবিভাগের বিরোধিতা করেন এবং মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবীকের প্রতিক্রিয়াশীল বলে চিহ্নিত করেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কমিউনিস্ট পার্টি মন্ত্রী-মিশনের কাছে একটিমাত্র সংবিধান পরিষদের দাবী জানায়। পাকিস্তান কথাটা আর উচ্চারিত হয় না। আরও বলা হয় যে সমস্ত ভারতবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে এক রাষ্ট্রের মধ্যে বাস করলেই বরং সকলের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকবে। ব্রিটিশ সরকারের কাছে কমিউনিস্ট পার্টি দাবী জানায় কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে অস্থায়ী সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্যে।  কিন্ত  দেশ যে গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টি তার মুখপাত্র ‘স্বাধীনতা’য় বার বার সতর্ক বাণী উচ্চারিত করতে থাকে। ১৬ ঐ আগস্ট, শহীদ সুহরাবর্দী পাকিস্তানের দাবীতে ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রামের’ ডাক দিলেন। লেগে গেলো কুখ্যাত ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও মুসলিম লীগের নিষ্ক্রিয়তার ফলে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ প্রাণ দিলেন। (সুত্রঃ - ‘The Report of Harwick Donald Ross, Police Commissioner of Calcutta, On the disturbances between 16th to 20th August 1946, State Archives, WB Govt.)এই প্রত্যক্ষ সংগ্রামের আবেদনের নিরিখে কমিউনিস্ট পার্টির আগাম সতর্কবার্তা  ‘...লীগ নেতাদের সংগ্রাম যদি হয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে, তাহাতে হিন্দু ও মুসলিম, কংগ্রেস ও লীগ উভয়েরই অমঙ্গল—ইহাতে সুযোগ হইবে শুধু বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের, সুযোগ হইবে ক্লাইভ স্ট্রিটের, সুযোগ হইবে জমিদার চোরাকারবারী ও দুর্নীতিপরায়ণ আমলাদের। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সরাসরি পৃথক সংগ্রামে পরাজয় নিশ্চিত হইলেও তাহাতে অতীত কংগ্রেসের ইতিহাস গৌরবান্বিত হইয়াছে,  কিন্ত  কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লীগের সংগ্রামে লীগের ইতিহাস গৌরবান্বিত হইবে না। ঘরোয়া লড়াই ও ব্যাপক দাঙ্গার ফলে দুঃখের অন্ধকারে দেশ ডুবিয়া যাইবে। মিলিত সংগ্রামের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের আসন চিরস্থায়ী হইবে...১৬ আগস্টের প্রাক্কালে আমরা জাগ্রত এবং হুঁশিয়ার মুসলিম জনগনের কাছে আবেদন জানাই----আপনাদের জন্যই নেতারা খেতাব ছাড়িয়ে দিতে বাধ্য হইয়াছেন; আপনারাই নেতাদের ঘরোয়া যুদ্ধের রাস্তা হইতে ফিরাইতে পারেন। ভ্রাতৃবিরোধের পথ হইতে নেতাদের ফিরান, কৃষক, শ্রমিক ও কেরাণীদের প্রত্যেকটি মিলিত সংগ্রামকে শক্তিশালী করুন, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মিলিত সংগ্রামের শপথ লইয়া নেতাদের আপোষহীন সংগ্রামের  পথে লইয়া চলুন’। (সুত্রঃ – স্বাধীনতা, ১৫ ০৮ ৪৬)।  এই প্রত্যক্ষ সংগ্রামের কর্মসুচীতে মুসলিম লীগের মধ্যেও দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। আবুল হাশিমের মতে ‘খাজা নাজিমুদ্দিন ও লাহোরের রাজা গজনফর আলি খান সভায় ভাষণ দেন। ‘খাজা নাজিমুদ্দিন বলেন, ‘আমাদের লড়াই কংগ্রেসের ও হিন্দুদের বিরুদ্ধে’। মাইক্রোফোন থেকে তাঁকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, ফোর্ট উইলিয়াম-এর দিকে আঙুল দেখিয়ে আমি ঘোষণা করি যে আমাদের লড়াই ভারতের জনসাধারণের বিরুদ্ধে নয়, ফোর্ট উইলিয়াম – এর বিরুদ্ধে। আমরা যখন মঞ্চে আছি তখন সবদিকে থেকে খবর এল যে কলকাতার প্রত্যেক মহল্লায় ভয়ঙ্গকর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে... মিস্টার সুহরাবর্দী ১৬ আগস্টকে সর্বাত্মক ছুটির দিন ঘোষণা করলেন। তিনি বিরাট ভুল করেছিলেন। শান্তিপ্রিয় হিন্দু ও মুসলমানদের এই দাঙ্গার সঙ্গে কোন, বা প্রায় কোন, সম্পর্কই ছিল না। এই দাঙ্গা যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্ররোচকরাই সংগঠিত করেছিল তার পুরো সমর্থন পাওয়া গেল, সেই ভয়ানক সংগ্রামের দিবসের পরের ঘটনাবলি থেকে। ১৬ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত দাঙ্গা পুরোদমে চলল’। (ইন রেট্রসপেক্ট, পৃ ঃ ১১৭)। ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা ও গৃহযুদ্ধ নিবারণের উদ্দেশ্যে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বশেষ ও নিষ্ফল প্রয়াসের প্রতিফলন ‘স্বাধীনতার’ নিবন্ধে ঃ- ‘...মনে রাখিতে হইবে যে লীগের কোনো কোনো নেতা বলিয়াছেন, এ সংগ্রাম কংগ্রেসেরও বিরুদ্ধে। যে লীগপন্থী জনসাধারণ কংগ্রেসী ভাইদের সঙ্গে ঝান্ডায় ঝান্ডা মিলাইয়া রসিদ আলি দিবস ও নৌবিদ্রোহ লড়িয়াছেন, কংগ্রেস ও লীগ একসঙ্গে লড়িলেই বৃটিশকে হারানো যায় তাহা দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় শিখিয়াছেন----সেই মুসলিম জনসাধারণ নেতাদের এই কথায় সায় দিবেন না তাহা আমরা জানি,  কিন্ত  ১৬ আগস্টের উত্তেজনার মধ্যে যদি তাঁহারা জোর করিয়া কংগ্রেসী ভাইকে হরতালে মানাইতে যান, কংগ্রেস-বিরোধী উত্তেজনায় অংশগ্রহণ করেন তবে ১৬ আগস্টের সমস্ত উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হইয়া যাইবে, বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের বদলে বৃটিশই আসিয়া হিন্দু ও মুসলিম উভয়কে শাসাইবে। ১৬ আগস্টে  একথা যেন তাঁহারা কিছুতেই না ভোলেন।
  ঐদিন হিন্দু জনসাধারণের কাছে আমরা আবেদন করি ঃ লীগের নেতারা যা কিছুই বলুন না কেন, মুসলিম জনগণের বৃটিশ- বিরোধী উন্মাদনা আপনারা চোখের সম্মুখে দেখিতে পাইতেছেন। আজ তাঁহাদের অন্তরের আবেগকে সমর্থন করিয়া স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করিবেন, না নেতাদের ভেদনীতির দিকে তাঁহাদের ঠেলিয়া দিয়া নেতাদেরই উদ্দেশ্য সাদন করিবেন? আমরা বিশ্বাস করি যে কোন স্বাধীনতাকামী হিন্দুই এই সাম্রাজ্যবাদ- বিরোধী উচ্ছাসকে গৃহযুদ্ধে পরিনত হইতে দিতে চান না। তাই আমরা আবেদন করি ঃ উত্তেজনার বশে সেদিন যদি কোন মুসলমান জবরদস্তি করিয়া বসেন, তবে ভাইয়ের ভুল ভাবিয়া উহা হাসিয়া উড়াইয়া দিবেন, পরস্পর – বন্ধুত্ব ও সমর্থনের  সাহায্যে সকল মলিনতা কাটাইয়া তাঁহাদের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনকে প্রকৃত লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাইয়া দিবেন’। (স্বাধীনতা, ১৬ ৮ ৪৬)।
সরোজ মুখোপাধ্যায় লিখছেন ঃ- ‘ কিন্ত  বিপরীত ঘটনা ঘটতে শুরু করলো ১৬ আগস্ট ভোর রাত থেকে। সেই মর্মান্তিক ভ্রাতৃঘাতী ঘটনাবলী বিবৃত করার ভাষা কারোর সেদিন ছিল না। হৃদয় বিদারক দৃশ্য, সকাল থেকে সমস্ত বড় রাস্তার ধারে ধারে সারি সারি মৃতদেহ। হিন্দু সংখ্যাধিক এলাকায় শত শত হিন্দু নরনারীর মৃতদেহ, আর মুসলিম সংখ্যাধিক এলাকায় শত শত মুসলিম নরনারীর মৃতদেহ। ...ইংরেজ সাহেবরা স্বচ্ছন্দেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ তাদের গায়ে হাত দিচ্ছে না।লালঝান্ডা হাতে কমিউনিস্টরা এলাকায় এলাকায় বেরিয়ে পড়ে----- কিন্ত  জঘন্য নৃশংস হত্যাকাণ্ড চলিতেই থাকে। ...একদল মুসলিম যুবক ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের বাড়ি আক্রমণ করে। কমিউনিস্ট নেতা মনসুর হবিব মুসলিম জনতাকে সাহসের সঙ্গে এই আক্রমণ বন্ধ করতে, এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ, থেকে বিরত থাকতে আবেদন জানান। তারা সাময়িকভাবে নিরস্ত হলেও অলিতে গলিতে প্রবেশ করে হত্যালীলা চালাতে থাকে’। (সুত্রঃ – ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও আমরা, পৃ ৪০২-৪০৩)। সোমনাথ লাহিড়ী বলছেন, ‘এদিন মুসলমানরা আসলে চেয়েছিল হরতাল করতে—দোকানপাট বন্ধ করতে। হিন্দুরা যদি মারামারিতে সক্রিয় ভূমিকা না নিত---তাহলে বিক্ষিপ্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে দিনটা পার হয়ে যেত।  কিন্ত  দেখা গেল – শিয়ালদহ থেকে যে শোভাযাত্রা আসছিল ওয়েলিংটন পর্যন্ত ---সেই শোভাযাত্রার উপর হিন্দুরা বেধড়ক ইঁট মারে, রাস্তার দুধারে বাড়ির ছাদে ইঁট জড়ো করেছিল হিন্দুরা। মুসলমানরা বদলা নেয় ওয়েলিংটনের পর থেকে। দোকানপাট ভাঙচুর করে---লুঠপাট করে। পাটেলের বক্তব্যে দাঙ্গায় হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার ছাপ পড়লো যখন তিনি জানালেন যে কলকাতার দাঙ্গায়, খুনোখুনিতে হিন্দুরাই এগিয়ে ছিল। (সুত্রঃ- সর্দার পাটেল করেসপন্ডেন্স, দুর্গাদাস সম্পাদিত, তৃতীয় খণ্ড, পৃঃ – ১৪৮)। কলকাতার নৃশংস দাঙ্গার ও হিংসাত্মক ঘটনার প্রতিশোধে নোয়াখালীতে অক্টোবারে দাঙ্গা শুরু হল। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এবং কৃষোক সভার ইতিবাচক ভূমিকায় মৃতের সংখ্যা ৩০০ তেই সীমিত থাকলো। (সুত্রঃ- আবদুল্লা রসুল, A History of the Indian Kisan Sabha, 1974, Page 141-142)তারপর কলকাতার যে চেহারা দাঁড়াল---তা সকলের অচেনা এবং কল্পনার বাইরে... সোহরাবর্দী মুসলমান জনতাকে কিছু বুঝিয়ে হিন্দু জনতার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতেই দেখা গেল যে হিন্দুরা তাঁর কোন কথা শুনতে প্রস্তুত নয়। উপরন্তু তাদের মধ্যে আক্রমণের মনোভাব খুব বেশী। একটা লাঠির আঘাতে গাড়ির উইন্ড স্ক্রিন ফেটে যায়। সোহরাবর্দীর গালে একটা ইঁটও এসে লাগে। তখন ভূপেশ গুপ্ত ও ধীরেনবাবু (কংগ্রেসের ধীরেন মুখার্জি) হিন্দু জনতার মধ্যে গিয়ে বুঝাতে থাকেন এবং সোহরাবর্দীকে মসলমান এলাকায় যেতে বলা হয়। মিলিত শান্তি স্কোয়াডের কাজ এখানেই শেষ হয়। বহুদিনের ইন্ধন দেওয়া গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠবার পর তাকে খুশিমতো নেভাবার ক্ষমতা নেতাদের থাকে না’। (স্বাধীনতা, ২ ৯ ১৯৪৬)।   ‘ভ্রাতৃহত্যা বন্ধ কর !---- ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই এখনই বন্ধ করুন। শরতবাবু ও সোহরাবর্দী সাহেব হইতে আরম্ভ করিয়া  সকল দলের নেতাই আপনাদের কাছে আবেদন করিয়াছেনযে আবেদন সফল করিয়া নিজ নিজ দলের সম্মান বাঁচান। বিরোধ মীমাংসার ভার নেতারা লইয়াছেন। সে ভার তাঁহাদের হাতে ছাড়িয়া দিয়া আমরা সকলে একত্রে আবার আমাদের সেই পুরানো কলিকাতা, হিন্দু-মুসলমানের কলিকাতা, বৃটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ কলিকাতা ফিরাইয়া আনি’। ...কমিউনিস্ট কর্মীদের প্রতি আহ্বান ভবানী সেনের (সম্পাদক, বাংলা কমিটি, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি)। (ক) আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধ হইতে কলিকাতার উন্মত্ত নাগরিকদাএর ফিরান। কংগ্রেস- লীগ- কমিউনিস্ট নেতারা পাড়া ও মহল্লায় সকল সম্প্রদায়ের সহিত একত্রে শান্তিবাহিনী গঠন করিতে নির্দেশ দিয়েছেন। ওই নির্দেশ অনুসারে কাজ করুন। (খ) নিজ নিজ পাড়া ও মহল্লাকে সকলে একত্র হইয়া রক্ষা করুন, বাহিরের কোন উত্তেজনা ও প্ররোচনায় নিজের পাড়া বা মহল্লার শান্তি ভঙ্গ হইতে দিবেন না। (গ)প্রত্যেকে নিজ নিজ পাড়ার আহতদের সেবার ভার লউন, নিরাশ্রয়দের আশ্রয় দিন, নিঃস্বদের সাহায্য করুন, উপবাসীকে খাদ্য দিবার চেষ্টা করুন...’ (স্বাধীনতা, ২০ ০৮ ১৯৪৬)।  কিন্ত  তার পরে যা ঘটে গেলো, সেই ঘটনার ভয়াবহতা ও ব্যাপকতা সম্বন্ধে কেউ পূর্বে অনুমান করতে পারেননি। সেই সব ভয়াবহ ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার মতন পার্টির কেউ তৈরি ছিলেন না।  রনেন সেনের কথায়, ‘আমরা সাম্প্রদায়িকতার বিপদ আঁচ করতে পেরেছিলুম- কিন্ত  তার গভীরতা অনুধাবন করতে পারিনি’।
১৯৪৬ সালটি ছিল দেশী ও আন্তজার্তিক ধনিকশ্রেনীর শোষণের বিরুদ্ধে দেশে শ্রমিক শ্রেণী ও সমাজের সর্ব অংশের নিপীড়িত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন-সংগ্রামের বছর।  সরকারী হিসাবে ধর্মঘটের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৬ সালের  সারাদেশব্যাপী ভ্রাতৃঘাতী গৃহযুদ্ধের ফলে শ্রেণী সংগ্রামের তীব্রতা স্তিমিত হলেও তার স্রোত ছিল প্রবহমান। ট্রাম ধর্মঘট সহ বিভিন্ন শিল্পে ধর্মঘটে শ্রমিকেরা ধারাবাহিকতার সাথ অংশগ্রহণ করেছে।  গান্ধীবাদীরা খেদোক্তি করেছেন... ‘সর্বত্র ধর্মঘট...সবাই চায় কম কাজ করে বেশী বেতন’।  এই প্রসঙ্গে সুমিত সরকারের অভিমত, ‘১৯৪৬-৪৭ সালের দিনগুলিতে হিন্দু – মুসলমান হানাহানি রোধ করার জন্যে গান্ধীজীর একক প্রয়াস—যতই মহৎ ও মর্মস্পর্শী হোক না কেন- এই দুর্যোগে তা নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর; তার দেয়ে শত বিভেদ সত্ত্বেও, যদি আবার সাম্রাজ্যবাদ – বিরোধী ঐক্যবদ্ধ জঙ্গী লড়াইয়ের ডাক দেওয়া হত- তাহলে ঘটনাস্রোত অন্যদিকে মোড় নিত।  কিন্ত  কারা দেবে এই ডাক। এমনকি শ্রমিক ধর্মঘটগুলির দিগন্তও যে অর্থণৈতিক দাবি-দাওয়া আদায়ের চৌহদ্দিতে সীমাবদ্ধ। তাদের সামনে ছিল না কোন সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক লক্ষ্য। শ্রমিক নেতৃত্ব জাতীয় স্তরে প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়েছে’। দাঙ্গার বিষাক্ত বাতাবরণে শহরের শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামের তীব্রতা যখন স্তিমিত, তখন বাংলার গ্রাম তেভাগার আন্দোলনের দাবী-দাওয়া আন্দোলনে উত্তাল। সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ছোবল বাঙলার গাঁ-গঙ্গকে কলুষিত করতে পারেনি। শ্রেণী সংগ্রামের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে অনিবার্যভাবেই মাথা নুইয়ে পিছু হটল দ্বিজাতি তত্ত্বের বিকৃত প্রয়োগ ও প্রসার। শ্রেণী সংগ্রাম তত্ত্ব প্রয়োগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে দৃঢ় ও মজভুত করে  তোলার বাস্তব  নিদর্শন দেখা যায়  তেভাগা আন্দোলনের প্রসার ও ব্যাপ্তিতে। স্লোগান উঠল ‘দাঁড়ী টিঁকি ভাই ভাই--- আধি নয় তেভাগা চাই। কাজেই এই আন্দোলনের ফলে বাঙলার গ্রামাঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বড় আকারে ধারণ করতে পারেনি। এইটুকুই যা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ্যে সান্ত্বনা।  কিন্ত  কলকাতা-নোয়াখালি-বিহার-পাঞ্জাবে এই বর্বরতার বিভীষিকার পরিবেশে গোটা কমিউনিস্ট পার্টি হয়ে পড়ল অসহায়। অন্নদাশংকর রায়ের  উপলব্ধি তার উপন্যাস ক্রান্তদর্শীর অন্যতম চরিত্রের মধ্যে  ঃ- ‘ আমি আগে ঠিক বুঝতে পারিনি, নোয়াখালির অতিরঞ্জিত বিবরণ শনে ব্যালান্স হারিয়েছি। ক্রমে ক্রমে উপলব্ধি করেছি যে মানুষকে যদি মুসলমান না ভেবে চাষি বা ক্ষেতমজুর ভাবি তবে এর অর্থ পরিষ্কার। এটা ধর্মের নাম করে শ্রেণী সংগ্রাম। জমিদার, মহাজন, জোতদার বা পুলিশ যদি প্রধানত হিন্দু না – হতো এটা হতো মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানের শ্রেণী সংগ্রাম’।   এই ভাত্রীঘাতি দাঙ্গার কলুষিত পরিবেশে কলকাতায় ও বাংলার কয়েকটি শহরাঞ্চলে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল এবং কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার প্রদেশ নেতৃত্ব বংগ-ভঙ্গের দাবী উপস্থাপিত করলো। এই দাবীর যৌক্তিকতা পেয়েছিল কংগ্রেসের জাতীয় নেতৃত্বের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।  এই দৃষ্টিভঙ্গি কংগ্রেসের জাতীয় নেতৃত্ব আগে থেকে গ্রহণ করতে শুরু করেছিলো এবং ইংরেজ শাসকদের তা অজানা ছিলো না। (সুত্রঃ – জয়া চ্যাটার্জী, বেঙ্গল ডিভাইডেড, ১৯৯৫, পৃঃ ২২৫)।  ১৯৪৫-৪৬ সালের প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচনে হিন্দু মহাসভা যেমন কংগ্রেসকে অনেক আসন ছেড়ে দিয়েছিল, সেরকম কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার সম্পর্ক ক্রমশ নিবিড় হতে শুরু করেছিলো। ১৯৪৫-৪৬ সালের আইন সভা নির্বাচনে হিন্দু মহাসভা যেমন কংগ্রেসকে অনেক আসন ছেড়ে দিয়েছিল, সেরকম তারই প্রতিদানে কংগ্রেসও হিন্দু মহাসভাকে কলকাতায় ও বিভিন্ন শহরাঞ্চলে হিন্দুধর্মাশ্রয়ী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তুলতে বাধা দেয়নি। এধরণের সংগঠনের মধ্যে ভারত সেবাশ্রম সংঘ , যেখানে সমাজকল্যাণমূলক কাজের আড়ালে হিন্দু মহাসভার কর্মসূচি অনুযায়ী মুসলমান-বিদ্বেশ ছড়ানো হতো আর মুসলমানদের বিরুধে সশস্ত্র অভিযান চালানোর জন্য যুবকদের অস্ত্র প্রশিক্ষন দেওয়া হতো। ১৯৩৯ সালের সেপটেম্বরে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের একটি সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন, যেখানে অনুশীলন-যুগান্তর দলের প্রাক্তন সদস্য পুলিন দাস ও সতিন সেনের সাহায্যে সশস্ত্র ‘আখড়া’ নির্মানের সিধান্ত নেওয়া হয়েছিল। (সুত্রঃ – গর্ভমেন্ট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল, ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চ’ নথিপত্রের ‘P H’ series, File no. 510/33)
পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ ১৯৪১ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার বর্ধমান শাখার সম্পাদকের একটি চিঠি হস্তগত করেছিলো যার থেকে জানা যায়, হিন্দু মহাসভার অনুরধে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের অস্ত্র শিক্ষার জন্য যুগলকিশোর বিড়লা যথেষ্ট অর্থসাহায্য করেছিলেন। (সুত্রঃ – গর্ভমেন্ট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল, ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চ’ নথিপত্রের ‘P H’ series, File no. 510/৪৪)আর এস এস অথবা রাষ্ট্রীয় সয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রাদেশিক শাখাও বিড়লা গোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রভূত অর্থ সাহায্য পেতো এবং আর এস এস-এর কলকাতার মূল কার্যালয়টি বিড়লা শিল্প বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে অবস্থিত ছিলো। (সুত্রঃ – গর্ভমেন্ট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল, ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চ’ নথিপত্রের ‘P H’ series, File no. 510/৩১) গোয়ান্দা দপ্তরের নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, ১৯৪৩ সালের মধ্যে বাংলায় আর এস এর – এর সদস্য সংখ্যা প্রায় এক লাখে পৌঁছে গিয়েছিলো। গোয়ান্দা দপ্তরের তথ্য থেকে আরও জানা যায় যে, আর এস এস –এর নেতা ভি আর পাট্টকে বাংলার বিভিন্ন জেলায় অস্ত্রশিক্ষার জন্য ১৯৩৪ সালে ইংল্যান্ড থেকে নানান ধরণের রাইফেল ক্রয় করার ব্যবস্থা করেছিলেন। (সুত্রঃ – গর্ভমেন্ট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল, ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চ’ নথিপত্রের ‘P H’ series, File no. 510/৩১)ভারত সেবাশ্রম সংঘ এবং আর এস এর ব্যাতীত অনেক ক্লাব গড়ে উঠেছিল কলকাতায় ও অন্যত্র যারা স্থানীয় যুবকদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার জন্য অস্ত্রচালনা শিক্ষা দেওয়া শুরু করেছিলো। এদের মধ্যে উত্তর কলকাতার জাতীয় যুবক সংঘ, বাগবাজার তরুন ব্যাম সমিতি, বউবাজার হিন্দু শক্তি  সংঘ এবং পার্ক সার্কাসের আর্য্যবীর দল উল্লেখযোগ্য। ভারত সেবাশ্রম সংঘ, আর এস এস এবং উপরুক্ত দলগুলির সদস্যরা ১৯৪৬ সালের আগস্টের দাঙ্গায় কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানদের উপরে সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়েছিল(সুত্রঃ – জয়া চ্যাটার্জী, বেঙ্গল ডিভাইডেড, ১৯৯৫, পৃঃ ২৩৩-২৩৯)।

কংগ্রেসের প্রাদেশিক নেতারা খোলাখুলিভাবে ভারত সেবাশ্রম সংঘের অনুষ্টানে যাতায়াত শুরু করেছিলেন। ১৯৪৬ সালের মে মাসে সংঘের একটি প্রকাশ্য অধিবেশনে সভাপতি হিশেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় আইনসভার কংগ্রেসী সদস্য ও প্রাদেশিক নেতা শশাঙ্কশেখর স্যানাল। (সুত্রঃ – গর্ভমেন্ট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল, ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চ’ নথিপত্রের ‘P H’ series, File no. 510/৪৬)  ১৯৩৯ সালে ভারত সেবাশ্রম সংঘের আহুত একটি সভায় ‘মর্ডান রিভিউ’ পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চ্যাটার্জি, অমৃতবাজার পত্রিকার মৃণাল কান্তি ঘোষ এবং দৈনিক বসুমতির সম্পাদক হেমচন্দ্র ঘোষ উপস্থিত ছিলেন। (সুত্রঃ – জয়া চ্যাটার্জী, বেঙ্গল ডিভাইডেড, ১৯৯৫, পৃঃ ২৩৪)।  ১৯৪৭ সালে সংঘ আয়োজিত স্বামী প্রনবানন্দের জন্মজয়ন্তী মিছিলে কংগ্রেসিরা বিপুল সংখ্যায় যোগদান করেছিলেন কংগ্রেসী পতাকা সমেত। (সুত্রঃ – গর্ভমেন্ট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল, ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চ’ নথিপত্রের ‘P H’ series, File no. 510/৪৬)
এই ধরণের যৌথ প্রস্তুতিপর্বের পরিবেশ থেকেই বঙ্গভঙ্গের আন্দোলন শুরু হয়েছিলো ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসের দাঙ্গার অব্যহতির পরে। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার প্রাদেশিক নেতৃত্বের উদ্যোগে দেশবিভাগের পক্ষে গন-দরখাস্ত সংগ্রহ করা হয়েছিল তৎকালীন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি জে বি কৃপালিনির কাছে। বক্তব্য ছিলো মোটামুটি এরকম- বাংলা অবিভক্ত থাকলে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ট হিসাবে প্রাদেশিক সরকারের কর্নধার হবে এবং তার ফলে হিন্দুদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রাধান্য খর্ব হবে। তাই ইংরেজ শাসনের আসন্ন অবসান ও ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাকে ভাগ করা হোক যা স্বাধীন ভারতের অঙ্গরাজ্য হতে পারে। এই সময়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন ডঃ বিধানচন্দ্র রায় ও নলিনী রঞ্জন সরকার এবং হিন্দু মহাসভার শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। ওনারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন যাতে দেশবিভাগ সমর্থণকারী  দর্খাস্তগুলি ঠিক মত কংগ্রেসের জাতীয় নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।  ১৯৪৭ সালের ২৩ শে এপ্রিলে বুধবার হিন্দু মহাসভার কার্যনির্বাহী সমিতি কলকাতায় একদিনের ধর্মঘট পালনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল বঙ্গভঙ্গ দাবীর সমর্থণে।  কিন্ত  কার্যনির্বাহী সমিতির সেই কর্মসূচি কিভাবে রূপায়িত করা যাবে তার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিলো কংগ্রেসের প্রদেশ কমিটির ওপরে। (সুত্রঃ – গর্ভমেন্ট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল, ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চ’ নথিপত্রের ‘P H’ series, File no. ৯৩৮/৪৭())মে মাসে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতৃবৃন্দ যৌথভাবে কলকাতায় একটি প্রকাশ্য সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন বঙ্গভঙ্গের সপক্ষে , সমাবেশে সভাপতিত্ব করেছিলেন স্যার যদুনাথ সরকার। (সুত্রঃ - 'All India Congress Committee'r নথিপত্র , file no. 14(c)/1946)এ প্রসঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’ (২৫ ৪ ৪৭) প্রকাশিত রিপোর্ট, ‘বুধবার হিন্দু মহাসভার আহ্বানে কলকাতায় ব্যাপক হরতাল প্রতিপালিত হয়। কয়েকখানি ছাড়া বাস ও ট্যাক্সি সম্পূর্ণ বন্ধ – ট্রাম একদম বন্ধ। হিন্দু মহল্লায় মটর সাইকেল প্রভৃতি কংগ্রেস পতাকার পরিবর্তে হিন্দু মহাসভার পতাকা উড়াইয়া চলিয়াছিল। লালদীঘিতে হিন্দু কর্মচারী প্রায় কেহই আসেন নাই’। ‘অতএব নিতান্ত অসময়ে স্বাধীন বাংলা গড়ার ডাক এসেছিল। সন্দেহ, অবিশ্বাস, হিংস্রতার জীবানু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে মানুষের স্থৈর্য ও বিচার-বুদ্ধি লোপ পেতে বাধ্য।  তখন রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিও যেন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়। মানুষের মনের অবস্থাকে ব্যাখ্যা করে তুষার চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘এত রায়ট হচ্ছিল যে দেশভাগ নিয়ে লোকের দুঃখ করার অবকাশ নেই। সবাই বুঝতে পারছে যেন দেশভাগ ছাড়া উপায় নেই’।
শরৎচন্দ্র বোস শেষ চেষ্ঠা করেছিলেন বঙ্গভঙ্গ রোধ করবার। তিনি তাঁর ‘স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ বাংলার’ র পরিকল্পনা উপস্থাপিত করেন ১৯৪৭ সালের মে মাসে অর্থাৎ দেশভাগের শেষ প্রহরে। কংগ্রেসের ভেতর থেকে কিরণশঙ্কর রায় ব্যাতীত আর কোনো নেতা শরত বোসের পরিকল্পনাকে সমর্থণ জানানোর সাহস অর্জন করেননি বা সমর্থণ করেননি সেদিন। বরঞ্চ সমর্থন এসেছিল মুসলিম লীগ নেতা সুরাবর্দী ও আবুল হাশিমের কাছ থেকে। (সুত্র ঃ- শরৎচন্দ্র বোস, ‘I wonder my countrymen’, 1968, page 186-187)সাথে সমর্থন এসেছিল বিশিষ্ট মুসলমান বুদ্ধিজীবিদের কাছ থেকে, যাঁদের মধ্যে আবু সৈয়দ আয়ুব, শওকত ওসমান, গোলাম কুদ্দুস ও সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহার নাম নিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এনারা সবাই মিলে বিবৃতি দিয়েছিলেন ‘হিন্দু ও মুসলমান বাঙালীর  মধ্যে মিলনের ক্ষেত্র বহুদুর প্রসারী এবং বহু শতাব্দীব্যাপী এবং সর্বপরী এই সত্যটি আজ উভয় সম্প্রদায়ের রক্তে লেখা অক্ষরে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, বিভেদের রাজনীতি জিঘাংসা ও আত্মহত্যার রাজনীতি এবং হিন্দু ও মুসলমানদের সম্মিলিত স্বাধীন বাংলার রাজনীতি মহান সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের রাজনীতি , স্পন্দিত জীবনের রাজনীতি ।রাষ্ট্রনায়কদের বিভেদকামী ও বিপথগামী নেতৃত্বের ভয়াবহ পরিনাম চোখের সামনে স্পষ্ট দেখেও কি আমরা আমাদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের দ্বারা মাউন্টব্যাটেন রোয়েদাদকে ছেঁড়া কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিয়ে বাংলাকে পূনর্গঠিত ও পূনর্জীবিত করতে আত্মদানে এগিয়ে আসবো না?’    
 সবচেয়ে বেশী বাধা এসেছিলো কলকাতার অবাঙালী হিন্দু পূঁজিপতি গোষ্ঠী, কংগ্রেসের জাতীয় নেতৃত্ব এবং হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে। বল্লভভাই প্যাটেল বাংলার প্রাদেশিক কংগ্রেস নেতাদের বলেছেন, ‘কিরণশঙ্কর ও শরতবাবুর মতোই ‘স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ বাংলার’র মোহে আকৃষ্ট হতে পারেন... কিন্ত  বাংলাকে বিভক্ত করতেই হবে, যদি হিন্দু অধিবাসীদের বাঁচাতে হয়’।   (সুত্র ঃ – সর্দার প্যাটেল করেস্পন্ডেসেস, খন্ড ৪, পৃঃ ৩৭, ৪৩)। লিগপন্থী কিছু নেতাদের মধ্যেও একটি ইতিবাচক ও প্রগতিশীল  চিন্তাধারা প্রবাহিত হয়েছিলো। এর কারণ হিশেবে সুমিত সরকার বলেছেন, ‘বাংলা মুসলিম লীগের অনেকেই  কিন্ত  সুদূর পাঞ্জাবের তাঁবেদারি মেনে নিতে রাজি নন। যেমন সোহরাবর্দী ও আবুল হাশিম। তাঁরা হিন্দুস্থান-পাকিস্তান দুটোরই বাইরে অবিভক্ত বাংলা গঠনের পরিকল্পনা তৈরি  করেন। শরত বসুর মতো কয়েকজন কংগ্রেস নেতাও প্রস্তাবটি বিবেচনা করে দেখতে রাজি হন’(মর্ডান ইন্ডিয়া, পৃ ৪৪৯)।  এই বিষয়ের অপর কিছুটা আলোকপাত করেন গান্ধি-শিষ্য অধ্যাপক নির্মলকুমার বসু। ‘ ১০ ৫ ১৯৪৭ (শনিবার) সোদপুর--কয়েকজন মুসলিম লীগ সদস্য একটি নতুন পরিকল্পনা উদ্ভব ঘটিয়েছেন। এবং তার সঙ্গে যুক্ত শরত বসুর নাম। পরিকল্পনাটির মর্মকথা হচ্ছে ভারত পাকিস্তান ও সংযুক্ত সার্বভৌম বাংলা- এই তিন ভাগে দেশকে ভাগ করা। শরতবাবু এ প্রসঙ্গে গান্ধিজীর সঙ্গে আলাপ করেন এবং বিষয়টির নানাদিক পর্যালোচনা করার জন্য সঙ্গে করে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক আবুল হাশিমকে সোদপুরে নিয়ে আসেন। আবুল হাশিম প্রায় দেড়ঘন্টা ধরে গান্ধিজীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেন । শরতবাবু সারাক্ষণ চুপচাপ বসেছিলেন। হাশিম সাহেবের মূল কথা হচ্ছে হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক- শেষ পর্যন্ত সবাই বাঙালি। সকলের ভাষা এক- সংস্কৃতি এক। তারা কেন হাজার মেইল দূরের পাকিস্তানীদের শাসন মেনে নেবে?’ (সুত্রঃ – মাই ডেজ উইথ গান্ধী, পৃঃ ২২৭)। ‘ ১১ ৫ ১৯৪৭ রবিবার সোদপুর—এইচ এস সোহরাবর্দী আজ গান্ধিজীর সঙ্গে সোদপুরে দেখা করেন।
শহিদ সোহরাবর্দি

তিনিই সংযুক্ত সার্বভৌম বাংলার মূল প্রবক্তা। তিনি গান্ধিজীর সামনে তার এক উজ্জ্বল ছবি আঁকেন’। (সুত্রঃ – মাই ডেজ উইথ গান্ধী, পৃঃ ২৩৯)। গান্ধিজী ভারত বিভাগ ঠেকাতে , সংযুক্ত সার্বভৌম বাংলা স্বীকার করে নিয়ে, দ্বিজাতি তত্ত্বকে নস্যাৎ করতে চেয়েছিলেন। (সুত্রঃ মাই ডেজ উইথ গান্ধী, পৃঃ ২৩৬)।  এই বিশয়ে দেখা যায় যে দেশভাগের লগ্ন যতোই ঘনিয়া আসছে বাংলার লীগ ও কংগ্রেসের নেতাদের এক প্রভাবশালী অংশ বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধ ও অখন্ড রাখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন। (সুত্রঃ মাই ডেজ উইথ গান্ধী, পৃঃ ২৩৬)। আবুল হাশিম লিখছেন  ‘এপ্রিল মাসের শেষাশেষি  সোহরাবর্দির ৪০ নং থিয়েটার রোডের বাসভবনে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতাদের এক যুক্ত বৈঠক বসে। সেখানে স্বাধীনতা বাংলার সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি নির্ধারণের জন্যে এক কমিটি গঠিত হয়... ২৩শে এপ্রিল ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকার সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে খাজা নাজিমুদ্দিন বলেন, ‘আমার সুচিন্তিত অভিমত হচ্ছে, মুসলমান ও অ-মুসলমান সকলের স্বার্থেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা চাই। এবং এটাও আমার সুনিশ্চিত ধারণা যে বঙ্গভঙ্গের ফলে বাঙালি মাত্রেরই সর্বনাশ ঘটবে’। (সুত্রঃ – ইন রেট্রস্পেকট)।
কংগ্রেস-লীগ যৌথ প্রয়াস অনেকটা ফলপ্রসু হয়। গান্ধীজীকে একটা চিঠির মারফৎ শরৎচন্দ্র বসু এই ইতিবাচক পদক্ষেপের অগ্রগতি অবহিত করেন। চিঠির মূল বয়ানটাই দেওয়া হল।
My Dear Mahatmajee,
Since you left Calcutta I have had several conferences which were attended by some Muslim League leaders and Kiran and Satya Babu and important developments have taken place. Last Tuesday evening (20 instant), there was a conference in my house which was attended by Suhrawardy, Fazlur Rahaman (Minister), Mohammad Ali (Minister), Abul Hashim  (Secretary, Bengal Provincial Muslim League, now on leave), , Abdul Malik (member, Bengal Legislative Assembly representing labour), Kiran and Satya Babu. We arrived at a tentative agreement, copy of which is enclosed herewith for your consideration. For purposes of identification, it was signed by Abul Hashim and myself in the presence of the others. It will, of course, have to be placed before the Congress and Muslim League organizations. From the trend of the discussions we had, it seems to me that so far as the Congress and Muslim league organizations in Bengal are concerned, the tentative agreement will be ratified by them, possibly with some modifications here and there. I am anxious to have your reactions and also your help, advise and guidance in giving final shape to the tentative agreement arrived at. I need not repeat what I told you at Sodepur. I still feel that if with your help, advice and guidance the two organizations can arrive at a final agreement on the lines of the tentative agreement, we shall solve Bengal’s problems and at the same time Assam’s. It may also have a very healthy reaction on the rest of India. If you want me to come to Delhi to discuss matters further with you, I need hardly say that I shall come as soon as I get your message. Tnings are moving rapidly and speaking for myself, I feel that further discussions with you are most necessary.
  I trust your Bihar tour is pulling your health to a great strain. I am feeling somewhat better. With Pronams,

                                                      Yours affectionately,
                                                Sd/- Sarat Chandra Bose.
শরৎচন্দ্র বসু ও আবুল হাশিমের স্বাক্ষরিত খসড়া চুক্তির বয়ান ঃ
1.    Bengal will be a free State. The free State of Bengal will decide its relations with the rest of India.
2.   The constitution of the free Bengal will provide for election to the Bengal Legislature on the basis of joint electorate and adult franchise, with reservations of seats proportionate to the population amongst Hindus and Muslims. The seats as between Hindus and Scheduled Castes Hindus will be distributed amongst them in proportion to their respective population or in such manner as may be agreed among them. The constituencies will be multiple constituencies and votes will be distributed and not cumulative. A candidate who gets the majority of the votes of his own community cast during election and 25% of the other communities so cast  will be declared elected. If no candidate satisified these conditions, that candidate who gets the largest number of votes of his own community will be elected.
3.   On the announcement by His Majesty’s Government that the proposal of the free stae of Bengal has been accepted and that Bengal will not be partitioned, the present Bengal Ministry will be dissolved and a new Interim Ministry brought into being constituting of an equal number of Muslims and Hindus (including Scheduled Castes Hindus) but excluding the Chief Minister. In this Ministry of Chief Minister will be a Muslim and the Home Minister a Hindu.
4.   Pending the final emergence of a Legislature and a Ministry under the new constitution, the Hindus Iincluding Scheduled castes Hindus) and the Muslims will have an equal share in the services including Military and Police. The services will be manned by Bengalis.
5.   A constituent assembly composed of 30 persons, 16 Muslims and 14 Hindus, will be elected by Muslims and non-Muslim members of the legislature respectively, excluding the Europeans.
1, Woodburn Park,
Calcutta,
20th May, 1947
                                                Sd/- Sarat Chandra Bose
                                                Sd/- Abul Hashim

কিন্ত  স্বাধীন বঙ্গ আন্দোলন তেমন দানা বাঁধতে পারলো না। তার মূল কারণ আবুল হাশিম সাহেবের লেখায় প্রতিভাত হয়। ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বাংলার গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক ব্যারোজ –এর সঙ্গে ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭ – এ দেখা করেন। স্পষ্টতই গভর্নর-এর অনুপ্রেরণায় ২৩ তারিখে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বঙ্গভঙ্গ দাবি জানিয়ে তিনি একটি বিবৃতি দেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি, আচার্য কৃপালনী, হিন্দু মহাসভার সভাপতি ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির দাবি সমর্থন করেন। তাঁরা বঙ্গভঙ্গের আন্দোলন শুরু করলেন। ইতিমধ্যেই ভারতের নেতৃবৃন্দের কাছে লর্ড মাউন্টব্যাটেন বৃটিশ সরকারকে ভারত-ভাগ ও ত্যাগের সংকল্প জানিয়ে দিয়েছিলেন। খুবই স্বাভাবিকভাবে কংগ্রেস এক নতুন রাজনৈতিক পথ ধরল। ভারত – ভাগের বিরোধিতা তারা হাওয়ায় ছুঁড়ে দিল’।  (সুত্রঃ- ইন রেট্রেসপেকট, পৃ ১৩৭)   

শরৎচন্দ্র বসুর ‘স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ বাংলার’ পরিকল্পনাকে কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য বামপন্থী দলগুলি সমর্থণ জানিয়েছিল নির্দিষ্ঠভাবে। ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিশেবে বহন করে কমিউনিস্ট পার্টির দ্যার্থহীন ভাষায় তাঁর মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’য়  জনগনের কাছে  আহ্বান জানিয়েছিল, ‘স্বাধীন ভারতীয়  যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ বাংলার জন্য আওয়াজ তুলুন’।
বঙ্গভঙ্গ রোধ করা গেলো না। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বাংলা আইনসভার অধিবেশনে বাংলাদেশকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব পেশ করিয়ে পাশ করানো হয়। তার মিনিট পনেরো পর হিন্দু – প্রধান অঞ্চলের এম এল এ অ মুসলমান – প্রধান অঞ্চলের এম  এল এ- দের পৃথক দুটি সভা হয়। হিন্দু – প্রধান অঞ্চলের এম এল এ- রা বঙ্গ  ও মুসলমান-প্রধান অঞ্চলের এম এল এ –রা দেশ বিভাগের পক্ষে ও বিপক্ষে মত দেন।  অতএব দেশ ভাগ, বাঙলাদেশ দুই-ভাগ হয়ে গেলো। ১৯৪৭ সালের ১৫ ঐ আগস্তে এই ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। সেদিন সত্যই বাঙালির কন্ঠ ও বাসনাকে রুদ্ধ করা হয়েছিল।  স্বাধীনতার যুগের রাজনীতিতে  জনসংগঠন ও  শ্রেনীসংগঠনের প্রত্যক্ষ্য রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অভাব একটা সমস্যা সৃষ্টি করেছিল যা কিনা জাতীমুক্তি আন্দোলনের তীব্রতা ও জনমনে অভিন্ন জাতীয়তাবাদী ধারনা ও বোধকে গড়ে তুলতে পারেনি।
এক্ষেত্রে সবথেকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলো সাম্প্রদায়িক ধর্মাশ্রয়ী জাতিয়তাবাদী প্রতিক্রিয়ার বিপরীত স্রোত। সে আমলের কংগ্রেসী নরমপন্থী নেতৃত্ব উদারনৈতিক চিন্তার অনুগামী ছিলেন। ধর্মকে রাজনীতির সাথে তাঁরা মেশাতে চাননি। প্রয়োজনে ইংরেজ সরকারের সমর্থন নিয়ে সমাজ সংস্কারের নানা পরিকল্পনা তাঁদের মনে ছিল।  কিন্ত  ১৮৯০ এর দশকে যে চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটলো, তাঁদের অনেকেই হিন্দু ধর্মকে আশ্রয় করে গন-সংযোগের চেষ্টা করেন। মহারাষ্ট্রের বাল গঙ্গাধর তিলক গনপতি উৎসবের প্রচলন এই উদ্দেশ্যেই করেছিলেন। তিলক সহ এদের অনেকেই সামাজিক চিন্তায় ও সমাজ পরিবর্তনের নিরিখে রক্ষণশীল ছিলেন ও অনেক সময়েই সমাজ সংস্কারবিরোধে বক্তব্য রেখেছেন। কংগ্রেসের নেতৃত্বের বিরোধিতায় তাঁরা ঝুঁকেছিলেন হিন্দু- ধর্মীয় চিন্তার দিকে। শিবাজী মহিমান্বিত হলেন  কিন্ত  টিপু সুলতান হয়ে গেলেন ব্রাত্য। এই ধর্মীয় উন্মাদনা বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদীদের প্রেরণা যুগিয়েছিল। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী সংগঠনের  (যুগান্তর , অনুশীলনী প্রভৃতি) কালি মাতার পা ছুয়ে বিপ্লবী কর্মকান্ডের  রীতি – রেওয়াজে  ব্রাত্য হয়ে গেলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। সেই প্রজন্মের বিপ্লবীদের আত্মত্যাগের মূল্য আমাদের স্বীকার করতেই হবে। তবুও বলতে হয় এই ধর্মাশ্রয়ী জাতীয়তাবাদী আদর্শ কালক্রমে সাম্প্রদায়িক জাতিয়তাবাদী আদর্শ কালক্রমে সাম্প্রদায়িক বিরোধের পথ প্রসস্থ করেছিলো। ব্যাক্তিহত্যার মাধ্যমে সমাজ ও জাতি মুক্তি  সম্ভব নয়, দরকার তাই শ্রেনি সংগ্রাম।
সাভারকার ও জিন্নার মস্তিস্কপ্রসুত দ্বীজাতি তত্ত্ব মানব সমাজের ঐতিহাসিক অগ্রগতির নিয়মে একটা গলিত মৃতদেহের লাশে  পরিনত হলো, যার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়া  হলো স্বাধীন সার্বভৌম ধর্মনিরোপেক্ষ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের  জন্ম নেওয়ার ফলে।  

1 comment: