খৃষ্টধর্মে নারীর অবস্থান।
মানব সভ্যতার উষাকাল থেকে আজ আমরা
বিভিন্ন সভ্যতার স্তর পেরিয়ে এসে দেখছি যে আধুনিক বূর্জোয়া গনতান্ত্রীক রাষ্ট্রে
‘নারী স্বাধীনতা’ এর নামে বড় বড় আন্দোলন হওয়া সত্ত্বেও নারীর প্রকৃত মুক্তিসাধণ এই
সমাজব্যবস্থা করতে পারে নি। সেই পারিবারিক শিল্পের নিগড়ে ও শৃংখলে আজও আমাদের
সমাজের মা, বোনেরা বদ্ধ হয়েই আছে। সামাজিক উতপাদনের সাথে গৃহশীল্পের মেলবন্ধন
ঘটানো যায়নি । নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ছাড়া আজকের সমাজে নারী –
স্বাধীনতার নামে বড় বড় সভা-সমিতি করা এই অবনমনের আসল রোগ নির্নয়ে এবং প্রতিকারের
সহায়ক হতে পারে না। ব্যাক্তিগত সম্পত্তি সম্পর্কের ওপর যে সমাজ ব্যবস্থা
প্রতিষ্টিত, সেই সমাজে নারীর প্রকৃত স্বাধীনতার চিন্তা করা অলিক স্বপ্ন স্বরুপ। প্রাচীনকালে বন্যাবস্থা – বর্বরতা থেকে আধুনিক
সমাজ অগ্রগতির পথে নারীর ওপর সামাজিক অত্যাচার ও দাসত্বের রুপ পালটেছে এবং
ইতিহাসের পরতে পরতে রাষ্ট্রীয় নীতিতে ধর্মের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ এর ফলে এই
নির্যাতন ও নারীর সামাজিক অবমূল্যায়ন বৈধতা পেয়েছে। আদিম সাম্যবাদী সমাজে সম্পদের মালিকানা ও
উৎপাদনের উপায় বিভিন্ন গোত্র, গোষ্ঠী ও উপজাতি সমাজের সম্পত্তি ছিল। তখন এই সব গোত্র, গোষ্ঠী পরিচালিত হত
মাতৃতান্ত্রীক প্রথায় এবং নারীর অবস্থান ছিল সমাজের পুরোভাগে। গোত্র, ফাত্রী ও
উপজাতি পরিষদের মধ্যে বিবাহ ব্যবস্থায় পুরুষকে তার গোত্র বা গোষ্টী ছেড়ে মাতুল
গোষ্ঠীতে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে হতো। বন্যাব্যবস্থা থেকে বর্বরতার উত্তরণের যুগে
এই স্ত্রী-পূরুষের জোড়ের ভিত্তি ছিলো ভঙ্গুর যেমন নৃত্বত্তবিধ মরগ্যানের মতে “As to their
family system, when occupying the old long-houses [communistic households
comprising several families], it is probable that some one clan [gens]
predominated, the women taking in husbands, however, from the other clans
[gentes] .... Usually, the female portion ruled the house.... The stores were
in common; but woe to the luckless husband or lover who was too shiftless to do
his share of the providing. No matter how many children, or whatever goods he
might have in the house, he might at any time be ordered to pick up his blanket
and budge; and after such orders it would not be healthful for him to attempt
to disobey. The house would be too hot for him; and ... he must retreat to his
own clan [gens]; or, as was often done, go and start a new matrimonial alliance
in some other. The women were the great power among the clans [gentes], as
everywhere else. They did not hesitate, when occasion required, “to knock off
the horns,” as it was technically called, from the head of a chief, and send
him back to the ranks of the warriors.”। (এঙ্গেলস কর্তিক উদ্ধৃত) । সামাজিক সম্পত্তি থেকে উদ্ধৃত সম্পদ সৃষ্টি করলো ব্যাক্তিগত সম্পত্তি ও
শ্রেণী। এই অবস্থার ক্রমবিকাশ এবং সমাজে শ্রমের বিভাজনের কালে নারীর অবনমনের
রাস্তা তৈরি করতে অনূকুল পরিস্থিতি তৈরি করলো। মৃত্যুর সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে
নিশ্চিত হয়ে মানুষের মনে ‘আত্মার’ অমরত্ব লাভের আশায়, এবং প্রকৃতি ও সমাজে শোষণের
অন্ধশক্তির সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অভাবে , অসহায়তা কে পাথেয় করে ধর্ম যেমন বাসা বাধলো
মানুষের মনে, ঠিক তেমন নিজের ব্যাক্তিগত
সম্পত্তির প্রকৃত উত্তররাধীকারকে নিজের রক্তে সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক
নিয়মে অনিবার্য হয়ে পড়ল এক পতি-পত্নী তান্ত্রীক পরিবার। এই নিরিখেই নিজের উত্তরাধিকারকে সূনির্দিষ্ট ও
বৈধ করতে, পুরষের দরকার পড়ল নারীকে অবদমিত করা। বিখ্যাত
দার্শনিক ও মানবহীতবাদী রাসেল এই কারণ
সঠীক ভাবেই বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর
‘Marriage and Morals’ গ্রন্থে(পৃষ্টাঃ – ২৬, লিভারাইট প্রকাশনা)। “If, on
the other hand, the child is not legitimate, the putative father is tricked
into lavishing care upon a child with whom he has no biological connetion.
Hence the discovery of fatherhood led to the subjection of women as the only
means of securing their virtue--- a subjection first physical and then mental,
which reached its height in the Victorian age”। এই
পারিবারিক একক জোড়ের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে এঙ্গেলস বলেছেন যে, এর কারণ নিহিত আছে
ব্যক্তিগত সম্পত্তি সামাজিক সম্পত্তির ওপর
বিজয়লাভে, কোনো একক কামণা-প্রনয়ের ফলে নয়। “This is the origin of
monogamy as far as we can trace it back among the most civilized and highly
developed people of antiquity. It was not in any way the fruit of individual
sex-love, with which it had nothing whatever to do; marriages remained as
before marriages of convenience. It was the first form of the family to be
based, not on natural, but on economic conditions – on the victory of private
property over primitive, natural communal property.” । (সুত্রঃ – পরিবার, ব্যক্তিগত
সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি – এঙ্গেলস)। এই নিরিখে জার্মান মার্কসবাদী দার্শনিক
আগস্ট বেবেলের আলোচনা অনেকক্ষেত্রে আমাদের চেতনা বিকাশের সহায়তা করে। আদিম যুগে
নারীর দাসত্ব, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই দাসত্ব এবং তার ফলে শারীরিক ও মানসিক
শক্তিতে পুরুষের সঙ্গে তার তফাৎ , -- যেগুলি কি না নারীর দাসত্ব আরো কঠোর করে
তুলতে সাহায্য করেছে--- এসবেরই মুলে নারীর
যৌন জীবনের কতগুলি বৈশিষ্ঠ্য দেখা যায়। আদিম যুগের নারীরা যদিও শারীরিক এবং মানসিক
শক্তিতে পুরুষের সমানই ছিল, তাদের গর্ভবতী অবস্থার সময়, সন্তান জন্মের পর, তাদের
শিশুদের স্তন্যপানের অবস্থা থাকার সময় বাধ্য হয়েই তাঁরা পুরুষের সাহায্য সহযোগিতা
ও রক্ষণাবেক্ষণের আশ্রয় নিত। ইতিহাসের যে সময়ে কেবলমাত্র শারীরিক শক্তিকেই
প্রাধান্য দেওয়া হতো এবং মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম যখন নিতান্তই পাশবিক এবং
বর্বর আকারের ছিল, তখন জৈবিক নিয়মে নারীদের সন্তান ধারণের কারণে সেই সাময়িক
অসহায়তার দরুনই তাদের উপর অনেক হিংস্র আক্রমণ হয়েছে, শিশু কন্যাদের হত্যা করা
হয়েছে, নারীদের উপর পাশবিক অত্যাচারও করা হয়েছে।
খৃষ্টধর্মে উৎপত্তি তত্ত্ব (Genesis) থেকে বাইবেলের অসংখ্য অধ্যায়ে ও পদে নারীকে পূরুষের
ব্যাক্তিগত সম্পত্তি ও পূরুষের দাসত্ব স্বীকার করার বিধি ও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উৎপত্তি তত্ত্ব (Genesis) থেকে এই
প্রবণতা এবং নারীর বশ্যতা কে ধর্মীয় বৈধতার আবরণে রাষ্ট্রীয় আইনে ও ন্যায়ে রপান্তর
করা হয়েছে। সৃষ্টিতত্ত্বে ভগবান মানুষ ব্যাতিরেকে সব প্রাণীকে জোড়ায়
জোড়ায় তৈরি করলেন। কিন্ত আদমের সঙ্গিনী ইভ কে তৈরি করলেন আদমের বুকের
পাঁজর থেকে। আবার বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে ঈশ্বর আদম কে নিজের
প্রতিমূর্তিতে সৃষ্টি করেছেন। এখান থেকে কিছু প্রশ্ন ওঠে। ১)
ঈশ্বরের রুপ তাহলে মুর্ত, তাই তিনি কোন আত্মা বা স্পিরিট নন। এবং এই নিরিখে
ঈশ্বরের অস্তিত্বের তত্ত্ব প্রথমেই খারিজ
হয়ে যায়। ২) ঈশর নিজের আদলে আদমকে তৈরি করেছেন, তার মানে নারী স্বত্তার মধ্যে
ঐশ্বরত্বের কোনো নিদর্শন নেই। আবার শয়তান
প্রথম পূরুষ আদমকে প্রলুব্ধ করার যায়গায় ইভ কে প্রলুব্ধ করলো, অতএব এই উদাহারনেই
স্ত্রীজাতির ওপর ধর্মীয় মূল্যায়ন হল যে স্ত্রীরা প্রবঞ্চক, পাপাত্মার অধিকারী,
পুরুষকে প্রলুব্ধ কারী ও ঘৃণ্য। এই উপাখ্যানের প্রকৃত কারণ অবশ্য ভগবান , না কোনো যাজক দিতে পারে নি, বরঞ্চ এই
তত্ত্বকে বারে বারে কাজে লাগিয়ে নারীকে ইতিহাসের প্রতি কালে, সমাজ বিকাশের প্রতিটি
স্তরে অবদমিত করা হয়েছে। খৃষ্টাব্দ ষষ্ট শতাব্দীতে রোমান ক্যাথলক যাজক
বর্গ ম্যাকন এর কাইন্সিলে নারীদের মনুষ্যত্ব ও আত্মার বিষয়টিকে আলোচনা করে সিধান্ত
নিয়েছিলেন, নারীরা মানুষ নয়, নারী যেন বস্তুবিশেষ, যাকে নিয়ে পুরুষ অন্যান্য
সামগ্রীর মতো যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। “And there are
those who know that an early council of bishops, held at Macon in Burgundy,
France in a.d.
585 decreed that women do not have a soul. The bishops of course decreed no
such thing, for if women do not have a soul how could they be baptized, how
receive the Eucharist, how be venerated as martyrs in heaven? Yet it may be
worthwhile to look at the story of this alleged decree, for one can see a myth
in the making.” (সুত্রঃ-http://www.firstthings.com/article/2007/12/002-the-myth-of-soulless-women-3)। এমনকি
ইহুদিদের মধ্যেও ধর্মানুষ্ঠানের অংগ হিসেবে নারীর পতিতাবৃত্তির চল ছিল। তার প্রমাণ
বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে পাওয়া যায়। আব্রাহাম বিনা দ্বিধায় তার স্ত্রী সারাকে
অন্যের কাছে ধার দিয়েছিলেন, অর্থাৎ
ফারাওর কাছে দিয়েছিলেন যার জন্য ফারাও তাঁকে মূল্যবান পুরষ্কার দিয়েছিলেন। ইহুদি
পূর্বপূরুষ এবং যীশুখৃষ্ঠের পিতৃপূরুষ এই দর কষাকষির মধ্যে দোষের কিছু দেখেন নি।
ডেভিড, সলোমন এবং অন্যান্যদের ‘হারেম’ বা
অনেক রক্ষিতা থাকত, কিন্ত তার জন্য ঈশ্বর তাদের উপর রুষ্ট হননি। বাইবেলের
ওল্ডটেস্টামেন্টে ঈশ্বর মুখ নিসৃত দশটি আজ্ঞা প্রকৃতপক্ষে শুধু পুরুষদের জন্যে বলা
হয়েছে, কারণ নবম আজ্ঞায় নারীদের, দাসদাসী
এবং গৃহপালিত পশু আর অন্যান্য সামগ্রীর এক গোত্রে রাখা হয়েছে। “The ten commandments of the old testament are addressed
exclusively to the man. In the ninth commandment the woman is mentioned
together with the domestic servants and domestic animals. The man is warned not
to covet his neighbor’s wife, nor his manservant, nor his maid-servant, nor his
ox, nor his ass, nor anything that is his neighbors. Woman then is an object, a
piece of property, that man should not desire if in someone else’s possession.
Jesus, who belonged to a sect that maintained rigorous asceticism and practised
voluntary emasculation, when asked by his disciples whether it were well to
marry, replied: All men cannot receive this saying save they to whom it is
given. For there are some eunuchs, which were so born from their mother’s womb;
and there are some eunuchs which were made eunuchs of men; and there be eunuchs
which have made themselves eunuchs for the kingdom of heaven’s sake.” । .”। (সুত্রঃ
- August Bebel. Woman and Socialism,Woman
in the Past)। বিশেষ করে যা বর্নিত এই গোত্রের
মধ্যে অর্থ বা কাজের বিনিময়ে লাভ করা হয়ে থাকে। বাইবেলের অনেক অধ্যায়ের পদে, যীশু
খৃষ্ট তার মা মেরীর মাতৃত্বের অধিকার স্বীকার করেননি। সর্বত্র ছেলে মাকে সম্বোধন করেছে ‘হে নারী’ বলে, অথচ ইশ্বরের
এই অবতার আবার প্রকাশ্যে তাঁর শিষ্যদের পিতা-মাতা কে সমাদর করার বিধান দিয়ে
গেছেন। সেন্ট পল খৃষ্টধর্ম কে আন্তজার্তিক
রুপ দিয়েছিলেন ইহুদী ধর্মের সংকীর্ণ গণ্ডী থেকে মুক্ত করে। যদিও তাঁর বিভিন্ন
বিধিতে ইহুদী ধর্মীয় ও আচার-আচরণের নিদর্শণ দেখা যায়। যীশু খৃষ্ট তাঁর অবত্বারত্ব
প্রমাণ করার জন্যে, মাতৃ-গর্ভে জন্মালেও বারবার তাঁর মাতার অধিকার অস্বীকার
করেছেন, কিন্ত আবার নীচু জাতের হিহুদিদের পরিত্যাজ্য সামারিয়
নারীর হাতে জলপান করেছিলেন তার বানী প্রচারের সময়ে। মৃত্যুর পরে যীশু খৃষ্ট
সর্বাগ্রে তাঁর স্বর্গীয় রুপের দর্শণ দেন মেরী ম্যাগদেলিনকে। এরুপ বহুবিধ ঘটনায় যীশু খৃষ্টের সমকালীন সামাজিক
ও ধর্মীয় কাঠামোতে তাঁর বিপ্লবীভূমিকা প্রতিভাত হয়। তাঁর যাবতীয় প্রচারকার্য্য ও
আদর্শ সমাজের নিম্নতর শ্রেনীর (জেলে, মাল্লা, গনিকা প্রভৃতি) মধ্যেই ব্যাপ্ত ছিল। খৃষ্টীয়
সাম্যবাদী ধারণা প্রতিফলিত হয় এমণ এক নিদর্শণ তূলে ধরা যায়। কোনো এক ধনপতির সন্তান
যীশু খৃষ্টের কাছে তাঁর শিষ্য হবার জন্য আবেদন জানার পরিপ্রেক্ষিতে যীশু খৃষ্ট
শর্ত রেখেছিলেন “ তোমার যাহা কিছু আছে বিক্রয় কর আর দরিদ্রদিগকে দান কর...”
(মার্ক, ১০ঃ২১) । প্রসঙ্গত তৎকালীন ইহুদী রাষ্ট্র রোম সাম্রাজ্যের অন্তরভূক্ত একটি করদ রাজ্য
ছিলো। এই বিষয়ে প্রশ্ন জাগে, , হঠাত কেন তাহলে খৃষ্টাব্দের চতুর্থ শতাব্দীতে সেই
রোম সাম্রাজ্যের কেন্দ্র একটি করদ রাজ্যের
সবে অঙ্কুরিত খৃষ্ট ধর্ম ও দর্শণকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিল এবং এই ধর্মের
পৃষ্টপোষকতা শুরু করলো যখন খৃষ্টধর্মের আনুগামীদের
ওপরে হিহুদী রক্ষণশীল রাষ্ট্রের কর্তাব্যাক্তিদের দ্বারা দুই শত বছর ধরে প্রচন্ড
দমণ-পিড়ন ঘটেছিলো খৃষ্টীয় বৈপ্লবিক বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে ? এর কারণ নিহিত ছিল তৎকালীন রোমসাম্রাজ্যের
ভিত্তি দাসভীত্তিক অর্থনীতির উৎপাদন সম্পর্কের ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে। শাসকশ্রেণী
রাজতন্ত্র ও রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতাদের তীব্র শোষণের ফলে দিকে দিকে
জনমনে বিক্ষোভ ও দাসবিদ্রোহ সংঘটিত হচ্ছিল এবং খৃষ্টীয় বৈপ্লবিক বাণী এই বৈপ্লবিক
ধারণার একটা প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার তাগিদে
তাই শাসক শ্রেণীর খৃষ্টীয় প্রেমবাদ ও পারলৌকিক দর্শণ কে হাতিয়ার হিশেবে গ্রহণ করতে
হয়েছিল শ্রেণী সমন্বয়ের দর্শণকে কে জনমনে
প্রতিষ্ঠিত করতে এবং বিক্ষোভকে প্রশমণ
করতে। বস্তুত যীশু খৃষ্টের বাণী গুলি পরবর্তীকালে লিখেছিলেন তাঁর শিষ্য ম্যাথীয়,
মার্ক, লূক ও জন এবং তাঁর দর্শণেকে পূনর্গঠন করেছিলেন সেন্ট পল হিহুদী রক্ষণশীল
আচার-আচরণের কাঠামোতে, তাই যীশু খৃষ্ট যে এই ইহলোকে হিহুদিদের স্বাধীন রাজ্য
স্থাপন করতে আসেননি কিন্ত পারলৌকিক রাজ্য স্থাপণের ধারণ সম্ভবত ইতিহাসে
ধারায় গীতার মতন প্রক্ষিপ্ত ও সংশোধিত, শ্রেণী সঙ্ঘাত প্রশমণের উদ্দেশ্যে। কিন্ত সংঘাত ও শ্রেণী দ্বন্দের সমাজ
বিকাশে চালিকাশক্তির অনিবার্য্য নিয়মে এই
দাসভীত্তিক অর্থনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত রোম সাম্রাজ্যের পতন ঘটল, উন্মেষিত হলও
মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্র। যীশু খৃষ্টের বাস্তব জাগতের বৈপ্লবিক বাণীর
প্রকৃত তাতপর্য্য সম্ভবত অনুভব করেছিলেন
তাঁর শিষ্য জুডাস ইস্কারিয়াত। তিনি খৃষ্টকে হিহুদী জাতীকে ও রোমসাম্রাজ্যের
উপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত করে জাতিস্বাধীনতার এক বৈপ্লবিক প্রতিক হিশেবে
মনে স্থান দিয়েছিলেন। কিন্ত তাঁর স্থান ও চরিত্র বাইবেলে হল বিশ্বাসঘাতক
হিশেবে। খৃষ্টের জীবনকালে মহিলাদের প্রতি সন্মান ও অনুকম্পার নিদর্শণ বাইবেলে অনেক
স্থানেই আছে, কিন্ত সেন্ট পল এই ধারণাকে বিকৃত করলেন, পরস্পরবিরোধী
বক্তব্যে হিহুদী রক্ষণশীল আচার-আচরণের কাঠামোতে এবং আবার
সম্ভত শাসক শ্রেণীর মদতে । জেরুজালেমে রোমসাম্রাজ্যের আঞ্চলিক শাসক পন্টিয়াস পীলাট রোমের আইন অনুযায়ী
যীশু খৃষ্টের মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহিতার কোনো অপরাধ খুঁজে পাননি, কিন্ত রক্ষণশীল হিহুদী ধর্মযাজকদের প্রতিবাদের কারণে ও
বিদ্রোহের আশঙ্কা থেকে খৃষ্টকে ক্রুশে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। হিহুদী করদ রাষ্ট্র
হিহুদী ধর্মীয় আইন প্রণয়নে এই হিহুদী ধর্মযাজকদের পৃষ্টপোষকতা করতো এবং যাজক
শ্রেনীর স্বার্থরক্ষা ছিল রাষ্ট্রের
অগ্রাধিকার। খৃষ্টের বৈপ্লবিক বাণী ও তাঁর ক্রমবর্ধমান শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে
জনপ্রিয়তা তাই এই যাজকশ্রেণীকে আশঙ্কিত করে তুলেছিল। তাই প্রয়োজন ছিল এই
সমাজবিপ্লবীকে হত্যা করা। সেন্ট পলের আগে নাম ছিল সৌল। দৈব প্রত্যাদেশে তিনি
খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে সৌল থেকে পল হলেন, খৃষ্টের তিরোধানের পরে। খৃষ্টেকে হত্যা করা
হলেও, জনমন থেকে খৃষ্টের বৈপ্লবিক বাণী মুছে যায়নি পরন্ত এই বাণী বিভিন্ন বিদ্রহ ও
গন আন্দোলনের আদর্শগত ভীত রচণা করে গেছে। এই গনবিদ্রোহ ও ইহুদি সমাজে মহিলাদের ওপর
অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে মহিলারাও সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছিল। করদ রাজ্যগুলির ওপর রোমের
নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যাচ্ছিল। এমত অবস্থায় তাই দরকার হয়ে পড়ল খৃষ্টের ওপর দেবত্ব
আরোপের। ইহলোকে জাতিমুক্তির তত্ত্ব প্রতিস্থাপিত
হলো পরকালের স্বর্গরাজ্য স্থাপনের তত্ত্ব। সেন্ট পল তাই দেশী মূসুদ্দী ও
বিদেশী কায়েমী স্বার্থবাদীদের প্রতিনিধত্ব করতেন। খৃষ্টধর্মে নারী প্রতি মর্যাদার
আদর্শ এবং ধর্মীয় রক্ষণশীল শৃঙ্খল থেকে নারীর বেরিয়ে আসার চাহিদাকে তাই প্রাথমিক ভাবেই
রোধ করার একটা প্রতিক্রিয়াশিল দর্শণ
পরিলক্ষিত হয় সেন্ট পলের আদেশ ও বিধিতে।
মধ্যযুগের
যাজকবর্গের মহিলাদের সম্পর্কে মূল্যায়ণ ও মনোভাব আগেই আলোচিত হয়েছে। বাইবেলের সকল স্থানে নারীদের প্রতি সেন্ট পলের ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রতিফলিত
হয়েছে। তিনি তাঁর নিজের ণীতি মেনে চলেছিলেন এবং অবিবাহিত ছিলেন কিন্ত জাগতিক, দেহের প্রতি ঘৃনা পরিবর্তিত হলো নারীর
প্রতি তাঁর ঘৃণার দৃষ্টিভঙ্গিতে, কারণ নারীকেই দায়ী করা হতো পুরুষকে প্রলুব্ধ করছে
বলে। তিনি সর্বক্ষেত্রে নারীর ওপর তাঁর
স্বামীর প্রভূত্তের বিধানকে মেনে নিতে
নারীদের আজ্ঞা দিয়ে গেছেন। করিন্থীয়দের ও ইফিষীয়দের প্রতি প্রেরিত পলের
পত্রে পলের নারীদের সম্পর্কে মানসিকতা প্রতিফলিত হয়। ‘স্ত্রীলোককে স্পর্শ না করা মনুষ্যের ভাল...’ (১করিন্থীয়,
৭ঃ১-২)। ‘নারীগণ,
তোমরা যেমন প্রভুর, তেমনি নিজ নিজ স্বামীর বশীভূতা হও। কেননা স্বামী স্ত্রীর
মস্তক, যেমন খৃষ্ট মন্ডলীর মস্তক; তিনি আবার দেহের ত্রাণকর্তা; কিন্ত মন্ডলী যেমন খৃষ্টের বশীভূত, তেমনি নারীগণ
সর্ববিষয়ে আপন আপন স্বামীর বশীভূতা হউক’। (ইফিষীয়, ৫ঃ ২২-২৪)। ‘যেমন পবিত্রগণের
সমস্ত মণ্ডলীতে হইয়া থাকে, স্ত্রীলোকেরা মণ্ডলীতে নীরব থাকুক, কেননা কথা কহিবার
অনুমতি তাহাদিগকে দেওয়া যায় না, বরং যেমন ব্যবস্থাও বলে, তাহারা বশীভূতা হইয়া থাকুক। আর যদি তাহারা
কিছু শিখিতে চায়, তবে নিজ নিজ স্বামীকে ঘরে জিজ্ঞাসা করুক, কারণ মণ্ডলীতে
স্ত্রীলোকের কথা বলা লজ্জার বিষয়। (১করিন্থীয়, ১৪ঃ৩৪-৩৫)। ‘তদ্রুপ, হে ভার্যা সকল,
তোমরা আপন আপন স্বামীর বশীভূতা হও’। (১ পিটার,৩ ঃ ১)। এতদ্বারা এক সিধান্তে উপনীত হওয়া যে, গ্রীক প্যাগান দর্শনে মহিলাদের
সমাজে যে উচ্চ স্থান ছিলো, তাঁরা শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং দর্শণ, গনিত শাস্রে যে ভাবে
মানব সভ্যতা কে সমৃদ্ধ করে গেছেন (হাইপেটিয়া প্রমুখ), পরবর্তী হিহুদী ধর্মীয়
বিধানে নারীশিক্ষার কোনো নিদর্শণ দেখা যায় না। স্বাভাবিক হিহুদী সমাজে স্ত্রীদের
সমাজ, জগত ও জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনের সম্বন্ধে কোনো ধারণা না হওয়াই স্বাভাবিক, এবং
খৃষ্টধর্মে বার বার এই পিটার ও পল মারফৎ স্ত্রীদের শিক্ষার আলোক, চিন্তা-চেতনা
বিকাশের পরিধি থেকে বিধি-আজ্ঞা মারফৎ দূরে রাখার সচেতন প্রয়াস বারে বারে
প্রতিবিম্বিত হয়। আধুনিক কালেও ক্যাথিলক ও প্রটেস্টান সমাজে ও পরিবারে স্ত্রীদের অবদমিত করে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা
পরিলক্ষিত হয়। আধুনিক কালে স্বামী যদি বোকা বা অশিক্ষিত হয় এবং স্ত্রী যদি স্বামী
অপেক্ষা উচ্চশিক্ষিত ও জ্ঞানী হয়, তাও ধর্মীয় বিধান মতন স্ত্রীকে স্বামীর কথা মেনে
চলতে হবে এবং ‘বশীভূতা’ হতে হবে। ধর্মান্ধ ব্যক্তিরা অবশ্য দাবি করেন খৃষ্টধর্মের
উদ্দেশই হলো মানবজাতিকে মুক্ত করা। এবং মা মেরীর প্রাধান্যের উদাহারণ দিয়ে
তাঁরা দৃঢ়তার সাথে বলে থাকে যে খৃষ্টধর্মই নারীকে তার পূর্বেকার পরাধীন
অবস্থা ও বন্ধন থেকে করেছে। কিন্ত পূর্বেই আলোচিত হয়েছে ষষ্ট খৃষ্টাব্দে কাউনসিল
অফ ম্যাকন নারীদের সম্বন্ধে কি মূল্যায়ন করেছে। খৃষ্টধর্ম প্রচারের ও
ধর্মান্তকরণের অভিপ্রায়ে প্রচারকরা যে সব
‘অসভ্য’ দেশে গিয়েছিল, সেই সব দেশে ও গোষ্টিতে তখন দেবী পূজার প্রচলন ছিলো তাই
খৃষ্টানদের একটি দেবী প্রতিষ্টা করার উদ্দেশ্যে তারা মেরী মাতার পূজা শুরু করলো।
দক্ষিণ দেশগুলিতে কিবেল, মিলিট্টা, অ্যাফ্রোডাইট, হেরা, জার্মান জাতির এড্ডা দেবীর
স্থানে মেরী মাতা অধিষ্টিত হলো। এই বিষয়ে জার্মান দার্শনিক ও চিন্তাবিদ
আগস্ট বেবেলের দৃষ্টিভঙ্গি স্মর্ত্যব্য। “ By
introducing the cult of the Virgin Mary, the Catholic Church, with wise
calculation, merely put this cult in place of the cult of the ancient
goddesses, that existed among all the peoples who were converted to
Christianity at that time. Mary replaced Cybel, Mylitta, Aphrodite and Venus
among the Southern nations, and Freia, Frigga and others among the German
tribes. She was only endowed with a Christian, spiritual idealism.”। (সুত্রঃ - August Bebel. Woman
and Socialism,Woman
in the Past)। ‘St.
Paul, who may be called the founder of Christianity even more so than Jesus
himself, St. Paul, who removed this creed from the narrow Jewish sectarianism
and gave it its international character, writes to the Corynthians: Now
concerning the things whereof ye wrote unto me: it is good for a man not to
touch a woman. Nevertheless, to avoid fornication, let every man have his own
wife and let every woman have her own husband.
“Matrimony is a degraded station; to marry is good, not to marry
is better.” “Walk in the spirit and resist the temptations of the flesh.” “The
flesh conspires against the spirit and the spirit conspires against the
“flesh.” They, whom Christ has won, have crucified their flesh with all its,
passions and desires. — -
He was true to his own views and refrained from marriage. This
hatred of flesh is the
hatred of woman, but also the fear of woman, who is
represented as man’s seducer. In this spirit the apostles and fathers of the
church preached; in this same spirit the church used its influence during the
entire middle ages, by establishing monasteries and introducing celibacy of
priests, and it is still using its influence in the same direction.
According to Christianity woman is impure.
She is the seducer who brought sin into the world and wrought man’s
destruction. Therefore the apostles and fathers of the church regarded marriage
as a necessary evil, as prostitution is regarded at present. Tertullian
exclaims: “Woman, you ought to go about clad in mourning and rags, your eyes
filled with tears of remorse, to make us forget that you have been mankind’s
destruction. Woman, you are the gate to hell!” And: “Celibacy must be chose,
even though the human race should perish.” Hieronymus says: “Matrimony is
always a vice, all that can be done is to excuse it and to sanctify it;
therefore it was made a religious sacrament.” Origines declares: “Matrimony is
impure and unholy; a means of sensual passion.” To escape the temptation he
emasculated himself. Augustin teaches: “The married people will shine in heaven
like radiant stars, while their parents (their procreators) will be like dark
stars.” Eusebius and Hieronymus are agreed that the teaching of the Bible: “Be
fruitful and multiply,” is no longer suited to the times, and does not concern
Christians. Hundreds of similar sayings by the most influential teachers of the
church might be quoted, to prove that they all taught in the same spirit. By
their continuous teaching and preaching they have disseminated those unnatural
views about everything pertaining to sex and the sex relation, which after all is
a law
of nature, and the fulfillment of which is one of the most important duties in
the plan of life. Modern society is still suffering from the
effects of these doctrines, and is but slowly recovering from them.’। (সুত্রঃ - August
Bebel. Woman and Socialism,Woman in the Past)।
নারীদের প্রতি এইরুপ বিধান ও দৃষ্টিভঙ্গি শুধু খৃষ্টধর্মেই ছিলো না।
খৃষ্টধর্ম ছিলো গ্রীক দর্শন ও ইহুদি ধর্মের মিশ্রণের ফল। গ্রীক দর্শণের প্রভাবিত
হয়েছিল প্রধানত মিশর, ব্যাবিলন ও ভারতের প্রাচীন সভ্যতা থেকে। খৃষ্টধর্মের সমকালীন
বিস্তারের সময়ে প্রাচীন বিশ্বে সর্বত্রই নারীকে হেয় ও ঘৃণ্য ও পুরুষের ভোগের বস্তু
হিশেবে প্রতিপন্য করা হত। হিন্দু ধর্মও তার ব্যাতিক্রম নয়। বর্তমান আধুনিক খৃষ্টান
পূঁজিবাদী রাষ্ট্রে নারীর অবস্থার ক্রমশ উন্নতির হতটুকু হয়েছে, তার জন্যে খৃষ্টধর্মের
কোনো কৃত্বিত্ত্ব নেই। পূঁজিবাদ বিকাশের ঐতিহাসিক চাহিদাতেই এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার
অগ্রগতির ফলেই তা হতে পেরেছে।
হিন্দু ধর্মে নারীর অবস্থান।
মনুস্মৃতিতে নারীর সামাজিক
হীনস্থান, পুরুষের বশ্যতা স্বীকার এবং পরাধীনতা স্বীকৃত ও সমর্থিত রয়েছে। বনগমন
সম্বন্ধে লক্ষণের সাথে আলাপচারিতায় রামের বক্তব্য ছিল যে শুধু তাকেই নয়,
কৌশল্যাকেও বনে পাঠাবার অধিকার দশরথের আছে। “বিশেষতঃ দেবীর তিনিই ভর্তা, তিনিই গতি
ও তিনি ধর্ম। অধিক আর কি কহিব, তিনি জীবিত আছেন,...এইরুপ অবস্থায় তাঁহার
আজ্ঞাক্রমে দেবীও অন্য স্ত্রীলোকের ন্যায় আমার সহিত এইস্থান হইতে বহিষ্কৃওত হইতে
পারেন”। ( বাল্মীকি রামায়ণ, পৃঃ ১৯০)। পরে তিনি কৌশল্যার উদ্দেশ্যে এই উপদেশ দেনঃ
‘জননী ! স্ত্রীলোক যতদিন জীবিত থাকিবে, ততদিন ভর্তাই তাঁহার দেবতা ও প্রভু। সুতরাং
মহারাজ আপনার ও আমার উপর যে যথেচ্ছ ব্যবহার করিবেন, ইহাতে আর বক্তব্য কি আছে। মাতঃ
! কায়মনে সেই বৃদ্ধ রাজার হিতসাধন করা আপনার বিধেয়। যে নারী ব্রতোপবাসশীল হইয়া
ভর্তৃসেবা না করে, তাহার অধোগতি লাভ হয়। ভর্তৃসেবা করিলে স্বর্গপ্রাপ্তি হইয়া
থাকে...দেবী! বেদ ও স্মৃতিশাস্ত্রে স্ত্রীজাতির এইরুপই ধর্ম নির্দিষ্ট আছে। (
বাল্মীকি রামায়ণ, পৃঃ ১৯৬)। স্বয়ং ভগবানের মুখ নিস্মৃত নারীদের প্রতি যদি এইরুপ
উপদেশ থাকে তাহলে আমজনতা কাছে ধর্মশাস্ত্রকেন্দ্রীক বিধি ন্যায় ও সত্যের পরাকাষ্টা
হিশেবে সমাজে বৈধ হতে বাধ্য। এভাবেই
সত্যের মুখোশে পরে ধর্মশাস্ত্রের মানবতাবিরোধী বিধি বার বা সমাজে ন্যায্যতা
পেয়েছে। রামায়ণে-সীতাচরিত্রকে কেন্দ্র করে নারীর সতীত্বের এক উচ্চ আদর্শ প্রতিফলিত
হলেও পুরুষের যৌন একনিষ্টতার কোন বিধান নেই, যেমন নেই মনুস্মৃতি প্রভৃতি
ধর্মশাস্ত্রে। দশরথের অন্তত সাড়ে তিনশ পত্নী ছিলো, কিন্ত সেই বিষয়ে ধর্মবীধিতে কোনো নিষধাজ্ঞা নেই। অসংখ্য
সুন্দরী যুবতী রামচন্দ্র রামচন্দ্রকে বনবাসের আগে স্নান
করাতেন এবং তার অন্যান্য পরিচর্যা করতেন। সীতার
মুখে এই নিয়ে কোন প্রশ্ন করানো হয়নি। লংকায় বাসকালে সীতার সতীত্ব সম্বন্ধে
রাম অকারণ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং সর্বসমক্ষে সীতার প্রতি আশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার
করেছেন। কিন্ত সীতার অবর্তমানে রামের চরিত্র সম্বন্ধে কোন
প্রশ্ন করা হয় নি। অশোক বনে সীতার মনে এই প্রশ্ন জেগেছিল। শোকবিধবস্ত সীতা –
স্বগোক্তি করছেন ঃ “ হা! আমার এই পাতিব্রত্য, ক্ষমা, ভূমিশয্যা ও নিয়ম সমস্তই
নির্থক হইল...আমি দুঃখশোকে বিবর্ণ, দীন ও কৃষ হইয়াছি, ভর্তৃসমাগমে আমার কিছুমাত্র
আশা নাই। রাম! বোধহয় তুমি নির্দিষ্ট নিয়মে পিতৃনির্দেশ পালন ও ব্রতচারণপুর্বক বৃহে
প্রত্যাগমন করিয়াছ এবং তথায় নির্ভয় ও কৃতার্থ হইয়া বহুসংখ্যক আকর্ণলোচনা কামিনীর
সহিত সুখে কালক্ষেপ করিতেছ। কিইন্তু আমি
তোমার একান্ত অনুরাগিণী, এক্ষণে প্রাণান্ত করিতে প্রস্তুত হইয়াছি “। (বাল্মীকি
রচিত ও হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য অনুদিত রামায়ণ, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন, কলকাতা, ১৯৮৪,
পৃঃ ৬১৮-৬১৯ )। রামচন্দ্র সীতাকে একবার অগ্নিপরিক্ষা করেছেন, তারপর প্রতিজ্ঞাভংগ
করে তাকে ত্যাগ করেছেন এবং আবার গ্রহণ করবার শর্ত হিশেবে দ্বীতিয়বার অগ্নিপরিক্ষা
দিতে বলেছেন। কিন্ত অগ্নিপরিক্ষা দ্বারা নারীর সত্বীত্ত্ব প্রমাণ ও ত্যাগ করার বিধান মনুস্মৃতি প্রভৃতি
ধর্মশাস্ত্রের লেখকদের মনে স্থান পায়নি। রামের বনে যাবার অভিপ্রায়ে সীতা তাঁর
স্বামীর কাছে আদর্শ নারীচরিত্রে ও সত্বীত্ত্বের নিদর্শণ হিশেবে রামের সাথে বনবাসে
সমস্ত দুঃখকেই সুখ হিশেবে মনে করবেন কারণ তার কাছে তার স্বামী ছিল দেবতাস্বরূপ এবং
রাম যদি সীতাকে অয্যোধায়ে রেখে চলে যান তাহলে তিনি প্রাণত্যাগ করবেন। এইরুপ আদর্শ
নারীচরিত্র সীতার মধ্যে প্রতিফলিত হলেও, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কোনো অধিকার বোধ
জন্মালো না। লংকা যুদ্ধ জয়ে পরে রাম সীতার সামনে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে
সর্বসমক্ষ্যে তাকে বললেন ঃ ‘তুমি নিশ্চয় জানিও আমি যে সুহৃদগণের বাহুবলে এই
যুদ্ধশ্রম উত্তীর্ণ হইলাম, ইহা আমার জন্য নহে। আমি স্বীয় চরিত্র রক্ষা, সর্বব্যাপী
নিন্দা পরিহার এবং আপনার প্রখ্যাত বংশের ণিচত্ব অপবাদ স্খালনের উদ্দেশ্যে এই কার্য
করিয়াছি। এক্ষণে পরগৃহ বাস নিবন্ধন আমার বিলক্ষণ সন্দেহ হইয়াছে। তুমি...আমার
চক্ষের অতিমাত্র প্রতিকূল হইয়াছ। অতএব আজ তোমায় কহিতেছি, তুমি যেদিকে ইচ্ছা যাও,
আমি আর তোমাকে চাইনা। .. তুমি এখণ স্বচ্ছন্দে লক্ষণ বা ভরতের অনুরাগিনী হও,
শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব কিংবা বিভীষণের প্রতি মনোনিবেশ কর, অথবা যা ইচ্ছা তাই কর। রাবণ
তোমাকে সুরুপা ও মনোহারিনী দেখিয়া এবং তোমাকে স্বগৃহে পাইয়া বড় অধিক্ষণ সহিয়া থাকে
নাই’। (বাল্মীকি রচিত ও হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য অনুদিত রামায়ণ, রিফ্লেক্ট
পাবলিকেশন, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃঃ ৯১২-৯১৪ )। কিন্ত যে ধর্মীয় বিধি সীতাকে লংকায় রাবণের সমস্ত ভয় ও
প্রলোভণকে অগ্রাহ্য করে, পতিভক্তিতে শুদ্ধচরিত্রা রেখেছে, সেই ধর্মবীধি কিন্ত সীতাকে অগ্নিপরিক্ষা থেকে অব্যাহতি দিল না। অগ্নিপরিক্ষার
পরে রাম সীতাকে গ্রহণ করে বললেন ‘ত্রিলোক মধ্যে ইনি পবিত্র। কীর্তি যেমন মনুষ্যের
অত্যাজ্য, সেইরুপ ইনিও আমার অপরিত্যাজ্য’। (বাল্মীকি রচিত ও হেমচন্দ্র
ভট্টাচার্য্য অনুদিত রামায়ণ, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃঃ ১৯৭ )। এরপর রাম সীতার সঙ্গে বেশ কিছুকাল দাম্পত্যসুখে
অতিবাহিত করলেন। এত কঠিন পরিক্ষা এবং আপাতবিশ্বাসের পর রাম যখন সীতার গর্ভলক্ষণ
দেখতা পেলেন তখন কেনো রাম অকারণে খোঁজ নিতে গেলেন যে প্রজারা সীতার সত্বীত্ব নিয়ে
কি ধারণা পোষণ করছে? প্রজাদের একাংশের মধ্যে সীতার সতীত্ত্ব নিয়ে সন্দেহের
জনশ্রুতি অবগত হবার পর রাম ভাইদের ডেকে বললেন যে তিনি সীতাকে পরিত্যাগ করার
চূড়ান্ত সিধান্ত নিয়েছেন এবং সীতার সঙ্গে এই বিশয়ে কথা বলার একটিবার মাত্র প্রয়োজন
অনুভব করলেন না। (এই প্রসঙ্গে স্মর্তব্য ১৯৯০ সালে প্রচারিত সরকারী পৃষ্টপোষকতায়
রামায়ণে রাম-সীতার মধ্যে এই বিশয়ে দীর্ঘ এবং মর্মস্পর্শী সংলাপ দেখানো হয়েছে যা
কিনা লেখকের কল্পণাপ্রসুত, বাল্মীকি রামায়ণে এই সংলাপের চিহ্নমাত্র নেই)। এই সিধান্তের কারণ রাম লক্ষ্মণকে ব্যাখ্যা করে
বললেন যে দযদিও অগ্নিপরিক্ষার ফলে তিনি যানেন যে সীতা নিষ্পাপ, তবুও এই অপবাদে
তাঁর মন ব্যাথিত হয়েছে ‘যার অকীর্তি রটনা হয়, যাবৎ সেই অকীর্তি ঘোষণা থাকে তাবৎ তাহার নরকবাস হইয়া থাকে। ...অতএব ভাই ! তুমি কাল
প্রভাতকালে সুমন্ত্রচালিত রথে আরোহণপূর্বক সীতাকে লইয়া অন্য দেশে পরিত্যাগ করিয়া
আইস।(বাল্মীকি রচিত ও হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য অনুদিত রামায়ণ, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন,
কলকাতা, ১৯৮৪, পৃঃ ১০৩৩-৩৪ )। রাম ভাইদের
শুধুমাত্র আদেশ দিলেন মাত্র, বশিষ্ট প্রভৃতি কোনো কুলপুরোহিতের মতও এক্ষেত্রে তার
কাছে অগ্রাধিকার পেলো না। অগ্নিপরিক্ষার
পর রাম যখন সীতাকে গ্রহণ করলেন এবং সীতাকে নিষ্পাপ বলে ঘোষণা করলেন, তখন শুধু
জনরবের এবং গুজবের ভিত্তিতে রাম কোন যুক্তিতে সীতাকে পুনরায় পরিত্যাগ করলেন? তিনি
প্রজাদের কি একবারও অগ্নিপরিক্ষায় সীতার উত্তীর্ণ হবার কথা জানাবার প্রয়োজন বোধ করলেন না? পঞ্চম শতাব্দীতে মহাকবি কালিদাস
তার রঘুবংশ কাব্যের চতুর্দশ সর্গে সীতা ও বাল্মীকির মুখে রাম কর্তৃক বিনাদোষে
সীতাকে পরিত্যাগের সিদ্ধান্তের ও প্রয়োগের কঠোর সমালোচনা করেছেন। পরিত্যাগের পরে
রাম সীতার কোনো খোঁজ নেবার প্রয়োজন বোধ করলেন না।
পরে লবকুশের রামায়ণ গানের মাধ্যমে জানতে পারলেন যে সীতা বাল্মীকির আশ্রমে
আছে। রাম আবার সীতাকে বাল্মীকির সঙ্গে নিয়ে প্রমাণ চাইলেন তার সতীত্বের, এবং
প্রমাণসাপেক্ষে তিনি পুনরায় সীতাকে গ্রহণ করবেন। বাল্মীকি রামকে বললেন ‘ এই দুই
যমজ কুশীলব জানকির গর্ভজাত। আমি সত্যই কহিতেছি ইহারা তোমারই ঔরসপুত্র। ...আমি যে
কখনও মিথ্যা কহিয়াছি ইহা আমার স্মরণ হয় না। এক্ষণে আমার বাক্য বিশ্বাস কর, ইহারা
তোমারই ঔরসপুত্র। ...এক্ষণে এই পতিপরায়ণা তোমার মনে আত্মশুদ্ধির প্রত্যয় উৎপাদন
করিবেন। (বাল্মীকি রচিত ও হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য অনুদিত রামায়ণ, রিফ্লেক্ট
পাবলিকেশন, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃঃ ১০৯০ )। তথাপি
রাম তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেন এবং সীতার কাছে আবার আত্মশুদ্ধি ও সতীত্বের প্রমাণ চাইলেন। কিন্ত কঠোর ধর্মনিয়ন্ত্রণে ও অনুশাসনে এবং নির্দয় পুরুশাসিত
সমাজব্যাবস্থার বিরুদ্ধে চিরঅবহেলিতা , নিষ্পেষিতা সীতার শেষ প্রতিবাদের প্রকাশ
ঘটলো তার অসহায় সিধান্তে ‘আমি রাম ব্যতীত
যদি অন্য কাহাকেও মনেতে স্থান না দিয়া থাকি তবে সেই পুন্যের বলে দেবী পৃথিবী
বিদীর্ণ হউন, আমি তন্মধ্যে প্রবেশ করি। যদি আমি কায়মনোবাক্যে রামকে অর্চণা করিয়া
থাকি তবে সেই পুন্যের বলে দেবী পৃথিবী বিদীর্ণ হউন, আমি তন্মধ্যে প্রবেশ করি। আমি
রামের পর আর কাহাকেই জানি না, যদি এই কথা সত্য বলিয়া থাকি তবে এই পুণ্যের বলে
পৃথিবী বিদীর্ণ হউন, আমি তন্মধ্যে প্রবেশ করি’। (বাল্মীকি রচিত ও হেমচন্দ্র
ভট্টাচার্য্য অনুদিত রামায়ণ, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃঃ ১০৯১ )। এর পর সকলেই জানেন যে সত্যি পৃথিবী দ্বিধা হলেন
এবং সীতা তার মধ্যে প্রবেশ করলেন।
বৈদিক যুগের লিখিত মূল
কাহিনীগুলোতে সম্ভবত নারীদের বেশ কিছুটা সামাজিক মর্যাদা প্রতিফলিত হয়। বিভিন্ন
বেদে, বিশেষত ঋগ্বেদে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে নারী স্বাধীনতার প্রচুর উদাহরণ । এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং
পুরুষের সঙ্গে যজ্ঞে সমান অধিকার সমাজে প্রতিফলিত হয়। বিধবাদের
পুণর্বিবাহের নিষেধাজ্ঞা ছিলো না। স্বাধীন বিবাহ, সহজ বিবাহ বিচ্ছেদ, এমনকি
অনেকবার বিবাহের অধিকার ছিলো। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের বিধানেও নারী তুলনাক্রমে
সম্মানিত ও মুক্ত ছিলো। অর্থশাস্ত্র নারীর সম্পত্তির অধিকারে অনেক উদার বিধান ছিলো। যদিও অর্থশাস্ত্রে নারীর অধিকার ও
স্বাধীনতা অনেকটা সঙ্কুচিত হয়েছিল, তবুও বলা যায় পরবর্তী যুগে সমাজজীবনে নারীদের ক্ষেত্রে ধর্মশাস্ত্রের বিধানের তুলনায়
ও হীনবস্থার নিরিখে নারী আপেক্ষিকভাবে
অনেক স্বাধীন ছিল। কিন্ত কালের প্রভাবে ক্রমশ ধর্মশাস্ত্রে ব্রাহ্মণ্য
সংযোজন, মনুস্মৃতি প্রভৃতি দ্বারা প্রক্ষিপ্ত
দর্শণে নারীর হীনস্থান মহাভারতেও প্রতিফলিত হয়। যদিও মনুস্মৃতি এক জায়গায় পরিবারের
মধ্যে নারীদের বাহ্যিক সম্মান দেখানো হয়েছে, কিন্ত সামগ্রিক ভাবে আর্যসমাজে মনুস্মৃতির পর্যালোচনা
করলে প্রতিফলিত হয় স্মাজের আর্থ-সামাজিক কাঠামোতে নারীর হীনস্থান সুনির্দিষ্ট করে
দেওয়া হয়েছে। মনু বলেছেন শৈশব থেকেয় বার্ধক্য পর্যন্ত আজীবন নারী পুরুষের বশীভূতা
হয়ে থাকবে, কোন কাজেই স্বাধীনভাবে নিজ ইচ্ছায় করতে পারবে না। (মনুস্মৃতি, ৫/১৪৭-৪৮)।
স্বামী যদি দুশ্চরিত্র, লম্পট, গুনহীন বা অপদার্থ হয়, তবুও দেবজ্ঞানে তাকে পূঁজা
করার নারীর আবশ্যিক ধর্মীয় কর্তব্য। (মনুস্মৃতি,
৫/১৫১,১৫৪)। স্বামীর মৃতুর পরে নারীকে অনেক কৃচ্ছসাধন করে বিধবার জীবন যাপন করতে
হবে, কিন্ত স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামী আবার বিবাহ করতে
পারবে। (মনুস্মৃতি, ৫/১৫৬-৫৮), (মনুস্মৃতি, ৫/১৬৭-৬৯) । মা কিংবা বোনের সাথেও
পুরুষ নির্জনে বসবে না কারণ নারী স্বভাবতই দুশ্চরিত্রা এবং পুরুষের মন ভোলানো তার
স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। (মনুস্মৃতি, ৫/১৬৭-৬৯) । নারীর এই স্বাভাবিক সহজাত প্রকৃতির
জন্যে সবসময় তাকে পাহারায় রাখতে হবে। (মনুস্মৃতি, ২/২১৩-১৫) । পুরুষের রুপ, বয়স
নির্বিশেষে নারী পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। (মনুস্মৃতি, ৯/১-২৭) । ঈশ্বর
নারীদের মধ্যে সব মানব দোষ দিয়েছেন বলেই এই বিধান দিয়েছেন যে তাদের সর্বদা কড়া
পাহারায় রাখতে হবে। (মনুস্মৃতি, ৯/১৭-১৮)। স্ত্রীলোকের কাজ নির্দিষ্ট হয়েছেন
পরিবারের সব কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার আর খরচ কমানো। (মনুস্মৃতি, ৫/১৫০)। নারী
অথবা শূদ্র হত্যা কোনো গুরুতর অপরাধ নয়, এই অমানবিক বিধানও দেওয়া হয়েছে।
(মনুস্মৃতি, ১১/৬৭)। নারীদের
বেদ পাঠ বা যাগ-যজ্ঞে অংশগ্রহণ করার নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। (মনুস্মৃতি,
১১/৩৬-৩৭, ৪/২০৫-২০৬)।
বেদব্যাসী মহাভারত থেকে পল্লবিত ও
প্রক্ষিপ্ত মহাভারতে নারীর যে সমাজে স্থান নির্ধারিত হয়েছে তা সম্পূর্ণ এই যুগের
ন্যায় – নীতির নিরিখে যথেষ্টই অমানবিক, অমর্যাদাকর
ও অবহেলিত। পল্লবিত মহাকাব্যের সর্বত্রই
ধর্মীয় বিধিতে শত শত সুন্দরী যুবতীকে সামগ্রী বা পন্যের মতন দান করা হয়েছে।
বকরাক্ষসের বধের কাহিনীতে এই বিধি প্রতিষ্টিত হয়েছে যে স্ত্রী রাক্ষস দ্বারা নিহত
হলে ব্রাহ্মণের আবার বিবাহ করতে পারবে কারণ পুরুষের বহুবিবাহ ধর্মসম্মত কিন্ত স্বামীর মৃত্যুর পরে স্ত্রীর পুনর্বিবাহ ঘোর
অধর্ম। এছাড়াও মহাভারতের উদ্যোগপর্বে সঞ্জয়যানপর্বাধ্যায়ে সঞ্জয়ের সাথে
যুধিষ্টিরের সংলাপে নিঃসন্দেহে প্রমানিত
হয় যে আর্য পুরুষদের বাড়ির মধ্যে বহুস্ত্রীর বর্তমানেও বেশ্যা রাখার প্রথা ছিল। উদ্যোগপর্বেই
উল্লেখিত আছে যে ধর্মরাজ যুধিষ্টির সেনাসজ্জার তদারকি করতে গিয়ে বেশ্যাদের শিবিরও
পরিদর্শণ করেন। এতদ্বারা প্রমানিত হয় যে
যুদ্ধ ক্ষেত্রে সৈন্যদের লালসা চরিতার্থ করতে নারীদের বেশ্যারুপে ব্যবহার করা
ধর্মযুদ্ধের অংগ ছিলো। দ্রৌপদীর
পঞ্চস্বামীর সাথে বিবাহের সময়ে তার মত নেওয়া হয় নি । দ্রৌপদীকে দেখার আগেই কুন্তি
তাকে পাচঁ ভাইএর মধ্যে ভাগ করে নিতে বলেছিলেন এবং মাতৃআজ্ঞার সম্মানে পাঁচ ভাই তার উপদেশ পালন করে দ্রৌপদীকে
গ্রহণ করেছিলেন, এই প্রচলিত বিশ্বাস ভ্রান্ত। দ্রৌপদীকে দেখার পরেই কুন্তির মনে
অধর্ম আর পাপবোধ জন্মালো। প্রথমে পঞ্চপাণ্ডবও কুন্তির কথার গুরুত্ব দেয় নি। যুধিষ্টির
আগেই দ্রৌপদিকে দাবী করলেন অর্জুনের কাছে এবং অর্জুন বিনম্রচিত্তে বললেন যে জৈষ্ট
ভ্রাতার আগেই বিয়ে করা উচিত অথহেব দ্রৌপদী যুধিষ্টিরের প্রাপ্য। কিন্ত ততক্ষণে পাঁচ ভাই দ্রৌপদীর রুপলাবন্যে কামাসক্ত
হয়ে পড়েছে। ‘ভক্তিস্নেহকৃত অর্জুনের বাক্য শ্রবণ করিয়া পাণ্ডুতনয়েরা দ্রৌপদীর
প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। তাঁহারা যশস্বিনী কৃষ্ণাকে নয়নগোচর করিয়া পরস্পর বদন
নিরীক্ষণ করিয়া উপবিষ্ট ও তদ্গতচিত্ত হইলেন। তাঁহারা দ্রৌপদীর রূপলাবণ্যে এরূপ
মোহিত হইয়াছিলেন যে তাঁহাদের ইন্দ্রিয়গ্রাম প্রমথিত করিয়া অনংগবিকার প্রাদুর্ভূত
হইল। ...যুধিষ্ঠির অনুজগণের আকার ও মনের ভাব বুঝিততে পারিয়া এবং ভেদভয়ে ভীত হইয়া
আনুজদিগকে নির্জনে লইয়া কহিলেন,
দ্রৌপদী আমাদের সকলের ভার্যা হইবেন’। (বেদব্যাসী মহাভারত, প্রথম খন্ড, পৃঃ ৩৩৫)।
তারপরে যুধিষ্টির ও ব্যাসদেব নারীর একাধিক স্বামীর পৌরানিক কাহিনীর কিছু উদাহারণ
দিয়ে এই বিবাহকে সামাজিক সমর্থনের একটা উপায় বের করলেন। অথহেব কামাসক্ত হয়ে পাঁচ
ভাই ধর্মপুত্র যুধিষ্টিরের পরামর্শে দ্রৌপদীকে ভোগ্যবস্তু হিশেবে একসঙ্গে বিবাহ
করলেন, মাতৃআজ্ঞায় নয়। অথহেব মহাকাব্যের রচয়িতা দ্রৌপদীর মতের কোনো মূল্যই দেননি
বরঞ্চ এই প্রধান নারীচরিত্রকে পূরুষের কাম ও ভোগ চরিতার্থ করার একটা বস্তু হিশেবেই
বিবেচনা করেছেন। মহাভারতের এই বীর পাঁচ
ক্ষত্রিয়, যুধিষ্ঠিরের পাশা খেলায় দ্রৌপদীকে পন রাখার অধিকারের বিশয়ে নীরব ছিলেন
কারণ তাঁরা নারীকে ভোগ্যপন্য বস্তু হিশেবেই গন্য করতে অভস্ত। দ্রৌপদীর মত জানার তো
কোনো প্রশ্নই ছিলো না। উপস্থিত ব্রাহ্মণ পুরোহিতেরা নিরব থাকেন কারণ ক্ষত্রিয়রা
তাঁদের অন্নদাতা। বনপর্বে কৃষ্ণপত্নী
সত্যভামার সাথে দ্রৌপদীর সংলাপে জানা যায় যে প্রাচীন কাল থেকেই এদেশের
ধর্মশাস্ত্রে নারীদের সমস্ত পরিবারে অবোইতিনিক দাসী হিশেবে নির্দিষ্ট স্থান আছে।
দ্রৌপদীও এর ব্যাতিক্রমী ছিলেন না। কিন্ত এতকরেও স্বর্গলাভে দ্রৌপদী ব্যার্থ হল কারণ তার
মনে নাকি অর্জুনের প্রতি কিঞ্চিত পক্ষ্যপাত ছিলো। এই বিচার করলেন অবশ্য জৈষ্ট
স্বামী যুধিষ্টির। এদিকে তার স্বামীরা যত্রতত্র
বিবাহ করলেও কবিকে কোনো বিড়ম্বনায় পড়তে হয় নি। স্বয়ং কৃষ্ণ নরকাসুর বধ করে তার
ষোলহাজার কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। এছাড়াও তাঁর দশ বারোটি পত্নী ছিলো। পতির জন্য
স্বেচ্ছা অন্ধত্য মহিমা বহুকির্তিত ও বন্দিত কিন্ত স্ত্রীর জন্যে স্বামীর ত্যাগের কোনো উদাহারণ মহাভারতে
নেই কারণ তা ধর্মশাস্ত্র অনুমোদন করে না । গান্ধারীর চোখ খোলা থাকলেই স্বামীর
বরঞ্চ বেশী সুবিধে হত। গীতায় অর্জুন যে কুলের নরকে পতিত হবার কারণ বিশেষে
কুলস্ত্রীদের অধর্মকে নির্নয় করেছেন। কুলস্ত্রীদের অধর্মের কারণে তারা ভ্রষ্টা হন,
ফলে বর্ণসঙ্করের কারণে কুল অধঃপতিত হয়। (শ্রীমদভগবদগীতা, ১/৪০-৪১)। কৃষ্ণের বচনে
‘আমাকে আশ্রয় করে স্ত্রী, বৈশ্য, শূদ্র প্রভৃতি পাপযোনিও পরম গতি লাভ করে,
ব্রাহ্মণ আর রাজর্ষিদের মতো পুন্যবান ভক্তদের আর কথা কি?’ (শ্রীমদভগবদগীতা,
৯/৩২-৩৩)। এই অমানবিক উক্তি থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে আর্থসামাজিক কাঠামোতে নারী ও
শূদ্রের স্থান সমান বলে গন্য করা হতো। উচ্চবর্ণে
জন্মালেও নারীদের জন্য জন্মনির্বিশেষে দাসসুলভ শুদ্রশ্রেণীর স্থানাংক নির্দিষ্ট ছিলো। যেহেতু
সমাজের অর্ধেক মানুষই নারী, অতএব সমাজের অল্প সংখ্যক পুরুষ ব্রাম্মণ-ক্ষত্রিয়রাই
যথাক্রমে বিশুদ্ধ সত্ত্ব এবং প্রধানত রজ ও আংশিক সত্ত্ব গুনের মালিক হয়ে গেলেন এবং
আর্থসামাজিক কাঠামোতে তাদের স্থান সমাজের সব স্তরের উচ্চে নির্দিষ্ট করার বিধান ও
নিশ্চয়তা প্রদান করা হলো। এই ভূতলস্থ দেবতাদের পরিবারের নারীরা আর দেবী হতে পারলেন
না, তমগুনসম্পন্ন দাসী হয়েই রইলেন। এটাই শ্রী ভগবানের বিধান। ব্রাহ্মণ্য –
ক্ষত্রিয় ধর্মশাস্ত্র যুগে নারীদের সামাজিক হীনস্থান পরিস্ফুট হয় আনুশাসন পর্বে
ভীষ্মের ভাষায় ও ভাবে নারীদের সামাজিক অবমূল্যায়নের চিত্রে । ‘কামিনীগণ
সতকূলসম্ভূত, রুপসম্পন্ন ও সধবা হইলেও স্বধর্ম পরিত্যাগ করে। উহাদের অপেক্ষা
পাপপরায়ণ আর কেহই নাই। উহারা সকল দোষের আকর। উহারা অবসরপ্রাপ্ত হইলেই ধনবান ও
রুপবান পতিদিগকে পরিত্যাগপূর্বক পরপুরুষসম্ভোগে প্রবৃত্ত হয়...যেমন কাষ্টরাশি
দ্বারা সমুদ্রের ও সর্বভূত সংহার দ্বারা অন্তকের তৃপ্তিলাভ হয় না, তদ্রুপ অসংখ্য পুরুষ
সংসর্গ করিলেও স্ত্রীলোকের তৃপ্তি জন্মে না’। (বেদব্যাসী মহাভারত, তৃতীয় খন্ড, পৃঃ ৯৮৭-৯৮৮)। এই উদ্ধৃতির বর্জিত অংশের
নারীজাতি নিয়ে এমন সব ছাপার অযোগ্য অশ্লীল
বর্নণা আছে যা এই সমাজের ন্যায়ের ও সভ্যতার নিরিখে একমাত্র অসভ্য বা
বর্বরের লেখকের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন হতে পারে। যুধিষ্টিরের সাথে সংলাপে নারীদের সম্বন্ধে এই
ধরণের আরো কিছু কুৎসিত বার্তা ভীষ্মের মুখ থেকে নির্গত হয় ‘ ইহলোকে স্ত্রীলোক
অপেক্ষা পাপশীল পদার্থ আর কিছুই নাই। প্রজ্জলিত অগ্নি, ময়দানবের মায়া, ক্ষুরধার,
বিষ, সর্প ও মৃত্যু, এসমুদয়ের সহিত উহাদের তুলনা করা যায়। স্ত্রীগণের প্রতি কোন
কার্য বা ধর্ম নির্দিষ্ট নাই। উহারা বীর্যবিহীন, শাস্ত্রজ্ঞানশুন্য ও
মিথ্যাবাদিনী। মনুষ্যের কথা দূরে থাকুক, ব্রহ্মাও উহাদিগকে স্বধর্মে রক্ষা করিতে
সমর্থ হন না’। (বেদব্যাসী মহাভারত, তৃতীয়
খন্ড, পৃঃ ৯৮৯-৯৯০)। পুর্বে উল্লিখিত নারীদের সম্বন্ধে বাইবেলে সেন্ট পলের
দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সমতুল্য। বর্তমানে
দেশে এই ভীষ্ম আবার ‘পিতামহ’ বলে সমাদৃত। ধর্মশাস্ত্রে
ও পল্লবিত মহাভারতে সমাজে নারীর এই হিনস্থান ভগবানের মুখে সমর্থিত ও অনুমোদন লাভ
করেছে। ‘ হে কৌন্তেয়, আমি জলের মধ্যে রস,
চন্দ্রসূর্যের মধ্যে প্রভা, সর্ববেদ ওংকার, আকাশে শব্দ এবং মানবজাতির মধ্যে
পুরুষত্ব রুপে বিদ্যমান’। (শ্রীমদভগবদগীতা, ৭/৮)। এখানে ‘পৌরুষ’ শব্দ
শৌর্যবীর্য অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে,
পুংলিঙ্গ অর্থে যে হয়নি তার নিশ্চয়তা কোথায়? এখান থেকেই কি এই সিধান্তে
উপনিত হওয়া যায় না যে পুরুষ ঈশ্বরের মধ্যে প্রকাশ, আর নারী ঈশ্বর বর্জিত এক অধম
প্রানী মাত্র। নারীর প্রধান ভূমিকা পুরুষ দ্বারা সন্তান উৎপাদনের উপায় হিশেবে ।
‘হে ভারত, মহদব্রম্ম (প্রকৃতি) আমার যোনি, আমি তার মধ্যে গর্ভধারণ করি। এ থেকেই সব
প্রানীর জন্ম হয়’। (শ্রীমদভগবদগীতা, ১৪/৩)। ‘কৌন্তেয়, সব যোনিতে যেসব মুর্তি
জন্মগ্রহণ করে, তাদের জন্মস্থান মহদব্রম্ম (প্রকৃতি), আর আমি বিজপ্রদ পিতা’ ।
(শ্রীমদভগবদগীতা, ১৪/৩)। এই ধরনের অশ্লীল
ভাষা ভগবানের মুখে আরোপ করা শোভন হয়েছে কিনা তা বর্তমান সময়ে বিবেচ্য। অর্থাৎ মহাকাব্যের ও ধর্মশাস্ত্রীয় যুগে নারীকে
পুরুষের যৌনযন্ত্র হিশেবে বিচার করার রীতি প্রচলিত ছিলো, শ্রীমদভগবদগীতার এই শ্লোক
দুটিতেই তার প্রতিফলন ঘটে। নারীকে স্বভাবত
ভ্রষ্টা, দুষ্টা এবং দুশ্চরিত্রা রুপে চিহ্নিত করবার যে রীতি সেই সময়ে ছিলো ,
ভগবদগীতায় তার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে অর্জুনের উক্তিতে ঃ ‘কৃষ্ণ, অধর্মের আবির্ভাব
হলে কুলস্ত্রীরা দূষিত হয়। হে বাষ্ণের্্য, স্ত্রীরা দুষ্টা হলে বর্নসংকরের সৃষ্টি হয়’ ।
(শ্রীমদভগবদগীতা, ১/৪১)। বর্নসংকরের অজস্র
কুফল গীতায় উল্লিখিত রয়েছে। বর্নসংকর হলে পরে পিতৃপুরুষের পিন্ড দেবার কেউ থাকে
না, তাই তারা চিরকাল নরকে বাস করে। কুলধর্ম অর্থাৎ জাতিধর্ম এভাবে বর্নসংকরের ফলে
উচ্ছন্নে যায়। (শ্রীমদভগবদগীতা, ১/৪২-৪৪)। অর্থাৎ শাশ্বত বর্নধর্মের এবং সমাজের
সর্বনাশের মূলে আছে কুলস্ত্রীদের দুষ্টা হবার প্রবনতায়। প্রশ্ন এখানেই যে অধর্মের
আবির্ভাব হলে শুধুমাত্র কুলস্ত্রীরাই দুষিত হয় কেন ? অধর্ম পুরুষকে স্পর্শ করে না
কেন? কুলস্ত্রীরা দের নষ্ট করতে পারে তো ব্যাভিচারী পুরুষ। তাই বর্ণসংকরের জন্য কি
শুধুমাত্র কুলস্ত্রীরাই দায়ী, ব্যাভিচারী পুরুষ দায়ী নয়? সেসব উচ্ছৃংখল ও ব্যাভিচারী
পুরুষরা কি কোনো অধর্ম করছে না কিংবা অপবিত্র হচ্ছে না? প্রকৃতপক্ষে মনুস্মৃতিতে ও
পল্লবিত মহাভারতে যে নারীর স্বভাবসিদ্ধ চরিত্রহীনতার যে ঘৃণ্য ও অবমানকর তত্ত্ব
এবং পুরুষদের বহুগামিতার এবং ব্যাভিচারের প্রতক্ষ্য ও পরোক্ষ্য সমর্থনের তত্ত্ব
দাঁড় করনো হয়েছে, ভগবদগীতায় তারই অনুরণ এবং প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। নারীর
একনিষ্ট সতীত্ব এবং পতিপরায়ণতা মনুস্মৃতি, মহাভারত ও ভগবদগীতার অভিন্ন আদর্শ। অথচ
ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের চরম ব্যাভিচার, বহুগামিতা উদাহারণ মহাভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে
আছে সুতরাং সেইসব নিদর্শন বর্তমান প্রসঙ্গে তুলে ধরে এই অধ্যায়ের কলেবর বৃদ্ধি
করতে চাই না। তবে বর্তমান হিন্দুধর্মীয়
আচার অনুষ্টানে দেবীদের প্রাধান্য দেখা যায় যা মুলত অনার্য্য উপাদান। সাংখ্য, যোগ ,
তন্ত্র সাধনা , শিব ও শক্তি, আদ্যার তাত্ত্বিক সমর্থন হিন্দুধর্মের আচার অনুষ্টানে
সংমিশ্রিত অনার্য্য উপাদান। আর্য্য-অনার্য্য সাংস্কৃতিক সংঘাত ও সংমিশ্রণের ফলে
ক্রমশ অনেক অনার্য দেব-দেবী আর্য্য সংস্কৃতি ও ব্রাম্মন্যধর্মে অংগীভুত হয়। এর
সাথে ঐতিহাসিক ভাবেই নিহিত আছে বর্নাশ্রম প্রথায় যাত সামাজিক শ্রেণী সংঘাত ও বুদ্ধ
এবং পরবর্তিকালে ইসলাম ধর্মের প্রভাব
বিস্তারে নিয়ন্ত্রণ। ‘দেবী মাহাত্য’ গ্রন্থে চারটি বিভিন্ন রুপে দেবী আরাধনার যে
সমর্থন রয়েছে তা প্রাক-আর্য্য সমাজের মাতৃতান্ত্রীক সমাজের পরিমার্জিত আর্্য্য রূপ। এই সংমিশ্রণের দরকার ছিল সমাজ
বিকাশের ঐতিহাসিক নিয়মের চাহিদাতেই। পল্লবিত মহাভারতেও শিব এবং দুর্গার আরাধয়ান সহ
আর্যদের বৈষ্ণব ধর্ম এবং অনার্যদের শাক্তধর্মের সংঘাত ও সমন্বয়ের চেষ্টার উদাহারণ
সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্ত তাত্ত্বিক স্তরে আর্য সমাজে দেবী মাহাত্য
স্বীকৃত হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে নারীর হীনাবস্থা এবং নারীর আর্থসামাজিক কাঠামগত
স্তরের স্থানাংকের কোনো পরিবর্তন হয়নি। জাগতিক পরিচয়ে নারী ভগবদগীতার পাপযোনির
অবস্থানেই থেকে গেছে। অধ্যাপক এ এল বেশমের
মতে ‘ The ancient Indian attitude to women
was in fact ambivalent. She was at once a goddess and a slave, a saint and a
strumpet’। (A. L. Basham, The Wonder that was
India, Calcutta, 1971)। নারীকে তাত্ত্বীক স্তরে দেবীর আসনে বসালেও ব্যবহারিক
স্তরে নারীর অবস্থান দাসী থেকে গেলো। তান্ত্রীক ধর্মে নারীপুরুষের সাম্যের মধ্য
দিয়ে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি পেলেও তন্ত্র কখনো ব্রাম্মন্যধর্মের আকরে প্রবেশ করতে
পারেনি এবং বৌদ্ধধর্মের মতন বারবার হিন্দুধর্মের আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়েছে।
আজকের যুগে সেই রামও নেই,
রাজতন্ত্র অবলুপ্ত কিন্ত তৎকালীন ধর্মীয় বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সামাজিক
, পারিবারিক ন্যায়, নীতির অবশেষ, আজও
আমাদের দেশে বহুলোকের জনমনে ধর্মীয় আদর্শে শ্রদ্ধার স্থান ও প্রাতিষ্টানিক গুরুত্ব
আধিকার করে রয়েছে। সেই নিরিখেই আজও আমাদের সমাজে লক্ষ লক্ষ সীতা বিনাদোষে ও
নির্বিচারে এ যুগের বীরপুরুষদের দ্বারা নির্যাতিত, অবহেলিত ও নিহত হন। পার্থক্য
এখানেই যে অসহায় নারীদের আর্তনাদে এ যুগে ধরণী আর দ্বিধাবিভক্ত হয় না, এই যুগের
সীতারা তাই নানাভাবে আত্মহত্যা করেন বা তাদের হত্যা করা হয়।
ইসলাম ধর্মে নারীর অবস্থান।
ক) বহুবিবাহের নামে ভ্রষ্টাচারঃ –
অনেকেই মনে করেন,
মুসলমান সমাজে গণ্ডায় গণ্ডায় বিয়ে করা এবং
গণ্ডায় গণ্ডায় ছেলেপুলে হওয়া তাদের একটা সামাজিক ব্যবস্থা। এগুলি একান্তই কুৎসা
এবং ধর্মব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষাই এসব কুৎসার উদ্দেশ্য এবং রীতি, তা সে যে
ধর্মেরই হোক না কেন। শুরুতেই উল্লেখ করা দরকার যে, ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে বহু
বিবাহের ধর্মীয় বিধি –নির্দেশ নেই। মহম্মদ যে একাধিক বিবাহ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তার প্রয়োজনিতা ছিল ভিন্ন, তার সামাজিক
পটভূমিকা ও প্রয়োজনীতা বিচার ও সমিক্ষা-বিশ্লেসন করা বাঞ্ছনীয় । বিদ্রোহকালীন
পরিস্থিতিতে তখন এক কথাতে একটি বিবাহ প্রচলন করা সম্ভব ছিলো না। মহম্মদের অনেক
আগের যুগ থেকেই আরবভূমিতে শতাধিক বিয়ে না করলে পুরুষ বলেই চিহ্নিত হত না। আমাদের
দেশের কুলীন ব্রাম্মণদের মতন (কুকার্যে লীন)। সেই অরাজকতার সময়ে এটাই
যুক্তিগ্রাহ্য ছিলো যে ক্রমান্বয়ে বহুবিবাহ প্রথা থেকে এক পতি-পত্নীতান্ত্রিক
ব্যবস্থায় অবতরণ। আর্য্য সভ্যতায় পুরুষদের যত্র তত্র বিবাহের কথা আগেই উল্লিখিত
হয়েছে। আক্কাদ-আসিরিয়-সুমেরিয়-ব্যাবিলনীয় এবং তৎপরে বিকশিত সেমিটিক সভ্যতায় একাধিক
বিবাহের প্রচলন ছিল। বাইবেলে আব্রাহাম থেকে যীশু খৃষ্টের পূর্বপুরুষ ডেভিডের
একাধিক বিবাহের সাক্ষ্য ধর্মশাস্ত্রের ইতিহাস বহন করে। তাই আরবভূমি এই প্রাচীন
ব্যবস্থায়, সেই অরাজকতার সময়ে এই বহুবিবাহ প্রথাটি প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থার বিবাহের
নিরিখে ধারাবাহিকতায় ব্যাতিক্রমি হবার কথা নয়। কিন্ত ভিতরের এই অমানবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আবেদনকে
আজ সমাজে প্রতিষ্টিত করতে হবে। সেই সময়ে আরেকটি সমস্যা ছিলো, যুদ্ধে বহু পুরুষ
মারা যায়। বিধবার সংখ্যা বাড়ে এবং এতে করে সামাজিক সংকটও বাড়ে। মর্যাদা দিয়ে
বিধবাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বিবাহকে একটি গ্রহণযোগ্য সামাজিক ব্যবস্থা হিসাবে
চিহ্নিত করা হয়। ইসলাম বহুবিবাহ প্রথা চালু করে নি। এর সপক্ষে কিছু আরো সুত্র
দেওয়া হল
১) “About the only
important peoples of ancient times that showed little or no traces of it
[(polygamy)] were the Greeks and the Romans. Nevertheless, concubinage, which
may be regarded as a higher form of polygamy, or at least as nearer to pure
monogamy, was for many centuries recognized by the customs and even by the
legislation of these two nations.” The Catholic Encyclopedia:
(http://www.newadvent.org/cathen/09693a.htm)
২) নৃতত্ব্যবিধ
ডেভিড মুরের মতে বহুবিবাহ ব্যবস্থা একপতি-পত্নী বিবাহ ব্যবস্থার তুলনায় ঐতিহাসিক
বিকাশের স্তরে বহুল পরিমাণে প্রচলিত ছিল। সুত্রঃ – Cheryl Wetzstein,
“Traditionalists Fear Same-Sex Unions Legitimize Polygamy,” The Washington Times
13 Dec. 2000.
৩) মহম্মদের পূর্বে বিভিন্ন অবতার বহুবিবাহ
করেছিলেন। উদাহারণস্বরুপ আব্রাহাম, মোজেস, জেকব, ডেভিড আর শলোমন (ওনার আবার ৭০০ টি
রানী ছিল)। সুত্র ঃ - (Genesis 16:1, 16:3, 25:1), (Exodus 2:21,
18:1-6; Numbers 12:1), (Genesis 29:23, 29:28,
30:4, 30:9), (1 Samuel 18:27, 25:39-44; 2 Samuel 3:3, 3:4-5,
5:13, 12:7-8, 12:24, 16:21-23), (1 Kings 11:3)। (http://www.biblicalpolygamy.com/).
৪) মুসলিম সমাজে বহুবিবাহ বিধি ও অনুমতি দেওয়া থাকলেও এই
সম্প্রদায়ের পুরুষদের মধ্যে বহুবিবাহ পালন,
শতাংশের তুলনায় ২ শতাংশের অধিক নয়।
সুত্রঃ - Dr. Jumah al-Kholy, ‘Ta’addud al-Zawjaat wa Hikmatuhu fil
Islam,’ (Multiple Marriages In Islam & It’s Wisdom), Journal of the
Islamic University of Medina, vol. 46, 222-231.
৫) পশ্চিম দেশে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের
শতাংশের তুলনায় বহুবিবাহের সংখ্যা নিতান্তই কম। সুত্রঃ – The most recent definitive
survey on sexual behavior shows that 20 percent of women and up to 35 percent
of men have been at one time or another unfaithful to their spouses (Sex in
Marriage, Little, Brown and Co., 1994, page 105). Another survey
shows that adultery is as common among Christians as non-Christians. Christianity
Today magazine surveyed its subscribers and found that 23 percent admitted to
having had extramarital intercourse. The Lutheran Church: Missouri
Synod (http://old.dcs.lcms.org/family/Content%5Cdoc_articles%5C409.doc)
আধুনিক যুগে ইসলাম ধর্মবিশষজ্ঞদের
মতে পশ্চিম দুনিয়ায় বেশ্যাবৃত্তি ও বিবাহবহির্ভূত সামাজিক ব্যাধির নিরসন করতে পারে
এই বহুবিবাহ প্রথা। এই সব সামাজিক সমস্যা নিরসনের দ্বারা প্রতারনার মতো পাপ এড়ানো
যায়। নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামে মনোভাব হল পুরুষের নারীদের
সম্বন্ধে দায়বদ্ধতা ও নারীর পুরুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। মোদ্দা কথা একে অপরের পরতি
দায়বদ্ধতা ও ন্যায় ব্যবহারের নিরিখে পাপ-পুন্যের নির্নয় করা হয়। দুনিয়ায় দ্রোহ,
যুদ্ধ ও বিভিন্ন অপরাধের কারণে পুরুষের তুলনায় নারীর অনুপাত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
(সুত্রঃ-According to Center for Health
Statistics, life expectancy of women in US is 77.9 years, while for men it is
only 70.3.)। এতদ্বারা সমকামিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে যদিও বৈজ্ঞ্যানিক মহলের এক
অংশ আবার একধারার জৈবিক উপাদানকে
সমকামিতার কারণ হিশেবে চিহ্নিত করছেন। বিশিষ্ট হিতবাদী এবং দার্শনীক বাট্রেন্ড
রাসেলের মতে “And in all countries where there is
an excess of women, it is an obvious injustice that those women who, by
arithmetical necessity, must remain unmarried should be wholly debarred from
sexual experience.” (সুত্রঃ-Marriage and Morals, p. 47 )। সুতরাং ইসলামী পন্ডিতদের মতে বহুবিবাহ এই সামাজিক
সমস্যাগুলির ও সমাধান করতে পারে।
|
Country
|
Male Population
|
Female Population
|
|
Russia
|
46.1%
|
53.9%
|
|
UK
|
48.6%
|
51.5%
|
|
USA
|
48.8%
|
51.2%
|
|
Brazil
|
49.7%
|
50.27%
|
(সুত্রঃ - The New Encyclopaedia Britannica,
vol. 17, pp. 34, 270, 244.)
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেন বিবাহবহির্ভূত
সম্পর্ক ও বহুগামিতার প্রবনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে? “What makes this state of
affairs possible, of course, is a supply of willing women. Most are
single, both because of the growing numbers of unmarried women (there are 34
million in the United States today) and because single women generally have
more free time and energy than do their married counterparts. Consider these
statistics: One out of every five women today has no potential mate because
there are simply not enough single men to go around. A 25-year-old
single woman faces a serious undersupply of available men to start with, and
the situation gets worse the older a woman gets. Divorced men
are much more likely than divorced women to remarry (and they tend to marry
younger women), so that there are more than twice as many single women as there
are single men in their 40s. Indeed, a woman who
divorces at 35 today is likely to remain single for the rest of her life. Caught in a
demographic bind while seeking greater autonomy, more and more single women are
opting for involvement with married men.”(সুত্রঃ - Laurel
Richardson “Another World; More and More Single Women Are Opting for Affairs
with Married Men, and the Trend Is Diminishing Feminist Progress,” Psychology
Today, vol. 20, February 1986.) অথবা জার্মানির মতন একটা
সমৃদ্ধশালী উন্নত ধনতান্ত্রীক দেশে গনিকাবৃত্তির প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ নারীদের
অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাহীন অবস্থার জন্যে দায়ী করা হয়েছে।
“In
addition, surplus of women who are not financially maintained by a husband is a
cause of increased prostitution in the society. For example,
Germany has 0.96 males/female. Under Germany’s welfare
reforms, any woman under 55 who has been out of work for more than a year can
be forced to take an available job – including being a prostitute in the sex
industry – or lose her unemployment benefit”(সুত্রঃ - Clare Chapman, ‘If you don’t take a job as a
prostitute, we can stop your benefits,’ The Telegraph, 30 Jan. 2005.)। এছাড়াও যুদ্ধের সময়ে
নারী-পুরুষ আনুপাতিক ভারসাম্যের সমস্যা যুদ্ধের সময়ে আরো জটিল আকার ধারণ করে। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিতে বেশী নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় ৭৩ লক্ষ বেড়ে যায়
যার মধ্যে আবার ৩৩ লক্ষ বিধবা হয়ে পড়ে। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়েসের
মধ্যে প্রতি ১০০ জন পুরুষের তুলনায় নারী সংখ্যা আনুপাতিক হারে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৭। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংকট এর সাথে রাজনৈতিক অরাজকতার কারণে বহু সংখ্যক নারী
পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নারীদের এই অধোগতি ও
অসহায়তার সুযোগ নিয়ে মার্কিন ও বৃটিশ সেনারা তাদের অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত করে এবং
প্ররোক্ষে পতিতাবৃত্তি বৃদ্ধি পায়। (সুত্রঃ-Ute Frevert, Women in
German History: from Bourgeois Emancipation to Sexual Liberation (New York:
Berg Publishers, 1988) pp. 257-264 as quoted by Dr. Sherif Abdel Azim, “Women
in Islam Versus Women in the Judaeo-Christian Tradition: The Myth and The
Reality.”)। বহুবিবাহপ্রথা
ইসলাম ধর্মে বিবাহবিচ্ছেদের একটি বিকল্প হিশেবে সমাধান দিয়েছে। রুগণা বা সন্তান প্রসবে অক্ষম মহিলাদের সাথে বিচ্ছেদের বিকল্প হিসেবেও
বহুবিবাহপ্রথা কে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে সেই বিচ্ছেদের কারণে সেই মহিলার জীবনে
অর্থনৈতিক ও ভরনপোষণের অনিশ্চয়তা কে দূর করা যায়। (সুত্রঃ - Schmitt, D.P., “Universal sex differences in the desire for
sexual variety: Tests from 52 nations, 6 continents, and 13 islands,” Journal
of Personality and Social Psychology, 85, 85-104. The study was
conducted by Bradley University psychologist David Schmitt and published in the
Journal of Personality and Social Psychology, was impressive in its scope: It
involved 16,288 college students from 50 countries in the Americas, Europe,
Africa, Asia, and Australia. http://www.bradley.edu/academics/las/psy/pdfs/schmitt%5B1%5D%5B1%5D.etal.2003.jpsp.pdf)। বহুবিবাহ নিয়ে পশ্চিমদুনিয়ায় দৃষ্টিভঙ্গি ভন্ডামীর
নিদর্শন ছাড়া আর কিছু নয়। মার্কিযুক্তরাষ্ট্রের আইন ও বিচার ব্যবস্থায়
বহুবিবাহপ্রথা একটি সভ্যতার কলঙ্ক ও বর্বরতা
হিশেবে চিহ্নিত হয়েছে। (সুত্রঃ - Jonathan Turley, “Polygamy
Laws Expose Our Own Hypocrisy,” USA Today 3 Oct. 2004. Turley is the Shapiro
Professor of Public Interest Law at George Washington Law School.)। পশ্চিম দুনিয়ায় একবিবাহ
ব্যবস্থায় উন্নত সভ্যতার প্রতিক হিশেবে ঘোষণা করা প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কি বা হতে
পারে। সংখ্যা তত্ত্বের নিরিখে ২৩ থেকেয় ৫০% পুরুষ আর ১৩ থেকে ৫০% নারী বর্তমান
দুনিয়ায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত। (সুত্রঃ - Webster’s Heritage
Dictionary, “The practice or condition of having a single sexual partner during
a period of time.” Laurel Richardson, “Another World; More and
More Single Women Are Opting for Affairs with Married Men, and the Trend Is
Diminishing Feminist Progress,” Psychology Today, vol. 20, February 1986.)। এছাড়াও জুডাইজম এবং খৃষ্টান
ধর্মে বহুবিবাহের প্রচলনে ধর্মীয় কোনো নিষধাজ্ঞা নেই। রাজা ডেভিডের অনেক রানী
থাকলে তিনি প্রভুত পরিমাণে ঈশ্বরের আশির্বাদ পেয়েছিলেন। হিন্দু ধর্মে বহুবিবাহের
প্রচলন আগেই আলোচিত হয়েছে। সুতরাং এক বিবাহের সংস্কার করা আজকে সমাজে দরকার
মানবসভ্যতা ও প্রগতির ঐতিহাসিক অন্যতম চাহিদা কিন্ত বর্তমান
সমাজব্যবস্থায় এক-বিবাহের সংস্কারের কাজের চাইতে
বড় ব্যাপার হল আজকের যুগে কোরানের সাম্যবাদী ও যুক্তিবাদী আদর্শ ও আবেদন
প্রতিষ্টিত করা যা সমাজপরিবর্তনের এক দিকনির্দেশিকা চিহ্নিত করতে সহায়ক ভূমিকা
পালন করতে পারে।
কোরানে প্রদত্ত ও
নিম্নেউল্লিখিত যে নির্দেশটিকে মুসলমানদের বর্তমান বহু বিবাহের পক্ষে গ্রহণ করা হয়
– তার অপব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগের ফল ভিন্ন অন্য কিছুই নয়।
১) (সুরা আন-নিসা, ৪)। ‘যদি তোমরা
আশঙ্কা কর যে, তোমরা এতীমদের ব্যাপারে ন্যায়-বিচার করিতে পারিবে না, তাহা হইলে
তোমরা (অন্য) নারীদের মধ্য হইতে (যাহারা এতীম নহে) তোমাদের পসন্দমত দুইজন অথবা
তিনজন অথবা চারজনকে বিবাহ কর; তবে তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তোমরা ন্যায়-বিচার
করিতে পারিবে না, তাহা হইলে একজনকে অথবা তোমাদের দক্ষিণহস্তের অধিকারভুক্তগণকে
বিবাহ কর। ইহা নিকটবর্তী (ব্যবস্থা) যাহাতে তোমরা অবিচার না কর’।
২) (সুরা আন-নিসা, ১৩০)। ‘ এবং
স্ত্রীগণের মধ্যে তোমরা কখনও (পুর্ণ) সমতা রক্ষা করিতে পারিবে না, তোমরা যতই
আকাঙ্ক্ষা কর না কেন’।
দুটো বাক্য একসাথে পড়লে এক বিবাহ
সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকে না। মহম্মদ একজন বড় বিদ্রোহী ও সমাজসংস্কারক ছিলেন। ৬২৫
খ্রিস্টাব্দে উহুদের যুদ্ধের পরেই এই প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়। ওই যুদ্ধে ৮০ জন
মুসলিম নিহত হয়েছিলেন। তাঁদের পরিবারের প্রতিপালনের দায়িত্ব মহম্মদ মদীনায় জীবিত ও
সক্ষম মুসুলমানদের উপরে ন্যাস্ত করেন। কিছুদিন পরে মহম্মদ জানতে পারেন, আশ্রিতা
নারীদের নিয়ে আশ্রয়দাতারা কিছু আনাচার-অন্যায় আচরণ করছে। তারই প্রতিকারার্থ মহম্মদ
তাঁর শিষ্যদের ঐ নির্দেশ দেন, দুই থেকে চারজন পর্যন্ত আশ্রিতা নারীকে বিবাহ করে
তাদের ও অনাথদের সংসারে রেখে পুণর্বাসন দেওয়ার জন্য। তিনি ওই নির্দেশে এটাও বলেন
যে, বিবাহিতা নারীদের সঙ্গে ন্যায্য ব্যবহার করে তাদের সমান অধিকার ও মর্যাদা দিতে
হবে। এই প্রত্যাদেশ থেকে আরো প্রমানিত হয় যে তৎকালীন মদিনার মুসলমানেরা একাধিক নয়,
একজন নারীকেই বিবাহ করতেন কারণ ঐ আশ্রদাতাদের সংসারে তখন একমাত্র বিবাহিত নারী ছিল
বলেই তাদের প্রথম নয়, দ্বিতিয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বিবাহ করার পরামর্শ দেওয়া
হয়েছে। এই ‘ওহী’ বা প্রত্যাদেশে সাথ্যে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে ছিল সমকালীন সমাজে
কিছু সমস্যা সমাধানের প্র্যয়াসে। তাতে আশ্রিতা নারীদের ও অনাথদের প্রতি ভালো
ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এটি মুসলমানদের একাধিক বিবাহ করার পক্ষ্যে কোনো
মতেই সওয়াল করে না। মুসলমানদের বিবাহের ক্ষেত্রে এটী স্থায়ী কোনো বিধান বা
ব্যবস্থা নয়। আয়াতটির প্রথম কয়েকটি কথা থেকেই এই তথ্য জানা যাবে। কিন্ত ওই বিবাহও শর্তহীন ছিল না। বিবাহিতা স্ত্রীদের সঙ্গে সমান ব্যবহার করতেই
হবে। আর তাই ছিল শর্ত। এবং তাও যে তাঁরা করতে পারবে না, এমন মন্তব্য তার সঙ্গে
সঙ্গেই করা হয়েছে, যাতে একাধিক বিবাহের বিষয়ে মুসলমানেরা সতর্ক থাকে। দুঃখের বিষয়
এই যে, কোরানের তৎকালীন এবং বর্তমানে একটি দুঃখজনক সমস্যা সমাধানের পক্ষে এই
নির্দেশ ও তার শর্তকে অনেক মুসলমানেরা সঠিকভাবে গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সামাজিক
সমস্যার তাতপর্য বুঝতেই অক্ষম হয়েছে, তাদের ভোগ, বিলাস ও স্বার্থপরতার
পরিপ্রেক্ষিতে। শুধু মুসলমান শাস্ত্রকারেরাই নন, তৎকালীন মুসলমানেরাও এই শিক্ষাকে
যথার্থ বাস্তবায়িত করতে অক্ষম হয়েছে। তাঁরা তখন বুঝতেই পারে নি যে, কোরানের কিছু
নির্দেশ অস্থায়ী আর তা সাময়িক সমস্যার সমাধান মাত্র। তাঁরা মনে করেন এইসব কাজ
ইসলাম সম্মত। একাধিক পত্নী রাখা যে নারীদের সমান অধিকারের ও তাদের প্রতি ন্যায়সংগত
ব্যবহারের পরিপন্থী, এমন কোনো বিচারও করা হয় না। অথচ মহম্মদের ন্যায়বাদী হওয়ার
জন্যে কোরানের এইরুপ নির্দেশ আছে।
১)( সুরা আন-নিসা, ১৩৬)।‘হে যাহারা
ইমান আনিয়াছ। তোমরা ন্যায়পরায়ণতার উপর দৃঢ় প্রতিষ্টিত হও আল্লাহর জন্য
সাক্ষী হিসাবে, যদিও (তোমাদের সাক্ষ্য) তোমাদের নিজেদের বা পিতামাতার এবং
স্বজনগণের বিরুদ্ধেই যায়। (যাহার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া হইবে) যদি সে ধনী অথবা
দরিদ্র, তাহা হইলে আল্লাহ তাহাদের উভয়েরই সর্বাধীক শুভাকাঙ্ক্ষী’।
২) (সুরা আল-মায়দা, ৯)। ‘হে যাহারা
ইমান আনিয়াছ। তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়পরায়ণতার উপর সাক্ষী হিসাবে দৃঢ়
প্রতিষ্টিত হও, এবং কোন জাতির শত্রুতা যেন তোমাদিগকে এই অপরাধ করিতে আদৌ প্ররোচিত
না করে যে, তোমরা ন্যায়বিচার না কর’।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কোরানের
সর্বত্রই, যেখানে পুরুষের অধিকারের কোনো প্রসঙ্গ আছে, সেখানে নারীদের সমান
অধিকারকেও নিশ্চিত করা হয়েছে। (সুত্রঃ – সুরা আল আহযাব, ৩৬ আয়াত ; সুরাঃ – আল নাহল, ৯৮ আয়াত; সুরাঃ-
আন-নিসা, ১২৫ আয়াত)। নিন্তু মহম্মদের মৃত্যুর পর থেকেই মুসলিম নারীদের প্রতি এই
ধরণের দুর্ব্যবহার সমাজে প্রশ্রয় পেয়েছে
পুরুষের ভোগের কামনায়। কোরানের শিক্ষা উপেক্ষিত হয়ে নারী হয়ে পড়ল পুরুষের ভোগের
বস্তু। এই বিশয়ে মহম্মদের শিক্ষার
অপব্যাখার ও অপপ্রয়োগ শুরু হয়ে যায়।
খ) বোরখা প্রথার নামে মধ্যযুগীয়
বর্বরতা ও মানব সম্পদের অপচয়।
এই কুপ্রথাটি জন্ম নিয়েছিল
পুরুষদের ভোগবাদের ও নারীর ওপর পুরুষের কতৃত্বকারী মনোভাবের ফলে। মহম্মদের সময়ে এই বিধির পেছনে যে
সাময়িক সমস্যা ছিলো, তাকে না জেনেই এই বিধিকে স্থায়ী আকার দেওয়া হয়েছে। মদীনায়
মহম্মদের শিষ্যদের সাথে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ও ধর্মীয়বিশ্বাস ও জাতের মানুষ বাস
করতো। তাদের মধ্যে ছিলো হিহুদি ও খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ। সব সম্প্রদায়ের
মানুষের সাথে মহম্মদ শান্তি চুক্তি করেছিলেন শান্তিপুর্ণ সহাবস্থানের কারণে। কিন্ত এই শান্তিপুর্ণ
সহাবস্থানের নীতি অবলমন করলেও সেই সময়ে নানান সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক
অশান্তি লেগেই থাকতো। মহম্মদ এই বাস্তব সামাজিক সংঘাতগুলো ও সমস্যাগুলি যুক্তি ও
বুদ্ধির আলোকে সমাধান করতেন। মদীনার
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সমাজে সহাবস্থান কালে একজন মুসলিম নারীর সম্মানহানি করে
ইহুদিদের কোনো একজন লম্পট প্রকৃতির মানুষ। ঐ নারী ইহুদিদের দোকানে দ্রব্য কিনতে
গেলে ঐ দুর্জন ঐ নারীর কাপড়ের এক অংশ ঐ
নারীর অগোচরে দোকানের একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দেয় । দ্রবাদী
ক্রয় করে উঠে যাবার সময়ে তার পরিধেয় বস্ত্রটি খুঁটিতেই আবদ্ধ হয়ে থাকে আর ঐ নারী
উলঙ্গ হয়ে পড়ে। তার চিৎকারে মুসলমানেরা ছুটে আসে আর ইহুদিদের সাথে মুসলমানদের একটা
দাঙ্গা বেধে দেওয়ার উপক্রম হয়। মহম্মদ
ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং পরিস্থিতির সামাল দেন। তখন অবতীর্ণ হয় নিম্নলিখিত
প্রত্যাদেশটি ঃ-
১) (সুত্রঃ – আল-আহযাব, আয়াত ৬০)।
‘হে নবী। তুমি তোমার পত্নী, তোমার কন্যা এবং মো’মেনগনের পত্নীগনকে বল, যেন তাহারা
তাহাদের চাদর নিজেদের উপর (মাথা হইতে টানিয়া মুখমন্ডল পর্যন্ত) ঝুলাইয়া লয়,
এতদ্বারা তাহাদের পরিচয় অত্যন্ত সহজ হইবে এবং তাহাদিগকে কষ্ট দেওয়া হইবে না।
বস্ততঃ আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়’।
এই নির্দেশানামা একটা সময়কালীন সমাজে সাময়িক সমস্যার সমাধান
মাত্র। এই নির্দেশের বিচার বিশ্লেষণ করলে কিছু সিধান্তে উপণিত হওয়া যায়। (ক)
এইখানে ধর্মীয় ইতিহাসে নিরিখে মহম্মদের বহু আগে হিহুদী সমাজে, খৃষ্টের মাতা মেরী
অসুর্য্যংস্পর্শা ছিলেন। তিনি জেরুজালেমের মন্দিরের বাইরে দিবালোকে বেরোতেন না। এবং
সেই আদর্শে বিশ্বাসী খৃষ্টান সিস্টারেরা অনুকরণ করেন এবং আপাদমস্তক নিজেদের দেহকে মুড়ে রাখেন। বাইবেলে
সেন্ট পলের এই বিষয়ে মহিলাদের ক্ষেত্রে পোশাক-পরিধানের বিধি দিয়ে গেছেন ‘যে কোন পুরুষ মস্তক আবৃত রাখিয়া
প্রার্থণা করে, কিম্বা ভাববানী বলে, সে আপন মস্তকের অপমান করে। কিন্ত যে কোন স্ত্রী অনাবৃত মস্তকে প্রার্থণা করে,
কিম্বা ভাববানী বলে, সে আপন মস্তকের অপমান করে, কারণ সে নির্বিশেষে মুন্ডিতার সমান
হইয়া পড়ে। ভাল, স্ত্রী যদি মস্তক আবৃত না রাখে, সে চুলও কাটিয়া ফেলুক; কিন্ত চুল কাটিয়া ফেলা কি মস্তক মুণ্ডন করা যদি
স্ত্রীর লজ্জার বিষয় হয়, তবে মস্তক আবৃত রাখুক। বাস্তবিক মস্তক আবরণ করা পুরুষের
উচিত নয়, কেননা সে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি ও গৌরব; কিন্ত স্ত্রী পুরুষের গৌরব। কারণ পুরুষ স্ত্রীলোক হইতে
নয়, বরং স্ত্রীলোক পুরুষ হইতে। আর স্ত্রীর নিমিত্ত পুরুষের সৃষ্টি হয় নাই কিন্ত পুরুষের নিমিত্ত স্ত্রীর’ (বাইবেল, ১ করিন্থীয়,
১১ঃ ৪-১০)। সুতরাং মস্তক আচ্ছাদন বা দেহ আচ্ছাদন ইসলাম ধর্মের আবিস্কার নয়, হিহুদি
ও খৃস্টীয় সমাজে বহু আগের থেকেই প্রচলিত ধর্মীয় বিধি। পশ্চিম সভ্য সমাজে এই
ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকেন এবং আমাদের দেশের হিন্দুত্ববাদীরাও তার উল্লেখ করেন না। পশ্চিম
দেশের অধিবাসী মুসলিম নারীদের বোরখা প্রথা তুলে দেবার সরকার বা বেসরকারি ফতোয়ার
জবাবে বলা যায়, আগে নিজের দেশের খৃষ্টান নান ও সিস্টারদের ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ করে
দেখান, আপনি আচরী ধর্ম। (খ) মদীনার হিহুদী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষেরা যাতে
মুসলিম নারীদের চিনতে পারে তার জন্যেই এই ওড়না পরার দরকার ছিল একটি আইডেন্টিটি
হিসেবে। বর্তমান সমাজে মুসলিম নারীদের আপাদমস্তক (এবং বিশেষ করে সৌদি আরব এর মতন
গৃষ্যপ্রধান দেশে) বোরখার মতন অত্যন্ত কদাকার ও অদ্ভূত পোশাক দিয়ে ঢেকে দেবার
নির্দেশ কোরানে নেই। মুসলিম নারীদের পরিচিতির জন্যই এই ধরনের জামা বা কূর্তা পরার
(শুধু উর্ধাংঙ্গে--- সর্বাঙ্গে নয়) রীতি তখন থেকেই চালু হয়- যা তার পুর্বে
অপ্রচলিত ছিলো। এই উর্ধাংঙ্গ থেকে
সর্বাঙ্গে ঢেকে দেওয়ার প্রয়াস পরবর্তিকালের সংযজন মাত্র। আল-কোরানে অবশ্য মুসলিম
নারীদের অযথা দেহ প্রদর্শণ না করতে আর শিষ্টাচার সম্পন্ন ও শোভন উপায়ে পোশাক পরার
ও চলাফেরা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই জন্যই খালি গায়ে বাইরে না যাওয়ার জন্য
তাদের এই নির্দেশ দিয়ে বক্ষাবরনী পরতে বলেছিল। এছাড়াও এই বিষয়ে পুরুষদের সংযমশীল
হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুত্রঃ – সুরা, আন নূর, আয়াত ৩১,৩২)। ‘তুমি মো’মেনদিগকে
বল, তাহারা যেন নিজেদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাহাদের লজ্জাস্থানসমূহের হিফায়েত
করে। ইহা তাহাদের জন্য অত্যন্ত পবিত্রতার কারণ হইবে। নিশ্চয় তাহারা যাহা করে সেই
সম্বন্ধে আল্লাহ ভালভাবে অবগত আছেন’। ‘ এবং তুমি মো’মেন নারীদিগকে বল, তাহারাও যেন
নিজেদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহের হিফাযত করে এবং নিজেদের
সৌন্দর্যকে প্রকাশ না করে, কেবল উহা ব্যতিরেকে যাহা স্বতঃই প্রকাশ পায়, এবং তাহারা
উড়নাগুলিকে নিজেদের বক্ষঃদেশের টানিয়া লয়, এবং তাহারা যেন তাহাদের স্বামীগণ অথবা
তাহাদের পিতাগণ অথবা তাহাদের স্বামীর পিতাগণ অথবা তাহাদের পুত্রগণ অথবা তাহাদের
পুত্রগণ অথবা তাহাদের স্বামীর পুত্রগণ অথবা তাহাদের ভ্রাতুষ্পুত্রগণ অথবা নিজেদের
ভগ্নী-পুত্রগণ অথবা তাহাদের সমশ্রেণীর নারীগণ অথবা তাহারা যাহাদের মালিক হইয়াছে
তাহাদের ডান হাত অথবা পুরুষদের মধ্য হইতে যৌন-কামনাবিহীন অধীনস্থ ব্যাক্তিগণ অথবা
নারীদের গোপন বিষয়সমূহ সম্বন্ধ অজ্ঞ বালকগণ ব্যতীত অপর কাহারও নিকট নিজেদের
সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। এবং তাহাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে যেন তাহারা
সজোরে পা দিয়া আঘাত না করে। এবং হে মো’মেনগণ ! তোমরা সকল আল্লাহ্র দিকে
প্রত্যাবর্তন কর যেন তোমরা সফলকাম হইতে পার’। অতএব ইসলামে নারী-পুরুষকে একে অপরকে সম্ভ্রম
দেখাতে ও সম্মান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এই নিরিখে আরও বলা হয়েছে। (সুত্রঃ –
সুরা, আল বাকারা, ১৮৭), ‘ তাহারা তোমাদের
জন্য এক (প্রকারের) পোশাক, এবং তোমরা
তাহাদের জন্য এক (প্রকারের) পোশাক’। মুসলিম নারীপুরুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত
প্রকারের কিছু শিক্ষা কোরানে দিয়েছিল যাতে তারা পরস্পরের প্রতি সম্মান ও ভদ্রতা
দেখাতে পারে। এই কাজ করতে গিয়ে ইসলাম
মুসলিম নারীদের ঘরে অন্তরীন করে রাখার বা বোরখার মতন অদ্ভূত এক জবড়জঙ্গ পোষাকে
আবদ্ধ করার কোনো নির্দেশ দেয়নি। মুসলিম নারীদের মধ্যে এই ধরনের পর্দাপ্রথা জোর করে
চাপিয়ে দেবার ফলে, মুসলিম জাতির আর্ধেক শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মুসলিম নারীরা
বর্তমানে সময়োপযোগী হয়ে কাজকর্ম করতে আর বাস্তব সংগ্রামশীল জীবনের কোনো অংশগ্রহণ
করার পক্ষে অক্ষম হয়ে যাচ্ছে। এইসবই হচ্ছে শাস্ত্রকারদের অপব্যাখ্যা, অপপ্রয়োগ আর মৌলবাদীদের ফতোয়ার
জোরে। মহম্মদ জীবিত থাকাকালীন নারীদের অন্তরীন করে রাখার কোনো উদাহারণ ইতিহাসে
নেই। মুসলমানেরা যখন ইসলামকে সামনে রেখে সাম্রাজ্যবিস্তারের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্যে
পরিনত করলো, তখনই তারা বিজিত দেশের বিশেষ করে, গ্রীক ও রোমক সভ্যতার ভোগবিলাসের
ব্যাপারে প্রত্যক্ষ্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে আর তাতেই তারা লিপ্ত হয়ে পড়ে। তখন থেকেই
তারা নারীকে ভোগ্যপণ্য হিশেবে গন্য করে। এই সময়ে এই মুসলমানেরা প্রচুর বিত্তও সঞ্চয়
করেছিল, সাম্রাজ্যবাদী লুন্ঠনের ফলে। আর তার ফলেই, মুসলমানেরা সাধারণভাবেই প্রায়
সবাই ভোগ-বিলাসের কদাচারে প্রমত্ত হয়ে। মহম্মদের
সময়ে মুসলিম নারীরা সাধারণ পুরুষের মতোই প্রয়োজন মতন ঘরে –বাইরে গিয়ে কাজ-কারবার
করবার করত। উহুদের যুদ্ধের সময়ে মুসলমান নারীরা যোগদান করেছিলো সেবিকার
কাজ করার জন্য। বোরখার মতন কোনোও পোশাকও তখন পরার উদাহারণ নেই।
গ) বিবাহ বিচ্ছেদের নামে অনাচারঃ -
ইসলামে ধর্মীয় বিধিতে বিবাহ ব্যবস্থা পারস্পরিক প্রেম, প্রীতি,
সংবেদনশীলতা এবং সম্মতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। শুধুমাত্র যৌন ও জৈবিক চাহিদাকে অগ্রাধিকার
দেওয়া হয় নি। কোরান তার নির্দেশ বহন করে। (সুত্রঃ – সুরা, আর রুম, ২২) ‘এবং তাঁহার
নিদর্শণসমূহ হইতে ইহাও একটি (নিদর্শণ) যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য হইতে
স্ত্রীগণকে সৃষ্টি করিয়াছেন যেন তোমরা তাহাদের নিকট প্রশান্তি লাভ করিতে পার, এবং
তিনি তোমাদের মধ্যে প্রেমপ্রীতি ও দয়া-মায়া সৃষ্টি করিয়াছেন। নিশ্চয় ইহার মধ্যে
চিন্তাশীল জাতির জন্য অনেক নিদর্শন আছে’। বিবাহের ক্ষেত্রে নারীর সম্মতির বিধান
দেওয়া আছে। বিবাহের প্রস্তাবে নারীর মতামতকেও গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। ইসলামের
আইনে বিবাহের ক্ষেত্রে নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার জোরাজুরির নিষেধ করা
হয়েছে। পুরুষকে পরিবারের মধ্যে সংবেদনশীলতা ও আলোচনার মাধ্যমে পরিবারের সমস্ত
রক্ষণাবেক্ষণের ও দায়িত্বভার বহণের বিধান দেওয়া হয়েছে। (সুত্রঃ- সুরা; আল বাকারা, ২২৪, সুরা; আন নিসা, ২০)। ‘হে যাহারা
ঈমান আনিয়াছ ! ইহা তোমাদের জন্য হালাল
নহে যে,তোমরা বলপূর্বক নারীগণের
উত্তরাধিকারী হইয়া যাও, এবং তোমরা তাহাদিগকে যাহা দিয়াছ উহার কতক ছিনাইয়া লওয়ার
উদ্দেশ্যে তাহাদিগকে আটকাইয়া রাখিও না, যদি না তাহারা প্রকাশ্যভাবে অশ্লীলতায়
লিপ্ত হয়, এবং তাহাদের সহিত সদ্ভাবে বসবাস কর; যদি তোমরা তাহাদিগকে অপসন্দ কর,
তাহা হইলে (স্মরণ রাখিও) এমনও হইতে পারে যে, তোমরা যে বস্তুকে অপসন্দ কর, আল্লাহ
উহার মধ্যে প্রভূত কল্যাণ রাখিয়াছেন’। কোরান পুরুষগণকে তাদের স্ত্রীদের সাথে
দয়া-মায়া এবং সংবেদনশীলতার সাথে আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্ত এমত বিধি সত্ত্বেও মুসলমান সমাজে ‘বিবাহ’ ও ‘তালাক’ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। আর তার ভিত্তিতে থাকে অনেক কূযুক্তি, গোঁড়ামি
আর অন্যায় বিচারের তথা ফতোয়ার উৎপীড়ন চলতে থাকে। ইসলামে ‘তালাক’ বা বিচ্ছেদ
ব্যবস্থায় তেমন কোনো অন্যায় কিংবা অপ্রয়োজনীয় কর্মের সমর্থন নেই। বরং কোনো
দম্পত্তির মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে কলহ ও মনোমালিন্য হলে, তারই সমাধানে তালাকের শিক্ষা
বা বিধান দেওয়া হয়েছে এবং আলাপচারিতার মধ্যে প্রাথমিকভাবে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ
দেওয়া হয়েছে এইভাবে। (সুত্রঃ- সুরা, আন-নিসা, ৩৬)। ‘এবং যদি তোমরা তাহাদের উভয়ের
মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর তাহা হইলে স্বামীর স্বজনগণ হইতে একজন সালিস এবং স্ত্রীর
স্বজনগণ হইতে একজন সালিস নিযুক্ত কর। যদি তাহারা উভয়ে (সালিস) আপোষ করাইতে চাহে
তাহা হইলে আল্লাহ্ তাহাদের উভয়ের মধ্যে মিল করিয়া দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্
সর্বজ্ঞানী, সকল বিষয়ে সবিশেষ অবহিত’। (সুত্রঃ- সুরা, আন-নিসা, ১২৯)।‘ এবং যদি কোন
নারী তাহার স্বামীর পক্ষ হইতে মন্দ ব্যবহার এবং উপেক্ষার আশংকা করে, তাহা হইলে
তাহাদের উপর কোন অপরাধ বর্তাইবে না, যদি তাহারা আপোষ সন্তোষজনক মীমাংসা করিয়া লয়।
বস্তূত ঃ আপোষ –মীমাংসা উত্তম। মনুষ্য প্রকৃতিতে কৃপণতা (নিহিত) রাখা হইয়াছে। এবং
যদি তোমরা সৎকাজ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তাহা হইলে তোমরা যে কর্ম কর সেই বিষয়ে
আল্লাহ্ সবিশেষ অবহিত’। (সুত্রঃ- সুরা, আল বাকারা, ২২৮)।‘ এবং যদি তাহারা তালাক
দেওয়ার সংকল্প করে, তাহা হইলে নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী’।
তালাকের বিষয়ে ইসলামের এই ধরনের
নীতি ও পদক্ষেপ অনুধাবনযোগ্য। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নানা কারণে বিরোধের সৃষ্টি হতে
পারে। আর তার জন্যে মীমাংসারও প্রয়োজন আছে। কিন্ত শেষপর্যন্ত যদি তা সম্ভবপর না হয়, তবে তখন উভয়কে
জর করে একত্রিত করে রাখা অন্যায় হবে। এমতাবস্থায় তামাল বা বিচ্ছেদ দুর্ভাগ্যজনক ও দুঃখ্যজনক হলেও, ঐ
দুই নর-নারী জন্য বিবাহ বিচ্ছেদই সংগত ও শান্তিপূর্ণ হবে। তালাক কোনো হঠাত ঘোষিত, স্বপ্নপ্রদত্ত কিংবা
স্বামী-স্ত্রীর একার কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটি হতে হবে উভয়ের সুবিবেচনা প্রসূত
সিদ্ধান্ত। আর চেষ্টা করেও তাদের মধ্যে যখন কোনো শান্তির বা সহাবস্থানের পক্ষে
কুল-কিনারা পাওয়া যাবে না, তখন, শুধু তখনই বিবাহ-বিচ্ছেদের ব্যবস্থা করা যেতে
পারে। কিন্ত এই ধরনের তালাক একবার দেওয়া যেতে পারে। দুবারও
দেওয়া যেতে পারে। একবার তালাক দিলেই তা চূড়ান্ত বলে গন্য হবে না। এমনকি, দুবার
তালাক দিলেও ঐ তালাক চূড়ান্ত তালাক বলে গন্য হবে না। কেননা, কোরান বলছে, (সুত্রঃ-
সুরা, আল বাকারা, ২৩০)।‘ এইরূপ তালাক দুইবার (ঘোষিত) হইতে পারে, অতঃপরে,
(স্ত্রীকে) ন্যায়সংগতভাবে রাখিতে হইবে অথবা সদয়ভাবে বিদায় দিয়ে হইবে। এবং তোমাদের
জন্য উহা হইতে কিছু (ফেরত) গ্রহণ করা বৈধ হইবে না যাহা তোমরা তাহাদিগকে দিয়াছ,
কেবল সেইক্ষেত্র ব্যতিরেকে যখন তাহার উভয়ে আশংকা করে যে, তাহারা আল্লাহ্র
সীমাসমূহ রক্ষা করিতে পারিবে না। অতঃপরে, তোমরা যদি আশংকা কর যে তাহারা (স্বামী ও
স্ত্রী) দুইজন আল্লাহ্র সীমাসমুহ রক্ষা করিতে পারিবে না, তাহা হইলে কোন পক্ষের
পাপ হইবে না যদি স্ত্রী মুক্তিপণ হিসাবে কিছু দিয়া দেয়। এইগুলি আল্লাহ্র সীমা,
সুতরাং তোমরা উহা লংঘন করিও না, এবং যাহারা আল্লাহ্র সীমামমূহ লংঘণ করে
প্রকৃতপক্ষে তাহারাই যালেম’।
রক্ষণশীল শাস্ত্রকারেরা এই
নির্দেশটির অপব্যাখা করে বলেন যে, শুধু একজায়গায় বসেই তিনবার ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ
করলেই তালাক হয়ে যাবে। আর এই ভাবেই তালাকপ্রাপ্তা কোনো নারীকে পুনরায় গ্রহণ করা
যাবে না। কিন্ত কোরানের এই বানীতে ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারনের কোনো
নির্দেশ নেই এবং কয়বার ঘোষিত হলেই তা প্রকৃত বিচ্ছেদ কে কার্যকারী করবে, তারও কোনো
উল্লেখ নেই। না উল্লিখিত আছে ‘তালাক’ শব্দ ঘোষনার উর্ধসীমা। কাজেই, প্রথম তালাকে
হাজারবার ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ করলেই তা তালাক হবে না। কেননা, সেটি প্রথম তালাক।
শুধু তাই নয়, তালাক আরও একবার দেওয়া যেতে পারে। অতঃপরে স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণ করা
যেতে পারে। আর এখানেই কোরানে বানী আছে। (সুত্রঃ- সুরা, আল বাকারা, ২২৯)।‘এবং
তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীগণ নিজেদের ব্যাপারে তিন ঋতুকাল পর্যন্ত প্রতিক্ষা করিবে, এবং
যদি তাহারা আল্লাহ্ এবং পরকালের উপর ঈমান রাখে, তাহা হইলে তাহারা জানিয়া রাখুক
যে, আল্লাহ্ তাহাদের গর্ভাশয়ে যাহা সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহা গোপন করা তাহাদের জন্য
বৈধ হইবে না, এবং তাহাদের স্বামীগণ ইহার (নির্ধারিত সময়ের) মধ্যে তাহাদিগকে
(নিজেদের স্ত্রীত্বে) পুনরায় গ্রহণ করার সমধিক হকদার হইবে যদি তাহারা আপোস মিমাংসা
করিতে চাহে। এবং ন্যায়সংগতভাবে কতক অধিকার নারীদের জন্য (পুরুষের উপর) আছে যেরূপে
কতক অধিকার (পুরুষদের জন্য) নারীদের উপর আছে, কিন্ত নারীদের উপর পুরুষদের (এক প্রকার) প্রাধান্য
আছে। বস্তুতঃ আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়)’। এই বানীতে দু’বার পর্যন্ত
তালাকের পক্ষেই নির্দেশ দেওয়া আছে, তিনবার তালাকের পক্ষে নয়। কারণ, তখন স্থায়ী
তালাক হয়ে গিয়েছে বলে ধরা হবে। এখানে আরো উল্লেখ্য যে রাগের মাথায়, ঘুমের ঘোরে,
ভুল করে কিংবা অন্য কোনো তুচ্ছ কারণে তালাক ইসলামে নেই। ইসলামে এই ব্যবস্থা
সুচিন্তিত ও যথার্থ বিবেচনার ফলশ্রুতি মাত্র। তার মধ্যে হঠকারিতা, অন্যায়, অশোভন
কিংবা পক্ষপাতপূর্ণ কোনো নির্দেশ নেই। দাম্পত্য কলহের মীমাংসার খাতিরেই শান্তিপূর্ণ
উপায়ে এই ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রক্ষণশীল শাস্ত্রকারদের অপব্যাখা ও
অপপ্রয়োগের জন্যই ইসলামে যুক্তিসংগত এই ‘তালাক’ ব্যবস্থা এখন একটা প্রহসনে পরিনত
হয়েছে। বাংলাদেশে তালাক দিতে হলে আগে নোটিশ দিতে হয়। তালাক সংক্রান্ত যেসব উদ্ধৃতি
দেওয়া হলো সেখানে কোথায় তালাক দেওয়ার অধিকার একমাত্র পুরুষ কে দেওয়া হয় নি।
স্ত্রীরাও তালাক দিতে পারে, যদি তার অভিযোগ প্রমানিত হয় আর তাদের মধ্যে কোনো
মীমাংসা করা যায় না। দুঃখ এই যে, নারীদের এই অধিকারকে এখন প্রায় আর স্বীকার করা হয়
না। লজ্জায় আমাদের মাথা হেট হয়ে যায় যখন শোণা যায় যে এই আধুনিক যুগেও মোবাইলে এস
এম এস পাঠিয়ে বিবাহিত স্ত্রীকে তালাক দেওয়া হচ্ছে। তালাক সম্পর্কে এবং মহিলাদের
অধিকারের প্রশ্নে সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষেরই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সম্পত্তি
সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত বিবাহ ব্যবস্থায় পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্টা করতে ধর্মের
মোড়কটিকে ব্যবহার করা হয়। নারীর ওপর পুরুষের এই কর্তিত্ত্ব বিস্তারে ,অন্য কোনো
ধর্মীয় ব্যবস্থার মতন ইসলামও ব্যাতিক্রম নয়।
No comments:
Post a Comment