সমকালীন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন
প্রান্তে পরিচিতস্বত্ত্বা যোনিত সন্ত্রাসবাদী প্রবণতা আমাদের সামনে প্রতিভাত
হচ্ছে। এই প্রবণতার আর্থ-সামাজিক কার্য্য-কারণ পুর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। সমাজদেহে
আজ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা একটা কঠিন রোগ হয়ে ব্যাপ্তি লাভ করছে। ২০১১ সালে মার্কিন প্রদেশে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী
হামলায় সারা বিশ্ব শিহরিত হয়েছে। একটা
স্বঘোষিত মুসলিম ধর্মের ‘পবিত্রতা’ রক্ষাকারী স্বঘোষিত সন্ত্রাসবাদী দল
আল-কায়দা দূনিয়ার বিভিন্ন দেশে আল্লাহের নামে, “জিহাদ” করে বেড়াচ্ছে। ভারত ,
আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া , পাকিস্তান, বাংলাদেশে প্রভৃত উন্নয়নশীল ও তৃত্বীয়
বিশের দেশে এই সব দল স্বঘোষিত ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের লক্ষ্য পালন করে,
নিরাপরাধ শিশু, নাগরিকদের হত্যা করে চলেছে। সন্ত্রাসবাদের রসদ সংগ্রহ করে সাম্প্রদায়িকতার
মতাদর্শ থেকে যা শুধু প্রশাসন পুলিস, সেনা বাহিনী দ্বারা
নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বিভিন্ন দেশে ও কালে, সমাজ প্রগতির স্তরে এই বিশেষ মতাদর্শের
একটি নির্দিষ্ট গুনগত রূপ আছে। ধর্মের নামে, জাতির নামে আবার কোনো বিকৃত রাজনৈতিক
মতাদর্শের নামে সাম্প্রদায়িকতা তার নিজস্ব রূপকে পূনর্গঠিত করে, মানিয়ে নেয়। এই
মতাদর্শ আবার সমৃদ্ধ হয় দেশ কালে শাসক দলের অনুসৃত ণীতি মাধ্যমে যা কিনা জনগনকে
বিক্ষুব্ধ করে, উন্নয়ন, প্রগতি বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ বিস্তারের
ক্ষেত্রে এই বিক্ষোভকে কাজে লাগায়, সুত্রপাত নয় নানান রঙের দাঙ্গা এই দাঙ্গার
সুযোগ নেয় আবার সেই শাসকশ্রেণী তাঁর শ্রেনীস্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে।
তাই শুধু সন্ত্রাসবাদকে
মোকাবিলা করতে শুধু প্রশাসন পুলিস, সেনা বাহিনী নিয়োগ করেই সমস্যা সমাধান সম্ভব
নয়। এই মতাদর্শের বিরুদ্ধে চাই স্বাধীন, ধর্মনিরেপক্ষ্য, শুভবুদ্ধি সমপন্ন,
গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবি মানুষের মতাদর্শগত সংগ্রাম এবং এই সংগ্রামের সহায়তা করার
দ্বায়িত্ব থাকে যেকোণ ধর্মনিরেপক্ষ রাষ্ট্রের। সাম্প্রদায়িকতা এখন দাঙ্গাবাজ ও
দাঙ্গাপ্রসু কাড়া-মারা- হানার প্ররোচক, উত্তেজক ও প্রণোদক, বিভেদ –বিদ্বেষ-
বিবাদের স্রষ্টা মাত্র। দেশ-কাল-জাত-জন্ম-বর্ণ-ভাষা-নিবাস-পেশা
–আঁধা-কানা- খোঁড়া- পণ্ডিত –মুর্খ নির্বিশেষে মানুষকে কেবল মানুষ হিশেবে গ্রহণ বরণ
করতে হলে ব্যাক্তিকে নিরীশ্বর – নাস্তিক সামাজিক সাম্য ও আর্থিক সাম্যবাদী হতে
হবে। হতে হবে মানবপ্রেমী মানবসেবী
প্রমূর্ত মানবতা ও মানববাদী। আস্তিক মানুষে
জাত-জন্ম-বর্ণ-ভাষা-নিবাস- পেশার শ্রেষ্টত্ব কিংবা হীনতাবোধ থাকে , থাকবেই। তেমন
মানুষ কখণো পার্থক্যবোধ, স্বাতন্ত্রচেতনা,
অতীতের ও ঐতিহ্যের গৌরব গর্ববোধ কিংবা হীনমন্যতা থেকে মুক্ত হতেই পারে না। কারণ ওই
পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র চেতনাই তার জগত-জিজ্ঞাসার ও জীবন ভাবনার উৎস ও ভিত্তি। তাই
সে আস্তিক যতো বড়ো জ্ঞানী-গুনী- মনীষী – মনস্বী হোন না কেন, ওই
স্বাতন্ত্র্যচেতনাই, ওই উত্তম্মন্যতাই কিংবা হীনমন্যতাই তাঁকে অন্তরে সাম্প্রদায়িক
রাখবেই। কিন্ত সাম্প্রদায়িকতা মানে দাঙ্গাবাজি নয়-একথাটি
জানতে, বুঝতে হবে। দাঙ্গা নিতান্ত সাম্প্রদায়িকতা প্রসূত নয়। দাঙ্গা বাধায়
রাজনীতিকরা, সরকার, বেনেরা, স্ব স্ব প্রয়োজনে ও শ্রেণীস্বার্থে প্রতিযোগী – প্রতিদ্বন্দ্বীদের
কাবু বা বিনাশ করতেই। কারণ ধনতন্ত্র বিকাশের অমোঘ ফল হলো
সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। এই ধর্মীয় বা জাতিগত
সাম্প্রদায়িকতার প্রবক্তারা দাঙ্গায় অংশ নেয় না, মিথ্যাদারে ও রটনার আশ্রয় নিয়ে
উত্তেজনা ও প্ররোচণা দিয়ে স্বদলের, স্বধর্মের, স্ববর্ণের, স্বশ্রেণীর সম ও
সহস্বার্থের লোকেদের প্রণোদনা-প্রবর্তণা দিয়ে উৎকোচে, অর্থে, লুটের প্রলোভনে অজ্ঞ
অনক্ষর দুস্থ শ্রমজীবিদের প্রলুব্ধ করে এগিয়ে দিয়ে, লেলিয়ে দিয়ে উনজন সম্প্রদায়ের
লোকদের হত্যা করিয়ে, তাদের ঘরের সম্পত্তি লুট করিয়ে পরে নিজেরা উনজনদের
অর্থ-সম্পদ, আড়ত দকান, কারখানা, ব্যবসা, বাড়িঘর দখল করে। সন্ত্রাস-দাঙ্গা-হাঙ্গামা
বাধায় ভাব-চিন্তা-কর্ম-আচরণে এক বিশেষ চরিত্রের হিংস্রপশুপ্রায় মানব প্রজাতির,
মনুষ্য অবয়বের কিছু প্রানী, তাদের মধ্যে রয়েছে রাজণীতিক নেতা, বড় ব্যবসায়ী,
কারখানাদার, আড়তদার প্রভৃতি।
আমাদের সমকালীন বিশ্বে পশ্চিমী
সংবাদমাধ্যম, সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের পদলেহী ও বেতনজীবি কিছু বুদ্ধিজীবি জনমনে
ইসালাতঙ্ক প্রতিষ্টা করতে বিশেষ প্রচেষ্টা আজকের দুনিয়ায় দৃশ্যমান হচ্ছে। ইসলাম ও
জিহাদের নাম করে কিছু সন্ত্রাসবাদী দলের কার্্য্যকলাপে সাম্রাজ্যবাদকে আরো রসদ
যোগাচ্ছে তাদের কার্য্যসিদ্ধির জন্যে। এই বিষয়ে সামাজিক সমস্যাবলীর নিরিখে আল-কোরাণের শিক্ষার পর্যালোচনা দরকার
বুদ্ধিজীবি মহলে। ইসলামের প্রবক্তা মোহম্মদ (৫৭০-
৬৩২ খৃষ্টঃ) সর্বপ্রথম দিব্যদৃষ্টি পান ৬১০ খৃষ্টাব্দে, তাঁর ৪০ বছর বয়সে। তখন
থেকে তিনি তাঁর মৃত্যুদিন পর্যন্ত ‘ওহী’ বা প্রত্যাদেশ পেতে থাকেন – যাকে তিনি
আল্লার (ভগবানের) প্রেরিত বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এইসব প্রত্যাদেশ তাঁর শ্রীমুখ
দিয়েই বের হত আর তাঁর শিষ্যগণ তাদের লিখে নিতেন বা মুখস্ত করতেন। বলা বাহুল্য যে, তিনি যখন কোনো সমস্যার সম্মুখীন
হয়েছেন, তখন তারই সমাধানে অবতীর্ণ হত এইসব ‘ওহী’ বা প্রত্যাদেশ। কাজেই, পয়গম্বর
তাঁর দিব্যদৃষ্টিত মাধ্যমে যে প্রত্যাদেশ পেতেন, তাতে থাকত তাঁর সমস্যার সমাধান আর
তারই বিবরণ ও তথ্যাদি আছে আল-কোরাণে। এই গ্রন্থে আছে মানুষের ব্যবহারিক জীবনের
পক্ষে সংগত শিক্ষা ও যথার্থ আচরণের আদর্শ। মোহম্মদই একমাত্র ধর্ম প্রতিষ্টাতা,
যিনি ছিলেন সর্ব অর্থে একজন প্রকৃত গ্রহী- যিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রকৃত বন্ধু,
স্বামী, অভিভাবক, পিতা, সংসারী। তাঁর পূর্বের ধর্মের প্রবক্তাগণ, মুসা (মোজেস),
ইশা (যীশু খ্রীষ্ট) আর বুদ্ধদেব সংসারী ছিলেন না। তাই, মোহম্মদ তার ধর্ম ইসলামকে
পরিপূর্ণ সংসারের প্রয়োজনে এমনভাবে প্রস্তুত করেছিলেন যাতে, মানুষেরা এই পৃথিবির
জীবনকে সর্ব অর্থে সার্থক করতে পারে। এই ধর্মে এবং কোরাণে মহম্মদের মুখনিসৃত বাণী
তে পরামর্শ আছে আমাদের বাস্তব জীবনে চলার পথে নানান ব্যবহারিক দিকনির্দেশ। কোরাণে
জ্ঞান-বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী চিন্তা ও চর্চাকে উৎসাহ দেওয়া হয়। পরিবেশরক্ষা ও স্বাস্থ রক্ষায় উন্নতমানের পরামর্শ দেওয়া হয়।
অতীতে জগতসংসারে সভ্যতার বিকাশে মানবমনকে
সমৃদ্ধ করেছে জ্ঞান-বিজ্ঞান-অঙ্ক শাস্ত্র, দর্শনের চিন্তার-চেতনার বিকাশে , এবং
মধ্যযুগীয় ধর্মীয় গোঁড়ামীর শৃংখল থেকে যুক্তিবাদী মন কে মুক্ত করার ক্ষেত্র
প্রস্তুত করে গেছে কোরাণের নানান দার্শনিক তত্ত্ব। আর এই পৃথিবীতে শান্তি সহ উন্নতিও সম্ভবপর হয় –
তাঁর ধর্মাদর্শের উন্নত আদর্শ, কাজ ও আচরণের মাধ্যমে। কিন্ত তাই বলে, তাতে প্রাগ্রসর পৃথিবীর সর্ব সমস্যার
জন্য আর সর্বকালের প্রয়োজনে ইসলামও আদর্শ নির্মাণ করতে পারে নি। তা কোনো ধর্মীয় বা
সামাজিক দর্শনের ক্ষেত্রে সমাজ প্রগতির স্তরে যুগ যুগ ধরে প্রাসঙ্গিক হওয়া সম্ভব
নয়। কোরাণে মহম্মদের বহু শিক্ষার ভিত্তি শাস্বত সত্যের উপর প্রতিষ্টিত হলেও আর
সেগুলো সর্বকালের জন্যে প্রযোজ্য হলেও, তার শিক্ষাদি মূলত দেওয়া হয়েছিল খৃষ্টীয়
সপ্তম শতাব্দীর পৃথিবী ও তার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে। সমাজের গতি কোনো সময় এক
জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। পেছনে চলে না।
চিন্তা-চেতনার সম্ভার নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে। তাতে থাকে প্রগতির বীজ। নতুনের
আবাহন। ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের সময় থেকে আজ সমাজ এগিয়ে এসেছে অনেক দূরে। মানুষে মানুষে
সম্পর্কগুলো আরও সহজ হয়েছে। সামাজিক, ব্যাক্তিগত, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে
সম্পর্কগুলি আরো তীক্ষ্ণ হয়েছে। সুতরাং তার ছোঁয়া ইসলামের গায়ে লাগবে সে বিষয়ে
কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। সুতরাং ইসলাম যখন ধর্ম হিসাবে আলোচিত হবে তখন তাতে
প্রগতিশীল সামাজিক উপাদান খুঁজে পাওয়া যাবে। আবার কেউ ইসলামকে দর্শণ হিসাবে
বিবেচনা করে এগিয়ে যেতে চাইবেন, তখন সেখানে চিন্তার খোরাক পাওয়া যাবে। দুটো বিষয়কে
সামনে রেখেই চিন্তার ধারা আজ প্রবাহিত হচ্ছে। ইসলাম সম্পর্কে চিন্তা, আলোচনা বাড়ছে
বিভিন্ন স্তরে। যারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী নন, তাদের
মধ্যেও আলোচনা বাড়ছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে – সারা পৃথিবীতে। বর্তমান পৃথিবীতে, বিশেষ
করে, রক্ষণশীল ও জ্ঞান বিরোধী শাস্ত্রকার শ্রেণীর স্বার্থপরতা আর ধর্মকেন্দ্রীক
ব্যাবসা করার পরিণতিতে যে সব কুশিক্ষার প্রসার ঘটছে, সন্ত্রাসবাদ বাড়ছে- তাঁর ফলে
জনমনে ইসলাম কে নিয়ে একটা বিভ্রান্তি ঘটছে, বিদ্বেষ বাড়ছে। বর্তমান সমাজের
প্রেক্ষিতে এবং মহম্মদের সময়ের প্রেক্ষিতে তাঁর আদেশ, উপদেশ, ধারণা এবং তাঁর কার্্য্যকারিতার
বিশ্লেষণ করা দরকার ইসলামের শান্তি ও শ্বাস্বত বানী সমাজ জীবনে প্রয়োগের ক্ষেত্রে,
তাঁর ইতিবাচক উপাদানকে বর্তমান সমাজের নিরিখে বিচারবিবেচনা করার ক্ষেত্রে, তাঁর
সাম্যবাদী আদর্শকে পাথেয় করে সমাজকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে। যেসব বিষয়ে
জনমনে আজ ইসলাম সম্বন্ধে ভ্রান্তি সৃষ্টি করছে সেই সব বিষয়গুলিকে আলোচনা বর্তমানে
অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
কোরান ইসলাম ধর্মের প্রধান গ্রন্থ।
আরবি ভাষাতে লেখা। কোরানের ছন্দবদ্ধ, সর্বসাধারণের জন্য সহজবোধ্য গদ্যশৈলীর মধ্যে
আরবি ভাষার সারল্য ও গভীরতা প্রতিফলিত হয়েছে। কোরাণে গভীরভাবে ও
সামঞ্জ্যস্যপূর্ণভাবে আলোচিত হয়েছে এবং নির্দেশিত হয়েছে এই পৃথিবীতে কেমনভাবে
থাকতে হবে, ভালো ও মন্দের সীমারেখা, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার রকমফের,
বিশ্বব্যবস্থার শান্তির রুপরেখা, প্রাত্যহিক জীবনচর্চা, বিবাহ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, স্বাথ্য ও পরিবেশ
চেতনা, বিবাহবিচ্ছেদ প্রভৃতি নিয়ে। আমার মনে হয় পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থে এই
বিভিন্ন ও বৈচিত্র্যময় ব্যবহারিক ও সামাজিক দিক নিয়ে বিস্তৃতি ও আলোচনার ব্যাপ্তি অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থে প্রায়
নেই। প্রত্যেক ধর্মগ্রন্থের মতন কোরাণেও
যুদ্ধের এবং একই সাথে হিংসা ও শান্তির আলোচনা রয়েছে। ইসলাম ধর্মের আর একটি বড় ও
গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে হাদিস। মহম্মদ
তাঁর জীবদ্দশায় যেমন কোরানের অন্তরবস্তু ব্যাখ্যা করতেন তাঁর অনুগামীদের সামনে,
তেমনই তাদের কাছে প্রাত্যহিক জীববচর্চায় আদর্শস্থানীয় হয়ে উঠেছিলেন। এই প্রক্রিয়ার
মধ্যে তিনি নিজে বহু আলাপআলোচনা করেছেন তাঁর আনুগামীদের মধ্যে, যাতে সমাজে শান্তি
আসে। আওন্দকার থেকে মুক্তি আসে। জীবন নিজস্ব সতিতে প্রবাহিত হয়। তাঁর প্রাত্যহিক জীবনচর্চা
এবং নির্দেশগুলি হাদিস হিসাবে চিহ্নিত আছে। কিন্ত কোরান ও হাদিস উভয় ক্ষেত্রেই মনে রাখতে হবে,
প্রথমে লিখিত কোনো ব্যাপার ছিল না। আজকের হিসাবেই বোঝা যায়, লিখিত না থাকলে কী
সমস্যা দেখা দেয়। যতদিন মহম্মদ বেঁচে ছিলেন ততদিন সমস্যা হয়নি। কারণ কোনো সমস্যা
হলে তিনি সমাধান করেছেন। তাঁর তিরোধানের পর দৈনিক, দার্শনিক, ব্যবহারিক সমস্যা
সমাধানের দায়িত্ব পড়ে তাঁর নিকটস্থ অনুগামীদের উপর। তাঁরাও ক্রমে ক্রমে গত হতে
থাকেন। সমস্যা দেখা দেয় কোনটা কোরানের বাণী আর কোনটা হাদিসের- সেটা কোনো কোনো
ক্ষেত্রে বোঝা যাচ্ছে না। লেখাপড়ার সুযোগ ক্রমে বাড়ার ফলে কোরান লিপিবদ্ধ করা হল। মহম্মদের
একান্ত অনুগামীরা সিলমোহর দিলেন- সেই ৩০ পারা (ভাগ) কোরান এখন সারা পৃথিবীর বহুলপঠিত
বইগুলির মধ্যে অন্যতম। প্রায় সব ভাষাতেই কোরান পাওয়া যায়। হাদিস নিয়ে জটিলতা কিছুটা বেশী। লক্ষ্য লক্ষ্য হাদিস, বহু জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যে
কেই দাবি করতে শুরু করে যে আমার কাছে এতগুলো হাদিস আছে। হাদিস সংগ্রহ হয়েছে ৯১৬
খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত। অর্থাৎ মহম্মদের মৃত্যুর ২৮৪ বছর পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময়ে দেখা
গেছে, অনুগামীরা অনেকেই নিজেদের স্বার্থে, রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বার্থ অ মান রয়াখতে
হাদিস রচণা করে দিয়েছেন। এই ক্ষেত্রে ‘সিয়াসিত্তাহ’ বলে একটা কথা আছে। অনেক
ঝাড়াই-বাছাই করে বৈজ্ঞ্যানিক পদ্ধতিতে যে হাদিসগুলি ইসলামি আইন প্রণয়নের ভিত্তি
হিসাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে সেগুলি এর আওতায় পড়ে। নির্ভেজাল হাদিস যাঁরা সংগ্রহ
করেছেন তাঁরা হলেন মহম্মদ বিন ইসমাইল বোখারি ( ৮২০-৮৭১ খৃঃ), মুসলিম বিন আল কুরেশি
(৮২০-৮৭৫খৃঃ), আবু দাউদ ( ৮১৮-৮৮৮ খৃঃ) এবং আবু ইশা আল তিয়ামিজি ( ৮২৪-৮৯২ খৃঃ)। এনাঁরা যা সংগ্রহ করেছেন সেটাই গ্রহণযোগ্য বলে
চিহ্নিত হয়েছে। সংগ্রহের সময় শুরু হয়েছিল আবু
হানিফার মৃত্যুর পর (৭৬৭ খৃঃ০ আর তা গতি লাভ করেছে আব্বাসীয় রাজবংশের
শাসনকালে, তাদের ইচ্ছা ও অর্থপ্রদানে। ঐতিহাসিক টয়েনবির মতে – “মন মতো শাস্ত্র
রচণা করিয়ে নিতে ইমাইয়া বা আব্বাসিয় রাজপূরুষগণ কেউ পিছপা ছিলেন না। তারা এই ইচ্ছা
ব্যক্ত করেছিলেন যে, হজরতের হাদিস অনুযায়ী জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করবে। তাই মদিনা থেকে
তারা শাস্ত্রকারদের নিয়ে আসে বাগদাদে। প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের স্বার্থের দিকে
তাকিয়ে ইসলামকে ব্যবহার করেছিল। আর এই শাস্ত্রকারদের পোষও মানিয়েছিল শাসকগোষ্টী”। আরো
দুটি বিষয়ে উপর ইসলামি আইন দাঁড়িয়ে, তা হল ‘কিয়াস’ এবং ‘ইজমা’। পরবর্তী ইসলামি
আইনের ব্যাখ্যা হল ‘ইজমা’। এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে কোনো সমস্যা সমাধানের বিষয়ে
মুসলিম শাস্ত্রকারদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা যদি কোরান
বা হাদিসে না পাওয়া যায়, তাহলে ইজমার সাহায্যে সমস্যা সমাধানে কোনো বাধা নেই। পদ্ধতিতে
প্রগতিশীলতার লক্ষণ আছে। ধরে নেওয়া হয়েছিল, এত বছর পেরিয়ে এসে বহু ব্যাপার ঘটবেযার
বিবরণ বা ব্যাখ্যা কোরান-হাদিসে পাওয়া যাবে না। সেগুলি সম্পর্কে মতামত জরুরি হবে
এবং মুসলমানদের সে ব্যাপারে অবহিত করতে হবে। আজকের সমাজে এই পদ্ধতির চর্চা করাটা
অত্যন্ত জরুরি। এ প্রসঙ্গে একটি কথা না বলে রাখলে হবে না যে, এই পদ্ধতিটিকে অনেক
সময় শাসকগোষ্টি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। ভাড়াটে বিচারক
নিয়োগ করে নিজের পক্ষে ফতোয়া নিয়েছে। কিন্ত বিষয়টির প্রগতিশীলতা এবং অন্তর্নিহিত
গনতান্ত্রিক মনোভাবটি নষ্ট হয়ে যায়নি। আজ যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব
বিকাশ হচ্ছে, মুক্তমন ও গণতান্ত্রিক চিন্তা প্রসারিত হচ্ছে, এখন যখন আত্মমর্যাদা
প্রতিষ্টার সময়, তখন মুসলিম সমাজের নিজস্ব সমস্যাগুলি সমাধানে এ রাস্তা নিতেই হবে।
‘কিয়াস’- এর প্রকৃত অর্থ হল কোরান-হাদিস বা অন্য কোনোভাবেই যখন সমস্যার সমাধান
পাওয়া যাচ্ছে না, তখন জ্ঞান, বিবেক, বিচারবুদ্ধির উপর নির্ভর করে সমাধানের সুত্র
খুঁজতে হবে। হজরত মহম্মদ জীবিত থাকতেই এই বিষয় চর্চিত হয়েছে। মহম্মদের বিদ্রোহী ও সমাজসংস্কারকের ভূমিকা সারা
পৃথিবীতের অন্য ঘরানার মানুষের মধ্যেও সমাদৃত হয়েছে। যে মনোভাব এবং পদ্ধতি মহম্মদ
অবলমন করেছিলেন, তাতে শিক্ষাদীক্ষা, বৈজ্ঞ্যানিক চিন্তা, দর্শণ চিন্তা ইত্যাদিতে
ইসলামের অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্ত ক্রমে ক্রমে অবস্থার পরবিবর্তন হতে থাকে।
শাসকগোষ্টী নিজেদের মাইনে-করা শাস্ত্রকারদের ও বুদ্ধিজীবীদের রাজদরবারে বিভিন্ন
গালভরা নাম দিয়ে পুষতে শুরু করলেন। তাঁরা বিভিন্ন ফতোয়া দিতে থাকেন, যা
শাসকগোষ্টীর মনমতো হবে। রক্ষণশীল বুদ্ধিজীবিদের তহন পোয়াবারো। তারা এই ফতোয়া
শাসকশ্রেণীর শয়ায়তায় কার্যকর করতে শুরু করে। এই সময়েই অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। ইবনে-
সিনার সমস্ত দার্শনিক বইগুলি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ইবন আল আইসেমের জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়কে সমস্ত লেখা
নষ্ট করে দেওয়া হয়। কেউ কেউ আবার ফতোয়া
জারি করেছিলেন, ‘ ধর্মকে ধারণ করতে হবে রক্ষণশীলতা দিয়ে, কোনো প্রশ্ন না করে’।
ইমামদের অমান্য করা গর্হিত কাজ বলে চিহ্নিত করা হয়। এইভাবে বেতনভোগী কাজি বা
ধর্মব্যবসায়ীরা ইসলাম ধর্ম এবং জাগতিক কাজকর্মকে করে তোলে একেবারে অমানবিক।
শাসকশ্রেণীর মদতপুষ্ট শাস্ত্রকারদের ভাষ্য প্রাধান্য পেয়ে যায়। যুক্তিবাদী,
মুক্তমন, উদার ও বঐজ্ঞ্যানিক দৃষ্টিভঙ্গির অংশটি ক্রমেই সভ্যতার অতলে ডুবতে থাকে।
এখানেই সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে। গভীর অনুভূতিপ্রবণ মন নিয়ে ট্র্যাজেডির
হৃদয় খূঁজে আবার মানবিকতার ফল্গুধারাকে প্রবাহিত করার প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করা ছাড়া নিশামুক্তি হতে পারে না। মানবিকতা ও উদারবাদ ছাড়া পৃথিবীতে কোনো ধর্ম বা
সমাজদর্শন বেঁচে থাকতে পারে না।
১) জিহাদের নামে বর্বরতা।
আল-কোরানের শিক্ষাকে অবজ্ঞা ও
উপেক্ষা করার আর তার অপব্যাখ্যা ও অপপ্র্যোগের বেশ কিছু উদাহারণ পাওয়া যায়।
বর্তমান মুসলিম সন্ত্রাসবাদ তারই একটি উজ্জ্বল উদাহারণ। কিন্ত তাকে নিয়ে যে এক শ্রেণীর ধান্দাবাজ চরম
বির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়ে যেন-তেন-প্রকারেণ শ্ত্রু নিধনই প্রশ্রয় দিচ্ছে, তার অনেক
বিষয় আমাদের অজানা থাকে। ইংরাজি ‘আস্যাসিন’ বা গুপ্তভাতক শব্দটি এসেছে ফার্সী
‘হাসাসীন’ শব্দ থেকে। তার অর্থ, যারা গুপ্ত হত্যার মতবাদে বিশ্বাসী অর্থাৎ
গুপ্তঘাতক। শিয়াদের একটি শ্রেণী এই দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়েছিল খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দীর
শুরু থেকে। তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের জন্যে সিরিয়ার ‘আলামুত’ পর্বতের গুহায়
একটা গুপ্ত ঘাঁটি নির্মাণ করে বহু যুবককে ট্রেনিং দিতে থাকে তৎকালীন মুসলিম
শাসকদের হত্যা করার জন্যে। যাদের দ্বারা ঐ
কাজ করানো হত, তাদের লোভ দেখানো হত এই বলে যে, ঐ কর্মের ফলে কেউ নিহত হলে তৎক্ষণাৎ
বেহেস্তে (স্বর্গে) যাবে। তার সমর্থণে তার কোরাণের নিম্নলিখিত নির্দেশগুলো তুলে
ধরত ঃ
১) “আল্লার পথে যারা (যুদ্ধে)
নিহত, তাদের ‘মৃত’ বোলো না। না, তারা জিবন্ত। শুধু তোমরা তাদের দেখতে পাও না”।
(সুরা, আল-বকরাহ/১৫৪)।
২) “আর তাদের ‘মৃত’ বলে গণ্য কোরো
না, যারা আল্লার পথে (যুদ্ধে) নিহত হয়েছে। না, তারা জীবিত। (আর তারা) তাদের প্রভুর
কাছ থেকে জিবিকা পেয়েছে। (তারা) তা নিয়ে আনন্দিত, যা আল্লাহ তাদের দিয়েছেন- তাঁর
অনুগ্রহ থেকে। আর তারা হর্ষোতফুল্ল তাদের জন্য, যারা এখনও পিছনে (পড়ে) আছে –
এইজন্যে যে, তাদের কোনো ভয় নাই, তারা কোনো দুঃখ করবে না”। (সুরা, আল-ই-ইমরান/১৬৯ ও
১৭০)।
উপরোক্ত বক্তব্যদ্বয়ে নিশ্চয়ই
মহাম্মদের মুখ দিয়েই বের হয়েছে। কেননা, তা না হলে কোরাণে তাদের স্থান হত না। তবে
তিনি তাঁর ঐ দুই বক্তব্যে তৎকালীন মুসলমানদের উৎসাহ বর্ধনের জন্যই এইভাবে বলেছেন
যাতে, তারা অমুসলমানদের আক্রমনাত্মক যুদ্ধে বিরুদ্ধে আপ্রাণ সংগ্রাম করে। বিচার-
বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে,
ক) নিহত ব্যাক্তিরা জীবিত বলা ঠিক
নয়। মৃত্যুর পরে তাদের আর দেখা যায় না। তারা জীবিত থাকে শুধু ইতিহাসে আর সমসাময়িক
কালের মানুষের স্মৃতিপটে- যদি তাঁরা সত্যের জন্য প্রাণ বিসর্জন করে।
খ) ঐ কাজে নিহত ব্যাক্তিরা আল্লার
কাছ থেকে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিদান পায় না, পেতেও পারে না । কারণ কোরাণে
অসংখ্যবার বলা হয়েছে যে, যে –কোনো ব্যাক্তি আল্লার কাছে তার প্রাপ্য পাবে, শেষ
বিচারের দিনে – তার পূর্বে নয়।
গ) কাজেই, ঐ শহিদদের মৃত্যুর পরেই
হর্ষোতফুল্ল হওয়ার কথা কল্পণামাত্র। বাস্তবে তা সম্ভবপর নয়।
মহাম্মদকে তাঁর সত্য প্রচার কেন্দ্র, মদীনার শিশু
রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করার জন্য আর সত্যসেবী তাঁর শিষ্যদের প্রাণে বাঁচাবার জন্য
বহুবার যুদ্ধ করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মরক্ষার ঐ যুদ্ধের পক্ষে বিশেষ
করে, ৬২৫ খৃষ্টাব্দের পরে ঐ দরণের যুদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক শিষ্যকে সংগ্রহ
করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কাজেই, তখন তাঁকে
বাধ্য হয়েই এমন কিছু উতসাহবর্ধক বাণী দিতে হয়েছিল যাতে, আত্মরক্ষার ওই যুদ্ধের
পক্ষে প্রয়োজনীয় সাড়া পাওয়া যায়। সত্যের পক্ষ্যে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত ব্যাক্তিরা
যথার্থে শহিদ হত নিশ্চয়। তবে তারা যে তখনই বেহেস্তে চলে যেতে পারত না। কারণ, রোজ
কেয়ামতের পূর্বে কোনো মুসলমানই কোনোভাবেই তার প্রাপ্য পেতে পারে না। কোরাণ গ্রন্থে
নিম্নলিখিত প্রকারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বহুবার ঃ
৩) ‘প্রত্যেক জীবকেই মৃত্যুবরণ
করতে হবে। আর শুধু মহাউত্থানের দিনেই তোমাদের পূর্ণ মাত্রায় দেওয়া হবে, তোমাদের
প্রতিদান’। (সুরা, আল-ই-ইমরান/১৮৫)।
৪) ‘এইভাবেই আমরা ভালোকে পুরস্কার
দিয়ে থাকি’। ((সুরা, আল-মুর-সালাত/৪৪)।
৫) ‘আমরা (মানুষের কাজের) সব কিছুই
লিখে রাখি গ্রন্থে’। (সুরা, আল-নবা/ ২৯)।
৬) ‘ (ঐ দিন) প্রত্যক জিবকেই দিতে
হবে তার কাজের হিসেব’ । (সুরা, আল-মুদাশশির/৩৮)।
৭) ‘আর আমরা মহা উত্থানের দিনে
স্থাপন করব যথার্থ মানদণ্ড। তাই, কেউই অন্যায় ব্যবহার পাবে না কোনো প্রকারেই। আর
যদি সর্ষের দানার মতো ওজনের কিছু কাজ করে থাকে, আমরা তাকে বের করে আনব আর আমরা তার
হিসাব করতেও পর্যাপ্ত (ক্ষমতাবান)’। (সুরা, আল-আম্বিয়া/৪৭)।
আধুনিক মুসলিম সন্ত্রাসবাদের আদর্শ
নেওয়া হচ্ছে উপযুক্ত দুই তথ্য থেকে। এইসব গুপ্তঘাতকের দল সত্যের স্বার্থরক্ষার
নামে পৃথিবির সর্বত্রই মানুষের প্রাণহানি করে চলেছে। তারা নাশকতামূলক কাজ ও
সন্ত্রাসবাদের জন্য যুবকদের যথেষ্ট ট্রেনিং দিচ্ছে। আর তাদের দেখাচ্ছে কোরাণের ঐ
দুই নির্দেশ । (১ ও ২)। সেখানে আত্মঘাতী যুবকদের জানানো হচ্ছে যে, তারা শহিদ হওয়ার
সঙ্গে সঙ্গেই বেহেস্তে যাবে আর সেখানে তারা অপরিমেয় ভোগের ও সুখের মধ্যে অনন্তকাল
জীবনযাপন করবে। সেই তুলনায় এই পৃথিবীর জীবন ও তার সুখ একেবারেই তুচ্ছ ব্যাপার। বর্তমান সন্ত্রাসবাদের পেছনে যে-কোনো অন্যায় বা
অভিযোগ নাই, তা কিন্ত সত্য নয়। বরং একথা বলা উচিত যে, বহু অবিচার
থেকেই এই ধরণের অপকর্মের জন্ম হয়েছে। মনে
করা হয় যে, তদ্বারা প্রতিকার হবে। কিন্ত তা সত্য নয়। যাদের বিরুদ্ধে এই ধরণের ধ্বংসসাত্মক কাজ করা হয়,
তারা প্রায় সকল দিক থেকেই ক্ষমতাবান। তাদের বিরুদ্ধে এইভাবে ভয় দেখিয়ে কোনো কাজ
করতে বাধ্য করা যায় না। বরং তার ফলে, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসা ঘটনাই ঘটে অধিকতর
ক্ষেত্রে। কিন্ত যে যাই হোক, ইসলামের নামে মুসলমেরা এই ধরণের
গুপ্ত হত্যাকান্ড চালাতে পারে না। তাতে আর যাই হোক, কোনো সমস্যার সমাধান হয় না।
উপরন্তু ধর্ম হিসাবে ইসলামের যথেষ্ট দূর্নাম হয়। তার প্রতিকারার্থে এখন শুধু
এইটুকু বলা যেতে পারে যে, কোরানের শিক্ষার অপব্যাখা ও অপপ্র্যোগ করে এই প্রকারের
সন্ত্রাসবাদ চালানো খুবই অনুচিত। কোরানের শিক্ষা ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ কীভাবে করতে
হবে, তার জন্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়া হয়েছে কোরানের নির্দিষ্ট বানীতে ঃ – “ ইনিই
তিন (আল্লাহ), যিনি তোমাদের কাছে প্রকাশ করেছেন পরমগ্রন্থ (আল- কোরান)। তার কিছু
বানী চূড়ান্ত। তারা হল গ্রন্থের মূল। আর অন্যগুলো আলংকারিক (উপমা)। কিন্ত যাদের অন্তরে আছে বিকৃতি, তারা অনুসরণ করে সেই
অংশটি, যেটা হল আলংকারিক- বিপথে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর তার ব্যাখ্যা করে নিজেদের
মতো করে। কিন্ত তার ব্যাখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আর যারা
জ্ঞানে দৃঢ়, তারা বলে, এতে আমরা বিশ্বাস কতি। এর সবই এসেছে আমাদের প্রভুর কাছ থেকে। আর জ্ঞানিরাই
সত্যকার চিন্তা করে”। (সুরা,
আল-ই-ইমরান/৭)। এই উদ্ধৃতি থেকে কিছু
সিধান্তে উপনীত হওয়া যায়। ক) তার শিক্ষা সকল কিছুই চুড়ান্ত নয়। খ) কিছু অংশ
চূড়ান্ত আর সেইগুলোই তার মূল ও শ্বাশ্বত বাক্য। গ) এতে আছে অনেক তুলনা, উপমা,
কাহিনী, ইতিহাস ও বর্ননা। সেগুলো আছে বিশদভাবে শিক্ষা দেওয়ার জন্য আর মূল
বিশয়গুলোকে ব্যাখার প্রয়োজনে। এইগুলো আসলে কিন্ত আলংকারিক। ঘ) যারা যথার্থ জ্ঞানবান নয় আর যাদের
অন্তরে আছে বিকৃতি, তারা এই আলংকারিক অংশটুকুকে ব্যাখ্যা করে নিজেদের মতো করে
নিজেদের স্বার্থপূরণের জন্য আর মানুষকে বিপথে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ঙ) কোরানের যথার্থ
ব্যাখ্যাকারী শুধু তারাই, যারা জ্ঞানবান। কারণ, তারাই সত্যকার চিন্তা করে যাতে,
মানুষের কল্যাণ হয় ও তারা সুপথে যায়। ইসলাম বা কোরানে অন্যায় ও অপকর্মের বিরুদ্ধে বহু
শিক্ষা আছে। যেমন কিছু উদাহারণ তুলে ধরা যায় ঃ-
১) “(ইসলামের দ্বারা) সংস্কারের
পরে পৃথিবীতে কোনো অনাচার কোরো না”। (সুরা, আল-আরাফ/৮৫)।
২) “নিশ্চয়, আল্লার দৃষ্টিতে
তোমাদের মধ্যে সেই-ই মহোত্তম, যে আচরণে শ্রেষ্ট”। (সুরা, আল-হুজুরাত/১৩)।
৩) “তারা (মুসলমানেরা) আল্লায় ও
শেষ বিচারের দিনে বিশ্বাস করে আর নির্দেশ দেয় সংগত কর্মের আর নিষেধ করে অন্যায় আর
ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করে একে অপরের সঙ্গে”। (সুরা, আল-ই-ইমরান/১১৪)।
৪) “হে বিশ্বাসীবৃন্দ !
ন্যায়বিচারে কঠোর হবে, সাক্ষী হবে আল্লার –যদিও তা যায় তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে
কিংবা পিতামাতা কিংবা আত্মীয়দের – তারা ধনী বা গরীব যাই-ই হোক না কেন”। (সুরা, আন
-নিসা/১৩৫)।
৫) “হে বিশ্বাসীবৃন্দ !
ন্যায়বিচারে দৃড়তা নিয়ে আল্লার জন্যে সাক্ষী হবে। আর কোনো জাতির প্রতি ঘৃণা যেন
তোমাদের ন্যায়বিচার না করতে প্ররচিত করে। ন্যায়ের সঙ্গে ব্যবহার করো। এইটাই হল,
তোমাদের (পূর্ণ) কর্তব্যের নিকটবর্তী। আল্লার প্রতি তোমাদের কর্তব্য করো”। (সুরা,
আল -মাইদাই/৮)।
মুসলমানের কাজ ন্যায় বিচার করা।
তার আরও কাজ হল সেবা করা। ভালো কাজই মসলমানের কর্তব্য। নির্বিচারে হত্যা করার মতো
অন্যায় ও ওপরাধ কোনো মুসলমানের কাজ হতেই পারে না। মানববোমা, আত্মঘাতী গুপ্তঘাতক আর
গুপ্তবাদী নৃশংস পাপীদের মতো ধবংস কর্মকে সমর্থন করা যায় না। না, তাকে জেহাদও বলা
যায় না। কেননা , তার ভিত্তিতে সত্য বা
ন্যায়ের যথার্থ সমাধানের পক্ষে কোনো স্বার্থ থাকে না। এই ধরণের প্রতিবাদ ও
প্রতিশোধে স্পৃহার কোনো স্থান ইসলামে নেই।
আমাদের অনেকের মধ্যে একটা ভ্রান্ত
ধারণা বিরাজ করে যে আরবি ভাষার উৎপত্তি প্রধানত ইসলাম ধর্মসম্পর্কিত, কিন্ত তাই যদি হত তাহলে মহম্মদ কোন ভাষার মাধ্যমে তাঁর
শিষ্যদের সাথে, সমাজের সাথে সংযোগ স্থাপন করছেন। ভাষার উৎপত্তির তত্ত্ব প্রধানত ভাষাতত্ত্ববিদদের
গবেষণার পরিধির মধ্যে মধ্যে পড়ে, তবে এই বিষয়ের উল্লেখ্য যে মহম্মদের সময়ের আগেও
আরবি জাতিগত ভাষা ব্যবহার করতেন কোরেশী রা (প্রধানত তাঁরা ছিলেন পৌত্তলিক উপাসক)
এবং আরবি খৃষ্টানরা। আরবি শব্দ জিহাদ যার অর্থ হল ‘মূল্যবান ও মহান উদ্দেশ্যে
প্রচেষ্টা’ তদসম্পর্কিত কতিপয় ধারণায় ধারাবাহিক বিকৃতি ব্যাপকতরভাবে ঘটানো হয়েছে।
বর্তমান এটিকে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসাবে সাধারণভাবে ভাবা হয়ে
থাকে। আপাতদৃষ্টিতে আত্মবিরধী মনে হলেও সত্য হল এটাই ইসলাম যার নিগুঢ়ার্থ হল সালাম
অর্থাৎ শান্তি, তাকে দেখা যায় এক যুধ্যমান ধর্ম হিসাবে, যার উন্মাদগ্রস্ত
অনুগামীরা অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ। স্থায়ী
ভাবাপন্ন এই উপলব্ধির জন্ম হয়েছে জিহাদকে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে এক আদর্শগত সংগ্রাম
হিসাবে সংজ্ঞায়িত করার জেদ থেকে, যাকে বলা হয় ঐশ্লামিক বিশ্বাস ও নীতিশাত্রের দার্শনিক মতের এক দুঃখজনক বিকৃতি। মুসলিম সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সংগ্রামজনিত
অস্থিরতা তোইরি হওয়ায় এবং ইসলামের নামে পার্থিব শাসকবর্গ যুদ্ধজয়ের ঐতিহাসিক
বাধ্যতার কথা বারংবার বলায় জিহাদের নীতিগত গূঢ়ার্থ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে
গেছে।
উর্দু ও পারসিক ভাষায় রচিত গালিবের
সুবিস্তৃত লেখা সংকলন ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যকে অতিক্রম করে মানবিক বোধবুদ্ধির সঙ্গে
গভীরতম সম্পর্কিত ও ব্যঞ্জনামণ্ডিত। বৃহদার্থে হিন্দুস্থান বা ভারত, শিমিত আকাএ
দিল্লিকে কেন্দ্র করে উত্তর ভারতের সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে নিজেকে
নিমগ্ন রাখতেন এই বিশিষ্ট কবি। পাশাপাশি, তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃত হয়ে থাকতেন এবং নিজে সুন্নি হওয়া
সত্ত্বেও যোগাযোগ রাখতেন শিয়া গোষ্টির সঙ্গে। ধর্মীয় গোঁড়ামির যাবতীয় পদ্ধতি
সম্পর্কে সচেতন থেকে তিনি সামাজিক অনুশাসন অমান্য করতেন এবং খারিজ করে দিতেন সেইসব
সাংস্কৃতিক আনুষ্ঠানিকতা যা একটি সম্পদায় থেকে অন্যটিকে পৃথক করে রাখে।
ধর্মবিশ্বাসকে ঘিরে পার্থিব তর্কবিতর্ক নয়, ঈশ্বরের একত্বের উপর ছিল তাঁর কাছে
প্রকৃত ধর্মবিশ্বাস। বাইরের ধর্মাচরণের
প্রতি তিনি যে কোনদিনই আকৃষ্ট ছিলেন না, তার স্বীকৃতিক মেলে নিম্নলিখিত রচনায়ঃ
‘ভক্তি ও প্রার্থনার পবিত্রতা আমার জানা
তবুও এসবের পানে ধায় না আমার মন’
‘গালিব, কোন মুখে কাবা যাবে তুমি
সেসময় নিশ্চিত, হবে তুমি অতি
লজ্জাহীন’।
ঐশ্লামিক নীতিশাস্ত্র এবং জিহাদের
অনাধ্যাত্মিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলির মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে গভীর সচেতনতা সৃষ্টি
না হলে, ঐশ্লামিক ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে অতিব সাযুজ্যপূর্ণ বিষয় হিসাবে জিহাদকে
উপলব্ধিতে আনা সম্ভবপর নয়। আধ্যাত্মিক তাতপর্যের দিকে মাথা হেলিয়ে রাখলেও, জিহাদকে
আক্রমণাত্মক অথবা প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের মুসলিম পদ্ধতি বলে বিবেচনা করেছে এটির
উপর অধিকাংশ রচনা। সংগ্রামকে হতে হবে মানবতাবাদী। গালিবের এই দার্শনিক মত
কোরানে উল্লিখিত জিহাদের প্রকৃত অর্থ
সামনে এনে হাজির করে। জিহাদ কথাটি মুল আরবি শব্দের প্রকৃতি প্রত্যয় থেকে নেওয়া,
যার অর্থ হল অবাঞ্ছিত প্রতিদ্বন্ধী- বহিঃশত্রু, শয়তান কিংবা নিজের মধ্যে থেকে
কলুষতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। প্রাক-ঐশ্লামিক আরব সমাজ একে মহান উদ্দেশ্যসাধক সেবা
করার প্রয়াস হিসাবে গণ্য করত, যুদ্ধের জন্য সাধারণভাবে ব্যবহৃওত হত অন্যান্য শব্দ।
মক্কা থেকে মদিনা চলে আসার পর বিভিন্ন উপজাতি ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইসলামের
ধর্মের প্রবর্তক যে চুকিত সম্পাদন করেন তার প্রথম বাক্যটিতে জাহদা (Jahada)-র অর্থ
হল বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের নিয়ে গঠিত সমগ্র সম্প্রদায়ের সামগ্রিক মংগলসাধনের জন্য
চেষ্টা চালানো। ঈশ্বরের জন্য সংগ্রামের দায়িত্ব যেমন সব মুসলিমেরই, অন্যদিকে এই
দলিলটিতে স্বাক্ষরকারীদের দায়িত্ব বর্তেছিল মদিনাকে রক্ষা করাও। কোরানের অর্থ
বিক্ক্রিতভাবে ব্যাখ্যা না করে জাহদাকে শব্দার্থে সশস্ত্র সংগ্রাম হিশেবে ত নয়ই,
পবিত্র হিসেবেও গ্রহণ করা উচিত নয়।
কোরানের আঠারোটা অধ্যায়ে মূল শব্দ জিহাদ একচল্লিশ বার
উল্লিখিত হয়েছে যা সব সময়ে ধর্মযুদ্ধের অর্থে নয়, অন্যদিকে যুদ্ধের বিরোধিতা করে
নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে সত্তরবার। ঈশ্বরের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে
জাহদাকে যুক্ত করে লিখিত পঙক্তিগুলি ব্যাতিরেকে সিদ্ধান্ত মুলক সমস্ত বিশয়েই
ধর্মবিশ্বাস স্থাপনে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী প্রযোজ্য।
সাধারণভাবে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়ায় জন্য অগ্রাধিকার পাওয়া শব্দটি হল কিতাল বা হারব।
অবশ্য ঈশ্বরের জন্য সংগ্রাম করার যুক্তি উপস্থিত করার জন্য কয়েকটি স্তবকও রয়েছে। ন্যায্য সশস্ত্র সংগ্রাম
হিসাবে জিহাদের একমাত্র পদ্ধতি কোরানে যা নির্ধারিত হয়ে রয়েছে তা হল জিহাদ ফি
সাবিল আল্লাহ অর্থাৎ ঈশ্বরের নির্দেশিত
হয়ে জিহাদ। তা সত্ত্বেও, উক্তিটি সম্পর্কে লেখা কবিতার স্তবকগুলি ভদ্র ও সুন্দর মেজাজ তৈরির সারকথা হিসাবে ব্যবহ্রত
হওয়ার পরিবর্তে ধৈর্যের জন্য মনত ও শক্তিপ্রদর্শনের ক্ষেত্রে শিথিলতা বলে চিহ্নিত
হয়। যদি কোরান নিজেই জিহাদ অর্থে পবিত্র যুদ্ধ ও অনেক নীচু অভিধায় অবিশ্বাসীদের
বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ধারণা তৈরি করে না দিত, তাহলে কী করে
মূল বিষয়বস্তু এবং যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যার উপরে তৈরি পরবর্তীকালের ধারণার মধ্যে
অমিল দেখা দিল? মুসলিম ধর্মবিশ্বাস ও নীতিশাত্রের ভূমিকা থেকে জিহাদকে কার্যত
বিচ্যুত করার বিষয়টি উপলব্ধিতে আনতে গেলে, আমাদের জিজ্ঞাসার পরিধি যুদ্ধ বিগ্রহের
পরিধিতে সীমাবদ্ধ করে রেখে দেওয়া সঠিক হবে না বরং দেখতে হবে, সমগুরত্বপূর্ণ
রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক বিতর্কগুলিকে যা প্রথম দিকের ইসলাম সম্প্রদায়কে বিক্ষুব্ধ করে
তুলেছিল। ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের প্রথম শতাব্দীতে উগ্রপন্থী কারাজাইত সম্প্রদায়
অন্তঃস্থ ও বহিস্থ ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গগত সংঘাত হিসাবে জিহাদকে
সংজ্ঞায়িত করে ঘোষণা করেছিলেন এটি হল ধর্মবিশ্বাসের এক স্তম্ভ কারাজাইতদের মতে, যে
সমস্ত মুসলিম কোরান ও ধর্মপ্রবর্তকের বাণী ও ব্যবস্থাপত্র থেকে বিচ্যুত হবেন,
তাঁরা এই সম্প্রদায়ভূক্ত হয়ে থাকতে পারবেন না। অবিশ্বাসীদের এবং ঈশ্বরের সঙ্গে
সম্পৃত নন এমন ব্যাক্তিদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করতেই হবে। প্রকৃত ধর্মবিশ্বাস
বিষয়ক সমস্যার আমূল সমাধানের এমন পথ প্রবল
প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় সেইসব মানুষের দিক থেকে দিক থেকে যাঁরা পরবর্তিকালে সুন্নি
গোঁড়াপন্থার মর্মবস্তুকে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। কারজাইত মতালম্বীরা সামগ্রীকভাবে
খারিজ হয়ে যান। প্রথমদিকে মুসলিম বিধিসম্মত প্রতিষ্টাঙ্গুলির কোনোটিই তাঁদের এই
মতের সমর্থক হয়ে ওঠেনি। যদিও কারজাইত নির্দেশনামাকে প্রতিহত করা গিয়েছিল কিন্ত তাঁদের দ্বারা উত্থিত নীতিশাস্ত্রসম্মত
কার্যাবলি এবং ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে মম্পর্ক বিধান নিয়ে বিতর্ক প্রভাব বিস্তার করে
মুসলিম মম্প্রদায়ের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিবর্গের মনে উপর। কারজাইতবাদীদের
ব্যতিরেকে, বিতর্কে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কেউই নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হওয়া বাক্তিদের ধর্মসম্প্রদায় থেকে বহিস্কার
করার যুক্তিকে গ্রহণ করেননি। মঙ্গলসাধনের জন্য শিক্ষাদান ও অন্যায়ের দূরীকরণের
মধ্য দিয়ে অনৈতিকতা রোধ করতে হবে – এই বক্তব্য উপস্থাপিত করে তরবারির পরবর্তে
কথাবার্তার আদানপ্রদানকে জিহাদ হিসাবে গন্য করেছিলেন কয়েকজন। অনৈতিকতাকেন্দ্রিক
সমস্যায় বাস্তবধর্মী সমাধানে উদ্যোগী হওয়ার বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল ব্যক্তিগত
সচেতনতার উপর। সম্প্রদায়ের অভিভাবক স্থানীয় ব্যক্তিরা ধর্মীয় বা সাধারণ প্রকৃতির
বাহ্যিক বিষয়গুলি নিয়ন্ত্রণে নিবদ্ধ ছিলেন। ঐশ্লামিক আচারানুষ্টানের উপর গুরত্ব
আরোপের ফলে ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে আনুষ্টানিক ঐক্য গড়ে ওঠে এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়কে
প্রসারিত করার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্ত এমন ধরনের অর্জিত ঐক্য ইসলামের চিরায়ত উপাদান-
ইশ্বরে আস্থাজ্ঞাপন বা বিষ্বাস ও মূল্যবোধ সম্পর্কিত আচরণকে আবছা করে দেয় এবং
আচারানুষ্টান পর্ব ধর্মীয় জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। মুসলিম
সম্প্রদায়ের পক্ষ্য থেকে নৈতিকতা প্রসঙ্গটির অনুপস্থিতি কোরাণের ভিত্তিতে নির্মিত
নীতিশাস্ত্রের ক্ষেত্রে এনে দেয় চরম বিপর্যয়কর ফলাফল। চরমপন্থী কারজাইতি অবস্থানের
বিরোধিতা করতে গিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মুখপাত্রদের মধ্যে অধিকতর শক্তিশালী অংশ
মুসলিম ধর্মবিশ্বাসের অপরিহার্য সহজাত উপাদান নীতিশাস্ত্রকেই একপাশে সরিয়ে রাখার
প্রবণতা দেখান। এর প্রভাব আরো বেশি মাত্রায় স্পষ্ট হয়ে পড়ে যখন ঐশ্লামিক আইন, যা
মুসলিমদের কাছে ও পাশ্চাত্য সমাজের উপলব্ধিতে জিহাদের মূল উৎস সেটি কোরানে বর্ণিত
নীতিগত দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জিহাদ সম্পর্কে কোরানে লিপিবদ্ধ প্রসারিত
ধারণা মূল্যহীন হয়ে যায় এবং ঐশ্লামিক আইনি ঐতিহ্য রূপান্তরিত হয় লঘুতর অর্থে। ইসলামের
প্রবর্তক এবং প্রথম চারজন খলিফার জীবৎকালে ঐশ্লামিক বিধিবিধান যে নিজ্বতা ও
গতিশীলতায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল তার পিছনে কারণ হল প্রত্যাদেশ এর ব্যাখায় ভিত্তিতে
নীতিসম্মত উদ্দেশ্যসমূহকে বিধিসম্মত করে তোলা। উম্মাইদ (৬৬১-৭৫০ খৃষ্টাব্দ) এবং
আব্বাসিড (৭৫০-১২৫৮ খৃষ্টাব্দ) বংশীয়রা যে যুদ্ধগুলিতে জয়লাভ করেছিলেন তাকে
আদর্শের দিক থেকে যুক্তিযুক্ত করে তোলার জন্য মুসলিম আইনপ্রণেতারা জিহাদকে
সংজ্ঞ্যায়িত করলেন সশস্ত্র সংগ্রাম হিসেবে এবং আইনকে পৃথক করলেন নীতিশাস্ত্র থেকে।
ধ্রুপদী বিচার বিষয়ক পুস্তকগুলি জিহাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অর্থ ঢেকে রেখে যুদ্ধের
বস্তুগত দিকটাই মাত্র তুলে ধরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে- লুন্ঠিত দ্রব্যের বন্টন অমুসলিমদের প্রতি আচরণ
ও মুসলিম সৈনিকদের বিধিনিষেধের প্রতি। এই নির্দেশাবলিতে জিহাদকে সশস্ত্র হিসেবে
উচ্চ প্রশংসিত করে যে হাদিসের সূত্রপাত করা হয়, তার সঙ্গে সবটাই সংগতিপূর্ণ। কিছুমাত্র
মুসলিম প্রশ্ন তোলেন অনাধ্যাত্মিক শাসকবর্গ দ্বরা পরিচালিত যুদ্ধগুলিকে জিহাদের
ধারণার প্রয়োগ হিসেবে দেখা হবে কি না এবং ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত সংগ্রামের
সঙ্গে তার সম্পর্কহীনতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে। এই আপত্তির যৌক্তিকতা মেলে এক
বহুশ্রুত ঘটনার। নবপ্রতিষ্টিত সম্প্রদায়কে রক্ষা করার জন্য প্রথম দিকের যুদ্ধ থেকে
ফিরে আসার পর ধর্মপ্রবর্তক মহম্মদ তাঁর সহযোদ্ধাদের বলেছিলেন যে তিনি ফিরেছেন
ক্ষুদ্রতর যুদ্ধ (জিহাদ আল আসগর) থেকে বৃহত্তর যুদ্ধে (জিহাদ আল আকবর) সামিল হওয়ার
জন্য। এই যুদ্ধ হল মানুষের মুখ্য ও ঈশ্বরদত্ত প্রবৃত্তির বিকাশ ও মনুষত্ব অর্জনের
ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টিকারী নিজেদের মধ্যেই থেকে যাওয়া অশুভ শক্তিগুলির বিরুদ্ধে।
আব্বাসিড ও উম্মাইদ বংশীয় খলিফাদের রাজত্বকালে হাদিস –এর কোনো প্রামান্য সংস্করণে
এই কথাটিকে অন্তুর্ভুক্ত করা হয় নি। এই বাদ রাখার
ঘটনাটির মধ্য দিয়ে বোঝা যায় এর সংকলকরা কী ধরনের শ্রেণী মানসিকতা পোষণ করতেন এবং
কেমন ছিল তৎকালীন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ। ভিন্নমত
পোষণকারী সমধর্মীয়দের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা ব্যাপকসংখ্যক মুসলিমদের মনে সন্দেহের
উদ্রেক করে। ধর্মের বিধিব্যবস্থা ও
বাহ্যিক আচার আচরণের উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপের বিষয়টি ভালোভাবে গ্রহণ করেননি
অতীন্দ্রিয়বাদ বিশ্বাসী ব্যক্তিগণ কারণ তাঁরা মনে করতেন যে এগুলি হল মুসলিম ধর্মের
মর্মবস্তুর অযোগ্য বহিঃপ্রকাশ। মানুষের আচরণ সত্যিকারের নৈতিক করে তুলতে অন্তরের
যে শুচিতা আনা প্রয়োজন তাইই হল ধর্মের মূল মর্মকথা যা জিহাদের মাধ্যমে অর্জন করা
যায়। জিহাদকে শুধুমাত্র সশস্ত্র সংগ্রামের স্তরে নামিয়ে আনার তীব্র বিরোধিতা করেন তাঁরা। আরবীয় সম্প্রসারণের
প্রয়োজনে যেভাবে জেহাদকে রাজনৈতিক দিক থেকে ব্যবহার করা হয়েছে, তার তুলনায় অনেক
বৃহত্তর আঙ্গিকে জিহাদকে সংজ্ঞ্যায়িত করেছে কোরান। তরবারির সাহায্যে যার বিস্তার
ঘটনা হয়েছিল তা ইসলামের রাজনৈতিক আধিপত্য, ইসলাম ধর্ম নয়। আধুনিককালে কিছু পণ্ডিত
ব্যাক্তিবর্গের রচনাসমূহে যেসব অনুশাসন ও ইশ্বরতত্ত্বের উপর গুরুত্ব প্রদান করা
হয়, তার ফলশ্রুতিতে জিহাদ প্রশ্নাতীতিভাবে হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইসলামের শত্রুদের
বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম। অতি সম্প্রতি, একদিকে জিহাদকে মুসলিম ধর্ম্বিশ্বাসের
এক ধারা হিশেবে বিবেচনা করা হয়, অন্যদিকে তাকে আখ্যা দেওয়া হয় সন্ত্রাসবাদের
সমপর্যায়ভুক্ত বলে। অন্তর্নিহিত অর্থ থেকে বিযুক্তি ঘটিয়ে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে
নিরন্তর যুদ্ধের স্তরে একে নামিয়ে আনাউ জিহাদ এখন ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টির
ব্যবস্থাপত্রে পরিণত হয়েছে এবং অবস্থান নিয়েছে ইসলামের মঊল ধারণার বিপরীতে। জিহাদ
শব্দটির জাতীয় এবং আন্তর্জার্তিক সংবাদ শিরোনামে থাকা এখন কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম অনেকটা জুড়েই থাকছে এই শব্দটা। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে
কিছু বহুল ব্যবহৃওত শব্দকে – যেমন, ‘ফতোয়া'’,
‘মোল্লা’ এবং ‘শরিয়ত’। ‘জিহাদ’ বলতে সংবাদমাধ্যম বোঝাতে চাইছে যুদ্ধ বা
হিংসাত্মক উপায়ে কোনো কিছুর আদায়কে। (১৮৬৯ সালে ইংরাজি ভাষায় জিহাদ শব্দটি জায়গা
করে নেওয়ার পর থেকেই জিহাদ বলতে বোঝানো হয় ইসলামের নামে ধর্মযুদ্ধ যেটা মুসলিমদের
একটি ধর্মীয় কর্তব্য। মেরিয়ম অয়েবস্টার- কলেজিয়েট ডিকশনারি (১১ তম সংকলন, ২০০৩)
সুত্রে ধারনাটি প্রযুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি একথাও বলা উচিত যে, তাঁর একটা হাদিস বা
বানীতে মহম্মদ ঈঙ্গিত করেছিলেন, পাপ কাজ বা দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকার সংগ্রামটাই
কোনো মানুষের পক্ষে সবচেয়ে বড় জিহাদ)। পশ্চিমি বৈদ্যুতিন ইন্টারনেট
মাধ্যম Wikipedia ভূমিকায় জিহাদকে যেভাবে
ব্যাখ্যা করেছে, তা তুলে দেওয়া হল, “Jihad , an Islamic term, is a
religious duty of Muslims. In Arabic, the word jihād translates as a
noun meaning "struggle". Within the context of the classical Islam,
particularly the Shiahs beliefs, it
refers to struggle against those who do not believe in the Islamic God (Allah).[ However, the
word has even wider implications.Jihad means "to struggle in the way of
Allah". Jihad appears 41 times in the Quran and frequently
in the idiomatic expression "striving in the way of God (al-jihad fi
sabil Allah)".A person
engaged in jihad is called a mujahid; the plural is mujahideen. Jihad is an
important religious duty for Muslims. A minority among the Sunni
scholars sometimes refer to this duty as the sixth pillar of Islam, though it occupies no such official
status.In Twelver Shi'a Islam, however,
Jihad is one of the 10 Practices of the Religion.
There are two commonly accepted meanings of jihad: an inner spiritual
struggle and an outer physical struggle. The
"greater jihad" is the inner struggle by a believer to fulfill his
religious duties. This non-violent meaning is stressed by
both Muslim and non-Muslim authors.
However, there is consensus amongst Islamic scholars that the concept of jihad
will always include armed struggle against persecution and oppression. The "lesser jihad" is the physical struggle against
the enemies of Islam. This physical struggle can take a
violent form or a non-violent form. The proponents of the violent form
translate jihad as "holy war",although some Islamic
studies scholars disagree. The Dictionary of Islam and British-American orientalist Bernard Lewis both argue
jihad has a military meaning in the large majority of cases. Some scholars
maintain non-violent ways to struggle against the enemies of Islam. An example
of this is written debate, often characterized as "jihad of the pen".
1. According to
the BBC, a third meaning of jihad is the struggle to build a good society. In a commentary
of the hadith Sahih Muslim, entitled
al-Minhaj, the medieval Islamic scholar Yahya ibn Sharaf al-Nawawi stated that
"one of the collective duties of the community as a whole (fard kifaya) is
to lodge a valid protest, to solve problems of religion, to have knowledge of
Divine Law, to command what is right and forbid wrong conduct. সুত্রঃ – (http://en.wikipedia.org/wiki/Jihad)”।
আবার ডঃ আমির আলীর মতে ঃ – “In the West, “jihad” is generally translated as “holy
war”, a usage the media has popularized” । সুত্র ঃ - http://www.aboutjihad.com/jihad/jihad_explained.php ।
জিহাদ নিয়ে মুল্যায়ন ও তার ব্যাখ্যা
করেছেন ইসলাম দুনিয়ার সুবিদিত ওয়েবসাইট www.islamreligion.com । “Islam, a religion of mercy, does not permit terrorism. In the Quran, God has
said:“God does not forbid you from showing kindness and dealing justly with
those who have not fought you about religion and have not driven you out of
your homes. God loves just dealers.”
(Quran 60:8)The Prophet Muhammad, may the mercy and blessings of God be upon
him, used to prohibit soldiers from killing women and children,[1] and he would advise them: “...Do not betray, do not be excessive, do not
kill a newborn child.”[2] And he also said: “Whoever has killed a person having a treaty
with the Muslims shall not smell the fragrance of Paradise, though its
fragrance is found for a span of forty years.”[3]Also,
the Prophet Muhammad has forbidden punishment with fire.[4]He once listed murder as the second of
the major sins,[5] and he even warned that on
the Day of Judgment, “The first cases to be adjudicated between people on the
Day of Judgment will be those of bloodshed.[6]”[7]Muslims
are even encouraged to be kind to animals and are forbidden to hurt them. Once the Prophet Muhammad
said: “A woman was punished because she imprisoned a cat until it died. On account of this, she
was doomed to Hell. While she imprisoned it, she did not give the cat food or
drink, nor did she free it to eat the insects of the earth.”[8]He
also said that a man gave a very thirsty dog a drink, so God forgave his sins
for this action. The Prophet, may the mercy
and blessings of God be upon him, was asked, “Messenger of God, are we rewarded
for kindness towards animals?”
He said: “There is a reward for kindness to every living animal or human.”[9]Additionally,
while taking the life of an animal for food, Muslims are commanded to do so in
a manner that causes the least amount of fright and suffering possible. The Prophet Muhammad said:
“When you slaughter an animal, do so in the best way. One should sharpen his
knife to reduce the suffering of the animal.”[10]In
light of these and other Islamic texts, the act of inciting terror in the
hearts of defenseless civilians, the wholesale destruction of buildings and
properties, the bombing and maiming of innocent men, women, and children are
all forbidden and detestable acts according to Islam and the Muslims. Muslims follow a religion
of peace, mercy, and forgiveness, and the vast majority have nothing to do with
the violent events some have associated with Muslims. If an individual Muslim
were to commit an act of terrorism, this person would be guilty of violating
the laws of Islam.সুত্র ঃ – ([1] Narrated
in Saheeh Muslim, #1744, and Saheeh Al-Bukhari, #3015.[2] Narrated in Saheeh Muslim, #1731, and Al-Tirmizi,
#1408.[3] Narrated in Saheeh Al-Bukhari, #3166, and Ibn
Majah, #2686.[4] Narrated in Abu-Dawood, #2675.[5] Narrated in Saheeh Al-Bukhari, #6871, and Saheeh
Muslim, #88.[6] This means killing and injuring.[7] Narrated in Saheeh Muslim, #1678, and Saheeh
Al-Bukhari, #6533.[8] Narrated in Saheeh Muslim, #2422, and Saheeh
Al-Bukhari, #2365.[9] This saying of Muhammad has been mentioned in more
detail on this page. Narrated in Saheeh
Muslim, #2244, and Saheeh Al-Bukhari, #2466.[10] Narrated in Saheeh Muslim, #1955, and Al-Tirmizi,
#1409.)
ইসলামের প্রসার কি তরবারি দ্বারা হয়েছিল?
প্রচলিত বিশ্বাস বনাম প্রকৃত যুক্তি ও তথ্য।
এই বিষয়ে বক্তব্য রাখছে ওয়েবসাইট www.islamreligion.com । It is a common misconception with some non-Muslims
that Islam would not have millions of adherents all over the world, if it had
not been spread by the use of force.The following points will make it clear,
that far from being spread by the sword, it was the inherent force of truth,
reason and logic that was responsible for the rapid spread of Islam.Islam has
always given respect and freedom of religion to all faiths.
Freedom of religion is ordained in the Quran itself:“There shall be no
compulsion in [acceptance of] the religion. The right course has become
clear from the wrong.” (Quran 2:256)The noted historian De Lacy O’Leary
wrote:[1]
“History makes it clear however, that the legend of
fanatical Muslims sweeping through the world and forcing Islam at the point of
the sword upon conquered races is one of the most fantastically absurd myths
that historians have ever repeated.”The famous historian, Thomas Carlyle, in
his book Heroes and Hero worship, refers to this misconception about the
spread of Islam: “The sword indeed, but where will you get your sword? Every
new opinion, at its starting is precisely in a minority of one; in one man’s
head alone. There it dwells as yet. One
man alone of the whole world believes it, there is one man against all men. That
he takes a sword and tries to propagate with that will do little for him. You
must get your sword! On the whole, a thing will propagate itself as it can.”If
Islam was spread by the sword, it was the sword of intellect and convincing
arguments. It is this sword that conquers the hearts and minds
of people. The Quran says in this connection:“Invite to the
way of your Lord with wisdom and good instruction, and argue with them in a way
that is best.” (Quran 16:125)।
ইতিহাস, সভ্যতার বিকাশ ও সময়কালীন দেশের তথ্য এর
সাক্ষ্য বহন করে।
১) ইন্দোনেশিয়া এমন এক দেশ যেখানে পৃথিবীর মুসলিম
শতাংশে বিচারে সবথেকে বেশী মুসলমান বাস করে আর কোনো দেশের জনসংখ্যার শতাংশে সবথেকে
বেশী মুসলমান বাস করেন মালয়েশিয়া তে। এইসব দেশগুলিতে কোনকালে মুসলমান যোদ্ধারা
প্রবেশ করেনি। এটা ঐতিহাসিক নিরিখে প্রতিষ্টিত যে ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম প্রবেশ ও বিস্তার লাভ করেছিল কোন যুদ্ধে
কারণে নয় কিন্ত ইসলামের নৈতিক এবং মতাদর্শের কারণে। বিভিন্ন
দেশ থেকে ইসলামধর্মী সরকারের অপসারণের পরেও , সে দেশের আদি নাগরিকরা মুসলমানই থেকে
যান। তাছাড়া এই নাগরিকবৃন্দরা, বিভিন্ন রকমের তাড়না, নিপীড়ন সত্ত্বেও ইসলাম ধর্মের
আদর্শের প্রতি অনুরক্ত থেকে ইসালী শান্তি
এবং সত্যের বাণী প্রচার করতে থাকেন। সিরিয়া, জর্ডন, মিসর, উত্তর আফ্রিকা, এশিয়া,
বালকান প্রদেশ আর স্পেনের ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। এই সত্য প্রমাণ করে,
সেসব দেশের জনমনে ইসলামের শান্তি, সাম্য ও সহনশীলতার মতাদর্শের প্রভাব কিন্ত তুলনামূলক ভাবে পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদী পদলেহী
বুদ্ধিজীবিরা সযত্নেই এড়িয়ে যায় তাদের দেশের উপনিবেশে শোষণ, যন্ত্রনা, জমি এবং
সম্পদ থেকে বিতাড়নে অনুসৃত নীতির ঐতিহাসিক
সত্যতা।
২) মুসলিম সম্রাটরা স্পেন দেশে রাজত্ব করে প্রায় ৮০০
বছর ধরে। এই সময়ে সেখানকার হিহুদী , খৃষ্টান বা অন্য ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষেরা
স্বাধীভাবে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই তাদের ধর্ম
পালন করে গেছেন যা এক ঐতিহাসিক সত্য পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদী পদলেহী বুদ্ধিজীবিরা
সযত্নেই এড়িয়ে যান।
৩) মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামতন্ত্রী রাষ্ট্রগুলিতে হিহুদী
ও খৃষ্টান সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুরা নিশ্চিন্তে এবং নির্বিবাধে বাস করেছেন শতাব্দীর
পর শতাব্দী ধরে। ইজিপ্ট, মরক্কো, প্যালেষ্টাইন, লেবানন, সিরিয়া আর জর্ডন প্রভৃতি
দেশগুলোতে উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যায় হিহুদী ও খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন।
৪) বর্তমান আমাদের দেশে ৮০% এর ওপর অমুসলমান
সম্প্রদায়ের মানুষের বাস যদিও এ দেশে মুসলিম শাসকরা প্রায় হাজার বছর ধরে শাসন করেন
এবং শাসকগষ্ঠির সমস্ত মানুষকে ধর্মান্তকরণের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও।
৫) ইসলাম আফ্রিকা মহাদেশের পূর্বউপকূলে প্রভাব
বিস্তার করেছিল যদিও সেইসব অঞ্চলে মুসলিম যোদ্ধাদের আগমনের কোনো ঐতিহাসিক নজির
নেই।
৬) ১৯৩৪
থেকে ১৯৮৪ সাল, অর্থাৎ এই পঞ্চাশ বছরে ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষের বৃদ্ধির একটা তথ্যে
দেখা যাচ্ছে সব থেকে বেশী পরিমাণে ধর্মান্তরিত হয়েছে ইসলামে ( ২৩৫%) এবং খৃষ্টানদের
ক্ষেত্রে (৪৭%)। আশাকরি ঐ পঞ্চাশ বছরে কোনো ইসলামী আগ্রাসন হয়েছে, উন্মাদ ছাড়া কেউ
স্বীকার করবেন না। কিন্ত ইসলামের অগ্রগতি ঘটছে। (সুত্রঃ - An article in Reader’s Digest ‘Almanac’,
yearbook 1986, gives the statistics of the increase of the percentage of the
major religions of the world in half a century from 1934 to 1984. This
article also appeared in The Plain Truth magazine. )।
৭) বর্তমানে সবথেকে বেশী ইসলামের অগ্রগতি ঘটছে
মার্কিন প্রদেশে ও য়ুরোপে যদিও মুসলিমরা এই সব প্রদেশে মুসলান সম্প্রদায়ের মানুষ
সংখ্যালঘু কিন্ত তাদে কাছে একমাত্রে একটাই তরবারি আছে ধর্মীয় সত্য ও মতাদর্শের তরবারি যার দ্বারা
হাজারে হাজারে মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে।
এইসব কিছু উদাহারণে এই বিশ্বাস নাকচ হয়ে যায় যে ইসলাম তরবারি দ্বারা তার
বিস্তার ঘটিয়েছিল। “ইসলামের তরবারি” মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে অমুসলমান সংখ্যালঘু
দের ধর্মান্তরিত করেনি। ভারতবর্ষে মুসলমানেরা এখনও সংখ্যালঘু । মার্কিন প্রদেশে
ইসলাম সবথেকে অগ্রগামী ধর্ম এবং তার মতাদর্শের ছয় মিলিয়ন অনুগামী বর্তমান। হাস্টন স্মিথ
তাঁর বই “The
World’s Religions” আলোচনা করেছেন কিভাবে
মহম্মদ, মুসলমান শাসনে সমস্ত ধর্মীয়
মানুষের ধর্মাচারণের স্বাধীনতা স্বীকৃতি
দিয়েছেন ও নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন। (The Prophet had a document
drawn up in which he stipulated that Jews and Christians “shall be protected from all insults and
harm; they shall have an equal right with our own people to our assistance and
good offices,” and further, “they
shall practice their religion as freely as the Muslims.”- Quoted in
The World’s Religions by Huston Smith, Harper Collins, 1991, p. 256- Smith
points out that Muslims regard that document as the first charter of freedom of
conscience in human history and the authoritative model for those of every
subsequent Muslim state.)। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিশেষ করে
মহম্মদের ব্যক্তিজীবন ও তাঁর ভূমিকা সম্বন্ধে পশ্চিম রক্ষণশীল খৃষ্টানদের ঘৃণা ও
বিদ্বেষমুলক রচণা পরবর্তীকালে বহু ভুলের জন্ম দিয়েছে। মধ্যযুগে খৃষ্টান জগতে
মহম্মদ সম্পর্কে ভীতি, বিদ্বেষ ও ঘৃণা একজাতীয় একপেশে পক্ষপাতমূলক মনোভাবের পরিচয়
দিয়েছে, যা আজও নানাভাবে নানাজনের লেখাতে পাওয়া যায়। দাঁন্তে তাঁর ‘Divime Comedy’ তে “দিব্যদৃষ্টি” দ্বারা প্রত্যক্ষ্য করেছেন যে নরকে অসহ্য যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে
পরিত্যক্ত মানুষ হিসেবে মহম্মদের সাজা হচ্ছে, তখন তিনি তাঁর সমকালীন খৃষ্টানদের
অনুভূতিকেই তুলে ধরেন, যারা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি যে খৃষ্টান ধর্মের উত্থানের
পরেও আর একতা ধর্ম এসে যাবে, বিশ্বজুড়ে তা আধিপত্য বিস্তার করবে। ফলে শুরু হয়ে যায়
ইসলাম সম্পর্কে ব্যক্তি মহম্মদের
ভাবমূর্তি নিয়ে বিকৃত ধারণার সৃষ্টি করার পদ্ধতি, তার বিরুদ্ধে ‘জালিয়াতির’
অভিযোগ, তাঁর ব্যক্তিগত “যৌন ব্যভিচারমূলক’ জীবনকে চিত্রায়িত করার প্রচেষ্টা।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই চিত্রায়নকেই ইউরোপীয় যুক্তিবাদীরা বিনা প্রশ্নে গ্রহণ
করেছেন। যাজকদের সঙ্গে এহেন যুক্তিবাদীদের তফাৎ একটাই--- যাজকরা শুধু ইসলামকেই এবং
তার প্রবক্তার দর্শণ কে আক্রমণ করেছিলেন, যুক্তিবাদীরা সব ধর্ম সম্পর্কেই কম-বেশী
একই কথা বলেছিলেন। একথা অনস্বীকার্য্য যে ইসলাম একটা সারা পৃথিবীব্যাপী ধর্ম। তবুও
বিশ্বজুড়েই ইসলাম সম্পর্কে একটা বিশেষ নির্দিষ্ট ধারণা গড়ে উঠেছে; ৯/১১ মার্কিন
প্রদেশে ঘটনা ঘটার বহু বহু আগে থেকেই। ম্যাক্স
ওয়েবারের মতো সমাজবিজ্ঞানীরা ইসলামকে ‘warrior religion’ বলেছেন। হালফিলের
লেখক হাটিংটন তো ‘Clash of
Civilization’- এর তত্ত্ব আমদানী করেছেন; দেখাতে
চেয়েছেন ভয়ংকর ইসলামের সঙ্গে গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল পশ্চিমের সংঘাত। এই জাতীয়
স্টিরিওটাইপ ইমেজে ইসলাম ভয়ংকর, হিংস্র, সংকীর্ণ, পিতৃতান্ত্রীক, ধর্মান্ধ।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জীবনবোধকে ধ্বংস করে দিচ্ছে তা। ইসলামের মুখ কী? বোরখায় অবগুন্ঠিত নারী মুখ ( পরে আলোচিত হবে)।
আফগানিস্তানে আমেরিকার ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তালিবানীরা শুধু পরাস্ত হয়,
(প্ররাস্ত হত না যদি সাধারণ মুসলমান জনসমর্থন তাদের সঙ্গে থাকতো), নারীমুক্তি
ঘটেছে , অবগুণ্ঠন খুলে দিচ্ছে আফগানি মহিলারা। এই লিংগবৈষম্য – ভিত্তিক
স্টিরিওটাইপ ইমেজ ফুঁৎকারে নস্যাৎ করে সমকালীন সময়ে দেশে দেশে মুসলিম সমাজে বহু
ধরনের নারীদের লড়াই ও সক্রীয়তাকে; এক কলমের খোঁচায় নস্যাৎ করে আফগানি উওমেন
আয়সোসিয়েশনের (RAWA) তালিবানি মৌলবাদের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রামের কাহিনীকে; আবার
তারাই মনে করে, তাদের দুর্দশা দূর করার জন্য আমেরিকার আফগানিস্তনা আক্রমণ কোনো উওর
নয়, তারা ধিক্কার জানার আমেরিকাকে। প্যালেস্তানীয় মহিলাদের ‘আত্মঘাতী মানবী বোমা’
নতুন ধরনের ‘নারীবাদী বীরত্বের’ কাহিনী হিসাবে বন্দিত, যা স্টিরিওটাইপ ইমেজের সাথে
খাপ খায় না। পাকিস্তান, ভারতে ইসলামীয় কাঠামোর মধ্যে থেকেও লড়াই –এর ঘটনাও সেই
ইমেজকে চ্যালেঞ্জ জানায়। বারবার প্রমানিত হচ্ছে, ইসলামের একটিমাত্র স্বর নেই, অন্য
স্বর আছে, বহু স্বর আছে। বাংলাদেশের শাহবাগ, ইজিপ্টের তাহরির স্কোয়ার, ঈস্তামবুল
এর নানান গনতান্ত্রিক প্রবাহ আজ এই স্টিরিওটাইপের তত্ত্বকে খারিজ করে দিয়েছে।
অন্যান্য সব রাজনৈতিক মতবাদের মতোই ইসলামিয় রাজনৈতিক মতবাদও
তার নিজের পক্ষে উপযোগী এবং প্রয়োজনীয় কিছু কার্যসাধন করে নিতে চায়। (সুত্রঃ – দি
ইভল্যুশন অব ‘জিহাদ’ ইন ইসলামিস্ট পলিটিকাল দিসকোর্স ঃ হাউ এ প্লাস্টিক কনসেপ্ট
বুকেম হার্ডার, ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যটেজিক আয়ন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (আই এস
আই এস), মালয়েশিয়া; http://www.ssrc.org/sep 11/essays/noor-text-only.htm. )। জিহাদের ধারণাকেও অনেক সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
চরিতার্থ করতে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এর জন্য বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস
হিসাবে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসলামের প্রতি
ঘৃণার , কুৎসা রটানোর মনোভাবও এজন্য তীব্র হয়েছে। ইসলাম চিহ্নিত হয়ে গেছে এমন একটা
কারণ হিসাবে যার প্রভাব বহুজাতি বা বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে ঐক্য বা সহাবস্থানের
ক্ষেত্রে মারাত্মক। ইসলামীয় বা আরবীয় দেশগুলির (ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো যেসব
দেশে জিহাদি মতবাদের জন্য বহু নিরিহ মুসলিম প্রতিনিধি মারা যাচ্ছেন) সরকারের
স্থিতিশীলতার পক্ষে এটি বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হয়েছে। (সুত্রঃ – মজিদ কিয়ালি ঃ ‘দি
ইভল্যুশন অব জিহাদ কনসেপ্ট ইন ইসলামিক থট ঃ আ নিউ বুক অন হট ইস্যুস’; অল-হায়াত,
ইস্যু নং ১৬৩৫৩, তারিখ ঃ ১২/০১/২০০৪, পৃ। ১৬)। আগেই উল্লিখিত জিহাদ শব্দটা এসেছে
জুহাদা থেকে যার মানে পরিশ্রম বা সংগ্রাম করা। কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর
জন্য সক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে কাজ করাকেই বলে জিহাদ। যেহেতু শ্ত্রুর সঙ্গে
যুদ্ধ করাটাও সেই পর্যায়েরই কাজ তাই যুদ্ধকেও জিহাদ বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।
এখানে একটা বিষয় খেয়াল করা আবশ্যক যে শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ মাঝেমধ্যে ঘটে থাকে যা
ব্যতিক্রমী ঘটনা। কিন্ত যথার্থ অর্থ করতে গেলে জিহাদ শব্দটা একজন প্রকৃত
ঈশ্বরবিশ্বাসীর জীবনের প্রতিটি দিন বা রাতের সঙ্গে পলে পলে জড়িত থাকে। জিহাদের
তিনটে বিশেষত্ব রয়েছে। প্রথমত, এটা হল মানুষের অহং-এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম। রিপু,
কামনা এবং অন্যায় করার ইচ্ছা থেকে বিরত থেকে একজন সৎ এবং ঈশ্বরবিশ্বাসীর মতো
জীবনযাপন করার লড়াই। দ্বিতীয়ত জিহাদ হল শান্তিপূর্ণ পথে ভগবানের বাণী মানুষের
মধ্যে প্রচার করার চেষ্টা। এজন্য একজন ধর্ম-প্রচারককে মানুষের সুখদুঃখের সঙ্গে
একাত্ম হতে হয়, তাঁদের প্রতি দরদি হতে হয়। যদিও সবসময় একজন প্রচারক এইরকম ব্যবিহার
ফিরে পান না। কোরাণ-এর মতে এটাই হল মহান জিহাদ। সবশেষে জিহাদের তৃতীয় বিশেষত্ব হল,
নিজের ধর্মবিশ্বাসের প্রতি একনিষ্ট থেকে শত্রু-র আক্রমণ প্রতিহত করা। অতীতেও
জিহাদের এই তৃতিয় বিশেষত্ব শান্তিপূর্ণ উপায়ই বোঝাত, এখনও তাই বোঝায়। সুতরাং, সঠিক
অর্থ করতে গেলে, জিহাদ এক শান্তিপুর্ণ সংগ্রাম, সামরিক কাজ বা যুদ্ধ নয়। (সুত্র ঃ-
মৌলানা ওয়াহিদ্দুদিন খান – ২০০৫ ঃ রিভিজিটিং দ্য কনসেপ্ট অব জিহাদ ইন ইসলাম, আমন-
এ –আমন ( গ্লোবাল পিস), গুডয়ার্ড বুকস। নিউ দিল্লী, পৃ, ২৭-৩৭, উর্দূতে লেখা)। অন্য
ধর্মের প্রতি সহনশীলতা ইসলাম বারবার
ব্যক্ত করেছে। কোরানেই বলা আছে, তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার। অথবা ধর্ম নিয়ে
বাড়াবাড়ি করো না। ইহুদিদের সঙ্গে মহম্মদ চুক্তিতে গেছেন শান্তি প্রতিষ্টার জন্য।
যেটা অনাক্রমণ চুক্তির সঙ্গে তুলনীয়। অন্যদের প্রতি যখন হিংস্র আক্রমণের কথা বলা
হচ্ছে তখন চলছে যুদ্ধের বর্ণনা। নিজেদের মতামত এবং অধিকার প্রতিষ্টার লড়াইতে জয়ী
হবার বাসনা। সেখানে নম্র ভাষণের প্রত্যাশা বাতুলতা মাত্র। মহাভারতের
পাতায় পাতায় এমনই বর্ণনা আছে অন্য আঙ্গিকে। কিন্ত সব ধর্মই অপূর্ণতা নিয়ে পথ চলে, অশান্তি নিয়ে পথ
চলে, দ্বন্দ হয় অনিবার্য্য, হিংসা ও শান্তিকে নিয়েই পথ চলে কিন্ত শান্তি প্রতিষ্টায় মানবিকতার বিষয়ে উর্ধে তুলে
ধরে। ইসলাম সেক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম নয়।
কোরাণে জিহাদ বলতে সদারণভাবে বোঝায় আল্লার নির্দেশিত
পুথে চলার সংগ্রাম। প্রাচীণ উম্মাহ সম্প্রদায়ের লোকজন এটা বলতে বুঝিয়েছেন শত্রুর
বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ইসলামি আইন বা শরিয়তের
দ্বিতীয় কৃর্তৃত্বকারী সূত্র হল হাদিস। এই হাদিসে জিহাদ বলতে বোঝানো হয়েছে সশস্ত্র
সংগ্রাম। মুসলিম ইতিহাসের প্রথম তিন শতকে ইসলামি ধর্মশাস্ত্রজ্ঞ এবং আইনজ্ঞরা
আল্লার প্রতি মুসলিমদের সামরিক দায়বদ্ধতা বা কর্তব্যকেই বলতেন জিহাদ। (সুত্র ঃ-
ডগলাস ই স্ট্র্যাসেন্ড (১৯৯৭)ঃ What
does Jihad mean? Middle East quarterly, September)।ইসলামের প্রথম দিককার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে
বোঝা যায় কেন “জিহাদ” শব্দটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিংসা বা সশস্ত্রযুদ্ধ বোঝাতে
ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রাক-ইসলাম আরব ছিল বিভিন্ন উপজাতি অধ্যুষিত। যুদ্ধের
মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যে – কোনো বিবাদ মেটানোই সেই সমাজের রীতি ছিল। ইসলাম
বিশেষজ্ঞ আসগর আলি ইঞ্জিনিয়ারের মতে, , জিহাদের সাথে হিংসার সম্পর্কে এটাই হল
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। একইসঙ্গে তিনি এই ধারণা সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ
দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রাক-ইসলামীয় আরব সমাজ, এই উপজাতিক রীতিনীতি এবং ধ্যানধারণা
দ্বারা পরিচালিত হত। তাই বলে আধুনিক সমাজেও এই প্রাচীন চিন্তাভাবনা প্রযুক্ত করার
কোনো মানে হয় না। (সুত্র ঃ- আসগর আলি ইঞ্জিনিয়ার(২০০৮)ঃ জিহাদের প্রকৃত অর্থ, http://dawoodibohras.com/news/176/64/The real meaning of Jihad/d.pdb-detail-article/)।ইসলামি আইন দ্বারা শাসিত দেশে (দার-অল-ইসলাম) এবং যে
সব দেশে ইসলামের শাসন নেই (দার-অল-হার্ব- ইসলামের ব্যাখ্যায় যুদ্ধের অঞ্চল), এই
দুই জগতের মধ্যেকার দ্বন্দের মধ্যেই জড়িয়ে আছে জিহাদের ব্যাখা। একটা বিশ্বাস আছে
যে দার-অল-ইসলাম সারা জগত জুড়ে জড়িয়ে না পড়লে জিহাদ চলবে। কিন্ত তার অর্থ এই নয় যে ইসলামের ধর্মগুরু ও আইনজ্ঞরা
আশা করেন পৃথিবী থেকে সমস্ত অ-মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করে ইসলামি দুনিয়ার সীমা শেষ
পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে এবং এজন্য সব মুসলিমদের অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। কারণ কোরাণে বলা আছে (২:২৬) “ধর্মের ক্ষেত্রে
কোনোরকম জোর খাটানো চলবে না”। বাস্তব ক্ষেত্রে ইতিহাস এই ধর্মান্তকরণে প্রক্রিয়ার
পদ্ধতি কে সমর্থন করে নি। বাংলায় পাল রাজাদের শাসনে বৌদ্ধধর্ম অবলম্বীদের ওপর গোঁড়া
হিন্দুত্ববাদী সেন রাজাদের দমণ – পীড়ন মারমত ধর্মান্তকরণের চেষ্ঠা বিফল হয়েছে।
বৌদ্ধদর্ম্মালম্বীদের অনেকেই ঈসলাম ধর্মগ্রহণ করেন, কিন্ত হিন্দুধর্মে দিক্ষিত করার প্রচেষ্টাকে
প্রত্যাখ্যান করেন। তাই কোরাণের বাক্য
অনুযায়ী, গায়ের জোরে অন্য ধর্মের লোককে মুসলিম করার জন্য জিহাদ চালিয়ে যাওয়ার কোনো
অর্থ নেই। অবশ্য যেকোনো ধর্মনিরপেক্ষ্য গনতান্ত্রীক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের কোনো
প্রনোদনা ছাড়াই সব ধর্মের মানুষের নিজের ধর্মপ্রচার ও শান্তিপূর্ণ্য উপায়ে মানুষের
স্বাধীন চিন্তা-চেতনাকে প্রাধান্য দিয়ে ধর্মবিস্তার করার অধিকার আছে, সেই নিরিখে ইসলাম
ব্যাতিক্রম হবে কেনো? মহম্মদ নিজেই ৬৩০ খৃষ্টাব্দে মক্কাবাসীদের সঙ্গে হুদাইবিয়া
(শান্তি) চুক্তি করেছিলেন। তারপরেও অনেক খালিফা বাইজেন্টাইন সম্রাটদের সঙ্গে
শান্তি চুক্তি করেছিলেন। ইসলাম দুনিয়া বাড়িয়ে নিয়ে যেতেই হবে এই ধারণার
পরিমার্জন করা ঐতিহাসিক অবস্থার চাহিদাতেই দরকার হয়ে পড়লো। আইনজ্ঞরা দার-অল-ইসলাম
এবং দার-অল-হার্ব – এর মাঝখানে আর একটা দুনিয়া অস্তিত্বে প্রয়োজনিতা উপলব্ধি
করলেন। এটা হল দার-অল-আদ (চুক্তির দুনিয়া) বা দার-অল-শুলহ (শান্তির দুনিয়া),
যেখানে অ-মুসলিম শাসকরা অ-মুসলিম প্রজাদের শাসন করেন। সুতরাং জিহাদের প্রাচীন ধারণায় ধর্মের চেয়েও
অভিপ্রায় ও উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক। ( সুত্রঃ – মাইকেল জি ন্যাপ ঃ The concept and practice of jihad in Islam)। তবে
হাদিসে ১৯৯ বার জিহাদের উল্লেখ রয়েছে । ধর্বিশারদ এবং আইনজ্ঞরা এর সবকটাই যুদ্ধ বা
সশস্ত্র সংগ্রাম বলে ব্যাখা করেছেন। তাই জিহাদ মানেই যুদ্ধ, এই ধারণা শতাব্দীর পর
শতাব্দী ধরে চলে এসেছে। তবে এই সমরিক মতাদর্শ খুব কম সময়েই বিভিন্ন মুসলিম জামার
নীতি নির্ধারণে প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার পেয়েছে। আবার কোনো সাধারণ অ-মুসলিম শত্রু
বা রাষ্ট্রের বিরদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতেও এই
নীতি খুব একটা সাহায্য করেনি। আটোমান সাম্রাজ্যকে অনেক সময়ে বলা হয় গাজিদের
সাম্রাজ্য, কারণ বৈধতা পেতে গেলে অটমান সম্রাটদের জিহাদকে নীতি হিসেবে বরণ করতেই
নীতি। কিন্ত অটোমান সাম্রাজ্য বিস্তারে জিহাদই যে একমাত্র
অনুঘটক এবং চালিকাশক্তি তা কিন্ত নয়। অন্যান্য কারগুলির মধ্যে ছিল জনসংখ্যার চাপ
(আর্থ-সামাজিক), অন্য মুসলিম রাজ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা (রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক) এবং
সীমান্ত যুদ্ধের উসকানি (সাম্রাজ্যবাদ)। জিহাদী দর্শণ ছাড়াও অটোমান সাম্রাজ্যের
আদর্শের মধ্যে ছিল তুর্ক-মোগল, পারস্য এবং বাইজেন্টাইন উপাদান(অর্থাৎ
বহুতত্ত্ববাদ)। ভারত উপমহাদেশেও মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তারে এই একই ধরণের উপাদান
সহায়কের ছিল। অন্যত্রও, যেমন পশ্চিম ইরান
এবং এন্যাটলিয়ার শাসক উজুন হাসান আকুইউনলু (১৪৫৩-৭৮) এবং সাফাজিদ শাহ তাহমাস্প
(১৫২৪-৭৬) শুধুমাত্র আদর্শের কারণে জিহাদ কে অবলম্বন করেননি, তাঁরা এই
সাম্রাজ্যবিস্তারে অংশ নিয়েছিলেন শাসনের
বৈধতা বাড়াতে এবং লুঠ করতে। (সুত্রঃ-ডগলাস ই স্ট্র্যাসেন্ড)।
কোরাণ ও হাদিস একটু মন দিয়ে পড়লেই বোঝা যাবে
শুধুমাত্র হিংসা এবং যুদ্ধের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে জিহাদের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ। হাদিসে
অন্তর্মুখী সংগ্রামের কথা বলা হয়েছে। এই গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে কীভাবে একটা
যুদ্ধের পর মহম্মদ বলেছিলেন, আমরা ছোট জিহাদ (অল-জিহাদ অল – আসগার) থেকে ফিরে এলাম
বড় জিহাদের ( অল-জিহাদ অল-আকবর) দোরগোড়ায়। বড় জিহাদ কাকে বলে, তাঁকে এই প্রশ্ন করা
হলে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা হল নিজের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম’। কোনো নামকরা প্রবন্ধ
সংগ্রহে এই হাদিসকে পাওয়া যায় না, কিন্ত মুসলিম রহস্যবাদে (সুফিবাদ) এর প্রগাঢ় রয়েছে। তবে আধুনিক ইতিহাসে দেখা গেছে অনেক ধর্মীয় বা
ধর্মনিরপেক্ষ্য মুসলিম নেতাই জিহাদের দিয়েছেন। কেউ বহির্দেশীয় শত্রুর আগ্রাসন
রুখতে আবার কেউ দেশের মধ্যে রাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দিয়েছেন।
জাতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ক্ষেত্রে জিহাদ শব্দটিকে
যথেচ্ছ ব্যবহার এর ধর্মিয় যথার্থতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, জিহাদ নিয়ে
আধুনিক চিন্তাভাবনা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে যুদ্ধ শুরু করার কারণকে ঘিরে। কিন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে আচরণ কেমন হবে সেটা পায় কোনো
গুরুত্বই পাচ্ছে না। রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে, আধুনিক ধ্যনধারণা নিয়ে সর্বপ্রথম
জিহাদের প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন ভারতীয়
মুসলিমরাই ১৮৫৭’র সিপাহি বিদ্রোহের পরে। ইউরোপীয়দের পাশাপাশি দেশের ধর্মীয় মহলেও
স্যার সৈয়দ আহমেদ খান এবং তার সমসাময়িকদের লেখার কদর ছিল। তাঁরা যুক্তি দিয়ে অবতরণ
করেছিলেন যে শুধুমাত্র আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করাকেই জিহাদ বলা চলে। তাঁরা প্রচার
করতেন ইসলাম একটি শান্তিকামী ধর্ম। (সুত্রঃ মৌলবি চেরাগ আলি (১৯৮৪, প্রথম প্রকাশ
১৮৮৫) ঃ A Critical exposition of the
popular Zihad (দিল্লি ঃ ইদারে আই, আদাবিয়াত আই)।
এখাণে বলা হয়েছে “দেখা যায় যে মহম্মদের করা সবকটা যুদ্ধই ছিল আত্মরক্ষার্থে এবং
আক্রমণাত্মক যুদ্ধ বা জোর করে ধর্মান্তকরণ কোরাণে নিষিদ্ধ। সংযোজনে দেখা যাচ্ছে
জিহাদ বোঝাতে যুদ্ধ বলা হয় নি”)। ভারতীয়, পরে পাকিস্তানি চিন্তাবিদ আবু অল আলা
মাওদুদি (১৯০৩-১৯৭৯) জিহাদ সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণার তথ্যনিষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তাঁর মতে, ইসলামীয় রাজনৈতিক প্রাধান্য বজায় রাখতে যুদ্ধ করে যাওয়াই জিহাদের
একমাত্র বৈশিষ্ট নয়। একটা সঠিক আইনগত ব্যাখ্যা এবং বিভিন্ন ধর্মের স্বাধীনতা
রক্ষাও এর একটি বিশেষত্ব। (সুত্রঃ-ডগলাস ই স্ট্র্যাসেন্ড)।মাওদুদির চিন্তাভাবনাই
‘জিহাদ বলতে ইসলামীয় শাসনের প্রসার’ এই ধারণা থেকে সরিয়ে নিয়ে এসে জিহাদকে
সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এবং জাতীমুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে। এই ধারণাই
ইসরায়েলের আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে আরব প্রতিরোধকে জিহাদ বলে চিহ্নিত করেছে। এই
চিন্তা থেকেই মুহম্মদ শালতুত ১৯৭৩ সালে বলেছিলেন, খ্রিস্টানসমেত সব মিশরবাসীকেই
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জিহাদে যোগ দেওয়া উচিত। এই পথ ধরেই পরে পালেস্তাইন লিবারেশন
অর্গানাইজেশন জেরুজালেমকে স্বাধীন করার ‘ধর্মনিরপেক্ষ্য জিহাদের’ নেতৃত্বে চলে
আসে। (সুত্রঃ – Rudloph Peters
(1979) : Islam and Colonialism the doctrine of Jihad in modern History , পৃঃ ১৩৪)। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে প্রমানিত হচ্ছে যে
জিহাদকে দার অল- ইসলামের সমর্থনে যুদ্ধ বলে প্রচার করলেও এটা কিন্ত সাম্রাজ্যবাদকে ঠেকিয়ে করে কোনো
প্যান-ইসলামিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে
নি। অথবা ইসলামি দুনিয়ার অন্তর্বিভাজনকেও এই জিহাদ ঠেকাতে পারেনি। সম্প্রতি ইরানকে
কেন্দ্র করে মার্কিনি অবরোধকে (অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক) নৈতিক সমর্থন জানাচ্ছে ও
সামরিক সহায়তা দিচ্ছে সৌদি আরদ সহ বিভিন্ন ইসলামিক দেশ। ইরান ও সিরিয়া ওপর আগ্রাসন চালাতে একজোট হবার
তৎপরতা দেখা যাচ্ছে ইসরাইলের নেতৃত্বে বিভিন্ন আরব রাষ্ট্র গুলির। ইরানকে অবরুদ্ধ
করতে এই পরিকল্পনা প্রকাশ্যে ঘোষণা করছে ইসরাইল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ইসরাইল
রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সিরিয়া ও ইরানকে অবরুদ্ধ করতে এবং সামরিক আগ্রাসন
চালাতে আহ্বান জানাচ্ছে মার্কিনমিত্র আরব রাষ্ট্রগুলিকে। মার্কিন মদতপূষ্ট সোউদি রাজতন্ত্র বাহরিনে
গণতান্ত্রিক আন্দোলকে ধ্বংস করতে সামরিক বাহিনী পাঠাতে দ্বিতিয়বার চিন্তা করেনি। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন বর্বতা ও লুণ্ঠনকে
প্রতিরোধ করতে জিহাদের ‘মৌলবাদী’ তত্ত্ব কখনও জাগ্রত হয়নি। উগ্র জায়নবাদ ও উগ্র
ঐস্লামিক সংগ্রাম ও মতাদর্শ এখন সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠন ও হত্যার অভিপ্রায়ে মিলে
মিশে এক হয়ে গেছে। ইতিপূর্বে ইসরাইলের
বিরুদ্ধে মাঝেমাঝেই জিহাদের ডাক দেওয়া হয়েছে। কিন্ত তার পরে ইজরাইলের বিরুদ্ধে তেমন সংঘটিত প্রতিরোধ
গড়ে তোলা যায়নি, বা এই প্রতিরোধকারী শক্তির মধ্যেও অন্তর্বিবাদ বা ভাঙন ঠেকানো
যায়নি। ঐশ্লামিক জিহাদী তরবারির বর্তমান সংস্করণ এখন মার্কিন মৃত্যুর কারবারি লকহিড মার্টিন, বোয়িং প্রভৃতি
কোম্পানির অত্যাধুনিক আগ্নয়াস্ত্র, তফাৎ শুধু একটাই এই সব অস্ত্রের ওপর ছাপ মেরে
দেওয়া হয় চাঁদ-তারার। মার্কিন সেনার আফগানিস্তান বা ইরাকে মৌলবাদী বা
সন্ত্রাসবাদীদের গুলিতে মৃত্যু ঘটলে, তার দেহের ব্যবচ্ছেদ হয় বিদেশে না হয়ে, হয়
মার্কিন প্রদেশে। কারণ সেই দেহ থেকেয় যে বুলেট বেরোবে তার ওপর ছাপ থাকবে ‘Made in USA’ । এই প্রসঙ্গে মৌলানা ওয়াহিদ্দুদিন
খানে যুক্তি, এর ফলে যে সব ধরণের সংঘাত হচ্ছে তার সব কটাই ইসলাম বিরোধী। এর ফলে
সাধারণত দুই ধরণের যুদ্ধ ঘটতে দেখা যাচ্ছে। একটা গেরিলা যুদ্ধ এবং আরেকটা
ছায়াযুদ্ধ। গেরিলা যুদ্ধ ইসলাম বিরোধী কারণ রাষ্ট্র-বহির্ভূত শক্তি এর শরিক হয়ে
পড়ে। আবার ছায়াযুদ্ধও ইসলাম বিরোধী কারণ তাতে এক রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে
সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে না। এটা ইসলাম ধর্ম সমর্থণ করে না। (সুত্র ঃ - মৌলানা
ওয়াহিদ্দুদিন খান (২০০৫) ঃ- Revisiting
the concept of Zihad in Islam, আমন-এ
আলম (গ্লোবাল পিস), গুডওয়ার্ড বুকস, নিউ দিল্লি)। সুতরাং কোরানে কোথাও জিহাদ
শব্দের অর্থ যুদ্ধ বা যুদ্ধ শুরু করা এমন
কথা বলা হয়নি। কোরানে এর অর্থ ‘সংগ্রাম’। যুদ্ধ বা মারামারি বোঝাতে অন্য একটি শব্দ
‘কিতাল’ ব্যবহার করা হয়েছে। কিতালের অর্থ শত্রুরা আক্রমণ করলে তা প্রতিরোধ করতে
যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। (সুত্র ঃ – ফারিদা খানাম (২০০০) Understanding Zihad http://www.jammu.kashmir.com/insights/2000070sa.html )। জিহাদ শব্দটা কোরানে চাওরবার ব্যবহৃত হয়েছে। আরবীয়
শব্দকোষ অনুসারে এর যে অর্থ হয় তা আগেই আলোচিত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটি
উদ্যোগ বা চেষ্টা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে, যুদ্ধ বা মারপিট বোঝাতে নয়। কোরাণে
প্রথম চরণ বা পঙক্তিতে (৯ঃ২৪) ‘জিহাদ ফিসাবিল ইল-লাহ’ বলে একটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে
যার অর্থ ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দিতে মহম্মদকে সাহায্য করা, যুদ্ধ করা নয়। কোরাণের
আরেকটি পঙক্তিতে (২২ঃ ৫২) বলা হচ্ছে ‘অবিশ্বাসীদের কথা শুনো না, বরং তাদের সঙ্গে
কোরান নিয়ে সংগ্রাম বা জিহাদ চালিয়ে যাও’।
কোরানে জিহাদ শব্দ তৃতীয়বারের জন্য এসেছে “মুমতাহানা’ (৬০ঃ১) নামে এক
অধ্যায়ে। এখানে বলা হচ্ছে, “তুমি যদি আমার পথে (জিহাদ) সংগ্রাম করতে চাও এবং আমায়
সন্তুষ্ট করতে চাও”। এই পঙক্তিটি মক্কা দখলের কিছু পরেই প্রকাশিত হয়েছিল। মহম্মদ
তখন মদিনা থেকে মক্কা যাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছিলেন। হুদিয়াইবিয়া শান্তি চুক্তির পর এটা
ছিল শান্তিপূর্ণ ফলাফলের জন্য শান্তিপূর্ণ যাত্রা। যাত্রাপথে একজন মুসলিম চিৎকার
করে বলে উঠেছিলেন, ‘আজকে হচ্ছে যুদ্ধের দিন’। কিন্ত মহম্মদ তৎক্ষণাৎ উত্তর দিয়েছিলেন, ‘না আজকে
ক্ষমা করে দেওয়ার দিন’। বাইশ নম্বর অধ্যায়ে জিহাদ শব্দটা কোরানে চতুর্থবার এসেছে।
এখানে বলা হয়েছে (২২ঃ৭৮), ‘তাঁর প্রদর্শিত পথে সংগ্রাম (জিহাদ) করে যাও যেমন তোমার
করা উচিত’। এখানেও জিহাদ শব্দটা ধর্মের জন্য সংগ্রাম করা বলতে বুঝিয়েছে। মহম্মদ
নিজে ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রামকে ‘জিহাদ-ই-আকবর’ বা বৃহত্তর জিহাদ বলে উল্লেখ
করেছিলেন। এর পাশাপাশি রয়েছে ‘জিহাদ – ই- আসগর’ বা ক্ষুদ্রতর জিহাদের ধারণা – যার
অর্থ আত্মরক্ষার্থে সংগ্রাম। তাই ‘জিহাদ’ ধারণার পুনর্বিচার করাটাই আগামী দিনের
কাজ। শুধুমাত্র গোঁড়া মোল্লাদের হাতে ছেড়ে না দিয়ে ইসলাম নিয়ে আলোচনার দায়িত্ব
পণ্ডিত এবং বুদ্ধিজীবীদেরও নিতে হবে। ভোগোলিক সীমানা বিস্তারের থেকেও বর্তমান যুগে
অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আধুনিকতা এবং নাগরিক সমাজের নির্মাণকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া
হয়। মুসলমান জনতার অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়েই
তাই জিহাদের ধারণাকেও পরিবর্তন করতে হবে। মহম্মদের তাঁর সমকালীন সমাজে ‘জিহাদের’
প্রগতিশীল তত্ত্ব আজকের সমাজে আবার নতুন ভাবে পূনর্গঠন জরুরী যার স্লোগান ছড়িয়ে
দিতে হবে সমগ্র জাতি, বর্ণ, ধর্মের মানুষের মধ্যে মানব মুক্তির উন্নতর সোপান তৈরি
করার জন্য, যেখানে ঐতিহাসিক সমাজপরিবর্তনের অনিবার্য প্রক্রিয়ার জিহাদ হয়ে উঠবে এক
শোষণহীন , সাম্যবাদী ব্যবস্থার প্রতিষ্টার করার অন্যতম উপাদান।